|
মার্কসবাদের আলোয় সংস্কৃতি (পর্ব ১)Chandan Mukhopadhyay |
মার্কস দেখিয়েছিলেন "সংস্কৃতির অমেয় শক্তিতেই মানুষ পশুর চেয়ে আলাদা"। মানুষের মধ্যে কিন্তু জান্তব পিছুটান রয়ে যায় যা আজকের ভোগবাদী সমাজে যেন প্রতিদিন প্রকট হয়ে সামনে আসছে। জান্তব প্রবৃত্তির লজ্জাহীন অভিব্যক্তি ইদানীং সভ্যতার সমার্থক হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের চেতনাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। |
‘‘শিল্পীকে কী ভাব তোমরা? নিছক জড়পদার্থ! ভাবো, যদি চিত্রকর হয় শুধু চোখ আছে? যদি গাইয়ে হয় শুধু কান কিংবা যদি কবি হয়, তাহলে মনের প্রতিটি স্তরে একটা বীণা? কিংবা ধরো, মুষ্টিযোদ্ধা হলে নেহাত কিছু পেশি? ঠিক একেবারে উল্টো। একজন শিল্পী সবসময় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব,হৃদয় বিদারক, উত্তেজক বা সুখপ্রদ ঘটনার প্রতি সে সজাগ,সমস্ত রকম ভাবে সে এদের ডাকে সাড়া দেয়। এটা কী করে সম্ভব যে অন্য কোনো মানুষ সম্পর্কে সে কোনো আগ্রহ বোধ করবে না? জীবনকে যে এত আন্তরিকতা দিয়ে তোমাদের সামনে তুলে ধরছে—কী করেই বা সে জীবন থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখবে? না, ঘর সাজানোর জন্যে ছবি আঁকা হয় না। শত্রুকে আক্রমণ করার জন্যে বা শত্রুর কবল থেকে আত্মরক্ষার জন্যে ছবি,আসলে যুদ্ধের হাতিয়ার।’ এই মহান উক্তি বিশ শতকের কিংবদন্তি শিল্পী পাবলো পিকাসোর । ১৯৩৭-এর ২৬ এপ্রিল জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নির্দেশে জার্মান বিমান বাহিনী স্পেনের ছোট্ট শহর গুয়ের্নিকার উপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে তাকে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছিল। আর, এর ঠিক ছদিন পরে পিকাসো তার বিশ্ববিখ্যাত মুরালের কাজ আরম্ভ করেন। বোমাবিধ্বস্ত গুয়ের্নিকার নামে ছবিটির নাম রাখেন তিনি। এই ছবি দুনিয়া তোলপাড় করে দিয়েছিল।বহুদিন এই ছবি ব্যান হয়েছিল। এতে প্রমাণিত হয়েছিল, মানুষের সপক্ষে ও অন্ধকারের অপশক্তির বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাই শিল্পীর প্রধানতম দায়িত্ব। এরপর একটার পর একটা আক্রমণে দেশে,বিদেশে বারবার মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। অথবা ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিশুদের পাঠশালা উজাড় হয়ে গেছে এবং আজও হচ্ছে শক্তি-দম্ভে উন্মাদ শাসকের আক্রমণে অথবা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্রে বা বোমায়। এর সাথে আমাদের দেশে বা এই রাজ্যে প্রতিদিনের আমাদের জীবন যখন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে, এরই সাথে শাসক শ্রেণী আর তার তাঁবেদার সরকার চারিদিকে এক ভয়ংকর অন্ধকার নামিয়ে আনছে, পিকাসোর উত্তরাধিকারীরা কোথায় তখন ? তবে কি আজ চৈতন্য পুরোপুরি অসাড় হয়ে গেছে আমাদের? নাকি অন্য কিছু? আজ সারা বিশ্ব থেকে আমাদের দেশ, সবটা মিলিয়ে এই প্রশ্ন প্রতিদিন আমাদের বিদ্ধ করছে। এখান থেকেই খুঁজতে শুরু করতে হবে। আর তাই ফিরে যেতে হবে সেই মৌলিক আদি প্রশ্নে: সংস্কৃতি কি?