স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলার সংস্কৃতি (৪র্থ পর্ব)

Malini Bhattacharya
ইংরাজ শাসকের টনক নড়ল যখন 'নীলদর্পণ' মঞ্চস্ত হবার পর ১৮৭৩-১৮৭৫-এর মধ্যে পর পর কয়েকটি 'দর্পণ'-নাটক প্রকাশিত হবার মধ্য দিয়ে মানুষের রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রকাশ ঘটল। বিশেষত, 'নীলদর্পণ' যেমন নীলকরদের রুজি-রোজগারে টান দিয়েছিল, 'চা-কর দর্পণে' চা-শ্রমিকদের ওপর সাহেব-মালিকদের ভয়ঙ্কর শোষণের নাট্যরূপায়ণকে তেমনি চা-বাগানের মালিকদের বিপদ হিসাবে দেখা হলো। উপেন্দ্রনাথ দাসের 'সুরেন্দ্র বিনোদিনী' ও 'শরৎ সরোজিনী'র মধ্যে অত্যাচারী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের চেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়া গেল।

৪. জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও সংস্কৃতি

'উঠ, উঠ, উঠ মা বঙ্গজননী। এস ভাইসকল। আমরা এই অন্ধকার কালস্রোতে ঝাঁপ দিই। এস, আমরা দ্বাদশ কোটি ভুজে ঐ প্রতিমা তুলিয়া, ছয় কোটি মাথায় বহিয়া, ঘরে আনি।

বঙ্কিমচন্দ্র

'নীলদর্পণ' দিয়ে ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্বোধন করা হয়। ধনীর পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর না করে এই থিয়েটারের খরচ নির্বাহকরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো টিকিট বিক্রির মাধ্যমে। এর পৃষ্ঠপোষক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, 'নীলদর্পণে'র মতো বিতর্কিত নাটক করার ঝুঁকি নেওয়া বস্তুত এই সমাজের মধ্যে সঞ্চরমান ক্ষোভএবং তীব্র জাতীয়তাবোধের স্বীকৃতি। কিন্তু 'নীলদর্পণে'র বাস্তববাদী নাট্যকার নীলকরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম কৃষকের সম্মিলিত ক্ষোভ দেখাতে গিয়ে তোরাপের মতো একটি অবিস্মরণীয় চরিত্র রচনা করতে পেরেছিলেন ১৮৬০ সালে, সিপাহিবিদ্রোহের তিন বছর পর। অথচ সত্তরের দশকের গোড়ায় যে নাটকগুলি ন্যাশনাল থিয়েটার ও অন্যত্র জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল, তার অনেকগুলি দেশাত্মবোধক বিষয় নিয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে কৃষকের জীবনের চিত্রণ তো পাওয়া যায়ই না, কোনো কোনোটিতে আবার দেশাত্মবোধের বিকাশ ঘটে মুসলিমবিজয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের 'সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ', হরলাল রায়ের 'হেমলতা' ও 'বঙ্গের সুখাবসান', বঙ্কিমের 'মৃণালিনী'র নাট্যরূপ, প্রত্যেকটিতেই দেশপ্রেমিক হিন্দুর প্রতিপক্ষ হিসাবে আক্রমণকারী মুসলিমকেই দেখানো হচ্ছে।

অভিনেত্রী বিনোদিনী 'সরোজিনী' নাটকের দুটি দৃশ্যের উল্লেখ করেছেন, একটিতে ভৈরবাচার্য ছদ্মবেশী মুসলমান চর এ-কথা মঞ্চে উচ্চারিত হতেই কয়েকজন দর্শক উত্তেজিত হয়ে লাফিয়ে মঞ্চে উঠে পড়ে উত্তেজনায় অজ্ঞান হয়ে যান। অন্যটিতে রাজপুত নারীদের জহরব্রতের দৃশ্যে অভিনেত্রীরা এত আত্মবিস্মৃত হয়ে যান, যে গায়ে বা চুলে আগুন ধরে গেলেও তাঁদের হুশ থাকে না। এমন নয়, যে নাট্যকার বা অভিনেত্রীরা সচেতনভাবে সাম্প্রদায়িক ছিলেন, কিন্তু এটা এই সময়ে জাতীয়তাবাদের উন্মেষের মধ্যে একটা খুব স্পষ্ট প্রবণতা, হিন্দু মধ্যবিত্তদের মধ্যে খুব কম লোকই যার প্রভাব এড়াতে পেরেছিলেন। 'সরোজিনী'র কাহিনী কাল্পনিক, গ্রীক পুরাণের ইফিগেনিয়ার গল্পের সঙ্গে তার সাদৃশ্য আছে, কিন্তু টডের প্রভাব এখানেও লক্ষণীয়।

