|
নবজীবনের পথে (১ম পর্ব)Abdul Halim |
কলিকাতায় আসিয়া কিছুদিন চাকুরির উমেদারিতে ঘোরাফেরা করিয়া অবশেষে ‘হ্যারিসন-লাইন’ নামক জাহাজ কোম্পানিতে অল্প দিনের জন্য ‘অস্থায়ী টালিক্লার্কের’ চাকুরি পাই। ইহার অত্যল্পকাল পরেই ‘অ্যালাম্যান সিটি লাইন’ নামক জাহাজ-কোম্পানিতে ‘অস্থায়ী টালি ক্লার্কের’ কাজে যোগদান করি। এই জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করিবার সময় আমার রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ হয়। |
(শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস)
১ম পর্ব
ভূমিকাঃ কমরেড আব্দুল হালিম স্বাধীনতা পূর্ব বাংলা তথা ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার অন্যতম ব্যক্তিত্ব। গ্রামের স্কুলে পাঠ অসমাপ্ত রেখেই তরুণ বয়সে চাকরীর সন্ধানে কলকাতায় আসেন। জাহাজ কোম্পানিতে ঠিকা শ্রমিকের কাজ পান। সেভাবেই শ্রমজীবীদের জীবন-সংগ্রামের উপলব্ধি, দেশের পরিস্থিতি, লড়াই আন্দোলনের আঁচ তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছিল, সেভাবেই ক্রমশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। পরিচিত হন মুজফফর আহমদের সঙ্গে, হয়ে ওঠেন তাঁর একান্ত সহযোগী। বাংলা ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১৩৯১ সালে, মুখপত্র পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা দীর্ঘ প্রবন্ধ ‘নবজীবনের পথে’। সেই প্রবন্ধই চার পর্বে প্রকাশিত হল। শিরোনামের সঙ্গে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ‘শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস’ ওয়েবডেস্কের তরফে সংযোজন। যে উপলব্ধির প্রভাবে তিনি নিজের পথচলাকে ‘নবজীবনের পথে’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার সংগ্রামে সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। মূল লেখার বানানই যতদূর সম্ভব বজায় রাখা হয়েছে। ১৯১৮-১৯ সালে তরুণ বয়সে পল্লীজননীর আশ্রয় ছাড়িয়া চাকুরির সন্ধানে কলিকাতা আসিয়াছিলাম। শৈশব ও কৈশোরের অনেক মধুমাখা স্মৃতি সেদিন মানসলোকে উদিত হইয়া পুনরায় মিলাইয়া গিয়াছিল। আজ সে-সব কথা অতীত স্মৃতিতেই পর্যবসিত হইয়াছে। ভারতবর্ষ কিংবা বাংলার রাজনীতি সম্পর্কে তখনো আমার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না; আমার জীবনের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধেও কোনো স্থির লক্ষ্য ছিল না। স্বদেশী আন্দোলন ও কংগ্রেসের কথা শুনিয়া-ছিলাম; কিন্তু তাহাদের নীতি সম্পর্কে আমার কোনো প্রকৃত ধারণা ছিল না। আমার জীবনের যে এত বড় একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিবে এবং শ্রদ্ধেয় কমরেড মুজফফর আহমদের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হইয়া তাঁহার সহকর্মী ও বন্ধুরূপে আমিও যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠায় একজন কর্মীর ভূমিকা গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভকরিব তাহা সেদিন স্বপ্নেরও অগোচর ছিল। কলিকাতায় আসিয়া কিছুদিন চাকুরির উমেদারিতে ঘোরাফেরা করিয়া অবশেষে ‘হ্যারিসন-লাইন’ নামক জাহাজ কোম্পানিতে অল্প দিনের