|
ভগৎ সিং ও নওজয়ান ভারত সভার প্রতিষ্ঠা: স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সন্ধিক্ষণRabikar Gupta |
‘রঞ্জিত’ আর ‘সুজাতা’ ছদ্মনামে দু’জনে (সঙ্গে ভগবতীর পুত্রও ছিল) স্বামী-স্ত্রীর ছদ্মবেশে কলকাতায় এসে পৌঁছলেন। কলকাতাতেও একটি লম্বা সময় ‘হরি’ ছদ্মনামে থাকলেন ভগৎ সিং। দেখা করলেন বহু বাঙালি বিপ্লবীদের সঙ্গে। এই সময় তিনি সম্পূর্ণ বাঙালি পোশাক পরতেন - একটা ধুতি আর শাল। |
১৯৩১ সালের ২৩-শে মার্চ লাহোর সেন্ট্রাল জেলের ১৪ নং কারাকক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালেন জেল ওয়ার্ডেন চরৎ সিং। পকেট থেকে চাবির গোছা বের করে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় চোখ সরু করে বেছে নিলেন একটা চাবি। দরজার ওপারে শুকনো ঘাস বেছানো। তাতে শিকল পড়ে বসেছিলেন এক ২৩ বছর বয়সী তরুণ। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির শরীর অর্ধাহারে, অনাহারে, অত্যাচারে শীর্ণ। কিন্তু চোখদুটি উজ্জ্বল। চরৎ স্নেহ করেন এই তরুণকে। দ্বারকা দাস লাইব্রেরি থেকে জেলে নিয়িমিত বই পাচার করা হয় তরুণের জন্য। ওয়ার্ডেন সবই জানেন, দেখেও দেখেন না। বই পড়তে পারে বটে ছেলেটি। কার্ল লাইবনিখটের ‘মিলিটারিজম্’, লেনিনের ‘লেফট-উইং কমিউনিজম্’, বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘হোয়াই ম্যান ফাইট’ থেকে আপটন সিন্ক্লেয়ারের ‘স্পাই’ – কী পড়েনা ছেলেটা ! কিন্তু চরৎ সিং ছেলেটিকে যতই স্নেহ করুন, যতই তার বিদ্যাবুদ্ধিকে শ্রদ্ধা করুন – আজ ওপরমহল থেকে যে নির্মম নির্দেশ এসেছে তা পালন করতে তিনি বাধ্য। বন্দিকে চরৎ জানালেন, সময় হয়ে এসেছে, এখন শেষ ইচ্ছা জানানোর পালা। চরতের সঙ্গেই ছিলেন বন্দির উকিল, প্রাণ নাথ মেহতা। যুবক উঠে উষ্ণ হাসি হেসে প্রশ্ন করল যে বইটা সে চেয়েছিল, মেহতা নিয়ে এসেছে কিনা। মেহতা বইটি হাতে দিতেই পাতা উল্টে পড়তে শুরু করল সে। ‘দ্য রেভোলিউশানারি লেনিন’ নামক বইটি পড়তে পড়তেই মেহতার প্রশ্নের উত্তরে যুবক জানালো দেশের উদ্দেশ্যে তাঁর শুধু দুটো কথাই বলার রয়েছে – ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক!’ আর ‘ইনকিলাব্ জিন্দাবাদ!’। কিন্তু শেষ ইচ্ছাটা? আদৌ তোমার শেষ ইচ্ছা কিছু আছে? এইবার বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে তাকালো যুবক, ‘হ্যাঁ, আমি আবার এই দেশের মাটিতেই জন্ম নিতে চাই, এই দেশের সেবা করার জন্য’। পরিশেষে দুই ব্যক্তিকে ধন্যবাদ দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিল সে মেহতাকে, পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু আর সুভাষচন্দ্র বসু। এই পুরো ঘটনাতে তাঁরা যে সমর্থন দিয়েছেন তার জন্য যেন মেহতা তাদের ধন্যবাদ দেয়। মেহতা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবার জেলের লোকজন এসে উপস্থিত হল। ফাঁসির আদেশ কার্যকর হওয়ার কথা পরের দিন সকাল ৬-টায়। কিন্তু আবার ওপরমহল থেকে নির্দেশ এসেছে। আজ সন্ধ্যা ৭-টাতেই ফাঁসি কার্যকর করা হবে। কিছুটা হতাশা আর বিরক্তি নিয়ে বইটা মুড়ে উঠে দাঁড়ালো যুবক। তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু কর্মমুখর জীবনে ইতি পড়তে চলেছে, তা নিয়ে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কিন্তু বইটা রেখে চলে যেতে হচ্ছে এতে সে অতিশয় বিরক্ত। সেই বিরক্তিভরা কন্ঠেই সে তাকে নিতে আসা জেলের গার্ডদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনারা আমাকে একটা অধ্যায়ও শেষ করতে দিলেন না?’