ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা (৪র্থ পর্ব)

Author
বি টি রণদিভে

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হিসেব করে পার্টি ধর্মঘট সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য আবার এক দফা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এক্ষেত্রে তাদের অন্যতম প্রধান সাফল্য অর্জিত হয়েছিল বাংলায় ২ লক্ষ ২৫ হাজার শ্রমিকের চটকল ধর্মঘটে। “ভারতবর্ষে বিপ্লবের পথ সুগম করার” উদ্দেশ্যে ধর্মঘট পরিস্থিতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিক্রিয়াশীল ফজলুল হক মন্ত্রিসভা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল। ফজলুল হক মন্ত্রিসভার বিরোধী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি এই ধর্মঘটকে সমর্থন করেছিল। কমিউনিস্টরাও অটল ছিল।

Role of Communists in India's Freedom Struggle (Part – IV)

৪র্থ পর্ব

সংকীর্ণতাবাদী ভুলের সংশোধন

কমিউনিস্ট পার্টি ও তার আন্দোলনের অগ্রগতিকে দমননীতি দিয়ে আর ঠেকানো যাচ্ছিল না। আগের ভুল সংশোধন করে, জাতীয় নেতৃত্বের শ্রেণিচরিত্র সম্পর্কে বিস্মৃত না হয়েও তাদের ভূমিকা সম্পর্কে একটা সঠিক মনোভাব কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলেছিল। জাতীয় আন্দোলনের অংশ হিসেবে এবং তার একটি অগ্রগামী সহায়ক হিসেবে কাজ করার জন্য উপযোগী এক কর্মকৌশল তারা গ্রহণ করেছিল। তার অর্থ ছিল, ইতোপূর্বেকার অযৌক্তিক ধারণাগুলিকে কাটিয়ে তোলার জন্য ধৈর্য সহকারে কাজ করা কমিউনিস্টরা কংগ্রেসে যোগদান করল ঠিকই, কিন্তু তারা তাদের শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করল না এবং জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কে তাদের বিপ্লবী মনোভাবও বর্জন করল না।

পূর্বের বছরগুলিতে কংগ্রেসের মধ্যে কর্মরত কমিউনিস্টরা কৃষি সমস্যার প্রশ্নে, একটা সঠিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে জাতীয় কংগ্রেসকে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে চেয়েছিল এবং এভাবে জাতীয় সংগ্রামের সঙ্গে কৃষি বিপ্লবকে যুক্ত করতে হয়েছিল। ১৯২৯ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অবিবেশনে কংগ্রেস নেতৃত্বের ডমিনিয়ন স্ট্যাটাসের জন্য দাবির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য সংশোধন প্রস্তাবের সপক্ষে চাপ সৃষ্টিতে সুভাষচন্দ্র বসু ও অন্যান্যদের প্রতি কমিউনিস্টরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানিয়েছিল। একই সঙ্গে, কংগ্রেসের প্রস্তাবে কৃষকদের জরুরি দাবিগুলি অন্তর্ভুক্ত করার সপক্ষে কমিউনিস্টরা নিজেদের তরফ থেকেও একটা সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। কমিউনিস্টদের এই সংশোধনী-প্রস্তাব অবশ্য যথেষ্ট সমর্থন লাভ করেনি এবং পরাজিতও হয়েছিল। তার কারণ, এমনকি প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদীরাও কৃষক জনগণ থেকে বহুদূরে অবস্থান করত এবং কৃষকদের বিপ্লব ও স্বাধীনতার মধ্যে যে জীবন্ত সম্পর্ক সে সম্পর্কে তাদের কোন উপলব্ধি ছিল না।