ইংরাজ শাসকের টনক নড়ল যখন 'নীলদর্পণ' মঞ্চস্ত হবার পর ১৮৭৩-১৮৭৫-এর মধ্যে পর পর কয়েকটি 'দর্পণ'-নাটক প্রকাশিত হবার মধ্য দিয়ে মানুষের রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রকাশ ঘটল। বিশেষত, 'নীলদর্পণ' যেমন নীলকরদের রুজি-রোজগারে টান দিয়েছিল, 'চা-কর দর্পণে' চা-শ্রমিকদের ওপর সাহেব-মালিকদের ভয়ঙ্কর শোষণের নাট্যরূপায়ণকে তেমনি চা-বাগানের মালিকদের বিপদ হিসাবে দেখা হলো। উপেন্দ্রনাথ দাসের 'সুরেন্দ্র বিনোদিনী' ও 'শরৎ সরোজিনী'র মধ্যে অত্যাচারী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের চেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। ১৮৭৬ সালে রঙ্গমঞ্চের এই বিপজ্জনক প্রবণতাকে খতম করার জন্য সরকার নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন পাশ করলো, যদিও তার প্রথম প্রয়োগ হয় 'গজদানন্দ' ও 'Police of Sheep and Pig' নামে দুটি ব্যঙ্গাত্মক নাটিকার ওপর। অভিনেতা, পরিচালক, মঞ্চাধ্যক্ষ, থিয়েটারের মালিক, এমনকি দর্শকদেরও এই আইনের আওতায় আনা হলো। এবং এর ব্যত্যয় হলে পুলিসকে প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে গ্রেপ্তার এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার দেওয়া হলো। 'সুরেন্দ্র বিনোদিনী'র বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে মামলা করা হলো, যার জেরে এর সঙ্গে জড়িত সকলেই নাট্যজগৎ থেকে একরকম বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। সাধারণের রঙ্গশালা যেভাবে সাধারণের ক্ষোভ-প্রতিবাদকে অভিব্যক্তি দেবার একটি উপায় হিসাবে গড়ে উঠছিল, প্রতিহিংসামূলক এই আইন তার গোড়ায় ঘা দিল, এবং বহুদিনের জন্য নাট্যশালাকে পঙ্গু করে দিল। ব্যবসায়িক স্বার্থে নিছক বিনোদনের জন্য মঞ্চকে দখল করে নিল কিছু পয়সাওয়ালা লোক, নাট্যশালার রাজনৈতিক সম্ভাবনাতে যাদের কোনো আগ্রহ ছিল না।

'ন্যাশনাল থিয়েটারে'র পেছনে উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগানোর জন্য ছিলেন 'হিন্দুমেলা'র সংগঠকদের অন্যতম মনোমোহন বসু এবং নবগোপাল মিত্র, স্বাদেশিকতার সঙ্গে এটি তার অন্যতম যোগসূত্র ছিল। এই 'হিন্দুমেলা' এই পর্বে জাতীয়তাবোধ যে স্পষ্ট রূপ নিচ্ছিল তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ। রাজনারায়ণ বসুর প্রতিষ্ঠিত 'জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা'র যে অনুষ্ঠানপত্র ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয়, তাকে কার্যকরী করতেই হিন্দুমেলার জন্ম। ১৮৬৭ সালে বেলগাছিয়ার এক বাগানবাড়িতে 'হিন্দুমেলা' প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৮০ সাল পর্যন্ত বছরে একবার তার অধিবেশন হতো। রাজনারায়ণ বসু নিজে ব্রাহ্ম ছিলেন। বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই সময়ে ব্রাহ্মসমাজের সমাজ-সংস্কারমূলক ও লোকাচার-বিরোধী তীক্ষ্ণতা অনেক স্তিমিত হয়ে এসেছে। রাজনারায়ণ ব্রাহ্মধর্মকে 'হিন্দুধর্মেই সমুন্নত আকারমাত্র' বলে তাঁর 'আত্মচরিতে' বর্ণনা করেন এবং বিদেশী সংস্পর্শমুক্ত হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা বিষয়ে ১৮৭২ সালে একটি বক্তৃতা দেন। গোঁড়া হিন্দুদের মধ্যেও অনেকে এর পরে তাঁকে 'হিন্দুকুল-চূড়ামণি' বলে সম্বোধন করতেন। বঙ্কিম এই বক্তৃতার জন্য রাজনারায়ণ বসুকে অভিনন্দন জানান তাঁর 'বঙ্গদর্শনে'।

