|
খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ার জ্বালাPrabhat Patnaik |
তবে খনিজ সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিলে দেশকে একটা বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তখন ওই ‘জাতীয়তাবাদী’ সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। আর যদি দেখা যায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানে সরকারকে হটানো যাচ্ছে না, তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে সাম্রাজ্যবাদীরা সরাসরি সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করে। |
বর্তমান বিশ্বের পুঁজিবাদী কাঠামোতে বৈশ্বিক দক্ষিণের কোনো দেশ বা অঞ্চল যদি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হয়, তবে তা সেখানকার মানুষের জন্য চরম দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটা মজার ব্যাপার হলো, পুঁজিবাদের মূল ঘাঁটি উত্তরের দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে খনিজ সম্পদে দরিদ্র। শিল্প-পুঁজিবাদের পথিকৃৎ ব্রিটেনের ক্ষেত্রেও এটা সত্য, আর বৈশ্বিক উত্তরের একমাত্র এশিয়ান দেশ জাপানের ক্ষেত্রেও তা-ই। সাম্রাজ্যবাদের একটা প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, বিশেষ করে খনিজ সম্পদের খোঁজ। কারণ উত্তরের দেশগুলোর এই ‘সমৃদ্ধি’ বজায় রাখতে ওই সম্পদগুলো অপরিহার্য। দক্ষিণের কোনো দেশে বাণিজ্যিক ব্যবহারের কোনো খনিজ সম্পদ পাওয়া গেলেই উত্তরের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই সম্পদ উত্তোলনের ফলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বেড়ে যায়। কিছুদিনের জন্য উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেখা মেলে। সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাগুলো তখন সেই দেশটিকে রপ্তানি-মুখী প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। কিন্তু আসল কথা হলো, খনি খাতে তেমন কোনো কর্মসংস্থান হয় না। আর হলেও তা শিল্পধ্বংসের ফলে তৈরি হওয়া বেকার শ্রমিকের বিশাল বাহিনীর তুলনায় নগণ্য। এর ওপর, এই খনি উন্নয়ন সাধারণত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় হয়। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারায়। খনি থেকে আয় হওয়া বিশাল অঙ্কের টাকা চলে যায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পকেটে, তারা তা বিদেশে পাচার করে। খনিজ সম্পদ রপ্তানির জন্য যে সামান্য অবকাঠামো তৈরি হয়, তার বাইরে অর্থনীতির অন্য খাতগুলোর তেমন কোনো উন্নতি হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ এই খনি উত্তোলনের সুফল থেকে বঞ্চিত থাকে। অবশেষে একদিন ওই খনিজ সম্পদ ফুরিয়ে যায়। বহুল প্রচারিত ‘উন্নয়ন’-এরও ইতি ঘটে। দেশ তখন শুধু আগের জায়গাতেই ফিরে আসে না, বরং খনিজ সম্পদ হারিয়ে আরও পিছিয়ে পড়ে। খনিজ সম্পদ রপ্তানির জন্য যে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তা আর রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় না। তা ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে যায়। মানুষ উত্তোলনের সময় ওই সম্পদের কোনো সুফল পায় না। বরং শেষ পর্যন্ত তাদের খনিজ সম্পদও হারাতে হয়। সহজ কথায়, তাদের শুধু লুট করা হয়। এই ঘটনা বোঝার জন্য আমাদের বেশি দূর যেতে হবে না। অনেকে একে ‘সম্পদের অভিশাপ’ বলে থাকেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কারণ এটা আসল সামাজিক সমস্যাটির দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ বার্মা বা মায়ানমার এর একটা চমৎকার উদাহরণ। দেশটি শুধু মূল্যবান ধাতুতেই সমৃদ্ধ ছিল না, পেট্রোলিয়ামেও ছিল প্রচুর। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই তারা তেল রপ্তানি শুরু করে। ব্রিটিশ মালিকানাধীন বার্মা অয়েল কোম্পানি এবং আমেরিকান মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি এতটাই নিবিড়ভাবে তেল তুলেছিল যে, ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার সময় দেশটির প্রায় সব তেল ফুরিয়ে গেছে। আজ বার্মা সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কৃত গ্যাস রপ্তানি করলেও, তাদের জ্বালানি তেলের চাহিদার ৯০ ভাগেরও বেশি আমদানি করতে হয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতিসংঘের মানদণ্ডে দেশটিকে ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। দক্ষিণের দেশগুলোতে খনিজ সম্পদের এই যে ক্ষণস্থায়ী উত্থান, এর জন্যই খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসন বলেছিলেন, খনিজ সম্পদ উত্তোলনে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ হলো প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ। কারণ, উৎপাদনশীল খাতে বহুজাতিক কোম্পানি বিনিয়োগ করলে অন্তত দেশে কিছু স্থায়ী সম্পদ তৈরি হয়। কিন্তু খনিজ উত্তোলনে তারা দেশের অ-নবায়নযোগ্য সম্পদ কেবল লুটে নিয়ে যায়। কোনো স্থায়ী সম্পদ তৈরি করে না। বরং শেষ পর্যন্ত দেশটিকে আরও গরিব করে রেখে যায়। স্বাভাবিকভাবেই, দক্ষিণের অনেক দেশে রাজনৈতিক ঔপনিবেশিকতার অবসানের পর খনিজ সম্পদগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়। খনিজ উত্তোলনের জন্য গড়ে তোলা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। এমনকি, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে রাষ্ট্রের রাজস্বের অংশ বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই হুমকিকে কাজে লাগানো হতো। যেমন, ইকুয়েডরে বামপন্থি নেতা রাফায়েল কোরিয়া যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তিনি খনিজ সম্পদ থেকে আয় হওয়া রাজস্বে রাষ্ট্রের অংশ বাড়িয়ে দিলেন। বিশেষ করে পেট্রোলিয়াম খাতে। তবে খনিজ সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিলে দেশকে একটা বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তখন ওই ‘জাতীয়তাবাদী’ সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। আর যদি দেখা যায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানে সরকারকে হটানো যাচ্ছে না, তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে সাম্রাজ্যবাদীরা সরাসরি সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করে। এর সবচেয়ে ক্ল্যাসিক উদাহরণ আজকের ইরান। সরকারের আমূল পরিবর্তন আনার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যেই আমেরিকা এবং ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে। আধুনিক যুগের এক অকল্পনীয় বর্বরতায় তারা ইরানের সমগ্র নেতৃত্বকে হত্যা করেছে। সরকার পরিবর্তনের এই হামলার পেছনে নানা রকম উদ্দেশ্য থাকলেও, ইরানের তেল দখল করে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর লাভ করার যে আর্থিক উদ্দেশ্য ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প তা কখনও লুকোননি। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণ করেছিলেন। এর জের ধরে ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থারা মিলে এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁকে উৎখাত করে। কিন্তু বর্তমান ইসলামি শাসনামলেও তেল এখন রাষ্ট্রায়ত্ত খাতেই আছে। এর একটা কারণ হলো, বেশ কয়েকজন ইসলামি আইনবিদের মতে, খনিজ সম্পদের সার্বজনীন মালিকানা ইসলামি আইন অনুযায়ী বৈধ, কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। দক্ষিণের দেশগুলোর খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার এই মরিয়া প্রচেষ্টার জের ধরেই সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে কিছু অত্যন্ত বর্বর অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে একটা কুখ্যাত ঘটনা হলো ঔপনিবেশিক আমলের বেলজিয়ান কঙ্গো। প্যাট্রিস লুমুম্বার নেতৃত্বে কঙ্গো যখন স্বাধীনতা পেল, তখন সাম্রাজ্যবাদী চক্রের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হলো। তারা ভাবল, স্বাধীন দেশটি হয়তো তাদের কবল থেকে প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেবে। এরপর সাম্রাজ্যবাদীদের মদতেই দেশটির খনিজ সম্পদশালী কাটাঙ্গা প্রদেশকে কঙ্গো থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দেওয়া হলো। গ্রেফতার করা হলো প্যাট্রিস লুমুম্বাকে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা হলো। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে সারা বিশ্বে নব্য-উদারবাদী নীতি গ্রহণ করা হয়। এটা ছিল দক্ষিণের দেশগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতার পর যে অর্থনৈতিক ঔপনিবেশিকতার অবসান ঘটেছিল, তার বিরুদ্ধে এক ধরনের পাল্টা বিপ্লব। এর ফলে একঝাঁক দেশে এবং অঞ্চলে খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ আবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হলো। ভারতের কথাই ধরা যাক। উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন স্বাধীনতার পর খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর তাই জাতীয় নীতি ছিল সেটাই। কিন্তু ১৯৯৩ সালে সেই নীতি থেকে সরে আসা হলো। বহুজাতিক এবং দেশীয় পুঁজিকে এই খাতে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হলো। এমনকি, খনিজ খাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর থাকা বিদেশি মালিকানার ৫০ শতাংশের সীমারেখাও ২০০৬ সালে তুলে দেওয়া হলো। তখন থেকে সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে এই খাতে প্রবেশাধিকার দেওয়া হলো। এর পরই শুরু হলো নির্মম লুটতরাজ। দেশীয় কর্পোরেট এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো খনি চালানোর জন্য আদিবাসী মানুষদের তাদের ঐতিহ্যবাহী বাসস্থান থেকে উৎখাত করতে শুরু করল। এই সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যাকে ‘উন্নয়ন’ বলা হচ্ছে, তা স্থানীয় মানুষের জন্য চরম দুর্দশা নিয়ে এসেছে। আসলে এখানে পুঁজির আদিম সঞ্চয় প্রক্রিয়াই চলছে। কেন্দ্রে এবং খনিজ সম্পদশালী ওড়িশায় এখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায়। বড় পুঁজির প্রতি তাদের এই অগাধ দুর্বলতার কারণেই তারা সম্প্রতি কিছু নতুন নিয়ম এনেছে। এই নিয়মের ফলে রাজ্য সরকারের পক্ষে খনি কোম্পানিগুলোর ওপর কর চাপানো কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে খনি থেকে আয় হওয়া রাজস্ব কেন্দ্রীভূত হবে এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পকেটে আরও বেশি টাকা যাবে। স্বাভাবিকভাবেই, খনি কোম্পানিগুলোর দ্বারা মানুষের উৎখাত এবং ভিটেমাটি হারানোর বিরুদ্ধে জনআন্দোলন এখন শ্রেণিসংগ্রামের একটা প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নব্য-উদারবাদ এখন মৃতপ্রায়। এই নীতি দিয়ে জনগণের কাছে যে ‘সমৃদ্ধির’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা যে মিথ্যে ছিল, তা এখন স্পষ্ট। ফলে পুঁজির আদিম সঞ্চয় প্রক্রিয়া এখন আরও বেশি করে হিংস্র রূপ নেবে। ভেনেজুয়েলা বা ইরানের মতো দেশে সরাসরি আগ্রাসন চালানো থেকে শুরু করে, নব্য-ফ্যাসিবাদী শাসনকে মদত দেওয়া, সব কিছুতেই এই হিংস্রতা দেখা যাবে। কারণ বিশ্বায়িত পুঁজির স্বার্থে এই শাসনগুলোই আদিম সঞ্চয় প্রক্রিয়া আরও নির্মমভাবে চালাবে। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি জনগণের মুখোমুখি দাঁড়াবে। পুঁজিবাদ যখন তার অস্তিত্বের শেষ পর্যায়ে পা দেয়, তখন তা আরও অনেক বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। জনগণের প্রতিরোধকে এই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতেই হবে। পিপলস ডেমোক্রেসী ২৮শে সেপ্টেম্বর – ৪ঠা অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ: ০৫-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|