আরএসএস কি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল ?

ঔপনিবেশিক শাসনকে অন্যায় বলে মানতেও রাজি ছিল না আরএসএস। ১৯৪২ সালের ৮ জুন এক বক্তৃতায় গোলওয়ালকর বলেন, “সমাজের বর্তমান অধঃপতিত অবস্থার জন্য অন্য কাউকে দোষ দিতে চায় না সংঘ। লোকেরা যখন অন্যকে দোষ দিতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় তাদের মধ্যে দুর্বলতা আছে। দুর্বলের প্রতি অন্যায় করার জন্য সবলকে দোষ দেওয়া বৃথা।...

আরএসএস দাবি করে আজকের ভারতে তারাই হচ্ছে জাতীয়তাবাদের মূর্ত রূপ। দেশবাসী জানতে চায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য ১৯৪৭সালের আগে কী কী আন্দোলন করেছিল আরএসএস? ঔপনিবেশিক শাসনে তাদের কোন কোন নেতা ও কর্মী অত্যাচার সহ্য করেছেন? তাদের মধ্যে কারা দেশের স্বাধীনতার জন্য কারাগারে গেছেন বা শহিদ হয়েছেন? স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায় সম্বন্ধে গোলওয়ালকরের নিম্নলিখিত বক্তব্যটি পড়লে যে কোনও দেশপ্রেমিক মানুষ চমকে উঠবেন।
সর্বদা প্রাত্যহিক কাজকর্মে যুক্ত থাকার অন্য একটি কারণও আছে। দেশে মাঝে মধ্যেই যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে মন কিছুটা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৪২ সালে এরকমই বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। তার আগে ছিল ১৯৩০-৩১-এর আন্দোলন। সেই সময় অনেকেই ডক্টরজির সঙ্গে (ডক্টরজি হচ্ছেন ডঃ হেডগেওয়ার, আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা) দেখা করতে যান। তাঁরা ডক্টরজিকে বলেন, এই আন্দোলনের সূত্রেই স্বাধীনতা আসবে, এই অবস্থায় সংঘ (আরএসএস) পিছিয়ে থাকলে চলবে না। সেইসময় জনৈক ভদ্রলোক ডক্টরজিকে বলেন যে, তিনি জেলে যেতে প্রস্তুত। ডক্টরজি বলেন, “অবশ্যই যান। কিন্তু তারপর আপনার পরিবারের দেখাশোনা করবে কে?” ভদ্রলোক উত্তর দেন, “দু'বছর সংসার চালানোর মতো সংস্থান আমি করে রেখেছি, প্রয়োজন হলে জরিমানার টাকা দেওয়ারও ব্যবস্থা করেছি”। তখন ডক্টরজি তাঁকে বলেন, “যদি সব ব্যবস্থা করাই থাকে, তাহলে আসুন, সংঘের জন্য দু'বছর কাজ করুন”। বাড়ি ফেরার পর সেই ভদ্রলোক জেলেও যাননি, সংঘের জন্যও কাজ করতে আসেননি।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সৎ দেশপ্রেমিকদের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্য থেকে সরিয়ে এনে নিরুৎসাহিত করার কাজেই সচেষ্ট ছিল আরএসএস নেতৃত্ব।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ‘অসহযোগ’ এবং 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই দুটি মহান ঘটনা সম্পর্কে মহান গোলওয়ালকরের মহান তত্ত্বটি একটু দেখা যাক।
“এই সংগ্রামের ফলাফল অবশ্যই খারাপ হবে। ১৯২০-২১-এর আন্দোলনের পর ছেলেরা অবাধ্য হয়ে উঠেছিল। আমি নেতাদের গায়ে কাদা ছেটাতে চাইছি না। কিন্তু এগুলি হচ্ছে সংগ্রাম-পরবর্তী অবশ্যম্ভাবী ফলাফল। মূল কথা হল, আমরা এইসব ফলাফলকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি। ১৯৪২ সালের পর লোকেরা ভাবতে শুরু করেছিল, আইনকানুন নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও প্রয়োজন নেই।”
অর্থাৎ গোলওয়ালকর চান অমানবিক ইংরেজ শাসকদের নির্মম ও অত্যাচারী আইনকে সম্মান করে চলুক ভারতীয়রা। ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ (১৯৪২) সম্বন্ধে আরএসএসের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি স্বীকার করেছেন:
“১৯৪২ সালেও অনেকের মনে এক তীব্র আবেগ সৃষ্টি হয়েছিল। সংঘের দৈনন্দিন কাজকর্ম তখনও যথানিয়মেই চলত। সংঘ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে কিছু করা হবে না। তবে সংঘের স্বেচ্ছাসেবকদের মনের মধ্যে উথালপাথাল চলছিলই। সংঘ হচ্ছে অকেজো লোকেদের সংগঠন, এদের কথাবার্তার কোনও মূল্য নেই-শুধু বাইরের লোকেরা নয়, আমাদের অনেক স্বেচ্ছাসেবকও এরকম কথা বলত। রীতিমতো বিরক্তও হয়ে উঠেছিল তারা।”
অবশ্য ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের জন্য পরোক্ষভাবে কী কী মহান কাজ করেছিল আরএসএস, সে ব্যাপারে কিছু জানার জন্য সংঘের একটিও প্রকাশনা বা দলিল নেই।
বিদেশি শাসনের বিরদ্ধে যে কোনও আন্দোলনের প্রতি নিজের বিরোধিতা কখনও গোপন করতে পারেননি সরসংঘচালক গোলওয়ালকর। এমনকী ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে, যখন ব্রিটিশ শাসকরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, তখনও দিল্লিতে আরএসএসের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সংকীর্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন নেতারাই ব্রিটিশ রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতা করছেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দুর্দশার জন্য শক্তিশালী বিদেশিদের দায়ী করা ভুল। “বিজয়ীদের প্রতি আমাদের ঘৃণার ভিত্তিতে রাজনৈতিক -আন্দোলন শুরু করার” প্রবণতার নিন্দা করেন তিনি। ভাষণের মধ্যে একটি ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বিষয়টিকে আরও বিশদে ব্যাখ্যা করেন তিনি: “একবার জনৈক সম্মানীয় বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের শাখায় আসেন। আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য এক নতুন বার্তা বহন করে আনেন তিনি। শাখার স্বেচ্ছাসেবকদের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত প্রত্যয়ের সুরে কথা বলেন ভদ্রলোক। ‘এখন শুধু একটা কাজই করুন। ইংরেজদের ধরুন, মারুন আর ছুঁড়ে ফেলে দিন। পরে কী ঘটে দেখা যাবে।’ এইটুকু বলেই বসে পড়েন তিনি। এই মতাদর্শের পিছনে আছে রাষ্ট্রশক্তির প্রতি ক্রোধ ও দুঃখের অনুভূতি এবং ঘৃণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতা। বর্তমানের রাজনৈতিক আবেগসর্বস্বতার ক্ষতিকর দিকটি হল এই যে, এটি গড়ে উঠেছে প্রতিক্রিয়া, দুঃখ ও ক্রোধের ভিত্তিতে এবং বন্ধুত্ব ভুলে গিয়ে বিজেতাদের বিরোধিতা করার ভিত্তিতে।”
গুরু গোলওয়ালকরের প্রতি সম্পূর্ণ সুবিচার করেই বলা যায়, তিনি কখনও দাবি করেননি যে আরএসএস ইংরেজদের বিরোধী। ১৯৬০ সালে ইন্দোরে একটি বক্তৃতায় তিনি বলেন, “ইংরেজদের তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করার অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে বহু মানুষ কাজ করে গেছেন। ইংরেজরা আনুষ্ঠানিকভাবে চলে যাওয়ার পর এই অনুপ্রেরণা শিথিল হয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে কী, এত অনুপ্রেরণার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। মনে রাখা দরকার, আমরা আমাদের অঙ্গীকারে ধর্ম ও সংস্কৃতি রক্ষা করার সাহায্যে দেশের স্বাধীনতার কথা বলেছিলাম। সেখানে ইংরেজদের চলে যাওয়া সংক্রান্ত কোনও কথা ছিল না।”
ঔপনিবেশিক শাসনকে অন্যায় বলে মানতেও রাজি ছিল না আরএসএস। ১৯৪২ সালের ৮ জুন এক বক্তৃতায় গোলওয়ালকর বলেন, “সমাজের বর্তমান অধঃপতিত অবস্থার জন্য অন্য কাউকে দোষ দিতে চায় না সংঘ। লোকেরা যখন অন্যকে দোষ দিতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় তাদের মধ্যে দুর্বলতা আছে। দুর্বলের প্রতি অন্যায় করার জন্য সবলকে দোষ দেওয়া বৃথা।... অন্যদের গালমন্দ বা সমালোচনা করে সংঘ নিজের অমূল্য সময় নষ্ট করতে চায় না। আমরা যদি জানি যে, বড়ো মাছ ছোটো মাছেদের খেয়ে থাকে, তাহলে বড়ো মাছটিকে দোষ দেওয়া নিতান্তই পাগলামি। ভালোই হোক আর খারাপই হোক, প্রকৃতির নিয়ম সর্বদাই সত্য। অন্যায় বলে চিহ্নিত করে এই নিয়ম বদলানো যায় না।”
স্বাধীনতা সংগ্রামের নিন্দা করা এবং ইংরেজ শাসকদের মহিমান্বিত করার ব্যাপারে গোলওয়ালকর অবশ্য একা নন। তাঁর গুরু এবং আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারও একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। হেডগেওয়ারের স্বীকৃত জীবনীতে এই অর্থবহ কথাটি লেখা আছে, “সংঘ প্রতিষ্ঠা করার পর নিজের সমস্ত বক্তৃতায় কেবলমাত্র হিন্দু সংগঠন নিয়ে কথা বলতেন ডক্টর সাহেব। সরকার সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ কোনও মন্তব্য কখনওই করতেন না”।
লক্ষণীয় বিষয় হল, হেডগেওয়ার সম্বন্ধে আজ পর্যন্ত প্রকাশিত যাবতীয় রচনাপত্রের কোথাও বর্বর ও অমানবিক ‘গোরাশাহি’ অর্থাৎ ইংরেজশাসন প্রসঙ্গে কোনও ‘পরোক্ষ’ মন্তব্যও পাওয়া যায়নি। এমনকী স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কার ‘ন্যাশনালিস্ট প্রেস’-এর যাবতীয় লেখাপত্র খুঁটিয়ে দেখলেও এই সংগ্রামে আরএসএসের ভূমিকার কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না।
বোঝা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামের সমগ্র পর্যায়ে আরএসএস অত্যন্ত সন্দেহজনক ভূমিকাই পালন করেছিল। যাবতীয় তথ্য এই সংগঠনের সংহতিনাশক কার্যকলাপের প্রমাণ দেয় এবং দেখিয়ে দেয় যে, এই সংগঠন ও তার নেতারা কখনওই স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশীদার ছিলেন না। হিন্দু রাষ্ট্রের চরম স্বতন্ত্রতাবাদী ধুয়ো তুলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের সংহতি নষ্ট করার লাগাতার প্রচেষ্টাই ছিল আরএসএসের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
প্রকাশ: ০৮-আগস্ট-২০২৬
শেষ এডিট:: 08-Aug-26 09:27 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/did-the-rss-participate-in-the-freedom-struggle
Categories: Fact & Figures
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (172)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)