পূর্বেকার এই সূত্র ধরে ১৯৩৫ সালে কৃষক, শ্রমিক ও যুব সংগঠনগুলিকে জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত করার দেওয়ার জন্য কমিউনিস্টরা এক প্রস্তাব পেশ করেছিল যাতে সমস্ত দেশ জুড়ে চাঞ্চল্য জাগানো বিভিন্ন গণআন্দোলনের মিলিত সমাবেশে কংগ্রেস একটা প্রশস্ত মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। এই প্রস্তাব অবশ্য প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। তার কারণ, কংগ্রেস নিজেকেই সমগ্র ভারতীয় জনগণের একমাত্র ও অদ্বিতীয় সংগঠন বলে জ্ঞান করত। বুর্জোয়া নেতৃত্বে পরিচালিত কংগ্রেসের অবশ্য তখনকার দিনে জনসাধারণের উপর প্রচুর প্রভাব ছিল এবং সেই প্রভাব অন্যান্য যে-কোন গণ-সংগঠনের চেয়ে অনেক বেশিই ছিল।

১৯৩০ সালের কংগ্রেসের সংগ্রামের বিপর্যয়ের পরবর্তীকালে দেশে ও বহির্বিশ্বে ঘটনার অগ্রগতি দ্রুতবেগে ঘটে চলে। যদিও ব্রিটিশ সরকারকে প্রায় কিছুই ছেড়ে দিতে হয়নি বলে মনে হচ্ছিল; কিন্তু এই সংগ্রামের একটা ফল হয়েছিল যে, কংগ্রেসের মর্যাদা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এ বিপর্যয়ের ফলে জাতীয়তাবাদী সাধারণ কর্মীদের এক অংশের মধ্যে নৈতিক অবসাদ নেমে এসেছিল বটে, কিন্তু অন্যদের মধ্যে কংগ্রেসের নীতি ও ধারণাগুলি সম্পর্কে একটা পর্যালোচনা করে দেখার তাগিদ সৃষ্টি হয়েছিল।

সময়টা তখন ছিল এই যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাফল্য সম্পর্কে চাঞ্চল্য জাগানো কাহিনী চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল এবং সারা বিশ্ব জুড়ে সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নতুন অনুরাগীদের আকৃষ্ট করছিল। ইউরোপে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠার এবং স্পেনে গৌরবোজ্জ্বল ফ্যাসিস্ট-বিরোধী গৃহযুদ্ধের কালও ছিল এই সময়টাই। ঘটনাবলীর এই বিকাশের ফলে আমাদের দেশে সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি ক্রমবর্ধিষ্ণু আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়েছিল এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের ভূমিকা ও তাঁর ‘সমাজতন্ত্র কেন’ নামক বইখানি এই প্রক্রিয়াকে খুবই সাহায্য করেছিল। কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির উদ্ভব ছিল তার-ই একটি অংশ। তবে জাতীয়তাবাদী তরুণ প্রগতিশীলরা যেভাবে মার্কসবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল প্রকৃতপক্ষে তার ফলেই এই ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। কমিউনিস্টরা কংগ্রেস-সোশ্যালিস্টদের সঙ্গে এক সঙ্গেই কাজ করছিল এবং অবিলম্বে তার ছাপ তরুণ সমাজতন্ত্রী ও প্রগতিশীলদের উপর গভীরভাবে পড়েছিল। এসবের ফল হলো এই যে, কংগ্রেস-সোশ্যালিস্ট পার্টি গঠনের পাশাপাশি দ্রুতভাবে কমিউনিস্ট পার্টির বৃদ্ধি ও কমিউনিস্টদের প্রভাবের বিস্তার ঘটল। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি কমরেডদের মুক্তিলাভের পরে কেন্দ্রীয় ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টির গঠন এই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করল। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার প্রবীণ নেতৃবৃন্দ বাইরে ফিরে আসার বিষয়টি কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট প্রভাবকে দৃঢ়তর করেছিল এবং বাংলা, অন্ধ্র, মাদ্রাজ এবং ত্রিবান্ধুর ও কোচিন এই দুটি দেশীয় রাজ্যে পার্টি দ্রুতবেগে গড়ে উঠতে থাকল। শেষোক্ত রাজ্য দুটিতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী, জাতপাত-বিরোধী, সামন্ততন্ত্র-বিরোধী এরকম সমস্ত প্রকার প্রগতিপন্থী ধারা থেকে শক্তি সংগ্রহ করে ও তাকে ঐক্যবদ্ধ করে কমিউনিস্টরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

