ঘৃণার কারখানা বনাম মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়

Author
শমীক লাহিড়ী

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস ‘দ্য জার্মান আইডিওলজি’ (১৮৪৫–৪৬)-তে লিখেছিলেন, "প্রতিটি যুগে শাসক শ্রেণির ধারণাই হয়ে ওঠে সেই যুগের প্রভাবশালী ধারণা।" কারণ যে শ্রেণি বস্তুগত উৎপাদনের উপায় নিয়ন্ত্রণ করে, সাধারণত সেই শ্রেণিই মানসিক উৎপাদনের উপায়ও নিয়ন্ত্রণ করে। এই বাক্যটির গভীরতা আজ ডিজিটাল যুগে আরও স্পষ্ট।

Factory of Hate vs. University of Humans

ফ্যাসিবাদ মানুষের হাত থেকে প্রথমে অস্ত্র কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় তার স্মৃতি। কারণ যে মানুষ নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে নিজের শৃঙ্খলও চিনতে পারে না।


যে যুদ্ধ মানুষের মাথার ভেতরে শুরু হয়

একটা দেশের মৃত্যু সবসময় সীমান্তে ঘটে না। অনেক সময় একটা দেশের মৃত্যু শুরু হয় শ্রেণিকক্ষে। সেদিন শিক্ষক একই মানুষ, ব্ল্যাকবোর্ডও একই। শুধু ইতিহাসের বইটা বদলে যায়। যে পাতায় একসময় লেখা ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম, সেখানে এখন অন্য গৌরবের একরৈখিক কাহিনি। যে অধ্যায়ে কৃষকের বিদ্রোহ ছিল, সেখানে এখন রাজাদের বংশতালিকা। যে পৃষ্ঠায় শ্রমিকের ধর্মঘট ছিল, সেখানে এখন সাম্রাজ্যের বিজয়গাথা। আর যেখানে মানুষ ছিল, সেখানে এখন কেবল 'আমরা' এবং 'ওরা'। একটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বোঝে — বন্দুকের আগে পাঠ্যপুস্তক দখল করতে হয়। ফ্যাসিবাদ এই সত্য অনেক আগেই শিখেছে।তাই ইতিহাসে যতবার ফ্যাসিবাদ মাথা তুলেছে, ততবার সে প্রথম আক্রমণ করেছে স্মৃতিকে। কারণ যে মানুষ নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, তার নিজের ভবিষ্যৎও অন্যের হাতে তুলে দিতে বেশি সময় লাগে না।
মার্কসবাদ এই কারণেই ইতিহাসকে কেবল অতীতের বিবরণ বলে মনে করে না। ইতিহাস হলো মানুষের সংগ্রামের স্মৃতি। শ্রেণিসংগ্রামের দীর্ঘ নদী। সেই নদীর জল শুকিয়ে গেলে মানুষের প্রতিবাদও শুকিয়ে যায়। আজকের সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ সেই কাজই করছে।

ফ্যাসিবাদ কখনও নিজেকে ফ্যাসিবাদ বলে পরিচয় দেয় না। সে আসে সভ্যতার রক্ষক সেজে। ধর্মের অভিভাবক সেজে। সংস্কৃতির প্রহরী সেজে। জাতীয় গৌরবের একমাত্র প্রতিনিধি সেজে।সে বলে — দেশ বিপদে। কিন্তু দেশ কোথায় বিপদে, তা সে কখনোই বলে না।
সে বলে — ধর্ম বিপদে। কিন্তু ধর্মকে কে আক্রমণ করেছে, তার কোনও নির্ভরযোগ্য উত্তর দেয় না। সে বলে — জাতীয় সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সংস্কৃতি বলতে সে বোঝায় ক্ষমতাবানদের নির্বাচিত স্মৃতি, মানুষের বহুত্ব নয়।

ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় ‘প্রতিভা’ এখানেই। সে বাস্তব সমস্যাকে অদৃশ্য করে দেয়। তারপর একটা কাল্পনিক শত্রু সৃষ্টি করে।
বেকারত্ব থাকে। কিন্তু আলোচনায় আসে না। কৃষকের ঋণ থাকে। কিন্তু খবরের শিরোনাম হয় না। হাসপাতালে ওষুধের অভাব থাকে। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দা ভরে ওঠে ধর্মীয় উত্তেজনায়। যে রাষ্ট্র নাগরিককে রুটি দিতে পারে না, সে নাগরিককে রাগ দেয়। যে রাষ্ট্র কর্মসংস্থান দিতে পারে না, সে শত্রু খুঁজে দেয়। ঘৃণা তখন রাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে সস্তা পণ্য হয়ে ওঠে।

