|
আগুনের শিখাকে শেকলে বাঁধা যায় নাSamik Lahiri |
আজ ১৪০ বছর পর নয়ডা থেকে গুরুগাঁও-এর শিল্পাঞ্চলে সেই নীরবতার ধ্বনিই তো বজ্রনির্ঘোষে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ক্ষমতার মসনদ সেদিন যতটা হিংস্র ছিল, আজও শ্রমিকরা একজোট হতে চাইলে সেই পুরনো রক্তচক্ষু একইরকম নির্মম হয়ে ওঠে। ১৪০টা বছর ‘মানব সভ্যতা’ পেরিয়ে এসেছে। |
৪ মে। ১৮৮৬ সাল। শিকাগোর আকাশ সেদিন মেঘলা ছিল কি না ইতিহাস তা মনে রাখেনি, কিন্তু মনে রেখেছে রাজপথের সেই রক্তভেজা লড়াইকে। ‘হে মার্কেট’চত্বরে সেদিন তলোয়ার হাতে কোনও সেনা লড়তে নামেনি, নেমেছিল কয়েক হাজার ঘাম-ঝরানো নিরস্ত্র মানুষ। তাদের দাবিটা ছিল নুন-ভাতের মতোই অতি সাধারণ — ‘দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, আর ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য।’ কিন্তু পুঁজির কাছে মানুষের রক্ত-ঘাম চিরদিনই সস্তা। যখনই ওই শ্রমজীবী মানুষগুলো একজোট হয়ে এই দাবি তুলল, তখনই নগ্ন হয়ে পড়ল রাষ্ট্র আর মালিকপক্ষের সেই ভয়ংকর আঁতাত। পুলিশের বেপরোয়া বুটের শব্দ, হঠাৎ বিস্ফোরিত বোমার ধোঁয়া, আর তারপর... নির্বিচার গুলির শব্দে সেদিন থমকে গিয়েছিল গোধুলির অস্তরাগে রেঙে ওঠা আকাশের লাল মেঘ। এরপর যা ঘটেছিল তা বিচার নয়, ছিল এক সুপরিকল্পিত ‘আইনি হত্যাকাণ্ড’। তড়িঘড়ি সাজানো বিচারে শ্রমিক নেতাদের ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হলো। ফাঁসিকাঠে দাঁড়িয়ে অগাস্ট স্পাইজ গর্জে উঠেছিলেন — “The time will come when our silence will be more powerful than the voices you are throttling today.” (এমন এক সময় আসবে যখন আমাদের এই নীরবতা, আজ তোমরা যাদের কণ্ঠরোধ করছ তাদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে।) আজ ১৪০ বছর পর নয়ডা থেকে গুরুগাঁও-এর শিল্পাঞ্চলে সেই নীরবতার ধ্বনিই তো বজ্রনির্ঘোষে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ক্ষমতার মসনদ সেদিন যতটা হিংস্র ছিল, আজও শ্রমিকরা একজোট হতে চাইলে সেই পুরনো রক্তচক্ষু একইরকম নির্মম হয়ে ওঠে। ১৪০টা বছর ‘মানব সভ্যতা’ পেরিয়ে এসেছে। পৃথিবী বদলেছে, কলকারখানার চেহারা বদলেছে, এসেছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু ক্ষমতার আচরণের কোনও বদল আসেনি। ‘এখনো তো মানুষের হাত মানুষের হাতে নেই মানুষ রয়েছে আজও রক্তচক্ষু মানুষের পাশে।’ আজকের ভারতের উত্তরপ্রদেশ বা হরিয়ানার শিল্পাঞ্চলগুলোর দিকে তাকালে সেই পুরনো ইতিহাসেরই ছায়া দেখা যায়। এখন শ্রমিকদের দাবির ভাষা হয়তো কিছুটা বদলেছে — তারা আজ স্থায়ী চাকরি, ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা আর ইউনিয়ন করার অধিকার চায়। কিন্তু এই ন্যায্য দাবির মুখে প্রশাসন আর মালিকপক্ষের প্রতিক্রিয়া সেই পুরনো দিনের মতোই। শ্রমিকরা সংগঠিত হতে গেলেই নেমে আসে আক্রমণ। প্রতিবাদ করলেই পুলিশের লাঠি, আর নেতৃত্বে থাকলে কপালে জোটে মিথ্যা মামলা আর রাতের অন্ধকারে হামলা। ইতিহাস যেন