|
ভারত, নয়া-ফ্যাসিবাদ এবং নভেম্বর বিপ্লবSamik Lahiri |
সম্পদের বৈষম্য - পুঁজির কেন্দ্রীভবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, দেশের মোট জাতীয় সম্পদের একটি বৃহৎ অংশ অতি ধনী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভুত হওয়া। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তির হাতে দেশের মোট সম্পদের ৪০.১ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এটা ১৯৬১ সাল থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। |
প্রথম পর্ব ফ্যাসিবাদ শুধু কয়েকজন উগ্র নেতার রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটা পুঁজিবাদের কাঠামোগত সংকটের ফসল এবং বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব। এই বিশ্লেষণের প্রধান ভিত্তি স্থাপন করেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের (কমিন্টার্ন) সপ্তম কংগ্রেসে জর্জি ডিমিট্রভ। কমিন্টার্ন ফ্যাসিবাদের শ্রেণীচরিত্র বিশ্লেষণ করে একে পুঁজিবাদের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক রূপ হিসেবে চিহ্নিত করে। কমিন্টার্নের ত্রয়োদশ প্লেনাম (১৯৩৩) ফ্যাসিবাদের একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেয় – “ফ্যাসিবাদ হলো লগ্নী পুঁজির (Finance Capital) সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে উগ্র সাম্রাজ্যবাদী ও সবচেয়ে সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র।” লগ্নী পুঁজি হলো পুঁজিবাদী বিকাশের একচেটিয়া পর্যায়ে পুঁজির সর্বোচ্চ ঘনীভবন, যা শিল্প ও ব্যাঙ্ক পুঁজির একত্রিত রূপ। পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সময়ে, এই বৃহৎ পুঁজি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মুখোশ খুলে ফেলে সরাসরি সন্ত্রাস ও হিংসার আশ্রয় নেয়। ফ্যাসিবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, সমাজতন্ত্রকে প্রতিহত করা, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে বজায় রাখা এবং শ্রমিকশ্রেণী এবং গণতন্ত্রের সমস্ত অর্জিত অধিকারগুলিকে চূর্ণ করা। ফ্যাসিবাদের সামাজিক ভিত্তি ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াই, যুক্তফ্রন্টের কৌশল ১) শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্য - প্রথমে কমিউনিস্ট এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলগুলো এবং শ্রমিকশ্রেণীর কাজের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। ২) ব্যাপক গণতান্ত্রিক ঐক্য - এরপর এই ঐক্যকে সমাজের সমস্ত ফ্যাসিবাদ-বিরোধী শক্তি, যেমন ক্ষুদ্র কৃষক, বুদ্ধিজীবী, এবং কিছু উদারনৈতিক বুর্জোয়া অংশ — এদের নিয়ে ব্যাপক গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করা। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা বর্তমান ভারতে প্রাসঙ্গিকতা যে ফ্যাসিবাদী উপাদানগুলি লক্ষণীয় পুঁজির কেন্দ্রীভবন অর্থ, অর্থনীতির মোট সম্পদ বা উৎপাদন ক্ষমতার একটি ক্রমবর্ধমান অংশ খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তি, সংস্থা বা কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। এটা পুঁজিবাদের বিকাশের একচেটিয়া পর্যায়ের একটি অনিবার্য বৈশিষ্ট্য, যা অর্থনৈতিক বৈষম্যকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। ভারতে বর্তমানে সাংঘাতিকভাবে পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটছে। সম্পদের বৈষম্য - পুঁজির কেন্দ্রীভবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, দেশের মোট জাতীয় সম্পদের একটি বৃহৎ অংশ অতি ধনী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভুত হওয়া। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তির হাতে দেশের মোট সম্পদের ৪০.১ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এটা ১৯৬১ সাল থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। দ্রুত ক্রমবর্ধমান এই বৈষম্য জি-২০-এর ২০২৫ সালের রিপোর্টেই প্রতিফলিত হয়েছে। এই রিপোর্ট অনুসারে, ২০০০-২০২৩ সালের মধ্যে ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর সম্পদের অংশ ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে, অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে নিচের দিকের ৫০ শতাংশ ভারতীয়র হাতে মোট সম্পদের অংশ মাত্র ৩ শতাংশ। আয়ের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য প্রকট। ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষ দেশের মোট জাতীয় আয়ের ২২.৬ শতাংশ উপার্জন করে (২০২২-২৩ সাল)। শ্রেণি জাতীয় আয়ের ভাগ মোট সম্পদের ভাগ শীর্ষ ১ শতাংশ ২২.৬ শতাংশ ৪০.১ শতাংশ শীর্ষ ১০ শতাংশ ৫৭.২ শতাংশ ৬৫ শতাংশ (প্রায়) মধ্য ৪০ শতাংশ ২৭.৩ শতাংশ ২৮ শতাংশ নীচের ৫০ শতাংশ ১৫ শতাংশ ৬.৪ শতাংশ অর্থাৎ, ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষ দেশের প্রতি ৪ টাকার মধ্যে ১ টাকার বেশি আয় করে এবং দেশের মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেকের মালিক। সূত্রঃ "ইন্ডিয়া ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট: দ্য রাইজ অফ দ্য বিলিয়নিওর রাজ" (WIL) স্বাধীনতার পরের ৩০ বছরে (১৯৫০-৮০) বৈষম্য কিছুটা কমেছিল কারণ, দেশের কিছু রাজ্যে ভূমি সংস্কার, কর নীতি ও সরকারি বিনিয়োগ হয়েছিল। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে আয়ের বৈষম্য দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১০-এর দশকে ভারতের ধনীক শ্রেণি সবচেয়ে দ্রুত গতিতে সম্পদ অর্জন করেছে, বিশেষত কর্পোরেট মালিকানার মাধ্যমে। আয় বৈষম্যের ঐতিহাসিক গতিপথ বোঝা যায় নীচে উল্লিখিত সারণী থেকে। সূচকের তথ্যগুলি ১৯৫১ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে ভারতের আয়ের বণ্টনে একটি বিরাট কাঠামোগত পরিবর্তন নির্দেশ করে। সময়কাল শীর্ষ ও এর আয়ের অংশ (শতাংশে প্রকাশিত) প্রবণতা ও কারণ
১৯৫১-৯১ শীর্ষ ১% ও ১০% এর আয়ের অংশ নেতিবাচক ছিল (অর্থাৎ, আয়ের হার কমছিল)। এটি স্বাধীনতার পর মিশ্র অর্থনীতি কার্যকর থাকার কারণে হয়েছিল, যেখানে ধনীদের আয় নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
২০২২-২৩ শীর্ষ ১% এর অংশ বেড়ে হয়েছে ২২.৬% এবং শীর্ষ ১০% এর অংশ বেড়ে ৫৭%+ হয়েছে। এটি ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর ঘটে। এর ফলে পুঁজিবাদের দ্রুত উত্থান হয়, যেখানে সম্পদ ও আয়ের সিংহভাগ
জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই তথ্যগুলিই প্রমান করে, ভারতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth) হলেও এর সুফল সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, বরং এটি পুঁজির ঘনীভবনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। কর্পোরেট ক্ষমতার ঘনীভবন টেলিকম ক্ষেত্র - এখানে কর্পোরেট ঘনীভবনের সবচেয়ে প্রকট। একসময় ভারতে প্রায় ডজনখানেক টেলিকম অপারেটর থাকলেও, বর্তমানে মূলত তিনটি বৃহৎ প্রাইভেট অপারেটরের হাতে কেন্দ্রীভূত। এদের মধ্যে শীর্ষ দুটি সংস্থা টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (TRAI)-এর রিপোর্ট এবং অন্যান্য শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের মোট বাজার রাজস্বের (Adjusted Gross Revenue - AGR) সিংহভাগ অর্থাৎ ৮৫% থেকে ৯০% এর কাছাকাছি বর্তমানে প্রধানত দুটি সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করে - রিলায়েন্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেল। ভোডাফোন আইডিয়া এবং বিএসএনএল ও এমটিএনএল-এর কাছে বাজারের বাকি সামান্য অংশ রয়েছে। এই ঘনীভবন ছোট অপারেটরদের বাজার থেকে বিলীন করে দিয়েছে এবং দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই তিনটি সংস্থার হাতেই এখন চূড়ান্ত ক্ষমতা। প্রকাশের তারিখ: ১৬-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|