১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সপ্তম কংগ্রেসে উপস্থাপিত ‘ফ্যাসিবাদী আক্রমণ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কর্তব্য’ (The Fascist Offensive and the Tasks of the Communist International in the Struggle of the Working Class against Fascism) প্রতিবেদনে জর্জি দিমিত্রভ ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, “ক্ষমতায় থাকা ফ্যাসিবাদ হলো আর্থিক পুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী অংশের প্রকাশ্য সন্ত্রাসী একনায়কত্ব।” এই সংজ্ঞা আজও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় — ফ্যাসিবাদ কেবল ঘৃণার রাজনীতি নয়; পুঁজির সংকট সামাল দেওয়ারও একটা রাজনৈতিক প্রকল্প।

অর্থনৈতিক বৈষম্য যখন চরমে পৌঁছায়, তখন শাসকশ্রেণির সামনে দুটো পথ খোলা থাকে। একটা পথ — মানুষের দাবি মেনে নেওয়া। অন্যটা — মানুষকে বিভক্ত করে দেওয়া।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, দ্বিতীয় পথটাই ক্ষমতাসীনদের কাছে অনেক বেশি সুবিধাজনক। শ্রমিক যদি শ্রমিককে শত্রু ভাবে, তবে মালিক নিরাপদ থাকে। কৃষক যদি প্রতিবেশীর ধর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তবে জমির প্রশ্ন, ফসলের ন্যায্য দামের ইস্যু চাপা পড়ে। বেকার যুবক যদি সংখ্যালঘুদেরই তার জীবনের যাবতীয় সমস্যার কারণ বলে মনে করে, তবে সে আর কর্পোরেটদের লুটের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয় না।

এইভাবেই শ্রেণির প্রশ্নকে সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে রূপান্তর করা হয়। এটা কোনও দুর্ঘটনা নয়। এটাই মতাদর্শের পরিকল্পিত স্থাপত্য।
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস ‘দ্য জার্মান আইডিওলজি’ (১৮৪৫–৪৬)-তে লিখেছিলেন, "প্রতিটি যুগে শাসক শ্রেণির ধারণাই হয়ে ওঠে সেই যুগের প্রভাবশালী ধারণা।" কারণ যে শ্রেণি বস্তুগত উৎপাদনের উপায় নিয়ন্ত্রণ করে, সাধারণত সেই শ্রেণিই মানসিক উৎপাদনের উপায়ও নিয়ন্ত্রণ করে। এই বাক্যটির গভীরতা আজ ডিজিটাল যুগে আরও স্পষ্ট।

একসময় রাজারা ফরমান লিখতেন। আজ অ্যালগরিদম লিখছে জনমত।
একসময় সাম্রাজ্য বন্দুক দিয়ে উপনিবেশ বানাত। আজ মিথ্যা, ভয় এবং ক্রমাগত অসত্য প্রচার নির্মান করে মানুষের চেতনাকে উপনিবেশে পরিণত করা হয়।
প্রতিদিন অসংখ্য ছবি, ভিডিও, অর্ধসত্য এবং গুজব মানুষের মনে একটা কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করে। সেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ দ্রুত ছড়ায়। তথ্যের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে ওঠে। মানুষ ধীরে ধীরে নাগরিক থেকে 'সমর্থক'-এ পরিণত হয়।

এই পরিবর্তন কেবল প্রযুক্তির কারণে ঘটেনি। এটা মতাদর্শগত প্রস্তুতির ফল। আর সেই কারণেই সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল নির্বাচনী লড়াই হতে পারে না। এ স্মৃতির জন্য লড়াই, ভাষার জন্য লড়াই, ইতিহাসের জন্য লড়াই, মানুষের কল্পনাশক্তিকে মুক্ত রাখার লড়াই।
মুসোলিনির কারাগারে বন্দি অবস্থায় ‘Prison Notebooks’ (১৯২৯–৩৫)-এ আন্তোনিও গ্রামশি দেখিয়েছিলেন, শাসকশ্রেণি কেবল রাষ্ট্রের দমনমূলক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বিদ্যালয়, পরিবার, সংবাদমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতির মতো নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে মানুষের সম্মতিও সংগঠিত করে। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা 'হেজিমনি' ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী শাসন সম্ভব নয়।

অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদ যদি মানুষের মনের মধ্যে তার দুর্গ গড়ে তোলে, তবে সেই দুর্গ ভাঙার কাজও কেবল রাজনৈতিক দল করতে পারে না। সেখানে শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী আছেন, শিল্পী আছেন, গায়ক আছেন, নাট্যকর্মী আছেন, গবেষক আছেন, সাংবাদিক আছেন, শ্রমিক-কৃষক আছেন। এমনকি সৎ প্রতিবেশীরাও আছেন, যারা গুজবের বদলে সত্যের পাশে দাঁড়ান।
মতাদর্শগত সংগ্রাম তাই কেবলমাত্র কয়েকজন বিশেষজ্ঞের কাজ নয়। এটা সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষার নাম।