কি তার ভূমিকা? সাংস্কৃতিক আন্দোলন কি,কেন, কাদের জন্যে? এতে ভাবাদর্শের গুরুত্ব কোথায়? না, এ আদপেই তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়, অত্যন্ত জরুরি প্রায়োগিক বাস্তবের বিষয়। আজকাল প্রতিদিন বেশ কিছু কথা মনে কাঁটার মতো বিধছে। হয়তো এ চিরন্তন কাঁটা। যাঁরা গানে-নাচে-নাটকে ,সাহিত্যে অত্যন্ত জোরালো ভাবে প্রগতিশীল মর্মবস্তুর পোষকতা করেন, তাঁদেরই কেউ কেউ যখন মাঝে মাঝে বলেন, "রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা এল বা কারা গেল, তাতে আমাদের কী, আমরা তো গাইব, লিখব, নাটক করব, সাংস্কৃতিক দায়িত্ব আন্তরিকভাবে যদি পালন করি, রাজনীতির মারপ্যাচ নিয়ে মাথা ঘামাব কেন? কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতা যাদের দখলে গেছে, তাদের কাছাকাছি থাকলে আমাদের সাংস্কৃতিক কাজ-কর্মের ক্ষেত্রে যদি সুবিধা হয়, তাহলে ক্ষতি কি? সাময়িক ঝড় যদি উঠে থাকে সমাজে, তাহলে মুখ বুজে একটু না হয় আত্মরক্ষাই করলাম। অন্তত ঝড়ের মুখে কুটোর মতো ভেসে তো যাইনি।" তখন নতুন করে সবটা ভাবতেই হয়। তাই সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা আজকের শুধু নয়, প্রতিদিনের জরুরি আলোচনা হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় । আর এইজন্যেই আদি-প্রশ্নটির উত্তর একই সঙ্গে সরল ও জটিল। যদি ভাবি, সংস্কৃতি মানে নাচ-গান-ছবি- সাহিত্য-নাটক -সিনেমা কিংবা সমস্যাদীর্ণ পৃথিবী থেকে ছুটি নিয়ে বিনোদনের মুহূর্ত-যাপন, তাহলে একে বলব সরল উত্তর।আর যদি এটা এত সরল উত্তর হতো তাহলে যুগে যুগে প্রগতিশীল সংস্কৃতি আর শিল্পী,সহিত্যিকদের ওপর বারবার রাষ্ট্র আর শাসকদের এত আক্রমণ নামিয়ে আনা হয় কেন! ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, "none kicks a dead horse", মরা ঘোড়াকে কেউ লাথি মারে না। সংস্কৃতি বা সমাজের সুপারস্ট্রাকচার যদি একান্তই মরা ঘোড়া হতো, তাহলে সমাজ বা রাষ্ট্রশক্তির বিচলনের কোনো কারণই থাকতোনা। তাই এর উত্তর খুঁজতে হবে অনেক গভীর থেকে। নাহলে নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে পাব না, এক অন্ধকার ভুলভুলাইয়ায় ঢুকে পরবো। যা শাসক শ্রেণী চিরকাল চেয়ে এসেছে। 'কালচার' অর্থ বাংলায় 'কৃষ্টি' এবং 'সংস্কৃতি' দুটোই চালু আছে। অধ্যাপক সুনীতি চট্টোপাধায় "সংস্কৃতি"কে গ্রহণ করেন এবং রবীন্দ্রনাথ নিজেও 'কৃষ্টি' র পরিবর্তে সংস্কৃতি শব্দকে গ্রহণ করার পক্ষপাতী ছিলেন।কারণ 'কৃষ্টির' সাথে 'কৃষির' যোগ আছে, কিন্তু কালচার 'মনের চাষ' হলেও মাটি ছেড়ে ওপরে উঠতে চায়। তাই তিনি লেখেন,"কমল হীরের পাথরটা হলো শিক্ষা, আর তার থেকে যে দ্যুতিটা বেরোয় সেটাই কালচার।" সুনীতি চট্টোপাধ্যয় তাঁর "জাতি,সংস্কৃতি ও সাহিত্য" গ্রন্থে সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করেন,সংস্কৃতি অর্থ "সম্যক কৃতি"। অর্থাৎ আমাদের শিল্প,সাহিত্য, ধ্যানধারণা,কর্ম-নীতি, আচার-ব্যবহার, এক কথায় আমাদের সমগ্র জীবনচর্চাই সংস্কৃতি। এই আলোতে যদি পথ চল শুরু করি তাহলে স্পষ্ট দেখতে পারবো আমাদের সমগ্র রাস্তাটাকে, আমাদের অতীত থেকে ভবিষ্যৎ। এই প্রশ্নের উত্তর অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, সংস্কৃতি কি সমাজ,অর্থনীতি,রাজনীতি নিরপেক্ষ? মার্কস বলেছিলেন,"মানুষের চেতনা তার অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করেনা,তাদের সামাজিক অস্তিত্বই তাদের চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে"। সেই