জন্য ‘অস্থায়ী টালিক্লার্কের’ চাকুরি পাই। ইহার অত্যল্পকাল পরেই ‘অ্যালাম্যান সিটি লাইন’ নামক জাহাজ-কোম্পানিতে ‘অস্থায়ী টালি ক্লার্কের’ কাজে যোগদান করি। এই জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করিবার সময় আমার রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ হয়। আমি ‘সিটি লাইনে’ প্রায় দুই বৎসর চাকুরি করিয়াছিলাম। জাহাজের ‘খোলে’ দিবারাত্র আমাকে কঠোর পরিশ্রম করিতে হইত। কর্মরত জাহাজী শ্রমিকদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির সহিত সেই সময় সাক্ষাৎভাবে আমি পরিচিত হই। আমি বেশীর ভাগ সময় সারা রাত্রি জাগিয়া জাহাজের খোলে কাজ করিতাম। রাত্রি জাগরণে শরীর অবসন্ন হইত। আমার চোখের সামনে ভবিষ্যতের কোনো হদিশ খুঁজিয়া পাইতাম না। জাহাজে কাজ করিবার সময়েই ধনিকশ্রেণীর নির্মম শোষণের কিঞ্চিৎ আস্বাদ পাইয়াছিলাম। ধনিকশ্রেণীর সহিত শ্রমিক্সের 'শ্রেণী পার্থক্য' সম্বন্ধে খানিকটা চেতনাও তখন জাগ্রত হয়। চোখের সামনে দেখিতাম, শ্রমিকেরা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করিয়া উচিত মজুরি পাইতেন না। জাহাজের মালিক এবং স্টেভেডোর হইতে শুরু করিয়া ফোরম্যান, বড়বাবু, সর্দার পর্যন্ত সকলেই শ্রমিককে দোহন করিতেছে। শ্রমিক-দের সংস্পর্শে আসিয়া এবং নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির ভিতর দিয়া আমি ক্রমশ রাজনীতির দিকে অগ্রসর হই। শ্রমিক আন্দোলন সম্বন্ধে আমার কোন ধারণা ছিল না। মনে পড়ে ১৯২০ সালে জাহাজে কাজ করিবার সময় রাত্রির ঘনান্ধকারে আমাকে যাতায়াত করিতে হইত, কারণ সেই সময় কলিকাতা শহরে রাস্তায় আলো জ্বলিত না-কলিকাতার গ্যাস কোম্পানির শ্রমিকরা একমাস যাবৎ ধর্মঘট করিয়াছিলেন। অন্ধকার রাত্রে রাহাজানির ভয়ে কলি-কাতার রাজপথে নাগরিকদের পক্ষে চলাফেরা করা নিরাপদ ছিল না। লোকে ভয়ে সন্ধ্যার পর ঘরের বাহির হইত না; চতুর্দিকে একটা অরাজকতার ভাব সৃষ্টি হইয়াছিল। সম্ভবত ঐ বৎসরেই কলিকাতার ট্রাম কোম্পানির শ্রমিকরাও ধর্মঘট করিয়াছিলেন এবং পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শ্রমিক কালীঘাট ডিপোর সন্নিকটে নিহত হইয়া-ছিলেন। তখনই সর্বপ্রথম আমি শ্রমিকের ধর্মঘটের কথা শুনি। ১৯১৮ সালে ভারতবর্ষে ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সূত্রপাত হয়। ১৯২০ সালে অক্টোবর মাসে বোম্বাই শহরে ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা-সম্মেলন হয় এবং সেখানেই কংগ্রেস-নেতা লালা লাজপৎ রায় ও যোশেপ ব্যাপ্টিস্টা সভাপতি ও সহ সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত ভারতের কংগ্রেস-আন্দোলন কিংবা ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের গঠন বা শ্রমিক-আন্দোলনের ইতিহাস সম্বন্ধে আমি কিছুই জানিতাম না। ১৯১৯-২০ সালে-সংবাদপত্র মারফত রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলনের কথা জানিতে পারি। পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে জালিয়ানওয়ালাবাগে অবরুদ্ধ নিরস্ত্র নরনারী শিশু জনতাকে জেনারেল ডায়ার গুলি করিয়া নৃশংসভাবে হত্যা করে। ১৯২০ সালে যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক সংকটের অবশ্যম্ভাবী ফলে গণ-আন্দোলনও তীব্র হইতে থাকে। ১৯২০ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্মঘট আন্দোলনের তরঙ্গ সারা ভারতে ছড়াইয়া পড়ে। ১৯২০ সালে কলিকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন হয়। সেই সময় আমি কংগ্রেস-পরিচালিত স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয়ে কিছু জানিতে পারি। পত্রিকা মারফত জাতীয় আন্দোলনের খবর পড়িয়া আমিও রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহশীল ও উৎসুক হইয়া উঠি এবং রাজনীতির দিকে ঝুঁকিয়া পড়ি। ১৯২১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগতি, অসহযোগ আন্দোলনের প্রবল উত্তেজনা উদ্দীপনা ও উৎসাহ আসমুদ্র হিমাচল আলোড়িত করিয়া তুলিয়াছিল। ১৯২১ সালে আমার চোখের সামনে এমন সব ঘটনা ঘটিয়া চলিল যাহার ফলে আমার চিত্তও স্বাধীনতার জন্য চঞ্চল হইয়া উঠিল। ১৯২১ সালের মে মাসে আসাম রেলওয়েতে শ্রমিকদের ধর্মঘট হয়। আসামের চা বাগানের শ্রমিকেরা বাগানের মালিকদের অত্যাচারে ধর্মঘট করিয়া বাগান ছাড়িয়া পদব্রজে দেশাভিমুখে ফিরিবার অভিযান করেন। মোপলা-বিদ্রোহ, আকালী-আন্দোলন, ইস্ট ইন্ডিয়া রেলের দীর্ঘদিনব্যাপী শ্রমিক-ধর্মঘট, বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ধর্মঘট ও হরতালের মধ্য দিয়াও শ্রমিক-জাগরণ শুরু হইয়াছিল। গান্ধীজীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে সমগ্র দেশের লোক ব্যাপক ভাবে সাড়া দিয়াছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশীয় ধনিক-বনিক হইতে শুরু করিয়া শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত বিক্ষোভ সংগ্রামের মধ্যে ফাটিয়া পড়িয়াছে। কলিকাতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে আইন-অমান্য আন্দোলন শুরু হইয়াছে। আমিও সেদিন দেশের এই স্বাধীনতা আন্দোলন হইতে দূরে সরিয়া থাকিতে পারি নাই। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের কোন এক দিনে চাকুরিতে ইস্তফা দিয়া আমি সরাসরি কংগ্রেস অফিসে গিয়া স্বেচ্ছাসেবকদলে নাম লিখাইলাম। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে আমরা বড়বাজারে পিকেটিং করিতে গিয়া পুলিস কর্তৃক গ্রেপ্তার হইলাম। কোর্টের বিচারে দেশবন্ধু দাশের সঙ্গে আমারও ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ড হইয়াছিল। প্রেসিডেন্সী জেলে কিছুদিন আটক থাকার পর আমি খিদিরপুর ডক জেলে প্রেরিত হই। এই খিদিরপুর জেলেই কমরেড আবদুর রজ্জাক খান ও আবদুল মোমিনের সহিত আমার প্রথম পরিচয় হয়। জেল হইতে মুক্ত হইবার অল্পদিন পরেই কমরেড আবদুর রজ্জাক খানের সহিত আমার পুনরায় ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় এবং পরে আমাদের একসঙ্গে কাজ করিবার সৌভাগ্যও হইয়াছিল। কমরেড মোমিনের সহিত জেলের বাহিরে ১৯২২ সালে আমার একবার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, কিন্তু আলাপ বেশী দূর অগ্রসর হয় নাই; তিনি তখন অন্য রাজনীতির দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছিলেন। প্রকাশের তারিখ: ০৯-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|