গ্রামশির এই বিশ্লেষণকে পরবর্তী সময়ে আরও এগিয়ে নিয়ে যান ফরাসি মার্কসবাদী দার্শনিক লুই আলথুসার। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘মতাদর্শ ও মতাদর্শগত রাষ্ট্রযন্ত্রসমূহ’ (Ideology and Ideological State Apparatuses, ১৯৭০)-এ তিনি যুক্তি দেন, রাষ্ট্র কেবল পুলিশ, সেনাবাহিনী বা আদালতের মতো দমনমূলক প্রতিষ্ঠানের (Repressive State Apparatus) মাধ্যমেই শাসন করে না; বরং বিদ্যালয়, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, সংস্কৃতি, এমনকি দৈনন্দিন সামাজিক অভ্যাসের মধ্য দিয়েও মতাদর্শ পুনরুৎপাদন করে। তাঁর ভাষায়, এগুলোই হলো ‘মতাদর্শগত রাষ্ট্রযন্ত্রসমূহ’ (Ideological State Apparatuses)। এই প্রতিষ্ঠানগুলির কাজ মানুষকে কেবল আইন মানতে শেখানো নয়; বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থাকে 'স্বাভাবিক', 'স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য' এবং 'চিরন্তন' বলে বিশ্বাস করানো।

সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ এই সত্য খুব ভালো করেই বোঝে। তাই সে শুধু সংসদ জিততে চায় না; সে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম বদলাতে চায়, সংবাদমাধ্যমের ভাষা বদলাতে চায়, চলচ্চিত্রের নায়ক বদলাতে চায়, ইতিহাসের স্মৃতি বদলাতে চায়। কারণ যে সমাজের কল্পনাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাকে দীর্ঘদিন শাসন করাও সহজ হয়ে যায়।

এই প্রসঙ্গে ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের সতর্কবাণী আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। ‘যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকর্ম’ (The Work of Art in the Age of Mechanical Reproduction, ১৯৩৫–৩৬) প্রবন্ধের শেষাংশে তিনি লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদের প্রবণতা হলো ‘রাজনীতিকে নন্দনতত্ত্বে রূপান্তরিত করা’; (The logical result of Fascism is the introduction of aesthetics into political life.)। অর্থাৎ, বাস্তব সামাজিক সংকটের সমাধান না করে, বিশাল সমাবেশ, সামরিক কুচকাওয়াজ, পৌরাণিক প্রতীক, পতাকা, ইউনিফর্ম, স্লোগান এবং আবেগঘন দৃশ্যের মাধ্যমে রাজনীতিকে এক ধরনের দর্শনীয় প্রদর্শনীতে পরিণত করা। মানুষের অংশগ্রহণ তখন আর গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে হয় না; বরং হয় পরিকল্পিত আবেগে।

মার্কসবাদ এই নন্দনতাত্ত্বিক প্রতারণার বিপরীতে বাস্তব জীবনের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সে মানুষকে দর্শক বানাতে চায় না; ইতিহাসের সক্রিয় নির্মাতা হিসেবে দেখতে চায়। তাই সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম মানে কেবল মিথ্যার প্রতিবাদ নয়, মানুষের কল্পনাশক্তিকে মুক্ত করা; এমন একটা সংস্কৃতি নির্মাণ করা, যেখানে যুক্তি, বিজ্ঞান, বহুত্ব, শ্রমের মর্যাদা এবং মানবিক সংহতি আবারও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে ফিরে আসে।

কিন্তু সেই সংগ্রাম কীভাবে সংগঠিত হবে? কেন বহু দেশে বামপন্থীরা অর্থনৈতিক প্রশ্নে শক্তিশালী হয়েও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেন? আর ভারতের মতো বহুধর্মী সমাজে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদী রাজনীতির নতুন ভাষা কী হতে পারে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে।


ঘৃণার কারখানা, পুঁজির প্রাসাদ

একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। একটা কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গেটের বাইরে শত শত শ্রমিক দাঁড়িয়ে। বহু বছরের শ্রম, ঘাম, দক্ষতা — সব একদিনে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। ভেতরে যন্ত্র আছে, কিন্তু কাজ নেই। বাইরে মানুষ আছে, কিন্তু মজুরি নেই।
এই দৃশ্য ফ্যাসিবাদ দেখতে চায় না। সে ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেয়। তারপর আমাদের সামনে আর-একটা দৃশ্য হাজির করে। একটা মিছিল। সেখানে মানুষ রুটি চাইছে না। চাকরি চাইছে না। ন্যায্য মজুরি চাইছে না। তারা চিৎকার করছে — ‘ওদের তাড়াও।‘ ঘৃণার রাজনীতি এভাবেই অর্থনীতির শূন্যস্থান পূরণ করে।

