রুশ বিপ্লব ও সাহিত্য (দ্বিতীয় পর্ব)

Tanmoy Bhattacharya
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনকে নিবিড়ভাবে দেখেছেন। তাঁর বহু গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, কবিতায় এই আন্দোলনের অজস্র ঘাত-প্রতিঘাত জায়গা করে নিয়েছে যার বিস্তারিত লিখতে অনেক বড় পরিসর প্রয়োজন।
প্রথম পর্বের লিঙ্ক

দ্বিতীয় পর্ব


বাংলা কাব্য জগতের সর্বোচ্চ মিনারে অবস্হানকারী দুই প্রধান পুরুষ হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নজরুল ইসলাম। নজরুল পরিচিত ছিলেন বিদ্রোহী কবি হিসাবে। রুশ বিপ্লব তাঁকে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে তিনি লাল ফৌজে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বিপ্লবের দু বছর পরে ১৯১৯ সালে তিনি একটি গল্প লেখেন। 'ব্যথার দান' নামে সেই গল্পে তিনি লাল ফৌজের সেনানীদের চরিত্র এঁকেছেন দেশপ্রেমের আয়নায়। এই গল্প বাঙালি মননে বিপ্লবের বারুদ পৌঁছে দিতে সহায়ক হয়। শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সঙ্গীত 'দ্য ইন্টারন্যাশনাল' এর প্রথম বাংলা অনুবাদ হয় নজরুলের হাতে। " জাগো/জাগো অনশন-বন্দী ওঠরে যত/জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত" পংক্তিতে এই গান দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার নজরুলের কবিতা 'আনন্দময়ীর আগমনে' নিষিদ্ধ করে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, "আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন"। 'ধূমকেতু' পত্রিকা  নজরুল সম্পাদনা শুরু করেন ১৯২২-এ। নভেম্বর বিপ্লবের চেতনায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এই পত্রিকা অগ্রসর ভূমিকা পালন করে। প্রায় একই সময়ে মুজফফর আহমদ সম্পাদিত 'লাঙল' ও 'গণবাণী' এবং অনেকগুলি সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ পায়। 'আত্মশক্তি' পত্রিকার ৪১ তম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে শিবরাম চক্রবর্তী লেখেন "সব্যসাচীর জ্ঞাতিবিরোধের কুরুক্ষেত্রের চেয়ে লেনিনের শ্রেণিবিরোধের কুরুক্ষেত্র ঢের বড়ো আদর্শের দিক দিয়ে, মহত্বের দিক দিয়ে, সম্ভাবনার দিক দিয়ে। জগতের বুদ্ধদেব কেঁদে কেঁদে আকুল হয়ে কঠোর বাস্তবের হাত থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন কিন্তু লেনিনকে আমি বুদ্ধের চেয়েও বড়ো বলব এই অর্থে যে, তিনি তাঁর কঠোরতম বাহুর ডোরে এই কঠিন বাস্তবকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়তে চেয়েছেন"। 

গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনকে নিবিড়ভাবে দেখেছেন। তাঁর বহু গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, কবিতায় এই আন্দোলনের অজস্র ঘাত-প্রতিঘাত জায়গা করে নিয়েছে যার বিস্তারিত লিখতে অনেক বড় পরিসর প্রয়োজন। তিনি নিজে কোনো দলীয় রাজনীতির আবর্তে কখনও নিজেকে বাঁধেন নি কিন্তু কোনোকিছুই যে তাঁর নজরের বাইরে নেই তা বারবার প্রমাণ করেছেন। রুশ বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভবও ছিল না এবং তিনি তা করেনও নি। ১৯৩০-এ তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতাকে স্হান দেন "রাশিয়ার চিঠি" নামক গ্রন্থে। ১৩ টি চিঠি সম্বলিত এই গ্রন্হ প্রায় সকলের পড়া বলেই ধরে নিয়ে তার বিষয়বস্তুর উল্লেখকে বর্জন করছি। শুধু কতগুলো শব্দবন্ধ 'সভ্যতার পিলসুজ', 'ধনগরিমার ইতরতার সম্পূর্ণ তিরোভাব', মানুষ করে তুলবার উপযুক্ত শিক্ষা', 'ধর্ম কি কেবল পুঁথির মন্ত্রে' ইত্যাদির উল্লেখের মধ্যদিয়েই বোঝা যায় কবিগুরু এই বিপ্লবোত্তর রাশিয়াকে কিভাবে দেখেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশকে লেখা চিঠিতে রাশিয়ার বিজয় সম্পর্কে যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তাও অসামান্য সাহিত্য হিসাবে বিবেচিত হয়। তিনি রাশিয়ার বিপ্লবী কর্মকান্ড ও দেশগঠনের সুবিশাল কর্মধারার মধ্যে একদিকে যেমন নিজের দেশ ভারতবর্ষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন তেমনি গোটা পৃথিবীর ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য নিজের মনোজগতকে প্রসারিত করেছেন। 

