|
অধ্যাপক সুমিত সরকার স্মরণেRabikar Gupta |
একটি বিষয়ে তাঁর নিখাদ বৌদ্ধিক প্রতিরোধ সব সময় সক্রিয় ছিল। সেটি হল আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। ১৯৯৩ সালে Khaki Shorts and Saffron Flags: A Critique of the Hindu Right’ অথবা ২০১৩ সালে Fascism: Essays on Europe and India-তে তাঁর যে বক্তব্য সংকলিত হয়েছে, তা বর্তমান সময়ে ফিরে ফিরে পড়া প্রয়োজন। |
দীর্ঘ রোগ ভোগের পর ৮৭ বছর বয়সে গত ১৩-ই অগাস্ট চলে গেলেন আধুনিক ভারতের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক। চলে গেলেন অধ্যাপক সুমিত সরকার। তাঁর চলে যাওয়ায় আমরা শুধু একজন অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ইতিহাসবেত্তা ও শিক্ষককেই হারালাম না, তার সঙ্গে হারালাম ক্রমশঃ বিরল থেকে বিরলতর হতে থাকা সেই বুদ্ধিজীবীদের একজনকে যাঁরা বিশ্বাস করেন বিদ্যায়তনিক গজদন্ত মিনারে বসে গবেষণা নিবন্ধ রচনা ও নিজের পেশাগত উন্নতি ও খ্যাতি অর্জনের বাইরেও তাঁদের একটা সামাজিক দায় আছে। সুমিত এটি শুধু বিশ্বাসই করতেন না, তাঁর জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে ও যাপনে তার প্রমাণ রেখে গেছেন। সুমিত সরকারের এই বিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল ছেলেবেলা থেকেই। ১৯৩৯ সালে কলকাতার এক ব্রাহ্ম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা সুশোভন চন্দ্র সরকার ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের বিখ্যাত ইতিহাসের অধ্যাপক। বাংলায় মার্কসবাদী ধারার ইতিহাসচর্চার ভগীরথ ছিলেন যাঁরা, তাঁর মধ্যে অধ্যাপক সুশোভন সরকার ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই সুমিত প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাস নিয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনের পর প্রথমে কলকাতা ও পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তবে সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ সময় তিনি অধ্যাপনা করেছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৭৪ থেকে ২০০৪ অবধি। এই তিন দশক কয়েক প্রজন্ম ইতিহাসের ছাত্র তাঁর শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছে। কেমন ছিল সেই শিক্ষা ? তাঁর প্রাক্তন ছাত্রদের (যাঁরা অনেকেই বর্তমানে খ্যাতনামা ইতিহাসের অধ্যাপক) স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়,সুমিত ছাত্রদের সামনে একতরফা ভাবে একরাশ তথ্য তুলে ধরা পছন্দ করতেন না। তিনি চাইতেন, ছাত্ররা যাতে স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে পারে। তাই পড়ানো শুরুর সময় প্রথমে তিনি কোনো একটি বিষয়ের একরকম ভাষ্য নির্মাণ করতেন। ঠিক যে মুহূর্তে ছাত্রদের মনে হত তারা মোটামুটি বুঝতে পারছে সেই বিশেষ ঘটনা অথবা ব্যক্তি কেমন ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সুমিত এতক্ষণ ধরে তৈরি করা নিজের ভাষ্যটিকেই প্রতিযুক্তির পর প্রতিযুক্তি সাজিয়ে দিয়ে ভেঙে চুরমার করে দিতেন। তিনি আসলে ছাত্রদের শেখাতে চাইতেন ইতিহাসে শেষ বলে কিছু নেই, অন্তিম বক্তব্য বলে কিছু নেই। ইতিহাস আসলে একটি সংলাপ, যে সংলাপ অন্তহীন, যাকে দেখার রাস্তা অনেক। খুব সাফসুতরো ভাবে একদম অঙ্ক মেলানোর মত অতীতকে নির্দিষ্ট কিছু খাপে পুরে ফেলা যায় না। অতীতের বিবিধ ঘটনা (এবং ব্যক্তির) মধ্যে নানারকম বিপরীতমুখী প্রবণতা থাকে। অতীতের সোজাসাপ্টা ভাষ্যের আপাত শান্ত জলতলের দিকে তাকিয়ে তাকেই সঠিক মনে করা ঐতিহাসিকের কাজ নয়। তাকে ডুব দিয়ে জানতে হবে নানা দিকে প্রবাহিত এবং কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী বিবিধ চোরাস্রোতের হাল হকিকত। অধ্যাপক সরকার ছাত্রদের যা শিক্ষা দিতেন তারই প্রয়োগ আমরা বারংবার নিপুন ভাবে দেখতে পাই তাঁর কাজের মধ্যেও। তাঁর পিএইচডি গবেষণার সন্দর্ভ ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল বই আকারে। The Swadeshi Movement in Bengal, 1903-1908-এ সুমিত প্রথমেই আঘাত হেনেছেন একটি একমুখী, সংগঠিত, সমসত্ত্ব জাতীয় আন্দোলনের ধারণায়। যে বিবিধপ্রকার সামাজিক শক্তি বিবিধ কারণে স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, তাকে তিনি দক্ষতার সঙ্গে চিহ্নিত করেছেন সংবাদপত্র, নাটক, কবিতা এবং স্মৃতিকথা থেকে। মহাফেজখানার নথির বাইরেও এই সকল উপাদানকে ইতিহাস রচনার কাজে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সুমিত ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক। জাতীয় আন্দোলনকে আবেগ বর্জিত ভাবে বিনির্মাণ ও তার আপাত সমসত্ত্ব আকারের পশ্চাতে থাকে বিবিধ বিচিত্র শক্তিকে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত থেকে ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তাঁর Modern India: 1885-1947-এ। পাঠ্যপুস্তক হিসেবে রচিত হলেও, অথবা সুমিত সরকার যেভাবে ভাবতেন, সেকথা স্মরণে রেখে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে রচিত বলেই এই বইটিতে আধুনিক ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে দেখা হয়েছে এমন এক অভিনব দৃষ্টিকোণ থেকে যা তৎকালীন বিদ্যায়তনিক গ্রন্থেও বিরল ছিল। সুমিত স্বাধীনতা সংগ্রামকে গুটিকতক নেতা, তাঁদের কর্মকান্ড ও জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের গৃহীত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেখার তৎকালীন রেওয়াজের বাইরে এসে গুরুত্ব দিয়েছেন শ্রমিক, কৃষক, আদিবাসীদের সংগ্রামকে। তিনি গান্ধী অথবা কংগ্রেসকে উপেক্ষা করেননি। কিন্তু তিনি দুটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন – প্রথম, কংগ্রেস নিজেই একটি সমসত্ত্ব রাজনৈতিক দল ছিল না। এটি ছিল একটি জাতীয় মঞ্চ,যেখানে বিবিধ রাজনৈতিক প্রবণতা সক্রিয় ছিল এবং দ্বিতীয়,জাতীয় নেতারা আন্দোলন একদিকে পরিচালনা করেছেন এবং সাধারণ মানুষ সেইদিকে পরিচালিত হয়েছে, বিষয়টি এইরকম একতরফা ছিল না। বরং শ্রমিকদের লড়াই, কৃষকদের সংগ্রাম, আদিবাসীদের লড়াই, দলিতদের অধিকারের লড়াই এগুলি নিচ থেকে চাপ সৃষ্টি করে বহুক্ষেত্রেই জাতীয় আন্দোলনের অভিমুখ এবং জাতীয় নেতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছেন। এই ‘pressure from below’ জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অধ্যাপক সরকারের এক অভিনব অবদান ছিল। এই পাঠ্যপুস্তক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইতিহাসের ছাত্রদের, যাদের অধ্যাপক সরকারের পাঠকক্ষে থাকার সৌভাগ্য হয়নি, তাঁর অভিনব ইতিহাসের দৃষ্টি এবং বিশ্লেষণের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে। অধ্যাপক সরকারের এই বিশেষ বিশ্লেষণের পদ্ধতির নিপুণ প্রয়োগ আমরা বারে বারে দেখেছি ‘Popular’ Movements and ‘Middle Class’ Leadership in Late Colonial India বা Writing Social History-এর মত গ্রন্থেও। প্রথম বইটিতে ‘জাতীয়’ ও ‘মধ্যশ্রেণি’-র নেতৃত্ব ও ‘গণ’ আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্কের নিপুণ বিশ্লেষণ রয়েছে। দ্বিতীয় বইটি একটি প্রবন্ধ সংকলন যেখানে নানা স্বাদের প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। অধ্যাপক সরকারের ইতিহাস দৃষ্টি ছিল জঙ্গম। সম্ভবতঃ তিনি ইতিহাসকে একটি চলমান সংলাপ বলে মনে করতেন বলেই। এই