মনোমোহন বসু রাজনারায়ণের অনুপ্রেরণায় প্রচলিত হিন্দুমেলার সম্বন্ধে বলেছিলেন: 'এই চৈত্র মেলা নিরবচ্ছিন্ন স্বজাতীয় অনুষ্ঠান, ইহাতে ইউরোপীয়দের নামগন্ধ মাত্র নাই, এবং যেসকল দ্রব্যসামগ্রী প্রদর্শিত হইবে, তাহাও স্বদেশীয় ক্ষেত্র, স্বদেশীয় উদ্যান, স্বদেশীয় ভূগর্ভ, স্বদেশীয় শিল্প এবং স্বদেশীয় জনগণের হস্তসভূত। স্বজাতির উন্নতিসাধন, ঐক্যস্থাপন এবং সাবলম্বন অভ্যাসের চেষ্টা করাই এই সমাবেশের একমাত্র পবিত্র উদ্দেশ্য।' স্বদেশী উদ্যোগে উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছিল এই মেলা, ব্যায়াম ও শরীরচর্চাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। তাঁতি, কুমোর, চাষী, পাইক, পালওয়ান সবাইকে শামিল করার চেষ্টা করেছিল। রবীন্দ্রনাথের 'জীবনস্মৃতি'তে তিনি কিছুটা কৌতুকের সঙ্গে স্বদেশী পোশাক নিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা, এবং স্বদেশী উদ্যোগে দেশলাই-এর কারখানা আর কাপড়ের কল তৈরির কাহিনী বলে গেছেন। কিন্তু যেখানে শিল্প উদ্যোগ সম্পূর্ণভাবে বিদেশীর হাতে চলে গেছে, সেখানে এই নতুন প্রচেষ্টার একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। মধ্যবিত্ত 'ভদ্রলোক' সমাজ তাদের নিজেদের স্বার্থেই হিন্দু মেলার মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী শ্রেণীগুলির সঙ্গে যোগাযোগের একটা রাস্তা খুলতে চেয়েছে, বিদেশী শাসকের বিরুদ্ধে তাদের নেতৃত্ব দিতে চেয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় যে এটা তারা করতে চেয়েছে হিন্দুসমাজের সংস্কার এবং তার স্তরভেদকে যথাযথ রেখেই। আরও লক্ষণীয় যে 'স্বজাতি' বলতে হিন্দু জাতিকেই বোঝানো হয়েছে, স্বজাতির 'উন্নতিসাধন' এবং 'ঐক্যস্থাপনে'র এই কর্মসূচি থেকে বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে অহিন্দুদের, 'জাতীয়তা' এবং 'হিন্দুত্বের' ধারণা প্রায় একাকার হয়ে গেছে।

উনিশ শতকে যুক্তিবাদী মননের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সমাজে মেয়েদের অবস্থান-সংক্রান্ত কতগুলি প্রশ্ন নিয়ে। রামমোহন লড়েছিলেন সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে আর বিদ্যাসাগর আন্দোলনের পথ তৈরি করেছিলেন বহুবিবাহের বিরুদ্ধে, বিধবাবিবাহ ও স্ত্রী-শিক্ষার পক্ষে। কোনো কোনো সমালোচক বলে থাকেন, শাস্ত্রে সহমরণ বা বিধবাবিবাহ আছি কি নেই, যুক্তিতর্ক চলেছে তাকেই ঘিরে, নারী সেই ক্ষেত্রমাত্র, যার ওপর এই বিতর্কের অস্ত্র-ঝঞ্জনাচলতে থাকে। তাকে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এখন এটা ঠিকই যে উনিশ শতকের যে সময়ে এই বিতর্ক আরম্ভ হয়, তখন এ সম্বন্ধে মেয়েদের আত্মপ্রকাশের ভাষা অশ্রুতই রয়ে গিয়েছিল। যদি তাঁদের কণ্ঠস্বর শোনা যেত, তাহলে কী বলতেন তাঁরা? কেউ হয়তো সতীদাহ অথবা বৈধব্যের আচার নিয়মের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাতেন, কেউ বা মনের ওপর দেগে-দেওয়া সতীত্বের প্রমাণ দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। এটা আমরা অনুমান করতে পারি। বিধবাদের অবস্থা রামমোহন বা বিদ্যাসাগর স্বচক্ষেই দেখেছিলেন, এ বিষয়ে মেয়েদের মতামত কানেও শুনেছিলেন। যুক্তি এবং অনুমানের ভিত্তিতে তার থেকে তাঁদেরই একটা বিকল্প তৈরি করে নিতে হয়েছিল, উভয়েই সেই বিকল্প তৈরি করার জন্য স্ত্রী-শিক্ষাকে অবশ্যম্ভাবী মনে করেছিলেন। এই বিকল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্রাহ্মরাও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

