নবজীবনের পথে (৪র্থ পর্ব)

Abdul Halim
শ্রমিক-আন্দোলনের সংস্পর্শে আসিয়া মুকুন্দলাল সরকার প্রভৃতি শ্রমিক-নেতার সহিত আমার পরিচয় হইয়াছিল। খিদিরপুরে সিমেন্স ইউনিয়ন, বাটলার ইউনিয়নের অফিসেও আমরা যাইতাম। বাংলার খ্যাতনামা বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, সন্তোষ মিত্র, জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রকুমার দত্তের সহিত পরিচয় হইয়াছিল।
(শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস)

৪র্থ পর্ব

ভূমিকাঃ কমরেড আব্দুল হালিম স্বাধীনতা পূর্ব বাংলা তথা ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার অন্যতম ব্যক্তিত্ব। গ্রামের স্কুলে পাঠ অসমাপ্ত রেখেই তরুণ বয়সে চাকরীর সন্ধানে কলকাতায় আসেন। জাহাজ কোম্পানিতে ঠিকা শ্রমিকের কাজ পান। সেভাবেই শ্রমজীবীদের জীবন-সংগ্রামের উপলব্ধি, দেশের পরিস্থিতি, লড়াই আন্দোলনের আঁচ তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছিল, সেভাবেই ক্রমশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। পরিচিত হন মুজফফর আহমদের সঙ্গে, হয়ে ওঠেন তাঁর একান্ত সহযোগী। বাংলা ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১৩৯১ সালে, মুখপত্র পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা দীর্ঘ প্রবন্ধ ‘নবজীবনের পথে’। সেই প্রবন্ধই চার পর্বে প্রকাশিত হল। শিরোনামের সঙ্গে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ‘শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস’ ওয়েবডেস্কের তরফে সংযোজন। যে উপলব্ধির প্রভাবে তিনি নিজের পথচলাকে ‘নবজীবনের পথে’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার সংগ্রামে সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। মূল লেখার বানানই যতদূর সম্ভব বজায় রাখা হয়েছে।

রুশ বিপ্লবের ইতিহাস ছাড়াও তলস্তয়ের লেখা 'রেজারেশন', চার্নেশেভস্কীর উপন্যাস 'হোয়াট ইজ টু বি ডান', ভিক্টর হুগোর 'লা মিজারেবল' প্রমুখ উপন্যাস, ডয়স্টভয়ঙ্কীর উপন্যাস 'ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট', ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলন সম্বন্ধে বই 'টাউন লেবর', ক্রপ্ট কিনের 'ফিল্ডফ্যাক্টরী ও ওয়ার্কস', বাকুনিনের 'গড এন্ড দি স্টেট', লেনিনের 'লেফট উইং কমিউনিজম', মার্কসের 'ক্যাপিটাল', ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমিক', 'পভার্টি অব ফিলজফি', লাফার্গের 'এভোলিউশন অব প্রপার্টি', এঙ্গেলস্-এর 'অরিজিন অব ফ্যামিলি', 'প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড স্টেট', বেবেলের 'উইমেন অ্যান্ড সোশ্যালিজম', প্রখর 'ফিলজফি অব পভার্টি' প্রভৃতি তত্ত্বমূলক বই ছাড়াও বিভিন্ন বিদেশী উপন্যাস-সাহিত্যও তখন পড়িয়াছিলাম কিন্তু ঐ সমস্ত পুস্তকের বিষয়বস্তুর মর্ম উপলব্ধি করার মতো বিদ্যাবুদ্ধি তখন আমার ছিল না। তবুও ঐ সমস্ত পুস্তক পাঠে নূতন চিন্তাধারার সন্ধান পাইয়াছিলাম এবং ঐসব বই পড়িয়া প্রাণে নূতন প্রেরণা উদ্দীপনা ও আনন্দও পাইতাম। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গীর অভাব এবং জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার জন্য অনেক বিষয়ই আমাদের নিকট তখন অস্পষ্ট থাকিয়া গিয়াছিল। ১৯২২ সালে বোম্বাই শহরে কমরেড ডাঙ্গে 'সোশ্যালিস্ট' নামে একখানি ইংরাজী সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। মার্কসবাদী তত্ত্ব বিষয়ে কতকগুলি বই ও 'সোশ্যালিস্ট' অফিস হইতে প্রকাশিত হইয়াছিল। কমরেড ডাঙ্গে 'গান্ধী বনাম লেনিন' নামে একখানি বইও লিখিয়া-ছিলেন। এই সমস্ত পুস্তক-পত্র পত্রিকা আমাদের চিন্তার খোরাক জোগাইয়াছিল।