কারণেই তাঁর পরবর্তী সময়ে মনে হয়েছিল Mordern India-তে তিনি যে ঐতিহাসিক প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে প্রয়াসী হয়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক প্রশ্নগুলিই বর্তমানে পাল্টে গেছে। তাই তিনি নতুন করে এই বইটি লিখতে প্রয়াসী হন। এরই ফলশ্রুতি ছিল Modern Times: India 1880’s-1950’s। নতুন এই বইতে রাজনৈতিক ইতিহাসের থেকেও সুমিত গুরুত্ব দিয়েছেন সামাজিক ইতিহাসকে। তাঁর লেখায় এসেছে নারী, পরিবেশ, নাটক, সিনেমা-র মত বিষয়। একজন ঐতিহাসিকের নিজের পুরনো কাজ এত বৈপ্লবিক ভাবে নতুন সময়ের জন্য নতুন প্রশ্নের উত্তর দিতে পরিবর্তন করার নজির অতি অল্প, ভারতে তো বটেই, এই দেশের বাইরেও। মার্কসের প্রিয় আপ্তবাক্য ছিল ‘De omnibus dubitandum’ অর্থাৎ সবকিছুকে সন্দেহ কর। মার্কসবাদী হিসেবে নিজের চিন্তা ও বিশ্বাসকেও সুমিত সন্দেহের বাইরে রাখেননি কোনোদিন। যে ‘সাব-অল্টার্ন’ স্কুলের সঙ্গে তাঁর এত দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং যেখানে তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, পরবর্তী কালে সেই ঘরানা থেকে নিজেকে তিনি শুধু সরিয়েই নেননি, তার অভিমুখের সুতীব্র সমালোচনা করেছেন। এই সরিয়ে নেওয়া এবং সমালোচনা পূর্বোক্ত সন্দেহ ও বারংবার আত্ম-অনুসন্ধান থেকেই জন্ম নিয়েছিল। সুমিত বিশ্বাস করতেন বিদ্যায়তনিক পরিসরের গজদন্ত মিনারে বসে ভাষণ দিয়েই বুদ্ধিজীবীদের কর্তব্যের ইতি ঘটেনা। তাঁদের যেতে হয় জনতার পরিসরে। ‘সাব-অল্টার্ন’-দের নিয়ে নিবন্ধ লিখে আর ‘প্রেশার ফ্রম বিলো’-কে চিহ্নিত করে অতীতে তা কীভাবে সক্রিয় ছিল তার আলোচনা করেই ঐতিহাসিকের দায়ের শেষ নয়। বরং ওই চর্চাই ঐতিহাসিককে পক্ষ নিতে বাধ্য করে, তাকে দায়বদ্ধ করে জনতার মিছিলে পা মেলাতে। উচ্চকিত ভাবে নয়, নেতা হিসেবে নয়, জনতাকে কিছু শেখানোর জন্য নয়। সে যখন জনতার মিছিলে পা মেলায়, তখন সে পা মেলায় তার অংশ হিসেবে, সহ-নাগরিক হিসেবে। এই অবস্থান থেকেই তিনি বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে যুক্ত থেকেছেন। ‘প্রগতিশীল’ বনাম ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ এই দ্বন্দ্বে তিনি নিছক বিশ্বাসী ছিলেন না, এর মধ্যেও নানা চোরা স্রোত আছে বলে মনে করতেন। ইতিহাসের নানাবিধ বাঁক-মোড়ে জনতা সব সময় ঠিক পথে চালিত হয়, এমনটি মনে করতেন না। ‘জাতীয়তা’-র মত ‘জনতা’-র ধারণাও তাঁর কাছে খুব পবিত্র কিছু ছিল না। তবুও ‘জনতা’-র সঙ্গে পা মেলানো তিনি কর্তব্য মনে করতেন। এদিক থেকে তাঁর সঙ্গে রাশিয়ার বিপ্লবী ‘নারোদনিক’-দের কিছু মিল হয়তো ইতিহাসের শিক্ষার্থীরা পেতেও পারেন। তবে একটি বিষয়ে তাঁর নিখাদ বৌদ্ধিক প্রতিরোধ সব সময় সক্রিয় ছিল। সেটি হল আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। ১৯৯৩ সালে Khaki Shorts and Saffron Flags: A Critique of the Hindu Right’ অথবা ২০১৩ সালে Fascism: Essays on Europe and India-তে তাঁর যে বক্তব্য সংকলিত হয়েছে, তা বর্তমান সময়ে ফিরে ফিরে পড়া প্রয়োজন। অধ্যাপক সুমিত সরকার চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন তাঁর সংশয়ী দৃষ্টিকোণ,তাঁর বিনির্মাণ ও বিশ্লেষণের অসাধারণ পদ্ধতি এবং বিদ্যায়তনিক পরিসরের বাইরেও গণ-আন্দোলোনের পরিসরে যুক্ত থাকার দায়বদ্ধতা। যতদিন তাঁর এই উত্তরাধিকার তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে সারা ভারতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী বহন করে যাবে, ততদিন তিনি জীবিত থাকবেন। প্রকাশের তারিখ: ১৮-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|