। তারপরেই বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে, হাসিমুখেই পা বাড়িয়েছিলেন ফাঁসির মঞ্চের দিকে। এই যুবক, ভগৎ সিং ও তাঁর দুই সহযোদ্ধা রাজগুরু ও সুখদেব হাতে হাত মিলিয়ে সেইদিন ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন। তাঁদের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল প্রিয় গান – ‘কভি ওহ্ দিন আয়েগা
কে জব আজাদ হাম হোঙ্গে
ইয়েহ্ আপনি হি জমিন হোগি
ইয়েহ আপনা আসমান হোগা
শহীদোকে কি চিতায়োঁ পার
লাগেঙ্গে হার বার মেলে
ওয়াতান পার মরনে ওয়ালো কা
ইয়েহি নাম-ও-নিশান হোগা।’
ভগৎ সিং-এর জন্ম ১৯০৭ সালের ২৮-শে সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের লায়লপুর জেলার বাঙ্গা গ্রামে। কিষাণ সিং সান্ধু আর বিদ্যাবতির চার ছেলে তিন মেয়ের সংসারে ভগৎ ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। যে গান একদা গাইতে গাইতে তিনি ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, সেই গানে মুখরিত থাকত তাঁর গৃহ। সর্দার কিষাণ সিং এবং তাঁর দুই ভাই ছিলেন গদর পার্টির সদস্য। গদর পার্টির বিপ্লবীরা তখন ছড়িয়ে রয়েছেন বার্লিন, মস্কো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ভারতে বিপ্লবের আগুন জ্বালতে বিশ্ব জুড়ে চলছে তাঁদের কঠোর তপস্যা। দেশকে মুক্ত করতে হবে ব্রিটিশ শৃঙ্খল থেকে, এই তাঁদের পণ। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দেশ স্বাধীন হবে, জন্ম নেবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক নতুন ভারত – এই ছিল তাঁদের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন ও সাধনার শরিক ছিল ভগৎ সিং-এর বাবা, জেঠা ও কাকা। তিনি যে দিন জন্মগ্রহণ করেন, সেই দিনই জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন তাঁর পিতা কিষাণ সিং ও জেঠা স্বরণ সিংহ। তাঁর কাকা অজিত সিং-ও খুব দ্রুত মুক্তি পাবেন, এমনই শোনা যাচ্ছিল। এই আনন্দের পরিবেশেই ছেলের নাম রাখা হয় ‘ভগৎ’ যে ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদ বহন করে এনেছে। বাবার প্রভাব ভগৎ সিং-এর ওপর গভীর ভাবে পড়েছিল। কিন্তু তাঁর ছেলেবেলার নায়ক ছিলেন কাকা অজিত সিং। দুরন্ত এই বিপ্লবীর ইরান, তুরস্ক, অস্ট্রিয়া আর জার্মানির মত দেশ ঘোরা ছিল। তাঁর নামে ব্রিটিশ পুলিশের ২২-টি কেস থাকা সত্ত্বেও অজিতের নাগাল তারা পায়নি। বিপ্লবী দেশপ্রেমের আদর্শে বেড়ে ওঠা ভগৎ পড়াশোনা করেন প্রথমে বাঙ্গার ডিস্ট্রিক্ট প্রাইমারি স্কুলে তারপরে লাহোরের দয়ানন্দ আর্য বিদ্যালয়ে। ১৯২৩ সালে ভর্তি হন লাহোরের ন্যাশনাল কলেজে। জাতীয়তাবাদী আদর্শে শিক্ষা প্রদানের জন্য এই কলেজ বিখ্যাত