আমরা তখনো শ্রমিক আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করি নাই, কিংবা তাঁহাদের মধ্যে মার্কসীয় চিন্তাধারা লইয়া যাইতে পারি নাই; বৈজ্ঞানিক সোশ্যালিজম ও মার্কসীয় তত্ত্ব প্রচারের জন্য কোনো পাঠ-চক্রও গড়িয়া তুলি নাই।

স্বদেশী যুগের আমল হইতে ভারতীয় রাজনৈতিক কর্মী ও বিপ্লব-বাদীদের 'সন্ত্রাসবাদী' আন্দোলনের ঐতিহ্য থাকায় তাঁহারাও এই রীতি ও মতবাদকে সুনজরে দেখিতেন না। ভারতবর্ষ হইতে ইংরাজকে বিতাড়ন করাই মাত্র ছিল তাঁহাদের রাজনীতির লক্ষ্য।

১৯২২ সালের শেষে মস্কোতে কমিউনিস্ট ইন্টার ন্যাশনালের চতুর্থ কংগ্রেসের অধিবেশনে কমরেড মুজফফরের মস্কো যাইবার কথা ছিল; কিন্তু ভারত হইতে বিদেশে যাত্রার উপর কড়াকড়ি থাকায় তাঁহার যাওয়া সম্ভব হয় নাই। জাহাজের খালাসী হিসাবে যাওয়ার চেষ্টাও ব্যর্থ হইয়াছিল।

এই সময়ে আমার অন্ন সংস্থানের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আমি ডাক্তার টি, এন, রায়ের কল্যাণে কিছুদিনের জন্য চিংড়িপোতায় একটা চাটনীর কারখানায় কাজ পাইয়াছিলাম, কিন্তু বেশীদিন সে কাজ করিতে পারি নাই। এখন সম্পূর্ণরূপে নিঃসম্বল, কপর্দকহীন অবস্থায় পথে বাহির হইলাম।

কমরেড আবছর রজ্জাক খানের সহিত আমাদের যোগাযোগ ছিল। মুজফ্ফর, খানসাহেব ও আমি-এই তিনজন তখন সহযাত্রী। অবনী চৌধুরী, কবি মহীউদ্দীনও আমাদের সঙ্গে জুটিয়াছিলেন। মহিউদ্দীন কম্পোজিটরের কাজ করিতেন। তিনি মাথায় লম্বা চুল রাখিতেন। তাঁহার কাব্যানুরাগ তাঁহার দৃষ্টিকে কল্পলোকেই সীমাবদ্ধ রাখিত। কলিন স্ট্রীটের খোলার বস্তির একটি ক্ষুদ্র কুঠরীতে তিনি থাকিতেন। ঐ ঘরে দিনেও আলো প্রবেশ করিত না। ঐ ঘনান্ধকার ঘরে বসিয়া মহীউদ্দীন কবিতা লিখিতেন। রাত্রে একটি কেরোসিনের ডিবি জ্বালিয়া একাগ্রচিত্তে লিখিয়া যাইতেন। তাঁহার দেশবাসী ঢাকার অনেক জাহাজের খালাসী, খানসামা, বাবুর্চিও ঐ ঘরেই থাকিতেন। মেঝেতে ঢাকাই মাছর পাতা, এবং তাহার উপর সারি সারি বিছানা। মহীউদ্দীন এই পরিবেশ ও অবস্থার মধ্যেই শ্রমিকের ঘর্মস্রাবী শ্রমের মর্ম কাহিনী রচনা করিতেন। আমি মাঝে মাঝে তাঁহার কাছে যাইতাম। তিনি উৎসাহভরে তাঁহার লেখা আমাকে পড়িয়া শুনাইতেন। কিন্তু কেন জানি না, তাঁহার দীর্ঘকেশ ও কবিতার প্রতি আমার বিশেষ কোন আকর্ষণ ছিল না। তাহা ছাড়া আমাদের মনে তখন বিপ্লব-চিন্তা প্রবাহিত। কি করিয়া ভারতবর্ষে তথা বাংলাদেশে গণ-আন্দোলন সৃষ্টি হইবে, শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করিব ও কাজের সাহিত্য প্রচার করিব-এইসব বিষয় লইয়া আমরা বেশী মাথা ঘামাইতাম। মহীউদ্দীন চাল চলনে ছিলেন 'বহিমিয়ান' এনার্কিস্ট প্রকৃতির। কলিকাতার একটি প্রেসে তিনি কাজ করিতেন। পরে কম্পোজিটরের চাকুরী পাইয়া পাটনা গিয়াছিলেন। কিছুকাল পরে সেখান হইতে ফিরিয়া আসেন। তিনি প্রত্যক্ষভাবে আমাদের সঙ্গে কোনদিন যোগদান করেন নাই। পরে তিনি জাহাজী ইউনিয়নে কাজ করিতেন ও কবি হিসাবে কিছু নাম করিয়াছিলেন।