পিতৃত্ববাদী হিন্দু সমাজের মধ্যে এতে যে আলোড়ন ওঠে, তারই ফলে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে আমরা অবরোধের বাইরে কিছু মধ্যবিত্ত নারীর দেখা পাচ্ছি, কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। স্বভাবতই এই স্ত্রী-শিক্ষার ধারণা একটা বিশেষ গণ্ডির মধ্যেই কাজ করেছিল, ১৮:৫০ সালে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মতো খুব কম লোকই বলতে পেরেছিলেন। 'বিশ্বপিতা স্ত্রী ও পুরুষের কিছু আকারগত ভেদ সংস্থাপন করিয়াছেন মাত্র। মানসিক শক্তি বিষয়ে কিছুই ন্যূনাধিক্য স্থাপন করেন নাই। অতএব বালকেরা যেরূপ শিখিতে পারে, বালিকারা সেরূপ কেন না পারিবেক।' বেথুন স্কুলে শিক্ষণীয় বিষয় ছিল লিখন-পঠন, পাটিগণিত, বাংলার ইতিহাস, ভূগোল ও সেলাইয়ের কাজ। বাল্যবিবাহের ফলে বেশিরভাগ মেয়েই এইটুকুও শেষ করতে পারতেন না। স্বভাবতই পুরুষ-অভিভাবকত্বই এখানে স্ত্রী-শিক্ষার বা স্ত্রী-স্বাধীনতার গণ্ডি একে দেয়। কিন্তু 'নবজাগরণে'র যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যে নারীপুরুষ সম্পর্কটাকেই নতুনভাবে দেখবার চেষ্টা করছে, যার ফলে তার মধ্যে নতুন বিসংবাদ সৃষ্টি হচ্ছে, মেয়েরা এই বিসংবাদের মধ্য থেকেই ভাষা খুজে পাচ্ছে এটাও অস্বীকার করলে ভুল করা হবে। ১৮৬৮ সালে রাসসুন্দরী দেবীর 'আমার জীবনে'র প্রথম সংস্করণ বার হয়। তার আগে ১৮৬৩ সালে কৈলাসবাসিনী দেবীর 'হিন্দু মহিলাগণের হীনাবস্থা'। 'বামাবোধিনী পত্রিকা'ও ঐ একই সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় মেয়েদের জবানিতে যে চিঠিগুলি পাই, সেখানেও কিন্তু সংসারের প্রয়োজনে, সুগৃহিণী এবং সুজননী হবার প্রয়োজনেই অধিকাংশ সময় শিক্ষাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। 'বামাবোধিনী'তে দু'একজন মুসলিম মহিলার চিঠিও পাওয়া যায়। তারপর বেগম রোকেয়ার 'মতিচুর', 'সুলতানার স্বপ্ন' প্রভৃতি রচনাগুলি পাই বিশ শতকের গোড়ায়। অন্যদিকে অভিনেত্রী বিনোদিনী ১৯১২ সালের আগে তাঁর 'আমার কথা' প্রকাশ করতে পারেননি। কিন্তু সম্ভাব্যতার গণ্ডি যে প্রসারিত হচ্ছিল, তার পেছনে উনিশ শতকের প্রথমার্ধের অনুপ্রেরণা অনস্বীকার্য।

বাংলা ১২৯৫ সালে 'বামাবোধিনী'তে জনৈক মহিলা লিখেছেন 'যাহাতে হিন্দু মহিলা হিন্দু থাকিয়া উচ্চ শিক্ষা করিতে পারেন এবং সেই বিদ্যার প্রভাবে নিজ নিজ সন্তান পালন ও গৃহকর্ম সম্পাদন করিতে পারেন এবং তৎসঙ্গে সামান্য সামান্য মতপ্রকাশ করিয়া পৃথিবীর অবস্থা বুঝিতে পারেন, সেই চেষ্টা করা হিন্দুর কর্তব্য।' উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উম্মেষশীল জাতীয়তাবোধ যখন হিন্দুত্বের রঙে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন স্ত্রী-শিক্ষা, স্ত্রী-স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব নারীর আদর্শকে কিছু নির্দিষ্ট আদলে বেধে দেবার চেষ্টা করে। 'হিন্দুমেলা'র সংগঠকরা একদিকে যখন 'দুর্দান্ত যবন আক্রমণ'কে হিন্দুর দুর্দশার কারণ হিসাবে বর্ণনা করে তার প্রাচীন ধর্মকে ধরে রাখার যুক্তি খুঁজেছেন সেই প্রেক্ষাপটেই, তখন যৌথ পরিবার ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি কারণ হিসাবে বলছেন, 'স্ত্রীলোকের কুপ্রবৃত্তি নিবারণের এমন মহৌষধ আর নাই।' প্রাচীন হিন্দু সমাজে নারীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার এক কাল্পনিক ছবি তৈরি করছেন তাঁরা, টড-এর 'অ্যানাল্স অব রাজস্থান' পড়ে 'বিদেশী' শত্রুর বিরুদ্ধে হিন্দু নারীর অস্ত্রধারণ বা জহরব্রতের বিবরণে খুঁজে পেয়েছেন নারীত্বের আদর্শ। এমনকি, মধুসূদনও প্রমীলাকে মেঘনাদের সঙ্গে সহমরণে পাঠিয়েছেন, যুক্তিবাদী ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের 'কঙ্কাবতী' স্বপ্নের মধ্যে 'সতী' হয়েছেন, 'সতী' হয়েছেন বঙ্কিমের 'মৃণালিনী'তে মনোরমা, তরুণ রবীন্দ্রনাথও প্রথম দিকে এর প্রভাব এড়াতে পারেননি। ব্রাহ্মসমাজে আশির দশকে মেয়েদের পর্দা থেকে মুক্ত করার যে আন্দোলন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়রা করছিলেন, তার মধ্যে যদিও এর একটা বিপরীত ছবি আছে, তবু কন্যার বিবাহ উপলক্ষে কেশবচন্দ্র সেনের রক্ষণশীল বনে যাওয়া ব্রাহ্ম প্রগতিবাদেও ভাঙন ধরিয়েছিল। বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রীদের মানবতাবাদের জায়গা নিয়ে নিচ্ছিল নীতিবাগীশরা। হিন্দুত্বের প্রসারিত প্রভাব থেকে ব্রাহ্মসমাজও মুক্তি পায়নি। 'ভারতমাতা' বা 'বঙ্গজননী'র আরাধ্য মূর্তির মধ্যে পুনরুত্থানবাদীদের নারীত্বের আদর্শই মিশে গিয়েছিল।