ছিল। ছাত্র হিসেবে ভগৎ সিং ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বিশেষ করে ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়তে তাঁর জুড়ি ছিল না। মাথায় পাক ক্ষেত মাৎসিনি, গ্যারিবল্ডি আর রুশ বিপ্লব। কলেজের ড্রামা সোসাইটির সদস্য ছিলেন ভগৎ সিং। উর্দু, হিন্দি, গুরুমুখী, ইংরেজি, সংস্কৃত – সব ভাষাতেই অত্যন্ত দক্ষ ভগৎ বইয়ের বিষয়ে বাছবিচার করতেন না। খুব গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক বই যেমন পড়তেন, তার সঙ্গেই আবার পড়ে ফেলতেন নানা প্রকার গল্প-উপন্যাসও। ইতিমধ্যে কিষাণ সিং ছেলের বিয়ে দেবেন বলেন স্থির করলেন। ভগতের ভাবগতিক তাঁর ভালো ঠেকছিল না। তিনি নিজে যেহেতু একদা এই পথে হেঁটেছিলেন, লক্ষণগুলো চিনতেন। ছেলেও ঐপথে হাঁটুক, তারপর কাকার মত সারা জীবনের মত দেশের বাইরে অথবা কারাগারে বন্দি হয়ে বাকি জীবন কাটাক – এমন তিনি চাননি। কিন্তু বাঘের বাচ্চা বাঘই হয়। তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঘাস খাওয়ানো যায় না। বাবার পরিকল্পনা কানে যেতেই বিদ্রোহ করলেন ভগৎ। বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে পালিয়ে গিয়ে উঠলেন কানপুরে। বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘প্রতাপ’-এর সম্পাদক গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী সস্নেহে আশ্রয় দিলেন ভগৎ সিং-কে। এইখানেই প্রথম আলাপ হল সেই সব যুবকদের সঙ্গে যারা পরবর্তীকালে হবেন তাঁর সহকর্মী ও সহযোদ্ধা। এঁদের মধ্যে ছিলেন বটুকেশ্বর দত্ত, বি. কে. দত্ত। ছিলেন ভবিষ্যৎ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক অজয় ঘোষ ও আরেক প্রখ্যাত ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট নেতা শিব ভার্মা। এঁদের সূত্র ধরেই ভগৎ নাম লেখালেন শচীন্দ্রনাথ সান্যাল প্রতিষ্ঠিত হিন্দুস্থান রিপাব্লিকান অ্যাসোসিয়েশন নামক বিপ্লবী সংগঠনে। শচীন্দ্রনাথ আহ্বান করেছিলেন যুবকদের ভারতকে মুক্ত করতে, যে মুক্তি নিছক রাজনৈতিক মুক্তি নয়, একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও অর্থনৈতিক। আহ্বান করেছিলেন এমন এক বিপ্লবের জন্য জীবন সমর্পণ করতে যার পরিসর নিছক জাতীয় নয়, বৈশ্বিক। হিন্দুস্থান রিপাব্লিকান অ্যাসোসিয়েশনের ম্যানিফেস্টো থেকে উদ্ধৃত করে বলতে হলে, ‘The revolutionary party is not national but international in the sense that its ultimate object is to bring harmony in the world by respecting and guaranteeing the diverse interests of the different nations. It…follows the footsteps of great Indian Rishis of the glorious past and of Bolshevik Russia in the modern age.’। এই আহ্বানে সাড়া দিলেন ভগৎ সিং। গুরুর আদেশ শিরোধার্য যুক্তপ্রদেশের গ্রামে গ্রামে গড়ে তুলতে লাগলেন সংগঠন। তবে আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রশ্নে ক্রমে তাঁর মনে নানা সংশয়ের উদয় হল। সেই প্রসঙ্গ ‘কেন আমি নাস্তিক’-এ রয়েছে, আলাদা ভাবে এখানে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। ভগৎ সিং বরাবরই মনে করেছিলেন বিপ্লবীদের লক্ষ্য সঠিক হলেও পদ্ধতিতে বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। গুপ্ত সমিতি ধাঁচের কাজকর্ম বিপ্লবীদের বারেবারে জন বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। তাই একটি গুপ্ত পার্টির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন রয়েছে প্রকাশ্য সংগঠনেরও। এই ভাবনা থেকেই ১৯২৬ সালে জন্ম নিল ‘নওজওয়ান ভারত সভা’। ইতিমধ্যে ক্রমে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনও ক্রমশঃ শক্তি সঞ্চয় করছে। সরাসরি কমিউনিস্ট রাজনীতি দমনপীড়নের মুখে পড়বে, একথা উপলব্ধি করে প্রদেশে প্রদেশে গড়ে তোলা হচ্ছে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজ্যান্টস্ পার্টি। পাঞ্জাবে কমিউনিস্ট নেতা সোহন সিং জোশ এই কমিউনিস্টদের ফ্রন্ট কীর্তি-কিষাণ পার্টির দায়িত্বে ছিলেন। এই সময় তাঁর সঙ্গে ভগৎ সিংয়ের গভীর সখ্যতা তৈরি হয়। পার্টির পত্রিকা ‘কীর্তি’-তে নিয়মিত ছদ্মনামে লিখতেন ভগৎ। অন্যদিকে এই সময় নওজওয়ান ভারত সভার সদস্যদের একটি বড় অংশই ছিল কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ভগৎ সিং-এর শাহাদত বরণের পর হোশিয়ারপুর জেলা কোর্টে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের জন্য নওজওয়ান ভারত সভার যে তরুণ সদস্য কোর্টে নাম জিজ্ঞেস করায় জবাব দিয়েছিল ‘লন্ডন তোড় সিং’, তাঁর আসল নাম ছিল হরকিষণ সিং সুরজিত। এইরকম সদস্য সুরজিত একা ছিলেন না। ভগৎ তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এই সভার তলায় পাঞ্জাবের ধর্ম নির্বিশেষে বাম মনস্ক যুবকদের একটি বড় অংশকে একত্রিত করেছিলেন। এই সদস্যরা জাত-পাত ও ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে এক নয়া ভারত গড়ার সংকল্প নিয়েছিলেন। তাঁরা সেই আমলে একসঙ্গে হালাল আর ঝটকা মাংস আহার করতেন একত্রে বসে, যা আজকের যুগেও অকল্পনীয়। ইতিমধ্যে ১৯২৭ সালে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার পর হিন্দুস্থান রিপাব্লিকান অ্যাসোসিয়েশন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। শচীন্দ্রনাথ কারাবন্দী হন। রামপ্রসাম বিসমিল, আসফাকুল্লাহ্ খানের মতো বিপ্লবী নেতাদের ফাঁসি হয়। ভগৎ সিং-কেও এই সময় পুলিশ ধরে, যদিও ভালো আচরণের জন্য বেইলে তিনি ছাড়া পেয়ে যান। পরে পুলিশ প্রমাণ জোগাড় করতে না পারায় সেই বেইলের টাকাও দিতে হয়নি। ছত্রভঙ্গ এই দলকে পরের প্রজন্মের সহায়তায় আবার গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন তিনি। দলের দায়িত্বে এগিয়ে আসেন চন্দ্রশেখর আজাদ, সুখদেব, বটুকেশ্বর দত্ত প্রমুখ। ভগৎ ও তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কাকোরির ধাক্কা সামলে এইচ. আর. এ. ঘুরে দাঁড়ায়। ভগৎ সিং-এর প্রচেষ্টায় দলের নামের সঙ্গে ‘সোশ্যালিস্ট’ কথাটি যুক্ত করা হয়, যাতে তার আদর্শিক অভিমুখ নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে। ইতিমধ্যে ভারতে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন লালা লাজপত