গত শতাব্দীর বিশ, তিরিশ, চল্লিশের দশকে এমন কবি বা লেখক খুঁজে পাওয়া দুস্কর যাঁরা রুশ বিপ্লবের দ্বারা কোনোভাবেই প্রভাবিত হন নি। প্রমথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, বিনয় ঘোষের প্রবন্ধে, বিজন ভট্টাচার্য, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, হীরেন সান্যাল, অরুণ মিত্র, গঙ্গাপদ বসু প্রমুখের লেখায়, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ির গল্পে, জসিমউদদীন, সুফিয়া কামাল, বিষ্ণু দে, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অতুল গুপ্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু এর কবিতায় তার অসংখ্য প্রকাশ বিদ্যমান। সেখান থেকে কোনো উদ্ধৃতি না টেনে যেহেতু বর্তমান বছরটি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর জন্মশতবর্ষ তাই তাঁর কবিতার সামান্য আলোচনায় যাব। সুকান্ত লিখছেন, "লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ/বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন"। এই আত্মপ্রত্যয়ের সঞ্চার ও ক্লীবত্বকে ঘৃণার উত্তরাধিকারই রুশ বিপ্লবের সাফল্য। 

আমাদের আলোচ্য যেহেতু রুশ বিপ্লব ও সাহিত্য তাই তার অঙ্গীভূত হওয়া উচিত গান, নাটক, যাত্রাপালার স্ক্রিপ্ট এমনকি সিনেমার চিত্রনাট্যও। কিন্তু এতকিছুকে একটি লেখায় আনা কঠিন। তাই আমরা শুধু উল্লেখের মধ্যদিয়েই আপাতত নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখব। পোল্যান্ডের সমাজতন্ত্রীরা ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৩-র মধ্যে কোনো একসময় রচিত 'ভার্সাভিয়াঙ্কা' নামের একটি গান গাইতেন যা বিপ্লব এবং বিপ্লবোত্তর গৃহযুদ্ধে সৈনিকদের মুখে মুখে ঘুরতো। " ঝঞ্ঝা ঝড় মৃত্যু ঘিরে আজি চারিদিক/অন্ধকারের চক্রান্ত কঠিন" রুপে সেই গানের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তিনি লাল ফৌজের পার্টিজান গানেরও অনুবাদ করেছিলেন "ভেদি অনশন মৃত্যু তুষার তুফান প্রতি নগর হতে গ্রামাঞ্চল"-এর সুপরিচিত লাইনে। রেড আর্মি মার্চ গানের অনুবাদ করেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর "বীর দোসর সবে হও আগুয়ান/বিপ্লব ডাকে এবে দিতে হবে প্রাণ"। এরকম আরও অনেক গানের কথাই উল্লেখ করা যায়।

শ্রীজীব গোস্বামীর নাটক 'জোয়া' সোভিয়েতকে রক্ষা করবার মরণপণ সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক দলিল। ১৯৪১ সালে অনাক্রমণ চুক্তি ভঙ্গ করে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে পিতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধে সামিল হয় গোটা দেশ ও জাতিসমূহ। জোয়া কসমেদিমিয়ানস্কায়া এই যুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন দেন। সেই কাহিনিকে কেন্দ্র করে শ্রীজীব গোস্বামী সমাজতন্ত্র বনাম ফ্যাসিবাদের প্রত্যক্ষ সংগ্রামকে এক বীরাঙ্গনা নারীর মধ্যে দিয়ে চিত্রিত করার সাথে সাথে মতাদর্শগত বুনিয়াদকে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ ছাড়াও শিব শর্মার 'আহ্বান', লেনিনের 'রাষ্ট্র ও বিপ্লব' গ্রন্হের দৃশ্যায়ন ঘটিয়েছে অনবদ্য মুন্সিয়ানায়,  চিররঞ্জন দাসের 'অক্টোবর বিপ্লব' লেনিন-স্তালিন-মার্তভ-কেরেনেস্কি-স্তানকোভিচ চরিত্র গুলিকে মঞ্চে এনেছে রাজনৈতিক বিতর্ক, ত্যাগ তিতিক্ষার অভূতপূর্ব প্রয়াসে। একই সাথে উল্লেখ্য বাসুদেব বসুর 'জনতার নেতা স্তালিন', দিলীপ সেনগুপ্তের 'শুনেন স্তালিন কথা', 'পাঁচালি', গোপীনাথ দে-র গীতি আলেখ্য 'লাল তারকার অভ্যুদয় স্তালিন', সুপ্রিয় সর্বাধিকারীর 'সূর্য সন্তান', সমরেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়ের 'স্তালিন যেখানে লেনিন' ইত্যাদি নাটকও।

এই লেখার উপসংহার টানা কঠিন। কারণ যা লেখা হয়েছে তার থেকে অনেক বেশি রয়ে গেছে না লেখা কথা। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচাইতে সাড়া জাগানো ঘটনার প্রভাব আজও বিদ্যমান। আজও বিশ্বের কোনো না কোনো স্হানে, এই বাংলার মাটিতে নভেম্বর বিপ্লবের মাস। আর সেই বিপ্লবের বন্ধনহীন গ্রন্থি বেঁধে ফেলে চলেছে কবির কলম, গল্পকারের গল্পের বিষয়, উপন্যাসের চরিত্র, নাটকের সংলাপ। তাই সাহিত্যে রুশ বিপ্লবের প্রভাব আজও বহমান সত্য এবং যতদিন মানুষের মুক্তির সংগ্রাম থাকবে ততদিনই তা থাকবেও।
প্রকাশের তারিখ: ১৪-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org