১৮৭৬-১৮৮৬'র মধ্যে প্রকাশিত কয়েকটি প্রবন্ধে প্রগতিশীল মুসলিম চিন্তাবিদ দেলাওয়ার হোসেন আহমদ শিক্ষিত বাঙালীদের মধ্যে যে-কোনো বর্বর দেশীয় প্রথার জন্য মুসলিম বিজেতাদের প্রভাবকে দায়ী করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, মুসলিমজাতির সামাজিক উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা ধর্মের সঙ্গে লোকাচার, আইন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে ফেলা। সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আইন ও সামাজিক প্রথার সময়োচিত সংস্কারের মধ্য দিয়ে, জ্ঞানবিজ্ঞানের দ্বারকে উন্মুক্ত করে, আর্বি ভাষার অধিকারকে রক্ষা করে মুসলিম সমাজ নিজেদের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। লক্ষণীয়, দেলাওয়ার হোসেনের মতো ইহবাদী, যুক্তিবাদী লেখকের ভাষাতেও হিন্দু মুসলিম শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে দূরত্ববোধ কীভাবে অভিব্যক্ত। ঐতিহাসিক কারণেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদের মধ্যে খুবই ক্ষুদ্র আকারের। ব্রিটিশ শাসনে যে সুবিধাগুলি হিন্দুদের কাছে কিছুটা সহজলভ্য হয়েছিল মুসলিমরা তার থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছেন। আর্বি-ফার্সির গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পাওয়া এই ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। রামমোহন যে-ভিত্তি থেকে 'তুহফাত-উল-মুওয়াহিদিন' লিখতে পেরেছিলেন তা ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়েছিল।

কেশবচন্দ্র সেন ইসলামের অধ্যয়নে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন, তাঁর কোনো কোনো শিষ্য আবি-ফার্সি শিখে মুসলিমসমাজের সঙ্গে আদান প্রদানের সেতু তৈরি করতে পেরেছিলেন, কিন্তু এগুলি নিতান্তই ব্যতিক্রমী ঘটনা। মীর মশাররফ হোসেন ১৮৭৩ সালে লিখেছিলেন 'জমিদার দর্পণ' নাটক, 'নীলদর্পণে'র মতোই গ্রামাঞ্চলে জমিদারদের প্রজাশোষণ ছিল তার বিষয়বস্তু। সাহিত্যে কৃষকসংগ্রামের উপাদান তিনি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এইসব প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে হিন্দু মুসলিম শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কোনো স্থায়ী যোগসূত্র গড়ে ওঠেনি। 'মেঘনাদবধ' রচনাকালে মধুসূদন একবার বলেছিলেন, রামায়ণের কাহিনীর চাইতে হাসান-হোসেন কাহিনী জাতীয় মহাকাব্যের অনেক বেশি উপযোগী, এবং কোনো প্রতিভাশালী মুসলিম কবি এই কাহিনী থেকে মহাকাব্য রচনা করে সমস্ত জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারেন। মীর মশাররফ হোসেন যখন ১৮৮৫-১১ সালে 'বিষাদসিন্ধু' লেখেন, তখন হিন্দু মুসলিম শিক্ষিতশ্রেণীর বিভাজন আরও স্পষ্ট; অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও বঙ্কিমচন্দ্র মশাররফ হোসেনের লেখার প্রশংসা করেছেন, কিন্তু সাহিত্যের মূল ধারার ওপর তার প্রভাব অল্পই।

এই সময়ে জাতীয়তাবোধ যে আদলে বিকশিত হচ্ছিল, তার সব চাইতে স্পষ্ট প্রতিফলন আমরা পাই বন্ধিমচন্দ্রের মধ্যে। তার সমস্ত স্ববিরোধের অংশীদার বঙ্কিম তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভার বলে এই জাতীয়তাবোধকে এক পূর্ণ ভাবগ্রাহ্য রূপ দিলেন। ১৮৬৫ সালে প্রথম উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী' নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর প্রবেশ। এই উপন্যাসে 'হুতোমি' এবং 'আলালি' গদ্যের সমকালীন বাস্তবতার ব্যঙ্গাত্মক চিত্রণের মধ্যে না গিয়ে তিনি অতীত ইতিহাসের কিছু উপাদান নিয়ে এক কাল্পনিক কাহিনী গঠন করেছেন। কোনো কোনো সমালোচক এইজন্য মনে করেছেন যে, এখানে বাস্তববাদ থেকে রোমান্সের দিকে পশ্চাদপসরণ ঘটেছে। ইউরোপে বুর্জোয়াশ্রেণীর উত্থানের সঙ্গে বাস্তববাদের যে বিকাশ ঘটেছিল, সত্যিই উনিশ শতকে বঙ্কিমের রচনা তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। এখানে পরিস্থিতিই সম্পূর্ণ আলাদা। ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পতিত এক দেশে জাতীয়তাবোধের উদ্বোধন ঘটছে এমন একটি বর্গের মধ্য দিয়ে, যাদের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর কোনোই নিয়ন্ত্রণ নেই, যারা ইংরেজী শিক্ষার মধ্য দিয়েই অধঃপতনের বোধ থেকে মুক্তিলাভ করার চেষ্টা করছে, স্বকীয়তার সন্ধান করছে। তাদের এই সন্ধানের একটা স্বাভাবিক সীমা আছে, তা লঙ্ঘন করে কেবল নিজেদের জোরে স্বাধীনতা-সংগ্রামকে বিকশিত করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তাও তারা স্বপ্ন দেখে স্বকীয়তার, গৌরবের, বীরধর্মের। বঙ্কিম তাদের এই স্বপ্নের অংশীদার, এর সীমাবদ্ধতা তাঁরও সীমাবদ্ধতা। প্রাচীন হিন্দুত্বের গর্ব, ব্রিটিশসাম্রাজ্যের অপ্রতিরোধ্য ও অগ্রগামী ভূমিকা সম্বন্ধে মোহ তাঁরও আছে, যদিও দেশীয় মানুষের পক্ষে এই পরিস্থিতি কত অপমানজনক, সে সম্বন্ধেও তিনি সচেতন। কিন্তু ঔপন্যাসিক হিসাবে তাঁর বাস্তববোধ এইখানে যে, এই পুনরুত্থানের স্বপ্নের বাস্তব স্ববিরোধ এবং সীমাবদ্ধতাও তাঁর উপন্যাসের গঠনের মধ্য দিয়েই ফলে ওঠে। যে 'জাতি'র কাহিনী তিনি বলছেন তা সৃষ্টি হয়েছে মধ্যবিত্তের ঐতিহাসিক প্রয়োজনবোধ থেকে, মধ্যবিত্ত মানস থেকে যে 'জাতি'র আদল পরিস্ফুট হচ্ছে তার মধ্যে কিন্তু উহ্য থেকে যায় ধর্ম ও জাতপাতের প্রশ্নে তার সংকীর্ণতা, নারীর ভূমিকা সম্বন্ধে তার সংস্কারাচ্ছন্নতা। মতাদর্শের স্তরে এগুলি উহ্য না থাকলে ঐ আদলটি গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র মতাদর্শের এই বাধ্যবাধকতাকে ছাড়িয়ে গেছেন। যা মতাদর্শের মধ্যে উহ্য ছিল তাঁর বাস্তব উপস্থাপনের মধ্যে তার শরীরী সংকেত তিনি রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