বারবার ফিরে আসে আরও নির্মম, নিষ্ঠুর হয়ে। উৎপাদন বনাম অধিকার আন্দোলন দমন করার জন্য পুঁজিপতিদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ‘শৃঙ্খলা’আর ‘উৎপাদন’-এর দোহাই দেওয়া। ১৮৮৬ সালেও আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ‘অরাজক’, ‘বিশৃঙ্খলাকারী’ ইত্যাদি তকমা দেওয়া হয়েছিল। আজও বলা হয় — আন্দোলন করলে নাকি উৎপাদনের ক্ষতি হচ্ছে, বিনিয়োগ পালাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে। এই চতুর ভাষার আড়ালে আসলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে ‘আইন শৃঙ্খলা জনিত সমস্যা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। যেন নিজেদের অধিকার চাওয়াটাই একটা বিরাট বড় অপরাধ! অথচ আসল প্রশ্নগুলোই ধামাচাপা পড়ে যায় — উৎপাদন আসলে কাদের জন্য? যারা রক্তজল করা পরিশ্রমে উৎপাদন করছে, তাদের ঘাম-রক্তের কি কোনো দাম নেই? এখানেই আসে ১৯৭৯ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ আর্থার লুইসের তত্ত্বের কথা। লুইস 'ডুয়াল সেক্টর মডেল' তৈরি করে দেখিয়েছিলেন, যখন বাজারে শ্রমিকের জোগান অফুরন্ত থাকে, তখন মালিকরা চায় শ্রমিককে নামমাত্র মজুরি দিয়ে নিজেদের মুনাফার পাহাড় গড়তে। লুইসের মতে, এই শোষণ রুখতে ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ হচ্ছে এক ‘বৈপ্লবিক দিশা’। ইউনিয়ন থাকলে মালিক একা তার ইচ্ছা চাপাতে পারে না, শ্রমিকরা পায় দরকষাকষির শক্তি। আজকের শিল্পাঞ্চলে যখন ইউনিয়ন গড়তে বাধা দেওয়া হয়, তখন আসলে লুইস বর্ণিত সেই পুরনো শোষণকেই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। লুইস মডেল কী? লুইস মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শ্রমের প্রাচুর্যের কথা বলেছিলেন। সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কেন জরুরি, তা এই মডেলে অঙ্ক কষে দেখানো কয়েকটি যুক্তিতে স্পষ্ট করেছিলেন তিনি। ১. শ্রমের শোষণ রোধ ও ন্যায্য ভাগ নিশ্চিত করা - লুইস মডেল অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রাম বা কৃষিক্ষেত্র থেকে শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিকের জোগান ‘অফুরন্ত’ থাকে, ততক্ষণ মালিকপক্ষ শ্রমিককে ন্যূনতম জীবনধারণের মজুরি (Subsistence Wage) দেয়। মালিকের মুনাফা বাড়লেও শ্রমিকের মজুরি বাড়ে না। এখানে ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা হলো — মালিকের সেই ‘উদ্বৃত্ত মুনাফা’ (Surplus Profit) থেকে শ্রমিকের জন্য ন্যায্য অংশ বা মজুরি বৃদ্ধি আদায় করা। ২. মজুরি ও উৎপাদনশীলতার যোগসূত্র (Efficiency Wage) - লুইসের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে অনেক অর্থনীতিবিদ দেখিয়েছেন, ট্রেড ইউনিয়নের চাপে মজুরি বাড়লে শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান ও পুষ্টি বাড়ে। এর ফলে শ্রমিকের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, ইউনিয়ন কেবল মুনাফার ভাগ চায় না, উৎপাদনের ‘গুণমান’ বাড়াতেও পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। ৩. দরকষাকষির ভারসাম্য (Bargaining Power) - লুইস মডেলে একক শ্রমিকের কোনো ক্ষমতা থাকে না, কারণ তার বিকল্প শ্রমিকের অভাব নেই। ইউনিয়ন এখানে ‘যৌথ দরকষাকষি’র (Collective Bargaining) মাধ্যমে সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার এই ক্ষমতাটিকেই রাষ্ট্র ও পুঁজি ছেঁটে ফেলতে চাইছে, যাতে মজুরি সবসময় একেবারে নিম্নস্তরে আটকে রাখা যায়। কাজের সময় বনাম উৎপাদন যাঁরা বলেন কাজের সময় কমালে উৎপাদনের ক্ষতি হয়, আধুনিক বিজ্ঞান কিন্তু তাঁদের ভুল প্রমাণ করছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রমিকের কাজের সময় কমানো কেবল মানবিকতা নয়, এটা উৎপাদনের মান বাড়ানোরও পথ। প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা’ (Marginal Productivity) - অর্থনীতিবিদদের মতে, একজন শ্রমিক দীর্ঘক্ষণ কাজ করলে ক্লান্তিবোধ (Fatigue) তৈরি হয়, ফলে প্রতিটি অতিরিক্ত ঘণ্টায় তার উৎপাদনের হার কমতে থাকে। ৮ ঘণ্টার বদলে ৬ বা ৭ ঘণ্টা নিবিড় কাজ করলে শ্রমিকের মনোযোগ ও ক্ষিপ্রতা বজায় থাকে। ভুল ও দুর্ঘটনার হ্রাস - দেখা গেছে, ১০-১২ ঘণ্টার শিফটে ক্লান্তিজনিত কারণে ভুল এবং শিল্প-দুর্ঘটনার হার প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। কাজের সময় সীমিত থাকলে ‘Rejection Rate’ বা ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের সংখ্যা কমে, যা সরাসরি উৎপাদনের গুণমান (Quality Control) বৃদ্ধি করে। অনুপস্থিতি (Absenteeism) - অতিরিক্ত কাজের চাপে শ্রমিকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাজের সময় কমালে শ্রমিকদের অসুস্থতাজনিত ছুটি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে, যার ফলে কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত হয়। ১৯২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ফোর্ড মোটর কোম্পানি তাদের কারখানায় সপ্তাহে ৫ দিন এবং মোট ৪০ ঘণ্টা কাজের নিয়ম চালু করে, আগে যা ছিল ৬ দিন এবং ৪৮ ঘণ্টা। হেনরি ফোর্ড লক্ষ্য করেছিলেন যে, একটানা কাজ করলে শ্রমিকের ক্লান্তি বাড়ে এবং কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। কিন্তু কাজের সময় কমিয়ে দেওয়ার পর দেখা গেল শ্রমিকরা অনেক বেশি সতেজ মনে কাজ করছে। ফলে কম সময়েও তাঁরা আগের চেয়ে বেশি এবং নিখুঁত উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছেন। ফোর্ডের এই সিদ্ধান্তের পেছনে অবশ্য মানবিকতা নয়, বরং এক গভীর অর্থনৈতিক কারণ ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের যদি অবসর সময় না থাকে, তবে তারা গাড়ি কেনার বা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করবে না।’ নিউজিল্যান্ডের এক উদ্যোগপতি অ্যান্ড্রু বার্নস ২০১৮ সালে তাঁর কোম্পানির ২৪০ জন কর্মীর ওপর একটি পরীক্ষা চালান। সেখানে নিয়ম করা হয়েছিল — কর্মীরা সপ্তাহে ৫ দিনের বদলে ৪ দিন কাজ করবেন, কিন্তু তাঁদের বেতন কমানো হবে না এবং উৎপাদনশীলতাও কমবে না। একে তিনি ‘১০০-৮০-১০০’ নীতি অর্থাৎ ১০০ শতাংশ বেতন, ৮০ শতাংশ কাজের সময়, কিন্তু ১০০ শতাংশ উৎপাদন বলে আখ্যায়িত করেন। 'The 4 Day Week' বইয়ে তিনি তাঁর হাতে কলমে গবেষণালব্ধ ফল লিখেছেন। তাঁর পরীক্ষায় তিনি দেখিয়েছিলেন, আইসল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের ফোর-ডে উইক ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে যে, কম সময়ে শ্রমিক অনেক বেশি সৃজনশীল ও দক্ষভাবে কাজ করতে সক্ষম। বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও চীনের শিক্ষা উৎপাদনশীলতা আর শোষণের এই দ্বন্দ্বে আজকের চীনের উদাহরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যে চীন একসময় সস্তা শ্রম আর দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের কারখানা হয়ে উঠেছিল, সেখানেও আজ বদল আসছে। একসময়ে বিদেশি কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর চালু করা ‘৯৯৬’ সংস্কৃতি অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সপ্তাহে ৬ দিন কাজ — আজ সেখানে বেআইনি। ২০২১ সালে চীনের সুপ্রিম কোর্ট এই প্রথাকে সরাসরি বেআইনি ঘোষণা করে। রাষ্ট্রও বুঝতে পেরেছে যে, একজন ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত শ্রমিকের চেয়ে একজন সুস্থ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়া শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি এবং তাদের জীবনধারনের মানও অনেক উন্নত হয়। গত এক দশকে চীনে শ্রমিকদের গড় মজুরি দ্রুত বেড়েছে। ২০১৩ সালে যে শ্রমিকের বার্ষিক গড় মজুরি ছিল প্রায় ৫১,০০০ ইউয়ান (৫,৮৬,৫০০ টাকা)। এক দশকের ব্যবধানে আজ তা ১,১৪,০০০ ইউয়ান (১৩,১১,০০০ টাকা) ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, মজুরি বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। চীনে মজুরি বাড়ার সাথে সাথে শিল্পের যান্ত্রিকীকরণ ও উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে। অর্থাৎ, বেশি মজুরি মানেই লোকসান নয়, বরং আরও দক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থা। ভারতের শিল্পাঞ্চলে যখন মজুরি বৃদ্ধির দাবি ওঠে বা কাজের সময় কমানোর কথা বলা হয়, তখনই তাকে ‘বিনিয়োগ বিরোধী’ বলে দেগে দেওয়া হয় — যা আসলে এক মধ্যযুগীয় মানসিকতারই প্রতিফলন। আইন, বিচার ও আগামীর পথ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে আনা ৪টি শ্রম কোডে আমাদের দেশের শ্রম আইনগুলো এমনভাবে শিথিল করা হয়েছে যাতে শ্রমিকরা একজোট হতে না পারে। রাষ্ট্র চাইছে — ‘শ্রম’ থাকুক কিন্তু শ্রমিকের ‘কণ্ঠ’ যেন না থাকে। ঠিক যেমনটা হে মার্কেটের বিচারপ্রক্রিয়ায় দেখা গিয়েছিল, যেখানে তথ্যের চেয়ে ‘বিশ্বাস’ আর ‘ক্ষমতার দাপট’ বড় হয়ে উঠেছিল। আজও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মাসের পর মাস মামলা ঝুলিয়ে রাখা বা একতরফা পুলিশি হস্তক্ষেপ সেই পুরনো হামলা বা সাজানো মামলার ছককেই মনে করিয়ে দেয়। তবুও ইতিহাসই আমাদের আশা জাগায়। হে মার্কেটে যাঁদের একসময় ‘অপরাধী’ বলে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, আজ বিশ্বজুড়ে তাঁরাই শ্রমিক আন্দোলনের অমর প্রতীক। তাঁদের দাবি করা ‘৮ ঘণ্টা কাজ’ আজ সারা পৃথিবীর স্বীকৃত অধিকার। যা একসময় ‘অরাজকতা’ ছিল, আজ সেটাই বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের আইনি অধিকার। শিকাগো থেকে নয়ডা, দূরত্ব ১২,০০০ কিলোমিটার। সময়ের তফাৎ ১৪০ বছর। কিন্তু ধুলোমাখা রাজপথ আর কারখানার গেটে কান পাতলে বোঝা যায় — হে মার্কেট থেকে নয়ডা বা গুরুগাঁও, গল্পের পাণ্ডুলিপিটা আজও একইরকম, শুধু চরিত্রগুলো বদলে গেছে। রাষ্ট্রের ভাষা হয়তো আলাদা, কিন্তু শ্রমিকের বুকের ওপর চেপে বসা সেই রক্তচক্ষু আজ আরও নির্মম, আরও নিষ্ঠুর। উত্তরপ্রদেশ বা হরিয়ানার শ্রমিকদের এই ধুলো-ঘাম মাখা লড়াই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এ হলো ইতিহাসের সেই মহাকাব্যিক সংগ্রামের এক চলমান অধ্যায়। ১৮৮৬-র শিকাগো হোক বা আজকের তথাকথিত ‘বিকশিত ভারত’ — সময় আর ভূগোলের মানচিত্র বদলে গেলেও শ্রমিক, মালিক আর রাষ্ট্রের সেই আদিম দ্বন্দ্বটা আজও মেটেনি। দমন-পীড়নের বুট দিয়ে ক্ষণিকের জন্য হয়তো কণ্ঠরোধ করা যায়, কিন্তু আগুনের শিখাকে কি কোনোদিন শেকল দিয়ে বাঁধা যায়? লড়াইয়ের মঞ্চ পাল্টায়, শ্লোগান পাল্টায়, কিন্তু ন্যায়ের জন্য সেই আদি অনন্ত সংগ্রাম থেমে থাকে না। সমাধানের রাস্তা তাহলে এই শোষণ আর দমনের অবসান কোথায়? ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, এই শেকল ছেঁড়ার চাবিকাঠি কারোর দয়ায় আসবে না। পুঁজি আর শ্রমের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান তখনই সম্ভব, যখন উৎপাদনের প্রতিটি চাকার ওপর শ্রমজীবী মানুষের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এই প্রসঙ্গে ১৮৬৪ সালে 'ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন' জন্য লেখা ‘সাধারণ নিয়মাবলী’-এর একেবারে শুরুর লাইনেই মার্কস লিখেছিলেন - “শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি তাদের নিজেদেরই ছিনিয়ে নিতে হবে।” কার্ল মার্কস-এর দেখানো এই পথই আমাদের চুড়ান্ত মুক্তির দিশা দেখায়। একমাত্র শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্রই পারে এই শোষণের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ভোরের জন্ম দিতে। শিকাগোর ফাঁসির মঞ্চ থেকে নয়ডার কারখানার গেট পর্যন্ত বিস্তৃত এই লড়াইয়ের লাল পতাকা আজ আমাদের এই সত্যটাই মনে করিয়ে দেয় — দমন পীড়ন যতই কঠিন হোক, ইতিহাস রচনা করে শেষ পর্যন্ত কারখানার ওই লড়াকু হাতগুলোই। ‘যাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে কাস্তে আর হাতুড়ি তারাই আজ মিছিলের মুখ।’ গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রকাশের তারিখ: ০৩-মে-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|