|
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা (৫ম পর্ব)B T Ranadive |
কিসান সভা গঠিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে, কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অধিবেশনকালে তার সদস্য সংখ্যা ৫ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়লাভ ও কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা গঠন এই আন্দোলনে আরও প্রেরণা যুগিয়েছিল এবং সমগ্র ১৯৩৮ সাল জুড়ে ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশে কৃষক-সংগ্রাম ঘটেছিল। |
৫ম পর্ব কৃষকদের মধ্যে সংগঠন গড়ার কাজ কৃষকদের সংগঠিত করে তুলতে ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গড়ে উঠতে থাকা সংগ্রামে টেনে আনতে তাদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চেতনার মান বৃদ্ধি করার জন্য প্রগতিশীল এবং কংগ্রেস-সোশ্যালিস্টদের সহযোগিতায় কমিউনিস্টরা কংগ্রেসি মন্ত্রিসভার আমলকে ব্যবহার করেছিল। কংগ্রেস কর্তৃক সংগ্রাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার সময় থেকে শুরু করে কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা গঠন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর মন্ত্রিসভা থেকে তাঁদের পদত্যাগ পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী বছরগুলিতে কমিউনিস্টদের নেতৃত্ব ও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে কৃষক আন্দোলন বিরাট পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়েছিল। কিসান সভা গঠিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে, কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অধিবেশনকালে তার সদস্য সংখ্যা ৫ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়লাভ ও কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা গঠন এই আন্দোলনে আরও প্রেরণা যুগিয়েছিল এবং সমগ্র ১৯৩৮ সাল জুড়ে ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশে কৃষক-সংগ্রাম ঘটেছিল। খাজনা বৃদ্ধি, উচ্ছেদ, বাধ্যতামূলক শ্রম ও বেআইনি আদায়ের বিরুদ্ধে এবং খাজনা হ্রাসের দাবিতে, এরকম বহু সংগ্রামে সাফল্যও অর্জিত হয়েছিল। এই সময়ে বিশাল বিশাল কৃষক মিছিল কখনও ৩০ হাজার, কখনও বা ৫০ হাজার লোকের মিছিল হতে দেখা গিয়েছিল। এমন অনেক কৃষক স্কুলও শুরু হয়েছিল যেখানে কমিউনিস্ট নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এটা ছিল জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটা স্বতন্ত্র গণ-আন্দোলন। কৃষকদের প্রভাবিত করার বিষয়ে তাদের একচেটিয়া অধিকার বিঘ্নিত হচ্ছিল বুঝে বুর্জোয়া নেতৃত্বে এ ব্যাপারটি পছন্দ করছিল না। ঘটনাটির তাৎপর্য নিহিত ছিল এইখানে যে, কৃষকরা বুর্জোয়া নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী না থেকে এইভাবে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের সঙ্গে কৃষিবিপ্লবের জন্য সংগ্রামকে যুক্ত করতে সুশিক্ষিত হয়ে উঠছিল। ভূস্বামীদের চাপের কাছে কংগ্রেসি মন্ত্রিসভাগুলি যাতে নতিস্বীকার না করে এই আন্দোলন সেরকম চাপ সৃষ্টি করেছিল। ১৯৩৯ সালে অনুষ্ঠিত সারা ভারত কিসান সভার গয়া অধিবেশনের প্রস্তাব কংগ্রেসি মন্ত্রিসভার কার্যকলাপ প্রসঙ্গে এবং শাসন সংস্কার আইনের আওতায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কার্যকারিতা সম্পর্কে খুবই সমালোচনামূলক ছিল। তাতে বলা হয়েছিল, গত বছর এমন একটা বছর গিয়েছে যখন প্রাদেশিক সরকারগুলি থেকে কৃষকরা সামান্যই সুবিধা পেয়েছিল। মানুষের কষ্ট লাঘব করার পক্ষে ক্ষমতার সুস্পষ্ট অপ্রতুলতা, কায়েমী স্বার্থ কর্তৃক সৃষ্ট বৃহত্তর বিঘ্নের সামনাসামনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এইগুলি যে কৃষি সমস্যার কোন মৌলিক সমাধানে প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের অক্ষমতা, তা এমন নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছিল যে, তাতে এই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের অন্তসারশূন্যতা সম্পূর্ণ রূপে উদঘাটিত হয়ে গিয়েছিল। সামন্ততান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের কবল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে ভারতের কৃষকদের দৃঢ় সংকল্পের কথা এবং অতীতের যে-কোনও সময় থেকে এখন তারা এ সংগ্রামের জন্য যে অধিকতর প্রস্তুত, একথা ঘোষণা করতে এই সংগঠন আজ গর্ব বোধ করছে। ঐ প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছিল যে, কৃষকদের এই সংগঠন দৃঢ়ভাবে এই অভিমত জ্ঞাপন করছে যে, সেই সময় আজ উপস্থিত যখন কংগ্রেস, দেশীয় রাজ্যের জনগণ, কৃষক ও শ্রমিকদের সংগঠন এবং সাধারণভাবে জনগণ সহ সমগ্র দেশের ঐক্যবদ্ধ শক্তি নিয়ে খোদ সাম্রাজ্যবাদী শাসনাধীন এই দাসত্বমূলক সংবিধানকে আক্রমণ করার জন্যে এগিয়ে যাওয়া কর্তব্য। এই অগ্রগমণ হবে পূর্ণ জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের জন্য, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র স্থাপনের জন্য, যা শেষ পর্যন্ত এক কৃষক-মজুর শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়িত করবে। নতুন প্রগতিশীলদের নেতৃত্বাধীন কৃষকদের এটাই ছিল কণ্ঠস্বর। এটাই ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের এবং সমগ্র সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার সপক্ষে ভারতীয় জনগণের কণ্ঠস্বর। মাত্র কয়েক মাস বাদেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু, সুতরাং এই আহ্বান যথা সময়েই জানানো হয়েছিল। কৃষকদের মধ্যে এই চেতনাকে একটা রূপ দেওয়ার কাজে কমিউনিস্টরাই ছিল অবশ্যই সকলের সম্মুখভাগে। কয়েক মাসের মধ্যে যুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কিসান সভাকে প্রচণ্ড দমন-পীড়নের সম্মুখীন হতে হলো। ব্যাপক ধর-পাকড় চলল, নেতা ও কর্মী সকলকেই আটক করা হতে থাকল। এসব সত্ত্বেও ঐ বছরেই বিহার, অন্ধ্র, বাংলা, যুক্ত প্রদেশ, মালাবার, সিন্ধু এবং সুরমা উপত্যকায় কৃষকদের সংগ্রাম হয়েছিল স্বেচ্ছাচারী করধার্যের বিরুদ্ধে এবং বলপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে। ১৯৪০ সালে পালাসায় অনুষ্ঠিত সারা ভারত কিসান সভার অধিবেশনে বলা হয়েছিল যে, কৃষকদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মেজাজ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অধিবেশনের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, এই সভা আরও বিশ্বাস করে, একটা বিদেশি সরকারের কর্তৃত্বকে অমান্য করতে এবং দেশের সমগ্র সম্পদ বিদেশে চালান দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে পুরোভাগে থাকার জন্য বরাবরের মতো জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়েও কৃষকেরা নিজেরাই শ্রমিকদের সঙ্গে এসে দাঁড়াবে। এই উদ্দেশ্য নিয়ে নিজেদের সভার নেতৃত্বে দৈনন্দিন সংগ্রাম শুরু করতে কৃষকদের অবিলম্বে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এই সংগ্রামগুলিই তীব্রতায় বৃদ্ধি পেয়ে এবং ব্যাপক এলাকা জুড়ে সম্প্রসারিত হয়ে সত্বর দেশব্যাপী কর-বন্ধ-খাজনা-বন্ধের এক অভিযানে পরিণত হবে। .... সেই অভিযানই সাম্রাজ্যবাদীদের এই পরজীবী অর্থনৈতিক শক্তির অবসান ঘটাবে ও এদেশে ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতার আসনকে টলিয়ে দেবে। এই ঘোষণা এমন সময় করা হয়েছিল যখন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। কৃষিবিপ্লবের আওয়াজে বলীয়ান হয়ে, কিসান সভার মধ্যে অন্যান্যদের সঙ্গে একই সঙ্গে কর্মরত কমিউনিস্টরা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের জন্য কৃষকদের প্রস্তুত করে চলেছিল। জনগণের মধ্যেও নিজস্ব সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি গড়ে তুলতে কমিউনিস্টরা মন্ত্রিসভার আমলকে সুকৌশলে ব্যবহার করেছিল। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যদি এদের প্রতি সাধারণ আহ্বান জানানো হতো, তবে এই জনগণ কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত। শ্রমিকশ্রেণির পার্টি হলো কমিউনিস্ট পার্টি; নিজস্ব শক্তি, তাদের দ্বারা পরিচালিত গণসংগঠনসমূহ এবং অন্যান্য প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে একসঙ্গে যে-সমস্ত গণসংগঠন তারা পরিচালনা করত, সেই সমস্তগুলি একত্রে মিলেমিশেও সারা ভারতব্যাপী জনগণের মধ্যে সাড়া জাগানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। এরকম এক সাড়া জাগানোর সহায়ক একমাত্র জাতীয় কংগ্রেস-ই হতে পারত। তার কারণ, ব্যাপক জনপ্রিয়তা তাদেরই ছিল এবং জনসাধারণের দৃষ্টিতে তারাই দেশের জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করত। শ্রমিকশ্রেণি ও তাদের পার্টির এই দুর্বলতাই তখন প্রমাণিত হলো। কমিউনিস্টরা তাদের গণসংগঠনগুলি নিয়ে এই লড়াইতে ঝাঁপিয়ে পড়তে সে সময় প্রস্তুত ছিল; কিন্তু যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে গণসংগ্রামের জন্য জনগণের প্রতি কোন আহ্বান কংগ্রেসের কাছ থেকে এল না। কংগ্রেস নেতৃত্বের অনুসৃত নীতির ফলে নিষ্ক্রিয় থাকা জনগণের প্রধান অংশটিই সে সময়ে এইভাবে আন্দোলনের প্রবাহের বাইরে পড়ে রইল। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধিতায় যে-সব জায়গায় কমিউনিস্টদের প্রভাব ছিল সেখানেই তারা স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি নীতিনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত থেকেই জনগণকে আন্দোলনের পথে পরিচালিত করতে সচেষ্ট হয়। যুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার কয়েকটা দিনের মধ্যেই ১৯৩৯ সালের ২ অক্টোবর তারা যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ হিসেবে বোম্বাইয়ে একটি ধর্মঘট সংগঠিত করে। এ ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করেছিল ৯০ হাজার শ্রমিক। বিশ্বের শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধবিরোধী ধর্মঘট। ধর্মঘটী শ্রমিকদের জনসভায় যে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, তাতে ঘোষণা করা হয়েছিল, "সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তৃক এই চরম বিধ্বংসী যুদ্ধে যাদের টেনে-হিঁচড়ে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণি ও বিশ্বের জনগণের প্রতি এই সভা সংহতি জ্ঞাপন করছে। এই সভা বর্তমান যুদ্ধকে শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতি এক চ্যালেঞ্জ বলে গণ্য করছে এবং ঘোষণা করছে যে, মানবতার বিরুদ্ধে এই সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকে পরাজিত করাই হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক ও জনসাধারণের কর্তব্য।" জনসাধারণের কাঁধে যুদ্ধের বোঝা চাপানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টিতে কমিউনিস্টরাই সর্বপ্রথমে এগিয়ে এসেছিল। ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে বোম্বাইয়ে মহার্ঘ ভাতার দাবিতে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার সুতাকল শ্রমিকের এক ধর্মঘট সংগঠিত করার মাধ্যমে তারা এই প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে। যুদ্ধের দরুন জিনিসের দর তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনধারণের ব্যয় প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়েছিল, অথচ এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য তারা কিছুই পেল না। ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসের সূচককে ১০০ মাত্রা ধরা হলে প্রাথমিক পণ্যের দরের সাধারণ সূচক তখন ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়ে ১৩৭ মাত্রা হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই জিনিসের দর ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল। অথচ মানুষকে বাঁচাতে কংগ্রেস এক ইঞ্চিও নড়ল না। যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোন প্রত্যক্ষ সংগ্রাম না করে এবং শুধুমাত্র কিছু চাপ সৃষ্টি করে ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে একটা আপস-মীমাংসায় উপনীত হওয়ার আশায় তারা বসেছিল। ধর্মঘটী শ্রমিকদের নেতৃবৃন্দের পাইকারি হারে গ্রেপ্তার এবং শ্রমিকদের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি সত্ত্বেও বোম্বাইয়ের এই ধর্মঘট ৪০ দিন স্থায়ী হয়েছিল। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে পরিচালিত 'বোম্বাই ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস' একদিনের সংহতিজ্ঞাপক ধর্মঘটের ডাক দিলে ১৯৪৯ সালের ১০ মার্চ বিভিন্ন শিল্পের ৩ লক্ষ ৫০ হাজার শ্রমিক তাতে অংশগ্রহণ করেছিল। বোম্বাইয়ের ধর্মঘট দেশব্যাপী ধর্মঘটের এক নয়া তরঙ্গের সূচনা করেছিল। কমিউনিস্টদের তাই আবার শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিতে দেখা গেল। যে কানপুরে ১৯৩৭সালের ধর্মঘটের মাধ্যমে সুতাকল ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ২০ হাজার সুতাকল শ্রমিকের ধর্মঘট শুরু হয়ে গেল। কমিউনিস্টদের উদ্যোগে শুরু বোম্বাই, কানপুর ও কলকাতার ধর্মঘট (মহার্ঘভাতার দাবিতে কলকাতা পৌরসভার ২০ হাজার শ্রমিক ধর্মঘট করেছিল) সারা ভারত জুড়ে ধর্মঘট সংগ্রামের ঢেউ ছড়িয়ে দিল। আর সেই সংগ্রামে অঙ্গীভূত হলো বাংলা ও বিহারের চটকল শ্রমিকরা, ঝরিয়ার কয়লাখনি শ্রমিক, আসামের ডিগবয়ের তৈল শ্রমিকরা, ধানবাদ ও ঝরিয়ার খনি শ্রমিক, জামশেদপুরের ইস্পাত শ্রমিক এবং বিভিন্ন শিল্প সংস্থা ও শিল্পকেন্দ্রের বহু সংখ্যক শ্রমিকরা। যুদ্ধের বোঝা চাপানোর বিরুদ্ধে দেশে বড় রকমের এক প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল, অথচ পাছে আপস-মীমাংসার সম্ভাবনা বিঘ্নিত হয় এই ভয়ে ভীত জাতীয় কংগ্রেস একটুও নড়তে চাইল না। কিন্তু এই সময়েই কমিউনিস্ট পার্টির উপর নেমে এল এক অবশ্যম্ভাবী আঘাত। পার্টির কেন্দ্রীয় মুখপত্র ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং রাজ্য পার্টিগুলির মুখপত্র যেমন বোম্বাই থেকে প্রকাশিত ক্রান্তি নিষিদ্ধ করা হলো। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য প্রগতিশীলদের দেশজুড়ে গ্রেপ্তার করা হলো। পার্টি পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে গেল এবং তার কাজকর্ম আত্মগোপন অবস্থাতেই চালাতে হলো। প্রায় ৫০০ কমিউনিস্ট কর্মী ও নেতাকে বিনা বিচারে আটক করা হলো। বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত হলো ৬,৪৫৬ জন এবং ১,৬৬৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে বহিষ্কার বা অন্তরীণ করা হলো কিংবা তাঁদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত করা হলো। উল্লিখিত পরের সংখ্যাটির মধ্যে কমিউনিস্ট এবং অন্যান্য প্রগতিশীল উভয়েই ছিল। সাম্রাজ্যবাদীদের এই আক্রমণের পাশাপাশি, কমিউনিস্টদের উপর কংগ্রেস-সোশ্যালিস্ট নেতৃত্বের আক্রমণও চলেছিল। এই পেটি বুর্জোয়া সোশ্যালিস্ট গ্রুপের মধ্যে কিছুকাল ধরে একটা কমিউনিস্ট-বিরোধী ঝোঁক দানা বেঁধে উঠছিল এবং তখন তা অভিব্যক্ত হতে থাকল তাদের দল থেকে কমিউনিস্টদের ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের এবং দ্বিমতপোষণকারীদের বহিষ্কার করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে কমিউনিস্টরা আত্মগোপন অবস্থায় একলাই লড়াই চালিয়ে গেল। অথচ জাতীয় নেতৃত্ব একেবারে চুপচাপ বসে রইল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক বছর পরে ১৯৪০ সালের অক্টোবর মাসে, এই নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ফলে বাধ্য হয়ে কংগ্রেস গান্ধীজীর নেতৃত্বে অত্যন্ত সীমিত ধরনের এক সংগ্রামে সম্মতি জানাল। তাদের সেই সংগ্রাম স্বাধীনতার জন্য ছিল না; তা ছিল বাস্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্য একটা প্রতীকী 'সত্যাগ্রহ' মাত্র। এর জন্য আইন অমান্যকারীদের একটা তালিকা পরীক্ষা করে দেখা ও অনুমোদনের প্রয়োজনে গান্ধীজীর কাছে পাঠাতে হতো। তাঁর অনুমোদিত ব্যক্তিরা কোথায় এবং কখন এই প্রতীকী যুদ্ধ-বিরোধিতা প্রদর্শন করবে তা তাঁকে পূর্বাহ্নেই জানাতে হতো। এটা যুদ্ধ-বিরোধী সংগ্রামের একটা প্রহসন বৈ কিছুই ছিল না। এক বছর ধরে বিধিনিষেধের গণ্ডীতে আবদ্ধ বিক্ষুব্ধ মানুষ কিন্তু তা সত্ত্বেও হাজারে হাজারে এসে কারাবরণ করল। জনযুদ্ধ ১৯৪১ সালের জুন মাস নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে হিটলারের আক্রমণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে একটা সুগভীর পরিবর্তন ঘটে গেল। যুদ্ধের চরিত্রগত এই পরিবর্তনের ব্যাপারটা বুঝতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কিছুটা সময় লেগে গিয়েছিল। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এরকমটাই মনে করা হচ্ছিল, অন্তত ভারতের ক্ষেত্রে যেন কোনও পরিবর্তনই ঘটেনি। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে পার্টি এই সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট বিরোধী জোটের জয়লাভবিশ্বের জনগণের স্বার্থের সপক্ষে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বার্থের সপক্ষে। তার কারণ, তা বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে এত দুর্বল ও হতোদ্যম করে দেবে যে, ভারতকে দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ রাখা ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্বের শক্তিসমূহের বিন্যাসের মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটেছিল, এটা ছিল তারই সঠিক উপলব্ধি। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃবর্গ এবং বাম জাতীয়তাবাদী সহ অন্যান্য জাতীয়তাবাদীরা তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টি এখন এই যুদ্ধকে তাই জনযুদ্ধ বলে ঘোষণা করল, যে যুদ্ধে জয় অর্জন করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ পরিচালনার কাজে বাধা সৃষ্টি বার্লিন-রোম-টোকিও অক্ষশক্তির পরাজয়কেই বিঘ্নিত করত। তারা বুঝেছিল যে, ফ্যাসিস্ট শক্তিত্রয়ের পরাজয় বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করবে, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে এসে দাঁড়ানো ছাড়া যাদের তখন আর কোনোও উপায় ছিল না, সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কিছুতেই পরিস্থিতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আর রাখতে পারবে না। ভবিষ্যৎ দৃষ্টি দিয়ে কমিউনিস্টরা একথাও বুঝেছিল যে, জনযুদ্ধে অর্জিত জয় ভারতীয় সমাজের সমগ্র শক্তির উদ্যমকে শৃঙ্খলমুক্ত করে দেবে এবং তাকে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র শেষ সংগ্রামে লিপ্ত করবে। তারা বুঝেছিল যে, এ যুদ্ধের শেষে ভারতের জনগণ বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই সম্মুখপানে এগিয়ে চলবে। পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে, কমিউনিস্টদের ধারণা সম্পূর্ণভাবেই সঠিক ছিল। এ যুদ্ধের শেষে একটা নতুন যুগের সূচনা পরিলক্ষিত হলো। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় সমাজতন্ত্র কায়েম হলো, সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল, এবং ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ শাসকরা সরে পড়তে বাধ্য হলো। যুদ্ধে বিজয়ী ব্রিটিশ ফৌজ ভারতীয় জনসাধারণের বিরুদ্ধে কোন দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে যেমন আর ইচ্ছুক ছিল না, তেমন-ই সক্ষমও ছিল না। সুবিধাবাদী বিশ্বাসঘাতকতা এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে একটা আপস করে ফেলার সুযোগ পেয়ে বুর্জোয়া নেতৃত্ব অবশ্য যুদ্ধোত্তর গণ-অভ্যুত্থানকে পরিচালনা করতে অস্বীকার করল এবং কৃষি বিপ্লবের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে জনগণকে প্রবঞ্চিত করল। তখনও পর্যন্ত জনসাধারণ বুর্জোয়া নেতাদের উপর যে আস্থা স্থাপন করে রেখেছিল, তাতে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ উন্মোচন না করে ও জমিদারদের স্বার্থের ক্ষতি না করে সাম্রাজ্যবাদীদের নিষ্ক্রমণ সুনিশ্চিত করতে তৎকালীন আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর বিকাশ তাদের কাজে লেগেছিল। এই দরকষাকষির সময়ে হাজার হাজার হিন্দু-মুসলমান দেশবাসীর ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ডের এবং দেশবিভাগের ক্ষতি জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃবৃন্দকে স্বীকার করে নিতে হয়েছিল। তাদের আপস-রফার এই কুফল এখনও ভারতীয় জনগণকে ভোগ করতে হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধের চরিত্র ছিল সাম্রাজ্যবাদী এবং যে সময়ে তার বিরোধিতায় দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতার দাবিতে নিজস্ব ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত ছিল, সেই সময় কংগ্রেস কিন্তু এক ইঞ্চিও নড়তে সম্মত হয়নি। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই কংগ্রেস হঠাৎ একেবারে জঙ্গি হয়ে উঠল এবং ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে 'করেঙ্গে-ইয়া-মরেঙ্গে' সংগ্রাম শুরু করে দিল। শত শত মানুষ জীবন বিসর্জন দিল, হাজার হাজার মানুষ কারাবরণ করল। কিন্তু চরিত্রগত কারণেই এই ক্ষিপ্রগতি ও স্বল্পায়ু সংগ্রাম ইতিহাসের প্রবাহের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতীয় জনগণকে বেকায়দায় এক আঘাটাতে নিয়ে গিয়ে ফেলল এবং তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। মুসলিম জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা এই সংগ্রাম অত্যন্ত তীব্রভাবে কংগ্রেস সংগঠনের এমন একটা মারাত্মক দুর্বলতা উদ্ঘাটিত করে দিল, যার সম্পর্কে কমিউনিস্টদের পক্ষ থেকে বহুবার সমালোচনা করা সত্ত্বেও তারা সেটা স্বীকার করিতে সম্মত হয়নি। সেই দুর্বলতাটি হচ্ছে, কতিপয় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খণ্ড খণ্ড এলাকা ছাড়া সর্বত্রই মুসলিম জনগণ থেকে সামগ্রিক আকারের কংগ্রেস সংগঠনের বিচ্ছিন্নতা। বস্তুত, এটা এমন একটা বিচ্ছিন্নতা যা বছরের পর বছর ধরে জমে উঠেছিল। এর ফলে মুসলিম জনসাধারণ এই আগস্ট সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করে বসল এবং প্রায় একটা বিরূপ মনোভাবই গ্রহণ করল। ১৯২০ সালের সংগ্রামের ব্যর্থতার পর থেকেই এই বিচ্ছিন্নতা দিনে দিনে বেড়ে চলছিল। মুসলিম জনসাধারণের উপর কংগ্রেসের প্রভাব ১৯৩০ সাল নাগাদ অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। ১৯৩৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম আসনসমূহে কংগ্রেস চরমভাবে পরাজিত হলো (১৯৩৭ সালের নির্বাচনকালে সম্প্রদায়ভিত্তিক পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল)। সাধারণ আসনগুলিতে কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। কিন্তু ৪২৮টি মুসলিম আসনের মধ্যে মাত্র ৫৮টি আসনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিল এবং জয়ী হয়েছিল মাত্র ২৬টি আসনে (১৫টি আসন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে এবং ১১টি আসন অবশিষ্ট ভারতে)। যদিও মুসলিমরা বহু গোষ্ঠী ও অংশে নিজেরা বিভক্ত ছিল এবং মুসলিম লিগ মাত্র ৪.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, তা সত্ত্বেও কংগ্রেস চূড়ান্তভাবে হেরে গিয়েছিল। শীঘ্রই সমগ্র মুসলিম ভোট লিগের নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে গেল। মুসলিম জনগণকে কাছে টেনে নেওয়ার জন্য লিগের সঙ্গে কংগ্রেস একটা সমঝোতায় আসার সপক্ষে কমিউনিস্টরা বহুবার নিজেদের অভিমত জ্ঞাপন করেছিল। কিন্তু মুসলিম জনসাধারণ যে সম্পূর্ণভাবে লিগের প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছিল, সে কথাটাই কংগ্রেস শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বীকার করতে অসম্মত ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ইতোমধ্যেই এই বাস্তব সত্যটিকে স্বীকার করে নিয়েছিল এবং ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে একটা সাধারণ সংগ্রামের স্বার্থে কংগ্রেস-লিগ সমঝোতা গড়ে তোলার জন্যে বলেছিল। জনযুদ্ধ চলাকালেই, এ যুদ্ধকে সমর্থন করার সঙ্গে সঙ্গে একটি জাতীয় সরকার, কেন্দ্রে একটি কংগ্রেস-লিগ সরকার গঠনের দাবি পার্টি করেছিল। ভারতের যুদ্ধপ্রচেষ্টা যাতে ব্রিটিশ আমলাদের হাতে না থাকে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে যাতে জনগণের প্রতিনিধিরাই থাকতে পারে এ দাবি সেজন্যই করা হয়েছিল। যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উক্ত দুইটি সংগঠন যদি এই দাবি করতে পারত তবে তাকে বাধা দেওয়ার মতো কোন অবস্থায় যে ব্রিটিশ সরকারের ছিল না, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সে যাই হোক, ব্রিটিশ সরকারকে বিব্রত করে তোলার অথবা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে কংগ্রেসকে সাহায্য করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ লিগ নেতৃত্বের ছিল না। ১৯৪০ সাল নাগাদ হিন্দু-মুসলিম সমস্যাটি এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে মুসলিম