এটাই ছিল সেই সময়ই যখন কংগ্রেসের ভিতর ও বাইরে উভয়দিক থেকেই কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের ভিতরে অবস্থিত বামপন্থীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে চলছিল এবং এইভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অটল যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের এক ভাবমূর্তি অপেক্ষাকৃত ভালভাবে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছিল।

এর থেকে কতিপয় দুর্বলতাও স্পষ্টতই দেখা দিয়েছিল। পূর্বতন দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে ইউনিয়নগত ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজনবোধ এবং এআইটিইউসি-তে সেই সময় কংগ্রেস-সোশ্যালিস্টদের যে প্রাধান্য ছিল, সেই ঘটনাদ্বয় একত্রে যুক্ত হওয়ায় সংগঠনে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিকে দুর্বল করে দেওয়ার ঝোঁক দেখা গেল। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, বহু সংখ্যক ইউনিয়ন সেই সময়ে এআইটিইউসি-র অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এর সদস্য সংখ্যাও হাজারে হাজারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি তখনও পর্যন্ত সর্বত্র পৌঁছতে অক্ষম ছিল এবং তারা নিজেরাও ছিল সংখ্যালঘু। দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে কংগ্রেস-সোশ্যালিস্টরা সর্বহারা শ্রেণিগোত্রীয় ছিল না এবং শ্রমিকশ্রেণির একটি বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা আছে বলেও তারা মনে করত না। বস্তুত এই শ্রেণিকে তারা বুর্জোয়া নেতৃত্বে পরিচালিত জাতীয় আন্দোলনের নিছক একটা উপাঙ্গ বলেই বিবেচনা করত। এই ধ্যানধারণা ও মতাদর্শ যা প্রকৃত পক্ষে পর্যবসিত হতো অর্থনীতিবাদে এআইটিইউসি-তে তখন তারই প্রাধান্য ছিল। দক্ষিণপন্থী সংস্কারবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এটাই খাপ খেয়ে যেত।

যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কিত অংশটি প্রত্যাখ্যান করলেও জাতীয় কংগ্রেস সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, তারা নয়া সংস্কার আইনের প্রাদেশিক ব্যবস্থা সম্পর্কিত অংশটি গ্রহণ করে তদনুযায়ী কাজ করবে। গণ-সংগ্রামে ক্লান্ত জাতীয় নেতৃত্ব এখন যে-কাজ করতে সচেষ্ট হল তা স্পষ্টতই একটা আপস-রফা। কমিউনিস্টরা কংগ্রেস-সোশ্যালিস্ট ও বামপন্থী অন্যান্য জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে একযোগে এই আইন সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যানের সপক্ষে দাবি জানাল। তার কারণ, ১৯৩০ সালের আন্দোলনকালে পূর্ণ স্বাধীনতাকে যে সংগ্রামের লক্ষ্যবস্তু বলে ঘোষণা করা হয়েছিল এটা ছিল তার প্রতি এক অবমাননা। কমিউনিস্ট পার্টি সঙ্গতভাবেই এটা আশঙ্কা করেছিল যে, বিশৃঙ্খল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কবলে পড়া জনগণ তার মোকাবিলায় যখন আর একদফা সংগ্রামের পথ গ্রহণ করতে চলেছে তখন এই সিদ্ধান্ত সেই সংগ্রামের পথ থেকে কংগ্রেসকে অন্যদিকে পরিচালিত করবে।

সে যাই হোক, নির্বাচনে পার্টি কংগ্রেসকেই সমর্থন করল এবং সাম্রাজ্যবাদী ঘেঁষা শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী শক্তির জয় হিসেবেই জনগণের রায়কে তারা অভিনন্দন জানাল। নির্বাচনে জয়লাভকে সাম্রাজ্যবাদী সংবিধানের বিরুদ্ধে যাতে ব্যবহার করা হয় পার্টি সেটাই চেয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট ও বামপন্থী জাতীয়তাবাদীরা যার বিরোধিতা করছিল, ১৯৩৭ সালে সেই মন্ত্রিত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্তই কংগ্রেস করল। ব্রিটিশ প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের অধীনে থেকে এই সংবিধান অনুযায়ী কাজ করতে গেলে জনসাধারণের বিরুদ্ধে যেতে কংগ্রেস বাধ্য ছিল। তাছাড়া, এটা অগ্রগামী কর্মীদের প্রগতিশীল ভাবধারার বিরুদ্ধেও বটে। কিন্তু কংগ্রেস যখন মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে বসল তখন এটাকে একটা বিরাট জয় বলে অভিনন্দন জানিয়ে জনগণের একটা ব্যাপক অংশ তাতে সায় দিল।