যেখানে রাষ্ট্র মানুষের জীবনকে উন্নত করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে সে মানুষের কল্পনাকে উত্তেজিত করতে শুরু করে। মানুষের পকেট খালি থাকে, কিন্তু তার পরিচয়কে ফুলিয়ে তোলা হয়। তাকে বলা হয় — ‘তুমি দরিদ্র হতে পারো, কিন্তু তুমি সংখ্যাগরিষ্ঠ। তুমি বেকার হতে পারো, কিন্তু তুমি মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী।’ এ যেন ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে রুটির বদলে পতাকা তুলে দেওয়া।

মার্কস দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদ কেবল সম্পদ সৃষ্টি করে না; সংকটও সৃষ্টি করে। মুনাফার অনবরত অনুসন্ধান উৎপাদন বাড়ায়, কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেই হারে বাড়ে না। ফলে সংকট জন্মায়। সেই সংকট কেবল অর্থনীতির হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজে, রাজনীতিতে, মানুষের মানসিক জগতে।

এখন প্রশ্ন হলো — সংকটের জন্য দায়ী কে? মার্কসবাদ বলে — পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক। ফ্যাসিবাদ বলে — প্রতিবেশী। মার্কসবাদ বলে — শোষণের কাঠামো বদলাও। ফ্যাসিবাদ বলে — শত্রুর পরিচয় বদলাও। ফলে এই দুই রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য শুধু কর্মসূচির নয়; বাস্তবতাকে দেখার পদ্ধতিরও।
মনে রাখা দরকার, ঘৃণার রাজনীতি কখনও শূন্যে জন্মায় না। তারও পৃষ্ঠপোষক থাকে।

যখন কর্পোরেট পুঁজি রাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে যায় যে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে জনকল্যাণের পরিবর্তে মুনাফার ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের ভেতরেই কর্তৃত্ববাদের বীজ অঙ্কুরিত হয়। কারণ বাজার চায় স্থিতি। কিন্তু সমাজে যখন বেকারত্ব, বৈষম্য ও ক্ষোভ বাড়ে, তখন সেই স্থিতি বজায় রাখতে কেবল অর্থনৈতিক নীতি যথেষ্ট হয় না।

প্রয়োজন হয় একধরনের মতাদর্শ। প্রয়োজন হয় এমন একটা গল্প, যেখানে মানুষ তার প্রকৃত শত্রুকে ভুলে যায়। সেই গল্পেরই নাম — সাম্প্রদায়িক উগ্র জাতীয়তাবাদ। এখানে জাতি আর নাগরিকদের সমষ্টি নয়; জাতি হয়ে ওঠে একটা ধর্মীয় পরিচয়। এখানে রাষ্ট্র আর সংবিধানের ভিত্তিতে দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় পৌরাণিক গৌরবের নির্বাচিত ব্যাখ্যার ওপর। এখানে দেশপ্রেম মানে সরকারের সমর্থন, আর প্রশ্ন তোলা মানে বিশ্বাসঘাতকতা।

ফ্যাসিবাদ ইতিহাসকে ভালোবাসে না। সে ইতিহাসকে ব্যবহার করে। অতীত তার কাছে গবেষণার বিষয় নয়; অস্ত্রাগারের অস্ত্র। যে ইতিহাস বিভেদের আগুন জ্বালাতে পারে, সে ইতিহাসকে সামনে আনা হয়। যে ইতিহাসে
শ্রমিক একসঙ্গে লড়েছে, কৃষক একসঙ্গে বিদ্রোহ করেছে, হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান-নাস্তিক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছে — সেই ইতিহাসকে আড়াল করা হয়।

কারণ ঐক্যের ইতিহাস ঘৃণার ব্যবসার পক্ষে ক্ষতিকর। এই কারণেই সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ সংস্কৃতিকে এত গুরুত্ব দেয়। সে জানে, একটা চলচ্চিত্র কখনও কখনও দশটি বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। একটা গান মানুষের মনে এমনভাবে থেকে যায়, যা কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি পারে না। একটা পাঠ্যপুস্তক এক প্রজন্মের চিন্তাকে বদলে দিতে পারে। তাই সে চলচ্চিত্রে হস্তক্ষেপ করে। সাহিত্যে হস্তক্ষেপ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তক্ষেপ করে। বিজ্ঞানেও হস্তক্ষেপ করে। সে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা চায় না; কল্পনাশক্তির ওপরও আধিপত্য চায়।
এখানেই গ্রামশির 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য'-এর ধারণা নতুন অর্থে ফিরে আসে।

Prison Notebooks (১৯২৯–৩৫)-এ আন্তোনিও গ্রামশি দেখিয়েছিলেন, শাসকশ্রেণির আধিপত্য কেবল রাষ্ট্রের দমনমূলক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; নাগরিক সমাজের নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা মানুষের সম্মতি সংগঠিত করে এবং দৈনন্দিন 'সাধারণ বোধ' (common sense)-কেও নিজেদের অনুকূলে গড়ে তোলে। একসময় মানুষ নিজের অজান্তেই শাসকের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।
যখন একজন শ্রমিক নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে ভোট দেয়, যখন একজন দরিদ্র মানুষ কর্পোরেট লুটের পরিবর্তে সংখ্যালঘুকে তার দুর্দশার কারণ বলে মনে করে, যখন একজন ছাত্র প্রশ্ন করার পরিবর্তে মুখস্থ করা ঘৃণাকে দেশপ্রেম বলে বিশ্বাস করে — তখন বুঝতে হবে, মতাদর্শগত আধিপত্য গভীর হয়েছে।