লিগ পাকিস্তানের জন্য দাবি উত্থাপন করে। হিন্দুদের আধিপত্য সম্পর্কে মুসলিম জনগণের মধ্যে যে ভীতি, তার সুযোগ গ্রহণ করে এটা স্পষ্টতই ছিল বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য একটা দাবি। যার মধ্যে মুসলিম জনগণেরও ঐকান্তিক স্বার্থ নিহিত ছিল, সেই কৃষিবিপ্লবের আওয়াজের মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলমান জনগণের ঐক্য গড়ে তুলেই একমাত্র এ থেকে পরিত্রাণের পথ পাওয়া যেত। কিন্তু কংগ্রেস অথবা মুসলিম লিগ, এদের কোন নেতৃত্বই এ ব্যাপারে কিছু করল না। প্রকৃত প্রশ্ন তখন ছিল এটাই যে, পাকিস্তানের আওয়াজের সম্মুখীন হয়ে ভারতবর্ষকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কোন বাস্তব সম্ভাবনা ছিল কিনা। আধিপত্য সম্পর্কে তাদের ভীতি থাকার পরেও একত্রে বসবাস করার জন্য মুসলিম জনগণের কাছে কিছু কি বলা যেত? বৈষম্যমূলক আচরণ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে সুনিশ্চয়তাদানে, সেই পর্যায়ে তখন একটাই মাত্র উপায় ছিল এবং সেটা ছিল মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলির জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া। তখনকার পরিস্থিতিতে একটা বাস্তব পন্থা হিসাবেই কমিউনিস্ট পার্টি এই অধিকারের প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেছিল। তবে প্রশ্নটিকে তখন একটা বিজ্ঞানসম্মত তাত্ত্বিক ভিত্তিতে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সপক্ষে বলতে গিয়ে কমিউনিস্টরা অবশ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সমর্থনে অভিমত জ্ঞাপন করেনি। একত্রে বসবাসের যাতে সুযোগ থাকে সেজন্যেই এই অধিকারের কথা বলা হয়েছিল এবং ঈপ্সিত ফললাভের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তবেই একমাত্র সেই অধিকার প্রয়োগের প্রশ্নটি ছিল। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত আশঙ্কাকে ঠেকাতে এছাড়া প্রতিকারের জন্য কোন উপায় ছিল না। মুক্ত ও স্বাধীন ভারতের অংশ হিসেবে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে বলপূর্বক ধরে রাখা অসম্ভব ছিল। বস্তুত, এটা পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল যে, পাকিস্তান দাবির প্রশ্নে যতকাল মীমাংসা না হচ্ছে, ব্রিটিশ শাসকরা ততদিন এদেশের উপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হবে। কংগ্রেস এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছিল যে, বড় বড় আঞ্চলিক ইউনিটগুলিকে জোর করে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাখা যাবে না। ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে গৃহীত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, "তৎসত্ত্বেও কমিটি এই মর্মে ঘোষণা করেছে যে, নিজেদের ঘোষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন আঞ্চলিক ইউনিটের জনগণকে ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে থাকতে বাধ্য করার কথা তারা চিন্তা করতে পারে না।" এটা স্মরণে রাখতে হবে যে, এই পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকারের উপর ভরসা করে লিগ নেতৃত্ব দেশবিভাগের জন্য কৃতসংকল্প হয়ে উঠেছিল। মুসলিম জনগণের ভীতির প্রশ্নটিকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং এ সম্পর্কে একটা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে কংগ্রেস মুসলিম লিগের প্রভাবকে কিছু পরিমাণে খর্ব করতে পারত। মুসলিম জনগণের মধ্যে একটা প্রবল ব্রিটিশবিরোধী জাগরণের প্রবাহ সৃষ্টি হওয়ায় এ সুযোগ এসেছিল। যুদ্ধশেষে যখন মুসলিম সৈন্য, নৌবাহিনীর শিক্ষার্থী ও বিমান বাহিনীর লোকরা অন্যান্যদের সঙ্গে একসঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী পতাকা তুলে ধরেছিল, যখন বোম্বাই শহর ও অন্যান্য জায়গায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে রুখতে মুসলিম জনসাধারণ ব্যারিকেড গড়ে তুলেছিল, তখন এই ঘটনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে পরিচালিত ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অফিসারদের বিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে কলকাতা ও অন্যান্য শহরে তারা হাজারে হাজারে এগিয়ে এসেছিল। ব্রিটিশ শাসকদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে দৃঢ়সংকল্প, এমন কিছু খ্যাতনামা মুসলিম অফিসার নিজেরাই এই আইএনএ-কে পরিচালনা করেছিল। যুদ্ধোত্তর এই গণঅভ্যুত্থানে লিগের মতো কংগ্রেসও ভীত হয়ে উঠেছিল এবং এই নেতারা আলাপ-আলোচনার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠে দেশ বিভাগকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলল। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করে কমিউনিস্ট পার্টি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত বিপদকে এড়াতে চেষ্টা করেছিল। কংগ্রেসের কৌশল সেই বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে তুলেছিল। তবে একথা বলা হচ্ছে না যে, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারটুকু মেনে নিলেই বিচ্ছিন্নতাকে কংগ্রেস ঠেকাতে পারত। তার কারণ, লিগ নেতৃত্ব ছিল একটা বিরাট বাধা। সমস্ত বাধা ভেঙে মুসলিম জনগণের কাছে পৌঁছতে পারলেই একমাত্র দেশবিভাগকে ঠেকানো যেতে পারত এবং এক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ব্যাপারটি ভারতের আন্দোলনের সম্মুখে দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার একটা সুযোগ এনে দিত। কিন্তু মুসলিম জনগণ লিগের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ায় ১৯৪০ সাল নাগাদ বিষয়টি খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশের জনগণ সবসময়েই ভারতবর্ষকে এক এবং অবিভাজ্য বলে মনে করত এবং তাদের কাছে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ধারণাটি দৈব অভিশাপের মতই অবাঞ্ছিত ছিল। তাছাড়া এই বিশ্বাসে তাদের পুষ্ট করা হয়েছিল যে, মুসলিম জনগণের অধিকাংশই কংগ্রেসকে সমর্থন করে এবং মুসলিম লিগ নিছক একটা সাম্প্রদায়িক সংগঠন যা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। আর একটা ব্যাপার এই যে, কংগ্রেস কখনও তাদের ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবটিকে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করে বলেনি। এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টদের বক্তব্য সম্পর্কে ব্যাপকভাবে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল এবং তার ফলে জনসাধারণ থেকে তারা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। কমিউনিস্টদের ভূমিকা সম্পর্কে যৎপরোনাস্তি বিকৃত ধারণা প্রচার করতে কংগ্রেস নেতারা এই বিভ্রান্তির সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করেছিল। সে যাই হোক, এটা কখনই বলা চলে না যে, কমিউনিস্ট পার্টি আত্মনিয়ন্ত্রণের সপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছিল বলেই দেশ বিভাগ ঘটেছিল। জনগণের উপর এত বিশাল প্রভাব থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস কেনই বা তা ঠেকাতে পারল না? স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্য আপসের মূল্য হিসাবে কেনই তারা এটাকে মেনে নিল? সঙ্গে সঙ্গে এটা অবশ্যই বলতে হবে যে, সমস্যাটির তত্ত্বগত উপস্থাপনায় কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্যে দুর্বলতা ছিল যা বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে তাদের বাস্তব প্রস্তাবটি সঠিক ছিল এবং প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে তা ছিল সঙ্গতিপূর্ণ। এটা অবশ্যই দেখা যাবে যে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত বিপদকে প্রতিহত করার চেষ্টার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি জনগণের স্বার্থে ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের স্বার্থে এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটির সমাধান করে জাতীয় আন্দোলনকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল। লিগ নেতৃবৃন্দ অবশ্যই তৎমুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হওয়া ব্যতিরেকে অন্য কোন রকম মীমাংসায় সম্মত না হতে কৃতসংকল্প ছিল। প্রকাশের তারিখ: ০৩-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|