চেতনা আর সামাজিক অস্তিত্ব নিয়েই সব আলোচনা। আজকের চারপাশে যদি একবার তাকাই তাহলে এক ভয়ংকর সময় দেখতে পাবো। "পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সব কিছু করে তার মুনাফার স্বার্থে" এই সত্যকে সামনে রেখে যদি দেখি আজকের সংস্কৃতিকে, তাহলে দেখবো এক ভয়ংকর ভোগবাদী এবং সমাজবিমুখ সংস্কৃতিকে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে প্রচুর অর্থ লগ্নি হচ্ছে। মার্কস দেখিয়েছিলেন "সংস্কৃতির অমেয় শক্তিতেই মানুষ পশুর চেয়ে আলাদা"। মানুষের মধ্যে কিন্তু জান্তব পিছুটান রয়ে যায় যা আজকের ভোগবাদী সমাজে যেন প্রতিদিন প্রকট হয়ে সামনে আসছে। জান্তব প্রবৃত্তির লজ্জাহীন অভিব্যক্তি ইদানীং সভ্যতার সমার্থক হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের চেতনাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এটাই সবচেয়ে শঙ্কার কারণ। ব্যক্তি-সর্বস্বতার সাম্প্রতিক উৎকট পর্যায়ে অন্ধ প্রতিযোগিতা শুধু নিজেকে জাহির করার জন্যেই নয়, সঙ্গে আছে আরো কিছু লোভ। এর প্রকিষ্ঠ প্রমান পাওয়া যায় সমাজ মাধ্যমের দিকে তাকালে। শুধুই আত্মপ্রচার নয়, সহজে অর্থ রোজগারের প্রবল ইচ্ছা নিয়ে এক বিরাট অংশ পরিশ্রমহীন, সমাজ চিন্তাহীন,চটুল বিষয় নিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছে। যখন মানুষ প্রতিদিন দীন থেকে দীনতর হয়ে পড়ছে, শিক্ষা আজ দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন, শাসক শ্রেণী কর্মহীন যৌবনকে গভীর অন্ধ্করের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। আজকের সময়কে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় বললে," যার হাত আছে তার কাজ নেই,/যার কাজ আছে তার ভাত নেই, /আর যার ভাত আছে তার হাত নেই / তারুণ্য আর যৌবন একটা সমাজের মেরুদণ্ড। তাই তাকে যে ওদের সব থেকে ভ্য়। আজ তাই পুঁজির শাসনকে টিকিয়ে রাখতে তরুন-যুবসমাজ কে সমাজ বিমুখ করে অন্ধকার চোরা গলিতে ঢুকিয়ে দেবার সব রকম উপাচার সাজিয়ে আয়োজন করে চলেছে প্রতিদিন। দেশ বিদেশের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে শিক্ষা আর সংস্কৃতির ওপর দখল নিতে পারলে রাজত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করা যায়। যেমন ধরা যাক, বাবর-কে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বললেও ইতিহাসে লেখা থাকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আকবর। বাবর অস্ত্রের জোরে ভারতবর্ষ জয় করলেও কিন্তু এখানে বিদেশী বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বলে মানুষের মনে বিরূপতা ছিল। তাই বাবরের মৃত্যুর পরেই মুঘল সাম্রাজ্যের ভীত সাময়িকভাবে কেঁপে উঠেছিল শের শাহের্ উত্থানে। কিন্তু আকবর বাদশা একদিকে যেমন অস্ত্রের জোরে প্রতিপক্ষ রানা প্রতাপ, চাঁদ সুলতানা প্রমুখকে মোকাবিলা করেছিযেন, ঠিক তার সাথে আইন, ধর্ম, দর্শন সংস্কৃতির মতো বিষয়ে যে নতুন নতুন ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, ফলে তাঁর শাসন ব্যবস্থা যেমন মসৃন হয়েছিল, পাশাপাশি সবার মন জয় করতে পেরেছিলেন। এমনকি হিন্দুদের কাছেও " দিল্লীশ্বরবা জগদীশ্বরবা " আখ্যা লাভ করেছিলেন। প্রকাশের তারিখ: ২৫-মে-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|