এটা কোনও ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়। এ দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির ফল।
তাহলে মার্কসবাদীদের কাজ কী? শুধু তথ্য দেওয়া? শুধু পরিসংখ্যান দেখানো? না। কারণ মানুষ কেবল যুক্তি দিয়ে বাঁচে না। সে স্মৃতি নিয়ে বাঁচে। গল্প নিয়ে বাঁচে। ভালোবাসা নিয়ে বাঁচে। স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। ফ্যাসিবাদ যদি মিথ্যা দিয়ে মানুষের কল্পনাকে বন্দি করে, তবে মার্কসবাদকে সত্য দিয়ে মানুষের কল্পনাকে মুক্ত করতে হবে।
সেই কাজ কেবল রাজনৈতিক ইস্তাহারে হবে না। হবে কবিতায়, গানে, নাটকে, লোকসংস্কৃতিতে, সিনেমায়, শিশুদের বইয়ে, ডিজিটাল মাধ্যমে। মানুষের প্রতিদিনের ভাষায়।

যে মতাদর্শ মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না, সে মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু নির্বাচনের নয়, সংস্কৃতিরও। শুধু সংসদের নয়, পাড়ার পাঠাগারেরও। শুধু দলের অফিসে নয়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেরও। শুধু বক্তৃতার নয়, মানুষের কল্পনাশক্তিরও।
কারণ ফ্যাসিবাদ বন্দুক দিয়ে যতটা শক্তিশালী হয়, তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয় তখন, যখন মানুষ নিজের অজান্তেই ফ্যাসিস্টদের কথাই তাদের মতো ভাষায় ভাবতে শুরু করে।
সেই ভাষাকে ভেঙে দেওয়াই মতাদর্শগত সংগ্রামের প্রথম শর্ত। আর সেই ভাষা ভাঙার জন্যই আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের কাছে — শুধু ইতিহাস জানার জন্য নয়, ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিরোধের উত্তরাধিকারকে পুনরুদ্ধার করার জন্য।

 
ইতিহাসের শ্রেণিকক্ষ, মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়

কোনও সভ্যতা একদিনে সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে না। একটা শিশুকে প্রথম দিন কেউ ঘৃণা শেখায় না। প্রথমে তাকে শেখানো হয় — ‘আমরা আলাদা।’ তারপর — ‘আমরা শ্রেষ্ঠ।’ তারপর — ‘ওরা আমাদের শত্রু।’ শেষ পর্যন্ত তাকে আর কিছু শেখাতে হয় না। ঘৃণা তখন তার স্বভাব হয়ে যায়।
এই কারণেই মতাদর্শগত লড়াই বন্দুকের বিরুদ্ধে নয়, ভাষার বিরুদ্ধে; শুধু মিথ্যার বিরুদ্ধেই নয়, সেই মিথ্যাকে স্বাভাবিক বলে মানতে শেখানো অভ্যাসের বিরুদ্ধে।
ভারতকে যদি বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে দেখতে পাব, এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য। শত শত ভাষা। অসংখ্য সংস্কৃতি। বিভিন্ন ধর্ম। বিভিন্ন জাতিসত্তা। নানারকম খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সঙ্গীত, লোককথা। ভারত কোনও একরঙা ছবি নয়। এটি বহু রঙের এক দীর্ঘ ক্যানভাস।

কিন্তু সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ এই বহুত্বকে শক্তি হিসেবে দেখে না। সে একে একটা সমস্যা হিসেবে দেখে। কারণ বৈচিত্র্য প্রশ্ন করতে শেখায়। একরূপতা আদেশ মানতে শেখায়। তাই ফ্যাসিবাদের প্রথম কাজ — বহুত্বকে সন্দেহের চোখে দেখা। যে সমাজে মানুষ একসঙ্গে গান গায়, সেখানে দাঙ্গা ঘটানো কঠিন। যে সমাজে মানুষ একসঙ্গে উৎসব পালন করে, সেখানে বিভাজনের রাজনীতি দুর্বল হয়। যে সমাজে ইতিহাসকে বহু কণ্ঠে পড়ানো হয়, সেখানে সরকারি অসত্য প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। তাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সবসময় সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। লোকগানকে বদলাতে চায়। ইতিহাসের পুনর্লিখন চায়। শহরের নাম বদলায়। রাস্তার নাম বদলায়।