এই কৌশলের অব্যবহিত ফলশ্রুতি ঘটল কংগ্রেসের সরকারগুলিকে বিরক্ত না করার ধুয়ো তুলে জনসাধারণের অসন্তোষকে চাপা দেওয়া। নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবের দৌলতে কংগ্রেস নেতৃত্বে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে এভাবে দেখিয়ে দিল যে, গণ-অসন্তোষকে নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা সাফল্যের সঙ্গেই শাসনকার্য চালাতে পারে।

এটা যে বরাবরই সম্ভব হয়েছিল তা নয়; মন্ত্রিসভাগুলির সঙ্গে জনসাধারণের কয়েক দফা সংঘর্ষও ঘটে গিয়েছিল। খ্যাতনামা কমিউনিস্ট নেতা সোলি বাটালিওয়ালার বিরুদ্ধে রাজাগোপালাচারি কর্তৃক রাজদ্রোহ আইনের প্রয়োগের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অন্ধ্রে ও অন্যত্র ব্যাপক গণ-বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল এবং তার ফলে সরকার সেই মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়।

বোম্বাইতে অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছিল। একটি সুতাকল মিলে চলা ধর্মঘটের সূত্র ধরে ডাঙ্গে ও অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের গ্রেপ্তার করে কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা মিলের ক্ষমতাশীল মালিকদের স্বার্থরক্ষায় হস্তক্ষেপ করে বসল। আটক নেতাদের জামিনের আবেদন মাসের পর মাস ধরে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। অপরাধী উপজাতি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করার জন্য অন্যান্যদের সঙ্গে আর একজন কমিউনিস্ট নেতা সরদেশাইকে গ্রেপ্তার করতেও ঐ মন্ত্রিসভা আদেশ দিয়েছিল।

ধর্মঘটকে বেআইনি ঘোষণা করা ও দাবিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে একটি বিল উত্থাপন করে ও তাকে পাস করিয়ে, ইউনিয়নের স্বীকৃতির জন্য শর্তাবলী চাপিয়ে দিয়ে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা পরিস্থিতিকে আরও বেশি খারাপ করে তুলল। তখনও যেখানে কমিউনিস্টদের শক্তিশালী ইউনিয়ন ছিল, সেই সুতাকল শিল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্যই প্রাথমিকভাবে ওই বিল আনা হয়েছিল। বিলটির উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্ট প্রভাবকে হটিয়ে দিয়ে সহজে বশ্য একটা ইউনিয়নের আওতায় শ্রমিকদের নিয়ে আসা। যথাযথভাবে রেজিস্ট্রিকৃত ও স্বীকৃত এই রকম কংগ্রেসি ইউনিয়ন গড়ার ভিত্তি এই আইনের দৌলতে স্থাপিত হয়েছিল। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়নগুলি কংগ্রেসের এই ট্রেড ইউনিয়ন বিলের বিরোধিতা করে গিরনি কামগড় ইউনিয়ন, বোম্বাইয়ের এআইটিইউসি এবং অন্যান্য কতিপয় সংগঠন একদিনের প্রতিবাদ ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানিয়েছিল। গুলিতে দুইজন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা সত্ত্বেও এই ধর্মঘট হয়েছিল এবং শ্রমিকরা এই কালা কানুনের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। বেকায়দায় পড়ে মন্ত্রিসভা এক দাঙ্গা-তদন্ত-কমিটি নিযুক্ত করল, আর সেই কমিটি হিংসাত্মক ঘটনাবলীর জন্য যাবতীয় দোষ কমিউনিস্টদের ও ট্রেড ইউনিয়নগুলির কাঁধে চাপিয়ে দিল।

সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় আন্দোলনের অন্তর্গত চরম বামপন্থী অংশ, এই কমিউনিস্টদের আক্রমণ করতে বুর্জোয়া নেতৃত্ব তাদের মন্ত্রিসভার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা সূত্রে দণ্ডিত দীর্ঘ মেয়াদী কারাবাস শেষে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ডাঙ্গেকেও আবার এক দফা জেলে বন্দি করতে তাদের বিবেকে কোনও যন্ত্রণাবোধ ছিল না।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার জন্য বুর্জোয়া নেতৃত্ব মন্ত্রিসভা গঠন করার সময় পর্যন্তও সবুর করেনি। ১৯৩৬ সালে পত্রপত্রিকা মারফত আজগুবি প্রচার ও কমিউনিস্ট-বিরোধী কুৎসামূলক গালগল্প রটনা ছাড়াও কমিউনিস্টদের রুখতে শ্রমিকদের মধ্যে প্রচারকার্য চালানোর জন্য কংগ্রেসের থেকে ‘গান্ধী সেবা সংঘ’ গঠন করা হয়েছিল। গিরনি কামগড় ইউনিয়নের অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করার জন্য এই সংঘ ব্রিটিশ প্রশাসনের শ্রমবিভাগের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন কর্তৃক এই সংঘের পৃষ্ঠপোষকতাও করা হয়েছিল।

মন্ত্রিসভার দ্বৈত চরিত্রের অভিব্যক্তি একই সঙ্গে পরিলক্ষিত হয়েছিল। এরা যেমন কমিউনিস্টদের ধ্বংস করে ফেলতে চাইত, অন্যদিকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধাদি দিয়ে শ্রমিকদের তেমনই বশে আনতে চাইত। মন্ত্রিসভা কর্তৃক নিযুক্ত একটি কমিটি ৮ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। গিরনি কামগড় ইউনিয়নও এটাকে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেছিল। মন্ত্রিসভাও তৎক্ষণাৎ কমিটির এই সুপারিশকে মেনে নিল এবং তা যাতে কার্যকরী হয় সেটাও দেখেছিল।

এটা লক্ষ্য করার মতো বিষয় ছিল যে, ট্রেড ইউনিয়নগুলির গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করার জন্য যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামে কিন্তু কংগ্রেস সোশ্যালিস্টদের কমিউনিস্টদের পাশে দেখতে পাওয়া যেত না।

কংগ্রেসি মন্ত্রিসভাগুলি সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টিকেও এ সময়ে দ্বৈতভূমিকা পালন করতে হয়েছিল। একদিকে আমলাতন্ত্র ও কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে মন্ত্রিসভার পক্ষ অবলম্বন করা এবং মন্ত্রিসভা যতটুকু যা রিলিফ দিতে পারছিল তাকে স্বাগত জানানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। অন্যদিকে ছিল, গণ-আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে কংগ্রেসি সরকারগুলির সচেতন প্রয়াসকে প্রতিরোধ করার, নিজেদের স্বাধীন উদ্যোগ বজায় রাখার এবং মন্ত্রিসভা সম্পর্কে প্রতিটা সমালোচনাকে কংগ্রেস-বিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাগুলিকে আটকানোর লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ। সেই সময়ের পরিস্থিতিতে বিশেষ করে জনগণের ব্যাপক অংশের মধ্যে তৎকালীন পরিস্থিতিতে ভাল থাকার যে অনুভূতি এবং যে মোহ কাজ করছিল তাতে এই কাজ করাটা একটা কঠিন বিষয় ছিল। কিন্তু পার্টির কেন্দ্রীয় মুখপত্র ন্যাশনাল ফ্রন্ট-এর সহায়তায় পার্টি তার এই ভূমিকা ফলপ্রসূভাবে পালন করতে পেরেছিল। পার্টিকে যে দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে হচ্ছিল সেটা স্মরণে রেখে জনসাধারণকে পরিচালিত করার জন্য সঠিক নির্দেশ সহ ওই মুখপত্রটি প্রতি সপ্তাহে প্রকাশ করা হতো।

জনসাধারণের বৈধ অধিকারগুলির বিরুদ্ধে কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা প্রত্যক্ষ সংঘাতে জড়িয়েছিল। আহমেদাবাদের সুতাকল শ্রমিক সম্পর্কিত ঘটনাটি তারই একটি জলন্ত উদাহরণ। গান্ধীবাদী শ্রেণি-শান্তির শক্ত ঘাঁটি এই আহমেদাবাদ তখন ধর্মঘটে চঞ্চল। শ্রমিকদের দমন করতে বোম্বাইয়ের কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা পাঁচ ও তার অধিক ব্যক্তির একত্র সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ১৪৪ ধারা সেখানে প্রয়োগ করেছিল।

পক্ষান্তরে কানপুরের ক্ষেত্রে কংগ্রেস ও তার মন্ত্রিসভার এক ভিন্ন রূপ দেখা গিয়েছিল। ১৯৩৭ সালে সেখানে কমিউনিস্টরা স্থানীয় কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে একত্রে সমস্ত শিল্প মিলিয়ে ৪০ হাজার শ্রমিকের এক সফল ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়েছিল। মালিক পক্ষ অনমনীয় ছিল, কারণ তাদের একটা বড় অংশই ছিল ব্রিটিশ মালিকানার স্বার্থের প্রতিভূ। যুক্ত প্রদেশের ঐ ধর্মঘটকে সমর্থন করতে গিয়ে সে রাজ্যের কংগ্রেস সংগঠন ঘোষণা করেছিল, "কানপুরের শ্রমিকরা শুধুমাত্র নিজেদের জন্যই সংগ্রাম করছে না, তারা ভারতের সমগ্র শ্রমিকশ্রেণির জন্যও সংগ্রাম করছে.... এবং সংগ্রাম করছে মানবাধিকারের জন্য।" "যে মহান সংগ্রাম ধর্মঘটী শ্রমিকরা শুরু করেছে তার প্রতি সমস্ত রকমের সাহায্যদান করতে কমিটি জনসাধারণের কাছে আহ্বান জানিয়েছিল। দীর্ঘ ৫৫ দিনের সংগ্রাম শেষে ধর্মঘটী শ্রমিকরা জয়লাভ করেছিল। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে কমিউনিস্টরা প্রগতিশীল কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সহায়তায় সাফল্য অর্জন করেছিল।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হিসেব করে পার্টি ধর্মঘট সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য আবার এক দফা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এক্ষেত্রে তাদের অন্যতম প্রধান সাফল্য অর্জিত হয়েছিল বাংলায় ২ লক্ষ ২৫ হাজার শ্রমিকের চটকল ধর্মঘটে। “ভারতবর্ষে বিপ্লবের পথ সুগম করার” উদ্দেশ্যে ধর্মঘট পরিস্থিতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিক্রিয়াশীল ফজলুল হক মন্ত্রিসভা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল। ফজলুল হক মন্ত্রিসভার বিরোধী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি এই ধর্মঘটকে সমর্থন করেছিল। কমিউনিস্টরাও অটল ছিল।

বাংলার কমিউনিস্টদের কাছে এটাই ছিল একটা সন্ধিক্ষণ। এরপর থেকে রাজ্যের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে তাদেরই নেতৃত্ব দিতে হয় এবং সেই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সারা ভারতের সংগঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

এই সময়টায়, যখন জাতীয় কংগ্রেস একেবারে চুপচাপ এবং গণ-সংগ্রামের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণে নারাজ, তখন ট্রেড ইউনিয়ন, কিসান সভা এবং যুবকদের মধ্যে ব্যাপক শক্তি গড়ে তোলার কাজে কমিউনিস্টরাই ছিল কর্মব্যস্ত। এই সময়ে একটা শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সক্রিয়তার ভিত্তি তারাই তৈরি করছিল।

 


প্রকাশ: ০২-আগস্ট-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 31-Jul-26 11:52 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/role-of-communists-in-indias-freedom-struggle-part-–-iv
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড