|
চিত্তের প্রসাদIndrajit Narayan |
সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মননেই বেঁচে থাকবে তাঁর সৃজন সম্ভার এব়়ং তাদের স্রষ্টা। কারণ তিনি 'চিত্ত-র প্রসাদ'। |
কখনও কালো জমির ওপর সাদা রেখা, কখনো ঠিক তার উল্টোটা - সাদার ওপর কালো। কিন্তু সেই রেখা, সাদা হোক বা কালো - সূক্ষ্ম হোক বা বলিষ্ঠ, এক স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দময়তায় তারা চিত্ররূপ দিয়েছিল তাঁর ভাবনার। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, সেই তৃতীয় দশকে, যে ভাবনা ছিল ভীষণভাবেই ব্যতিক্রমী। ![]() বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত, দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মানুষ যখন বাঁচার স্বপ্ন দেখতে দেখতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তখন তা পরিণত হয় এক বিপুল বলিষ্ঠ প্রতিবাদে। ![]() সেই সময়ে বাংলা থেকে সারা ভারতে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা 'Bengal School of Art'-এর ধ্রুপদী - দেশাত্মবোধক শৈলীর সমান্তরালে এমন প্রগতিশীল শৈলীর প্রতিষ্ঠা করা ছিল এক ভীষণ সাহসী পদক্ষেপ।ব্যতিক্রমীও বটে। আর তিনিই তা পেরেছিলেন। কারণ তিনি 'চিত্তপ্রসাদ'। হিন্দু বর্ণাশ্রমের সংকীর্ণ উঁচুনিচুর ভেদাভেদ, ঘৃণার সাথে প্রত্যাখান করেছিলেন। তাই স্বাক্ষরে কখনই তাঁর পারিবারিক পদবী 'ভট্টাচার্য' ব্যবহার করেন নি। সব ক্ষেত্রেই ছিলেন বাঁধা ছকের বাইরে।
৩০-এর দশকের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম সরকারি মহাবিদ্যালয়ে পড়াশুনা চলাকালিনই আকৃষ্ট হন প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি।সেই সময়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন আর দেশীয় সামন্ত প্রভুদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দেলনে নিজেকে যুক্ত করেন। আর তাঁর প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন চিত্রকলা মাধ্যমকে। ছাপাই ছবির মধ্যে লিনোকাট - উডকাট আর কালি কলমে তিনি সব চেয়ে বেশি কাজ করেছেন। ![]() সাদা কাগজের ওপর মূলত কালো রঙের বিভিন্ন ঘনত্বে স্বচ্ছ জলরঙের প্রলেপ, তার ওপর দ্রুত লয়ে কালো রঙে কলমে বা তুলিতে আঁকা মানুষ - কখনো খিদেয় কাতর, মরণাপন্ন, বাস্তুচ্যুত, কখনো প্রতিবাদে গর্জে ওঠা মিছিলে। আর ছিল ব্যঙ্গচিত্র - ব্রিটিশ শাসক বিরোধী নানান পোস্টারে। এর বেশিরভাগ কাজই ছিল প্রচারমূলক। সাধারণ মানুষের সামনে সাম্রাজ্রবাদ আর সামন্তবাদের কদর্য আগ্রাসী চেহারা তুলে ধরে, তার বিকল্প হিসেবে বামপন্থী আদর্শ সম্পর্কে সচেতন করা। এইসময় তিনি একের পর এক এমনই বহু প্রচারধর্মী ছবি এঁকেছেন। বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের জন্য। কখনো কখনো কিছু ছবিতে স্বাক্ষর করাও সম্ভব হত না - সময়ের অভাবে। এভাবেই ১৯৪৩-র মন্বন্তর নিয়ে তাঁর প্রথম ছবির series 'Hungry Bengal' প্রকাশ পায়। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আর সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনে প্ররোচিত করার অভিযোগ এনে, প্রকাশ পাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই 'Hungry Bengal' নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তার মূদ্রিত স়ংস্করণ বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। সেই উত্তাল সময়ে, স্বাধীনতাকামী বামমনস্ক জনমানসে তাঁর কাজ কতখানি প্রভাব ফেলেছিল, এই ঘটনা থেকেই তা অনুমান করা যায়। ![]() ৪০-এর দশকের শেষ ভাগে, কমিউনিস্ট পার্টির ভিতর গড়ে ওঠা মতাদর্শগত অর্ন্তদ্বন্দ্ব তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তাই পার্টির সাথে তাঁর প্রতক্ষ যোগাযোগ খানিকটা ক্ষিণ হয়। তিনি বিশ্বশান্তির সপক্ষে আন্দোলনে মনোনিবেশ করেন। তার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বঞ্চিত শিশু কিশোরদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার কর্মসূচিতে নিজেকে যুক্ত করে নেন। ![]() তাঁর অজস্র সৃষ্টি, যা একসময় তাঁর স্বাক্ষর ছাড়াই , সাম্যবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচারমূলক কাজেই শুধুমাত্র ব্যবহৃত হত….. আজ সম্ভ্রান্ত, সমঝদার সংগ্রাহকের কাছেও তা মহার্ঘ - তার নান্দনিকতা উত্তীর্ণ শিল্পগুণে। এভাবেই সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মননেই বেঁচে থাকবে তাঁর সৃজন সম্ভার এব়়ং তাদের স্রষ্টা। কারণ তিনি 'চিত্ত-র প্রসাদ'। প্রকাশের তারিখ: ২১-জুন-২০২৩ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|