কিন্তু নাম বদলালেই কি ইতিহাস বদলে যায়? নদীর নাম পাল্টালে কি তার স্রোত পাল্টায়? মানুষের স্মৃতিকে কাগজে বদলানো যায়। হৃদয়ে নয়। এইখানেই মার্কসবাদীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আমরা কি মানুষের স্মৃতির সঙ্গে কাজ করেছি? নাকি কেবল নির্বাচনের অঙ্ক কষেছি? আমরা কি শুধু শ্রমিকের মজুরির কথা বলছি, কিন্তু তার গানকে অবহেলা করেছি? আমরা কি শুধুই কৃষকের জমির কথা বলেছি, কিন্তু তার লোককথাকে গুরুত্ব দিইনি?
আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি, অথচ পাড়ার লাইব্রেরি, নাটকের দল, পাঠচক্র, ছোট পত্রিকা, গান, কবিতা — এসব সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কিন্তু আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনও মুক্তির রাজনীতি এগোয় না।

Prison Notebooks (বিশেষত Notebook ১২, ১৯৩২)-এ আন্তোনিও গ্রামশি 'অর্গানিক বুদ্ধিজীবী' (Organic Intellectual)-র ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বুদ্ধিজীবীর কাজ শুধু জ্ঞান উৎপাদন নয়; যে সামাজিক শ্রেণির সঙ্গে তিনি যুক্ত, তার অভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করা, রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলা এবং সমাজে নৈতিক ও বৌদ্ধিক নেতৃত্ব নির্মাণ করাও তাঁর দায়িত্ব।
আজ এই ধারণা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ মতাদর্শগত সংগ্রামে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার করে জেতা যায় না। জেতা যায় চায়ের দোকানের আড্ডায়। বাসস্ট্যান্ডে। কারখানার গেটে। মাঠের ধারে। মোবাইল ফোনের পর্দায়। যেখানেই মানুষ আছে, সেখানেই মতাদর্শের লড়াই।

আজ সামাজিক মাধ্যম এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় উত্তেজনা। যুক্তির চেয়ে দ্রুত ছড়ায় ক্রোধ। মানুষ খবর পড়ে না। শিরোনাম পড়ে। প্রবন্ধ পড়ে না। ছবি দেখে। ভিডিওর কয়েক সেকেন্ড দেখে মত গড়ে তোলে। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনও মতাদর্শগত সংগ্রাম সম্ভব নয়।
যদি প্রগতিশীল শক্তি মানুষের কাছে পৌঁছাতে চায়, তবে তাকে নতুন ভাষা শিখতে হবে। কিন্তু নতুন ভাষা মানে নতুন মিথ্যা নয়। নতুন ভাষা মানে সত্যকে সহজ করে বলা। সত্যকে আকর্ষণীয় করা। সত্যকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা।

একজন শ্রমিক যখন কারখানায় কাজ হারান, তখন তাঁর কাছে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' একটা বিমূর্ত শব্দ হতে পারে। কিন্তু যদি তাঁকে বোঝানো যায় — রাজনীতি তোমার সহকর্মীকে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করছে, সেই রাজনীতিই তোমার শ্রমিক ঐক্য ভাঙছে; যে বিভাজন তোমার সহকর্মীকে দুর্বল করছে, সেটিই তোমার মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে —তখন ধর্মনিরপেক্ষতা আর বিমূর্ত থাকে না। তখন তা হয়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব স্বার্থের প্রশ্ন।
এটাই মার্কসবাদী মতাদর্শগত কাজের শক্তি। বড় তত্ত্বকে মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা।

কিন্তু শুধু সমালোচনা যথেষ্ট নয়। মানুষ কেবল প্রতিবাদের জন্য বাঁচে না। সে আশার জন্যও বাঁচে। ফ্যাসিবাদ  মিথ্যা স্বপ্ন বিক্রি করে। মার্কসবাদীদের সত্য স্বপ্ন নির্মাণ করতে হবে। যেখানে স্বাধীনতা থাকবে। সমতা থাকবে। ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকবে, আবার ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও থাকবে। যেখানে জাতপাতের অবসান হবে। নারীর সমান অধিকার থাকবে। শ্রমের মর্যাদা থাকবে। বিজ্ঞান ও মানবিকতা পাশাপাশি চলবে।
এই ভবিষ্যতের কল্পনা ছাড়া মতাদর্শগত সংগ্রাম কেবল প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে; বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। মতাদর্শের লড়াই শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্পনাশক্তির লড়াই।

মানুষ কী ধরনের দেশ কল্পনা করছে? কী ধরনের প্রতিবেশী কল্পনা করছে? কী ধরনের ভবিষ্যৎ কল্পনা করছে? যদি সেই কল্পনার ভেতর ভয় থাকে, তবে ফ্যাসিবাদ জিতবে। যদি সেখানে স্বাধীনতা, ন্যায় এবং সহাবস্থানের স্বপ্ন থাকে, তবে প্রতিরোধের সম্ভাবনা কখনও শেষ হবে না। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় কোনও প্রাসাদে তৈরি হয় না। তা তৈরি হয় মানুষের মধ্যে। একটা প্রশ্ন থেকে আর একটা প্রশ্নে। একটা বই থেকে আর-একটা বইয়ে। একটা গান থেকে আর-একটা মিছিলে। আর সেখানেই মতাদর্শগত সংগ্রাম তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায় — ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, মানুষের চেতনাকে মুক্ত করার জন্য।


মানুষের পক্ষে, ইতিহাসের পক্ষে

ফ্যাসিবাদ কখনও শুধু একটা সরকার নয়। এটা একটা অভ্যাস। একটা ভাষা। একটা ভয়। একটা নীরবতা। যখন মানুষ অন্যায় দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন ফ্যাসিবাদ একটু একটু করে জিতে যায়। যখন প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগে, আর আমরা ভাবি — ‘এটা আমার বিষয় নয়’— তখনও ফ্যাসিবাদ জিতে যায়। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করাকে অপরাধ বলা হয়, যখন সাংবাদিকের কলমকে বিশ্বাসঘাতক বলা হয়, যখন শিল্পীর ক্যানভাসকে সন্দেহ করা হয়, যখন ইতিহাসবিদকে শত্রু বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন ফ্যাসিবাদ কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নিজের জায়গা করে নেয়।

এই কারণেই মার্কসবাদীদের কাছে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল নির্বাচনী কৌশলের প্রশ্ন হতে পারে না। এ এক দীর্ঘমেয়াদি 'যুদ্ধের অবস্থান' — গ্রামশির ভাষায়, সমাজের প্রতিটি সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও নৈতিক পরিসরে ধৈর্যশীল সংগ্রাম। এই সংগ্রাম বন্দুকের নয়। বইয়ের। গানের। নাটকের। খেলার। যুক্তির। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পুনর্গঠনের।

মার্কসবাদীদের সামনে আজ সবচেয়ে বড় কাজ কী?

প্রথমত, শ্রেণি ও সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ককে মানুষের জীবনের ভাষায় ব্যাখ্যা করা। কারখানায় হিন্দু ও মুসলমান শ্রমিক যখন একই মেশিনের সামনে দাঁড়ায়, তখন তাদের মজুরি ধর্ম দেখে নির্ধারিত হয় না। ক্ষেতে কাজ করা কৃষকের ঋণও ধর্ম দেখে বাড়ে না। বেকার তরুণের হতাশা কোনও জাতের নয়। দামবৃদ্ধি কোনও সম্প্রদায়কে আলাদা করে আঘাত করে না। শোষণ মানুষের পরিচয়পত্র দেখে কাজ করে না। তাহলে প্রতিরোধ কেন বিভক্ত হবে?
মার্কসবাদী রাজনীতির প্রথম কাজ এই সহজ সত্যটিকে মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা।

দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে আর 'সহায়ক কাজ' বলে দেখা যাবে না। একটা কবিতা কখনও কখনও একটা বক্তৃতার চেয়ে দীর্ঘজীবী হয়। একটা গান এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে রাজনৈতিক পুস্তিকা পৌঁছাতে পারে না। একটা নাটক এমন প্রশ্ন তোলে, যা হাজার বক্তৃতাতেও তোলা কঠিন। এই কারণেই প্রগতিশীল সংস্কৃতি কোনও অলংকার নয়। এ মতাদর্শগত সংগ্রামের অগ্রভাগ। যেখানে ফ্যাসিবাদ ঘৃণার গল্প বলে, সেখানে মানুষের গল্প বলতে হবে। যেখানে তারা পৌরাণিক শত্রু বানায়, সেখানে বাস্তবকে মানুষের জীবনকে সামনে আনতে হবে। যেখানে তারা ইতিহাসকে সংকুচিত করে, সেখানে ইতিহাসকে আবার মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে।
জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখট ১৯৩৫ সালে রচিত তাঁর প্রবন্ধ ‘সত্য লেখার পাঁচটি অসুবিধা’ (Five Difficulties in Writing the Truth)-এ লিখেছিলেন, সত্য লেখা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন সাহস, প্রজ্ঞা, শিল্পকুশলতা, বিচারবোধ এবং সেই সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা। অর্থাৎ, সত্য যদি মানুষের ভাষায় না পৌঁছায়, তবে তার রাজনৈতিক শক্তিও সীমিত হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নতুন ভাষায় কথা বলতে হবে। শুধু দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে নয়। ছোট ভিডিওতে। পডকাস্টে। গ্রাফিক নভেলে। লোকগানে। ব্যান্ড সংগীতে। স্ট্রিট থিয়েটারে। ডিজিটাল পাঠচক্রে। খেলার মাঠে। ভাষা বদলানো মানে নীতি বদলানো নয়। বরং সত্যকে এমনভাবে বলা, যাতে মানুষ তাকে নিজের জীবনের অংশ বলে অনুভব করে।

চতুর্থত, আত্মসমালোচনার সাহস রাখতে হবে। মার্কসবাদ যদি জীবন্ত দর্শন হয়, তবে সে নিজের ভুল থেকেও শিক্ষা নেবে। যেখানে মানুষের ভাষা বোঝা যায়নি, সেখানে শিখতে হবে। যেখানে সংস্কৃতির গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে, সেখানে নতুন করে সাংস্কৃতিক পরিসর গড়তে হবে। যেখানে সংগঠন সমাজের চেয়ে নিজের ভেতরেই বেশি ব্যস্ত হয়েছে, সেখানে আবার মানুষের মধ্যে ফিরে যেতে হবে। আত্মসমালোচনা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং  এটা জীবন্ত রাজনীতির পরিচয়।

ফ্যাসিবাদ প্রতিদিন একটা প্রশ্ন করে — ‘তোমার শত্রু কে?’ মার্কসবাদ পাল্টা প্রশ্ন করে — ‘তোমার শোষক কে?’
এই দুই প্রশ্নের মধ্যেই দুই পৃথিবীর অস্তিত্ব। একটা প্রশ্ন মানুষকে বিভক্ত করে। অন্যটা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। একটা প্রশ্ন ঘৃণা শেখায়। অন্যটা মুক্তির পথ খোঁজে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনও ফ্যাসিবাদ চিরস্থায়ী হয়নি। কারণ ফ্যাসিবাদ মানুষের শরীরকে বন্দি করতে পারে, কিন্তু মানুষের কল্পনাশক্তিকে চিরদিন বন্দি রাখতে পারে না। সে বই পোড়াতে পারে। কিন্তু ধারণা পোড়াতে পারে না। সে কারাগার বানাতে পারে। কিন্তু স্বপ্নের জন্য কারাগার বানাতে পারে না। সে ইতিহাসের বই বদলাতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না। এই কারণেই প্রতিটি ফ্যাসিবাদ শেষ পর্যন্ত মানুষের মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব বিলোপের ঠিকানা খুঁজে পায়।

১৮৪৫ সালে Theses on Feuerbach-এর একাদশ থিসিসে মার্কস যে আহ্বান জানিয়েছিলেন — "পৃথিবীকে শুধু ব্যাখ্যা নয়, পরিবর্তন করতে হবে" — তা মতাদর্শগত সংগ্রামের অন্যতম মৌলিক নীতি।
আজ সেই বাক্যের সঙ্গে আরও একটা বাক্য যোগ করার সময় এসেছে – ‘পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে হলে মানুষের চেতনাকেও মুক্ত করতে হবে।’ কারণ যে মানুষ ঘৃণাকে নিজের পরিচয় বলে বিশ্বাস করে, সে নিজের শৃঙ্খলও দেখতে পায় না। আর যে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, ইতিহাস পড়তে শেখে, প্রতিবেশীর মধ্যে মানুষকে দেখতে শেখে — তার কাছেই ফ্যাসিবাদ সবচেয়ে দুর্বল।

শেষ পর্যন্ত মতাদর্শগত সংগ্রাম কোনও দলের একার কাজ নয়। এটা শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, শিল্পী, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, লেখক এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের যৌথ দায়িত্ব। কারণ গণতন্ত্র শুধু একটা শাসনব্যবস্থা নয়। এ মানুষের একসঙ্গে বেঁচে থাকার নৈতিক সিদ্ধান্ত। আর মার্কসবাদের শক্তি এখানেই — সে মানুষকে ঘৃণার পতাকার নিচে নয়, মুক্তির স্বপ্নের নিচে একত্রিত করতে চায়।

হয়তো আগামীকাল আবার কোনও বই নিষিদ্ধ হবে। হয়তো আবার কোনও ইতিহাস বিকৃত হবে। হয়তো আবার কোনও শিশুকে শেখানো হবে, তার প্রতিবেশীই তার শত্রু।
কিন্তু যতদিন একজন শিক্ষক সত্য ইতিহাস পড়াবেন, একজন শ্রমিক বিভেদের বদলে ঐক্যের কথা বলবেন, একজন কবি মানুষের পক্ষে লিখবেন, একজন ছাত্র প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না — ততদিন সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে।
কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রাজাদের হাতে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় মানুষের হাতে। আর মানুষ, সব পরাজয়ের পরেও, বারবার প্রমাণ করেছে — ঘৃণার চেয়ে স্মৃতি বড়। ভয়ের চেয়ে স্বাধীনতা বড়। ক্ষমতার চেয়ে মানুষ বড়।ফলে জয় আমাদের হবেই।


প্রকাশ: ০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 08-Sep-26 18:18 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/factory-of-hate-vs-university-of-humans
Categories: Fact & Figures
Tags: capitalism, communalism, leftalternative
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড