স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলার সংস্কৃতি (১ম পর্ব)
১৮৫৩ সালে কার্ল মার্কস যখন ভারতে ব্রিটিশশাসন সম্পর্কে তাঁর প্রথম প্রবন্ধগুলি লিখছিলেন, তখন পরাধীনতার ফলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পবিরর্তনগুলির সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা-চেতনার জগতে এক সঙ্কটের কথাও বলেছিলেন। ইংল্যান্ড ভারতীয় সমাজের গোটা কাঠামোটাকেই চূর্ণ করেছে, এখনও পুনর্নির্মাণের কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। পরিচিত পূরনো জগৎ হারিয়ে গেছে, কোনো নতুন জগতের সন্ধানও সে পায়নি এই পরিস্থিতি আজকের দুর্দশাগ্রস্ত ভারতীয়কে এক বিশেষ ধরনের বিষাদে ডুবিয়ে দিচ্ছে। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তার প্রাচীন ঐতিহ্য ও অতীত ইতিহাস থেকে (The British Rule in India, 1853)।

১. প্রস্তাবনা
পরাধীনতায় যখন মনু সার সংকুচিত হয়, তখন সমাজ উন্নত দশা লাভ করিতে পারে না।
সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলাই প্রথম ঔপনিবেশিক শাসনের আওতায় আসে। এর ফলে কেবল তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিকাঠামোতেই নয়, তার সমগ্র সামাজিক চেতনার মধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল। আমেরিকা বা আফ্রিকার ভূখণ্ডে যেমন উপনিবেশবাদের হিংস্র আক্রমণ প্রাচীন সভ্যতা, ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছিল, ভারতে ঠিক তেমনটি না ঘটলেও এখানেও মানুষের মনন, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার সমস্ত রূপগুলি ব্রিটিশ শাসনের চাপে ভোল পালটাতে বাধ্য হয়েছিল।
১৮৫৩ সালে কার্ল মার্কস যখন ভারতে ব্রিটিশশাসন সম্পর্কে তাঁর প্রথম প্রবন্ধগুলি লিখছিলেন, তখন পরাধীনতার ফলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পবিরর্তনগুলির সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা-চেতনার জগতে এক সঙ্কটের কথাও বলেছিলেন। ইংল্যান্ড ভারতীয় সমাজের গোটা কাঠামোটাকেই চূর্ণ করেছে, এখনও পুনর্নির্মাণের কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। পরিচিত পূরনো জগৎ হারিয়ে গেছে, কোনো নতুন জগতের সন্ধানও সে পায়নি এই পরিস্থিতি আজকের দুর্দশাগ্রস্ত ভারতীয়কে এক বিশেষ ধরনের বিষাদে ডুবিয়ে দিচ্ছে। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তার প্রাচীন ঐতিহ্য ও অতীত ইতিহাস থেকে (The British Rule in India, 1853)।
মার্কসের মতে, ভারতীয় সমাজের যে 'গ্রামীণ ব্যবস্থা' শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে গিয়েছিল তারই ওপর মৃত্যু-আঘাত হেনেছে কেবল ব্রিটিশ সেনাবাহিনী আর ব্রিটিশ করসংগ্রাহকরাই নয়, ব্রিটিশের পরিচালিত বাষ্পশক্তি এবং তাদের অবাধ বাণিজ্যনীতিও। তাদের অবাধ লুণ্ঠন ও শোষণের সুযোগ করে দিতেই পুরনো কৃষিব্যবস্থা এবং তার সঙ্গে জড়িত হস্তশিল্পগুলিকে ধ্বংস করা হয়েছে। অবশ্য তাঁর সময়ে তাঁর কাছে যা তথ্য বা বিবরণ লভ্য ছিল, তার ভিত্তিতে মার্কস মনে করেছিলেন যে, অনড় এবং আধা-বর্বর সমাজ কাঠামোর অচলায়তনকে ভেঙে দেবার জন্য এই বিদেশী হস্তক্ষেপ অনিবার্য ছিল, যদিও বিদেশী শাসক তা করেছিল নিজের স্বার্থেই। পরবর্তীকালে অনেক ভারতীয় ইতিহাসবিদই বিদেশী শাসনের 'অনিবার্যতা'র এই তত্ত্বকে গ্রহণ করেননি। মার্কসের নিজের পরবর্তী লেখাতেও বিষয়টিকে তিনি এতটা সরলীকৃতভাবে দেখেননি। কিন্তু মার্কস তাঁর এই লেখাটিতে নিজে ইউরোপসম্ভূত হয়েও, সূতীক্ষ্ণ অক্ষরে যাকে চিহ্নিত করেছেন, তা হলো বিজিত জাতির সামগ্রিক মানসিক আদলের পরিবর্তন, তার সমস্ত আত্মপরিচয় যে ঐতিহ্যের মধ্যে উৎকীর্ণ তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঘটনাজনিত 'এক বিশেষ ধরনের বিষাদ'। এ 'বিষাদ' হলো শাসকজাতির সার্বভৌমত্ব এবং শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে নেবারই অপর পিঠ। চেতনার স্তরে বা মতাদর্শের স্তরে এই 'বিষাদ' থেকে উদ্ধারের প্রচেষ্টা থেকেই বিকশিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক রূপ। এখানে এই প্রচেষ্টারই একটা ঐতিহাসিক আদল আমরা অনুমান করার চেষ্টা করব, তার অন্তর্গত নানা টানাপড়েন এবং দ্বন্দ্বকেও চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে।
যে নতুন শ্রেণী বা বর্গগুলির স্বার্থ ব্রিটিশ শাসকের সঙ্গে এক সূত্রেগাঁথা ছিল, এই দ্বন্দ্ব এবং স্ববিরোধ থেকে তারাও মুক্ত ছিল না। শাসকসমাজের স্বার্থকে প্রতিফলিত করেও তাদের জীবনচর্যায় আত্মগ্লানি ও বিচ্ছিন্নতাবোধের মুহূর্তেরও সম্ভাবনা ছিল। মার্কস-কথিত 'বিষাদে'র খতিয়ান কারা বিদেশী শাসনে সরাসরিভাবে লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, শুধু তার হিসাবে করলেই মিলবে না। ব্রিটিশ আমলের প্রথমদিকে যে-বর্গগুলি সামাজিক ঊর্ধ্বকাতির শরিক হয়েছে, বশংবদতার বিষাদ তাদেরও চিন্তা-চেতনার সীমানাকে কঠোরভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছিল। আবার ব্যবসায়িক স্তরে রিটিশের সংসর্গে তাদের যে লাভ হয়েছিল, নিজেদের সামাজিক জীবনকে তার প্রভাব থেকে মুক্তবলে ভাবার প্রবণতা ঐ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বশংবদতারই উলটো পিঠ। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ-বিরোধিতা সম্ভব না হওয়ায় সামাজিক জীবনে বিলীয়মান ঐতিহ্যগুলির কাল্পনিক বিশুদ্ধতার পশ্চাদ্ধাবনে অথবা কোনো বিকল্প নিজস্বতার খোঁজেই শুধু এই বিষাদের মোক্ষণ সম্ভব ছিল।
ব্রিটিশের প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এ নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব দাখিল করার শর্তে জমির ব্যক্তিগত মালিকানা হাতে পেল জমিদারশ্রেণী। বহু মধ্যস্বত্বভোগীর। লুষ্ঠনে জর্জরিত ও ছিন্নমূল বাংলাদেশের কৃষক ব্রিটিশ আমলে সবচাইতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলো, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে একের পর এক কৃষক-অভ্যুত্থান এরই চিহ্ন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পুরনো জমিদারশ্রেণীর একাংশও ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল সময়মতো রাজস্ব দাখিল করতে না পারার অর্থ ছিল মালিকানা হারানো। কৃষক বিদ্রোহে অনেক সময় এদেরও ভূমিকা ছিল। মতাদর্শগত স্তরে অনেক সময়েই এই বিদ্রোহের উপজীব্য ছিল ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের আহ্বান। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফরাজি বিদ্রোহ, সাঁওতাল অভ্যুত্থান বা পরে ওয়াহাবি বিদ্রোহের মধ্যে এই উপাদানটি খুবই স্পষ্ট। শোষিত মানুষের আক্রোশের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি তার মধ্যে থাকলেও ধর্মীয় ক্রান্তির অভীপ্সায় আছে বিচ্ছিন্নতার বিষাদেরই এক আবেগাত্মক রূপ বাস্তবে যা লভ্য নয়, ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাকে পাবার স্বপ্ন। কৃষকের শ্রেণীগত আক্রোশ তাই কোনো কোনো মুহূর্তে জমিদার বা মহাজনকে ছাড়িয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে উৎক্ষিপ্ত হয়েও আবার তার স্বপ্ন যতটুকু যেতে পারে ততটুকু গিয়েই পরাস্ত হয়েছে। শোষণের সবচাইতে বাস্তব এবং প্রত্যক্ষ উপলব্ধিও সচেতনতার ভাষায় রূপান্তরিত হয়নি।
পলাশিতে সিরাজের পরাজয় নিয়ে গান রচিত হয়েছে।
নবাগত ইংরেজদের নিয়ে কৌতূহল, ব্যঙ্গ, বিদ্রূপের প্রকাশ ঘটেছে, যেমন সিরাজের তাড়া খেয়ে হেস্টিংস-এর কান্তবাবুর কাছে আশ্রয় নেওয়ার বিবরণেঃ
ভবানী পাঠক এবং মজুনুশা-র কাহিনী তেমনি লোকশ্রুতিতে রয়ে গেছে, সাঁওতাল ‘হুল’ বা উত্থানের সময় রচিত কিছু কিছু গান এখনও পাওয়া যায়। কিন্তু পরাধীনতার যে ভয়ঙ্কর চাপ সমস্ত সমাজই ভেঙে আমূল বদলে দিচ্ছিল, স্বাভাবিকভাবেই তার কোনো সামগ্রিক ছবি এই বচনের মধ্যে ছিল না।
অন্যদিকে ব্রিটিশশাসনের ছত্রছায়া যাদের পরিপুষ্ট করেছিল, তাদের মধ্যে ছিল 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে' জমির মালিকানা-প্রাপ্ত জমিদারকুল, ছিল কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসাদভোগী দেওয়ান ও মুৎসুদ্দিবর্গ, আর তার নিচের স্তরে ইংল্যান্ড থেকে আমদানি সাদা-চামড়া 'রাইটারে'র অপ্রতুলতা দূর করার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট সামান্য ইংরেজি-জানা করণিককূল, Hobson Jobson নামক তৎকালীন Anglo-Indian অভিধানে যাদের বাবু (Baboo) বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রিটিশশাসনের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত এই ক'টি বর্গকে ভিত্তি করে এক বিরাট 'ভদ্রলোক' সমাজ বা মধ্যবিত্ত সমাজ তখন প্রধানত কলকাতা শহরের পটভূমি'তে গড়ে উঠছিল। Hobson - Jobson-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, আদিতে বাংলাভাষায় ‘বাবু’ শব্দটি সম্মান ও ক্ষমতার দ্যোতক হলেও ইংরেজের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে তার মধ্যে একটা হেয়ভাব এসে গিয়েছিল এবং তা এমন লোককে বোঝাত যার চালচলনে ওপর ওপর সভ্যতার পালিশ থাকলেও ‘পৌরুষগুণ’ কম। ‘বাবু’ শব্দটির এই ইতিহাসের মধ্যে উপরোক্ত মধ্যবিত্ত সমাজের উদ্ভবের ইতিহাসেরই একটা আভাস আমরা পাই।
‘বাবু’ শব্দটির একটা সামন্ততান্ত্রিক শিকড় আছে। পুরনো জমিদারবর্গের গ্রামীণ অর্থনীতিভিত্তিক প্রতাপ এবং ঐশ্বর্য শব্দটির মধ্যে প্রতিফলিত হতো। 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' এদের মালিকানাস্বত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেও তাকে ব্রিটিশ সরকারের জন্য খাজনা আদায়ের শতাধীন করলো। একই সময়ে নিম্নতন মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে ‘খাজনা আদায়ে’র ভার দিয়ে ‘গরহাজির ভূস্বামী’ হিসাবে কলকাতায় বসবাস করার প্রবণতাও বাড়ছিল। কেবল ‘বাবুয়ানা’র সুযোগ নয়, শাসক ইংরেজের কাছাকাছি থাকাও হয়তো এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ‘বাবুয়ানা’র ফলে অনেকে হাতসম্পত্তি হলেও দেওয়ানি মুৎসুন্দিগিরি প্রভৃতির দৌলতে এক নব্য বড়লোকশ্রেণীরও আবির্ভাব হচ্ছিল। ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় ‘হুতোম’ কালীপ্রসন্ন সিংহ এই বিবর্তনের একটি জীবন্ত চিত্র দিতে গিয়ে বলেছেন। ‘মেঘাস্তের রৌদ্রের মতো ইংরাজদের প্রতাপ বেড়ে উঠলো। বড় বড় বাঁশঝাড় সমূলে উচ্ছন্ন হলো। কঞ্চিতে বংশলোচন জন্মাতে লাগল। নবোমুনসি, ছিরে বেগে ও পুটে তেলি রাজা হলো। ‘বড়ো বাঁশঝাড়ে’র প্রতিভূ কালীপ্রসন্নের এই তাচ্ছিল্যসূচক উক্তি কিন্তু ইংরেজ আমলের গোড়ায় এক ধরনের সামাজিক ঊর্ধ্বগতিরও ইঙ্গিত দেয়, পুরনো উচ্চবর্ণের সামন্ততান্ত্রিক প্রভুশ্রেণীর বাইরেও কিছু মানুষ যার সুযোগ নিতে পেরেছিলেন। এই নব্য বড়লোকেরা বিদেশী শাসকের প্র সাদভোগী হলেও তারা যে সাহেবি রীতিনীতি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারাকে গ্রহণ করেছিল তা নয়। শহরের লবণ কিছুটা গায়ে লাগলেও এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সাহেবদের সঙ্গে আদানপ্রদান থাকলেও পুরনো বড়লোকদের ধরনধারণ আত্মস্থ করার প্রবণতাই বেশি ছিল। যাঁদের গ্রামে জমিজমা ছিল, পুরুষানুক্রমিক ক্রিয়াকর্ম তাঁরা গ্রামে গিয়েই করতেন। আর 'কলিকাতা কমলালয়' বইটিতে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় 'বিষয়ী ভদ্রলোকের' যে দৈনন্দিন জীবনধারার বর্ণনা দিয়েছেন তাতে সনাতন সামাজিকতার প্রতি তাঁদের আনুগত্যই প্রকাশ পায়। হাফ আখড়াই, পাঁচালি, যাত্রা, গাজন, সং, বারোইয়ারি দুর্গোৎসব, খ্যামটা প্রভৃতি তাঁদের যেসব প্রিয় আমোদ-প্রমোদের বিবরণ হুতোমের নকশায় পাওয়া যায়, সেগুলিরও আদি উৎস গ্রামীণ সমাজের লৌকিক সংস্কৃতি। কিন্তু হুতোমের ভালয় 'বড়ো বড়ো নিষ্কর্মাবাবু'দের মুরুব্বিয়ানায় তা কিছুটা ভোল পালটে আধাশহুরে ছাপ গায়ে লাগিয়ে জন্মান্তর পেল। নতুন পৃষ্ঠপোষকতার এই শ্রেণীচরিত্র, এই সাংস্কৃতিক ধারাগুলির মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটেছিল তা বোঝার পক্ষে আবশ্যিক। হুতোমের নকশায় দেখা যায় 'সেরুড কোম্পানির বাড়ির মেট মিস্তিরি' গুরুদাস শুইয়ের মতো স্বল্পবিত্তরাও নিজেদের অবস্থার মাপে বড়ো বড়ো বাবুদের নকল করে মাহেশের স্নানযাত্রায় যাচ্ছেন। অন্যদিকে আবার হুতোম যে সময়ের কথা লিখছেন, তখন সাবেকী বাবুয়ানিতে কিছুটা ভাঁটা পড়েছে।
“এখন আর সে কাল নাই; বাঙালি বড় মানুষদের মধ্যে অনেকে সভ্য হয়েচেন। গোলাপজল দিয়ে জলশৌচ, ঢাকাই কাপড়ের পাড় ছিড়ে পরা, মুক্তভস্মের চুণ দিয়ে পান খাওয়া আর শোনা যায় না.... আজ্ঞা হুজুর, উচুগদি, কার্তিকের মতো বাউরি চুল, একপাল বরাখুরে মোসাহেব, রক্ষিত বেশ্যা আর পাকান কাছা জলস্তম্ভ আর ভূমিকম্পোর মতো কখনোর পাল্লায় পড়েছে।" এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, 'সভ্য' কথাটি, যা হুতোম ঈষৎ ব্যঙ্গের সঙ্গে ব্যবহার করেন। কালীপ্রসন্ন নিজে যদিও এই 'সভ্য'তার পক্ষে ছিলেন এবং সনাতনীপন্থীদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, তবু এর মধ্যে বিজেতা বিদেশীদের অনুকরণ করার যে বৃত্তি নিহিত ছিল তাকেও তাঁর তীক্ষ্ণ বাঙ্গ আঘাত করেছে। অন্যত্র গাজন সম্বন্ধে বাবুদের মনোভাবের কথা যেখানে বলা হচ্ছে সেখানে তাঁর এই দ্বিমুখী আক্রমণের তীক্ষ্ণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। 'কেউ শিভিলিজেসনের অনুরোধে চড়ক হেট করেন। কেউ কেউ নিজে ব্রাহ্ম হয়েও "সাত পুরুষের ক্রিয়াকাণ্ড" বলেই চড়কে আমোদ করেন'।
যখন হুতোম শহরের 'ইংরেজি কেতা'র বাবুদের দুটি দলে ভাগ করেন, তখন 'বাবু' শব্দের আরও একটি নতুন অর্থভেদ আমরা পাই। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এই বাবুরা অনেকেই চাকুরিজীবী ছিলেন, আবার অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্রে টাকাও করেছিলেন; কিন্তু লক্ষ্মীলাভ করে ভূসম্পত্তি করার পরেও, সাবেক জমিদারদের গ্রামের সঙ্গে যে নিবিড় যোগাযোগ থাকত এরা আর সেখানে ফিরতে পারেননি। শহরের। জীবনের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে গিয়েছিল অনেক বেশি। হুতোম ইংরেজিয়ানার ভক্ত প্রথম দলকে বলেছেন: 'উচুকেতা সাহেবের গোবরের বস্ট' আর দ্বিতীয় দলকে 'ফিরিঙ্গীর জঘন্য প্রতিরূপ'। প্রথম দলের সহৃদয়তা, পরোপকার প্রভৃতি গুণ সত্ত্বেও তাঁদের অবসন্নতা, ভীরুতা ও একতার অভাবের সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়দলের বিবরণে বলা হয়েছে, 'এরা 'সাপ হতেও ভয়ানক, বাঘের চেয়ে হিংস্র'। মুখে 'স্বদেশের ভালো'র চেষ্টা করার কথা বললেও "ক্যামন করে আপনি বড় লোক হব," "ক্যামন করে সকলে পায়ের নিচে থাকবে" হুতোমের মতে এদের সেটাই একমাত্র লক্ষ্য। তাহলে কালীপ্রসন্ন কি ইঙ্গিতে বলছেন, যে ফিরিঙ্গিদের এরা অনুকরণ করছে, তাদেরও মূলমন্ত্র তাই। সাহেবি আদর্শের বহিরঙ্গগুলির অনুকরণকেই শুধু তিনি ব্যঙ্গ করেননি, এই নতুন 'সভ্যতা'র মধ্যে যে তীর আত্মপরায়ণতা ও অর্থপৈশুন্যের উপাদান আছে, এই নয়াবাবুদের একাংশের মধ্যে তিনি তারও আত্মীকরণ দেখতে পেয়েছেন।
হুতোমের 'বাবু'দের মধ্যে নানা প্রকারভেদ আছে। এর এক দশকের কিছু পরে বঙ্কিমচন্দ্র যখন 'লোকরহস্যে'র 'বাবু' প্রবন্ধে কিংবা 'হনুমন্বাবুসংবাদে'র মধ্যে বাবুদের কীর্তিকাহিনীর বর্ণনা দেন, তখন কিন্তু এই শব্দটিতে তিনি ইংরেজের বেতনভোগী চাকুরিজীবীদেরই প্রধানত বুঝিয়েছেন। "যাঁহারা বাক্যে অজেয়, পরভাষাপারদর্শী, মাতৃভাষাবিরোধী, তাঁহারাই বাবু..... যাঁহাদিগের চরণ মাংসাস্থিবিহীন শুষ্ক কাষ্ঠের ন্যায় হইলেও পলায়নে সক্ষম; হস্ত দুর্বল হইলেও লেখনীধারণে এবং বেতন গ্রহণে সুপটু- চর্ম কোমল হইলেও সাগরপারনির্মিত দ্রব্যবিশেষের প্রহারসহিষ্ণু, যাঁহাদিগের ইন্দ্রিয়মাত্রেরই ঐরূপ প্রশংসা করা যাইতে পারে, তাঁহারাই বাবু। "কিন্তু আবার 'কেরানি, মাস্টার, ব্রাহ্ম, মুৎসুদ্দি, ডাক্তার, উকিল, হাকিম, জমিদার, সংবাদপত্র সম্পাদক ও নিষ্কর্মা'- বঙ্কিম বর্ণিত বাবুর এই দশ অবতার একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্তও বটে, এক অবতার থেকে আরেক অবতারে রূপান্তরের অনেক রাস্তাও আছে। বঙ্কিম শব্দটিকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে একদিকে 'হবসন-জবসন' বর্ণিত অর্থের অবনমনের উদাহরণ যেমন পাই, অন্যদিকে আবার বাবুদের একাংশের ক্রমবর্ধমান ইংরেজভক্তি এবং দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে বিরূপ মনোভাব তাঁদের চরিত্রলক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বঙ্কিম এদের প্রতি একান্তই বিরূপ; কালীপ্রসন্নও এদের যথেষ্টই ব্যঙ্গ করেছেন, যেমন মাতাল অবস্থায় বাবাকে ঘুষি মেরে ধরাশায়ী করে ইংরেজি-নবীশ দনুকর্ণবাবু যখন মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন "মা বিদ্দেসাগর বেচে থাক। তোমার ভয় কি?.......ও ওলড্ ফুল মরে যাক, আমি কোয়াইট রিফরম্ড বাবা চাই।' কিন্তু আবার ধনী ও প্রভাবশালী বৈষ্ণব গোস্বামীদের দ্বারা আচরিত সাবেকী 'গুরুপ্রসাদী' প্রথার বীভৎসতার বিরুদ্ধে কলেজে-পড়া ইংরেজি-শিক্ষিত হরহরিবাবুর বিদ্রোহ কালীপ্রসন্নের সহানুভূতিই আকর্ষণ করেছে।
ওপরের এইসব আলোচনা থেকে একটা কথা খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। যথা, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে 'ভদ্রলোক' সমাজে সাবেকিয়ানা এবং আধুনিকতার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলেছে, তাকে কোনোমতেই সরল বা একমাত্রিক বলা যায় না। বাবু-জীবনের মধ্যেই বিভিন্ন মুহূর্ত রয়েছে; বঙ্কিমের দেশাচার-বিদ্বেষী বাবুও আবার 'উৎসবার্থ দুর্গাপূজা', 'গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষ্মীপূজা', 'উপগৃহিণীর অনুরোধে সরস্বতীপূজা' এবং 'পাটার লোভে গঙ্গাপূজা' করেন। কিন্তু এর অনেক আগেই ভবানীচরণের 'কলিকাতা কমলালয়ে'ও নগরবাসী ভদ্রলোক বিদেশীকে জানাচ্ছেন যে, তাঁরা সকলেই স্বধর্মদ্বেষী নন, বা বিজাতীয় আচারব্যবহার কিছু কিছু গ্রহণ করলেও মূলে ঠিকই আছেন। বঙ্কিমের যুগে শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোকের মধ্যে জাতীয়তাবোধের জাগরণের একটি বিশেষ পর্যায়ের 'হিন্দুয়ানি'র যে পুনরুল্পব আমরা দেখি, এবং প্রাচ্যবিদ ইউরোপীয় পণ্ডিতদের হিন্দু সমাজ নিয়ে চর্চার পটভূমিতে হিন্দুদের প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব অনুভবের যে নতুন ধারা সূচিত হয়, তার অনেক আগে থেকে বাঙালির মানসে এক তীব্র টানাপড়েন ছিল। উনিশ শতকের প্রথমার্ধের যে ঘটনাকে অনেক সময় 'নবজাগরণ' বলে অভিহিত করা হয়, তার মধ্যেও এই টানাপড়েন স্পষ্ট। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নাড়ির যোগ ছিন্ন করে যাঁরা সম্পূর্ণভাবে পাশ্চাত্যভাবাপন্ন হয়ে গিয়েছিলেন, এই 'নবজাগরণ'-এ তাঁদেরই আত্মপ্রকাশ, এবং তাঁদের সংস্কার-আন্দোলন বিদেশী শাসকের প্রতি আনুগত্য থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল। ওপরের বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, যে, যে 'ভদ্রলোক' সমাজের উদ্ভবের প্রেক্ষাপটে এই 'নবজাগরণ ঘটেছিল তার মানসিকতার মধ্যে বহু বিপরীতমুখী স্রোতের সমাবেশ ছিল এবং 'নবজাগরণে'র মধ্যেও আমরা তাই দেখতে পাই। ইংরেজি শিক্ষা এবং ইউরোপীয় নানা চিন্তাধারা নিশ্চয়ই এর মধ্যে আবশ্যিক উপাদান জুগিয়েছিল, কিন্তু সাবেকিয়ানার বিরুদ্ধে যে বুদ্ধিবাদী আন্দোলন, তার মধ্যে পরাধীন বাঙালিকে প্রথম এক নিজস্বতার চেতনা আবিষ্কার করতেও দেখা যায়। ব্রিটিশ শাসকের সঙ্গে 'ভদ্রলোক' সমাজের শ্রেণীস্বার্থ জড়িত ছিল, সুতরাং তাদের নবজাগরণ সম্পূর্ণভাবে এই বশংবদতারই প্রতিফলন এই মতবাদটি একপেশে সরলীকরণেরই উদাহরণ।
প্রকাশ: ০৪-আগস্ট-২০২৬
শেষ এডিট:: 31-Jul-26 11:52 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/freedom-struggle-and-the-culture-of-bengal-part-i-
Categories: Fact & Figures
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (172)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)