শ্রমিক-আন্দোলনের সংস্পর্শে আসিয়া মুকুন্দলাল সরকার প্রভৃতি শ্রমিক-নেতার সহিত আমার পরিচয় হইয়াছিল। খিদিরপুরে সিমেন্স ইউনিয়ন, বাটলার ইউনিয়নের অফিসেও আমরা যাইতাম। বাংলার খ্যাতনামা বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, সন্তোষ মিত্র, জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রকুমার দত্তের সহিত পরিচয় হইয়াছিল।

একদিকে মার্কসীয় সাহিত্য ইত্যাদি আমদানী হইতে লাগিল এবং আমরাও ভবিষ্যতের পথ রচনা করিতে প্রয়াসী হইলাম। কুতুবুদ্দীন সাহেবের বাড়ীতে আমরা পড়াশুনা করিতাম। মাঝে মাঝে শ্রমিকদের সহিত যোগ স্থাপনেরও চেষ্টা করিতে লাগিলাম। পুলিশ ইতিপূর্বে কমিউনিস্ট প্লচারের গন্ধ পাইয়াছিল। পোস্টঅফিস হইতে চিঠিপত্র সেন্সর করিয়া পুলিশ কমরেড মুজফ্ফরের গতিবিধির উপর নজর রাখিতেছিল। গোয়েন্দা পুলিস ও স্পাইরা সব দিকেই ছায়ার মতো মুজফফরকে অনুসরণ করিত।

১৯২৩ সালের মে মাসে স্পেশাল ব্র্যাকের ডেপুটি কমিশনার মিঃ কীডের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ৭ নম্বর মৌলভী লেনে কুতুবুদ্দীন সাহেবের বাড়িতে কমিউনিস্ট সাহিত্য ও চিঠিপত্রের অনুসন্ধানে খানা-তল্লাসী করে। কিন্তু তল্লাসীতে কোন কিছুই পাওয়া গেল না। তবে মুজফফর আহমদকে গিরেফতার করিয়া পুলিশ লইয়া গেল। এই সময়ে পুলিশ নারিকেল ডাঙ্গা মেন রোডে কমরেড আবদুর রজ্জাক খানের ভাইয়ের বাড়িতে তল্লাসী করিয়াছিল। তাহা ছাড়া ২৪ পরগণা জেলার স্বরূপনগর থানার অন্তর্গত হাকিমপুরে কমরেড খানের দেশের বাড়ি সশস্ত্র পুলিশ ঘেরাও করিয়া তল্লাশী করিয়াছিল। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের নির্দেশেই এইসব তল্লাশী হইয়াছিল।

অনেক সময় পুলিসের কড়া দৃষ্টি এড়াইয়া আমরা কলিকাতার বাহিরে গা-ঢাকা দিয়া থাকিতাম। মুজফ্ফর ও আমি বালীতে অবনী চৌধুরীর বাড়িতে গিয়া মাঝে মাঝে থাকিতাম। অবনীর বিধবা মাতা সযত্নে আমাদের খাওয়াইতেন।

এইভাবে পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি এড়াইয়া আমরা শ্রমিক কৃষকদের মধ্যে রাজনীতি প্রচারের কাজে অগ্রসর হইতে লাগিলাম।


প্রকাশের তারিখ: ১০-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org