মার্কসবাদী সমালোচক লুকাচ্ যে অর্থে স্কট বা বালজাকের উপন্যাসকে ঐতিহাসিক বাস্তববাদের উদাহরণ বলে বর্ণনা করেছেন 'দুর্গেশনন্দিনী', 'আনন্দমঠ', 'মৃণালিনী' বা 'সীতারাম' সেই অর্থে ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে একাধিকবার বলেছেন: 'বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নাহলে বাঙ্গালী কখন মানুষ হইবে না।' প্রবন্ধে এই ইতিহাস পুনরুদ্ধার করার চেষ্টাও তিনি করেছেন, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখের ইতিহাস চর্চা ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে। 'কৃষ্ণ চরিত্রে' Weber Fergusson প্রমুখ ইউরোপীয় ইতিহাসবিদরা প্রাপ্ত তথ্যের যে ব্যাখ্যায় বাঙালি হিন্দু বা ভারতীয়দের হেয় প্রতিপন্ন করেছেন, তীর শ্লেষের তীরে সেই ব্যাখ্যাকে বিদ্ধ করেছেন। কিন্তু সব কিছু সত্ত্বেও স্কট বা বালজাকের বিশ্লেষণাত্মক গঠন নয়, বঙ্কিমের উদ্দেশ্য অতীতের উপাদান ব্যবহার করে কিছ নতুন 'মীথ' তৈরি করা। এ 'মীথ' ইংরেজি রোমান্সের নকল নয়, উনিশ শতকের শিক্ষিত বাঙালির অভীপ্সার মূর্তি। 'আনন্দমঠে'র সেই উক্তি এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়: 'হায়। আবার অসিবে কি মা। জীবানন্দের ন্যায় পুত্র, শান্তির ন্যায় কন্যা, আবার গর্ভে ধরিবে কি।' অথবা 'দেবী চৌধুরানী'তে 'এখন এসো, প্রফুল্ল। একবার এই সমাজের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলো দেখি, "আমি নূতন নহি, আমি পুরাতন। আমি সেই বাক্যমাত্রা, কতবার আসিয়াছি, তোমরা আমায় ভুলিয়া গিয়াছ। তাই আবার আসিলাম-

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামী যুগে যুগে।।

কিন্তু লেখক হিসাবে বঙ্কিমের মহত্ত্ব এইখানে যে মতাদর্শগত 'মীথ' তাঁর কাহিনীর গঠনকে গ্রাস করে নিতে পারেনি। 'মীথ'-এর সীমানা নির্দেশ করেছে কাহিনীর গঠনই। তাই বঙ্কিমচন্দ্রে ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসগুলির বেশিরভাগই এক ট্র্যাজিক মোহভঙ্গে শেষ হয়। এক 'রাজসিংহ' ছাড়া 'আনন্দমঠ', 'দেবীচৌধুরানী', 'মৃণালিনী', 'সীতারাম' সবই তাই। এক আদর্শ রাজ্য-তথা এক স্বাধীন হিন্দুরাজ্য স্থাপনের প্রয়াসে প্রত্যেকটি উপন্যাসেই রূঢ়ভাবে অর্ধপথে ছেদ টানা হয়। সৃষ্ট মীথকে বাস্তবতা ভেঙে দেয়। সত্যানন্দকে ইংরাজের শাসন মেনে নিতে হয়। দেবীচৌধুরানীকে মেরুদণ্ডহীন স্বামীর প্রথাবদ্ধ সংসারের কর্ত্রী হবার জন্য ফিরতে হয়। সীতারাম শ্রী-কে কখনো লাভ করতে পারে না।

আয়েষা, ওসমান, মবারক প্রভৃতি কতগুলি মহৎ মুসলিম চরিত্র বঙ্কিম সৃষ্টি করেছিলেন। 'রাজসিংহে'র মধ্যে লেখকের জবানিতে তিনি বলেওছেন যে "হিন্দু-মুসলমানের কোনো তারতম্য নির্দেশ করা' তাঁর উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জাতীয়তাবোধের মধ্যে ক্রমাগত যে হিন্দুত্বের রং লাগছিল, তার দ্বারা বঙ্কিম বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তাঁর উপন্যাসের শক্তিশালী ভাষা ও বিষয়টিকে সাকার করে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা এই মতাদর্শকে ছড়াতেও সাহায্য করেছে। পরবর্তীকালে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাও অনেক সময়েই একে হিন্দু লেখকদের একপেশেমির প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করেছে। 'বন্দেমাতরম্' গানটির রূপকাশ্রিত ভাষার মধ্যেও ইসলামবিরোধিতা খুজেছেন কেউ কেউ। এর মাঝখান থেকে কিন্তু 'লোকরহস্যে'র মধ্যে, 'বঙ্গদর্শনে'র নানা প্রবন্ধে, 'বঙ্গদেশের কৃষক' প্রভৃতি রচনাতে তাঁর স্থিতাবস্থার গভীর সমালোচনা, 'চিরস্থায়ী ব্যবস্থা' 'সম্বন্ধে তীর মন্তব্য এবং ব্রিটিশদের উন্নততর সভ্যতার দাবির ওপর নির্মম বিদ্রূপের কশাঘাত-এই সবই অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে তাঁর নতুন দিকনির্দেশ আমরা অনেক সময়ে খেয়াল করি না। এবং সংস্কৃতের গাম্ভীর্য এবং মাধুর্যের সঙ্গে কথ্য বাংলা ভাষার দক্ষ সংমিশ্রণে তিনি যে আধুনিক গদ্যকে সমৃদ্ধ করেন, তারও উপযুক্ত মূল্যায়ন আমরা করি না।

হিন্দুমেলার সময় থেকে দেশাত্মবোধক গানের একটি ধারা সৃষ্টি হয়। এর উদ্দীপনা অনেক পরিমাণে এসেছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে। কখনো কখনো এইসব গান নাটকের অংশ হিসাবেও গাওয়া হতো। ১৮৭৫ সালে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের 'কিঞ্চিৎ জলযোগ' প্রহসনের পরে 'গাও ভারতেরই জয়, গাও ভারতেরই জয়' গানটি গাওয়া হতো। 'পুরুবিক্রম' নাটকের আরম্ভে সমবেত কণ্ঠে শোনা যেত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মিলে সবে ভারত সন্তান'। এ-গান আদিতে হিন্দুমেলা উপলক্ষেই রচিত হয়েছিল। তরুণ রবীন্দ্রনাথও এই ধারায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর 'জীবনস্মৃতি'তে তিনি উল্লেখ করেছেন বৃদ্ধ রাজনারায়ণ বসু কিভাবে সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইতেন: 'এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন / এক কার্যে সপিয়াছি সহস্র জীবন'। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।

স্বাদেশিকতার প্রভাব চারুকলা বা চিত্রশিল্পের ওপরেও পড়েছিল। ১৮৭৫-৮০-র মধ্যে পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ রাজেন্দ্রলাল মিত্র লন্ডনের রয়াল সোসাইটি অব আর্টস্-এর একটি প্রকল্পে Antiquities of Orissa নামে দুই খণ্ডে একটি বই বার করেন। এর মধ্যে প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের নিদর্শন দিয়ে সেই গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতাকে পুনরাবিষ্কার করার চেষ্টা ছিল। প্রাচ্যবাদীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজেন্দ্রলাল একে আর্য সভ্যতার ধারার অন্তর্গত বলেই দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বাদেশিকতা তাঁকে উদ্বেলিত করেছিল পুরাতত্ত্ববিদ ফার্গুসনের সঙ্গে তর্কে অবতীর্ণ হতে, ফার্গুসনের বিরোধিতা করে তিনি বলেছিলেন যে, সম্রাট অশোকের আগে কোনো পাথরের সৌধের নিদর্শন পাওয়া না গেলেও তাতে এটা প্রমাণ হয় না, যে প্রস্তর-স্থাপত্য ভারতীয়রা গ্রীকদের কাছ থেকে শিখেছিল। প্রস্তর-স্থাপত্যের শুরু যে, অশোকের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল, তার তখনও পর্যন্ত প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকলেও রাজেন্দ্রলাল অনেক পরোক্ষ প্রমাণ জোগাড় করেছিলেন। প্রাচীন ভারতের ভাস্কর্য ও শিল্পকলার এইসব নিদর্শন বঙ্কিমকেও জুগিয়েছিল স্বাদেশিকতার প্রেরণা, 'সীতারাম' উপন্যাসে শ্রী ও জয়ন্তীর ললিতগিরি-দর্শনের বিবরণের মধ্যে লেখকের কণ্ঠ এই প্রাচীন গৌরবের কথায় উচ্ছ্বসিত হয়।

বটতলার কাঠ খোদাই আর কালীঘাটের পটচিত্র চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে আর শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মনোরঞ্জন করতে পারছিল না। ত্রিমাত্রিকতা এবং হুবহু বাস্তবের সন্ধানে তারা এই দেশীয় চিত্রকলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ইউরোপীয় চিত্র ও ভাস্কর্যের বাস্তবধর্মীতাই শুধু তারা চেয়েছিল তা নয়, এর মধ্যে ছিল হিন্দু সংস্কারাচ্ছন্নতা সম্পর্কে অনীহাও। কিন্তু শতাব্দীর শেষদিকে যখন দেশীয় বিষয় নিয়ে নতুন 'মীথ' তৈরির প্রয়োজন দেখা দিল, তখন সেই সমকালীন প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রথমে ক্যালকাটা আর্ট স্টুডিওর দেবদেবীর ছবি-সম্বলিত লিথোগ্রাফ ছাড়া কিছু ছিল না। পরে দক্ষিণ থেকে আসে রাজা রবিবর্মার 'পৌরাণিক' ছবি। নিম্নমানের লিথোগ্রাফগুলির পরে রবিবর্মার ছবিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সমালোচকরাও। লিথোগ্রাফের তুলনায় এই ছবিগুলি তাঁদের কাছে জীবন্ত এবং স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। এর মধ্যে তাঁরা 'জাতীয় শিল্পকলার' সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। পরের শতকের গোড়ায় গিয়ে হ্যাভেল, কুমারস্বামী, ওকাকুরা ও নিবেদিতার প্রভাবে অবশ্য শিল্পকলার ক্ষেত্রে দেশাত্মবোধ সম্পূর্ণ ভিন্ন রাস্তা নেয়।


প্রকাশের তারিখ: ০৬-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org