রায়। ভগৎ সিং কংগ্রেসের গান্ধীবাদী রাজনীতি এবং লালা লাজপত রায়ের রাজনৈতিক অভিমুখ উভয়ের সঙ্গেই দ্বি-মত পোষণ করতেন। কিন্তু এই আন্দোলনে অন্ততঃ দলের প্রকাশ্য অংশের যুক্ত থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দিলেন। পার্টির প্রকাশ্য অংশ ঝাঁপিয়ে পড়ল সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে। এই আন্দোলনেই পুলিশ কর্তা জে. সি. স্কটের লাঠির আঘাতে মৃত্যু হল লালা লাজপত রায়ের। ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোগীরা প্রতিজ্ঞা করলেন এর বদলা নেওয়ার। কিন্তু ভুল তথ্য থাকায় স্কট প্রাণে বেঁচে গেলেন। তাঁর পরিবর্তে বিপ্লবীদের হাতে নিহত হলে জে. পি. সন্ডার্স। লাহোরে পোস্টার পড়ল, ব্যক্তির মৃত্যু দুঃখজনক, কিন্তু যে ব্যবস্থার প্রতীক সন্ডার্স, লালা লাজপত রায়ের মতো নেতাকে মাটিতে ফেলে লাঠিপেটা করে মারার পর তার ওপর এই আঘাত অবধারিতই ছিল। ছদ্মবেশে ফেল্টের টুপি আর ওভারকোট গায়ে চড়িয়ে সাহেবের বেশে পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে লাহোর ত্যাগ করলেন ভগৎ সিং। গন্তব্য কলকাতা, যেখানে রয়েছেন ভগবতী চরণ বোহরা। ভগতের সঙ্গেই ছিলেন ভগবতী চরণের স্ত্রী, বিপ্লবীদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার দুর্গাদেবী, যিনি প্রথম স্কটকে হত্যার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। ‘রঞ্জিত’ আর ‘সুজাতা’ ছদ্মনামে দু’জনে (সঙ্গে ভগবতীর পুত্রও ছিল) স্বামী-স্ত্রীর ছদ্মবেশে কলকাতায় এসে পৌঁছলেন। কলকাতাতেও একটি লম্বা সময় ‘হরি’ ছদ্মনামে থাকলেন ভগৎ সিং। দেখা করলেন বহু বাঙালি বিপ্লবীদের সঙ্গে। এই সময় তিনি সম্পূর্ণ বাঙালি পোশাক পরতেন - একটা ধুতি আর শাল। কিন্তু বেশিদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা ভগৎ সিং-য়ের স্বভাব বিরুদ্ধ। তাঁর ক্রমশঃ এই ধারণা হচ্ছিল, এমন কিছু করতে হবে যার মধ্যে দিয়ে গোটা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল, এমনই তার ভাবনা ছিল। এই ভাবনা থেকেই পরিকল্পনা করা হয় ১৯২৯ সালে দিল্লিতে ভারতীয় আইনসভায় শিল্প বিরোধ আইন এবং নাগরিক সুরক্ষা আইন নামক দুই কালা কানুন যখন উপস্থাপন করা হবে, যখন গোটা দেশের নজর আইনসভার দিকে থাকবে, তখন সেখানে বোমা নিক্ষেপ করা হবে। এই বোমা নিক্ষেপের উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা হবে না। এর উদ্দেশ্য হবে, বধির কে শোনানো। এই পরিকল্পনা অনুসারেই ১৯২৯ সালের ৯-ই এপ্রিল ধোঁয়ার বোম বিস্ফোরিত হয় আইনসভায়। কক্ষ ভরে যায় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে আর লিফলেটের বৃষ্টিতে। পরের দিন সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, ‘Reds Bomb Indian Legislature’। এরপরের ঘটনা, কোর্টকে ব্যবহার করে ভগৎ সিং-য়ের নিজের আদর্শ প্রচার, জেলে রাজনৈতিক বন্দির অধিকার আদায়ে বীরত্বপূর্ণ অনশন (ও তাতে যতীন দাশের মৃত্যু), ভগৎ সিং-য়ের পক্ষে উথলে ওঠা জনসমর্থন, তাঁর জীবন নিয়ে গান্ধী-আরউইন দড়ি টানাটানি ইত্যাদি বিষয় বহুল চর্চিত। এই প্রবন্ধের পরিসরে তার বিস্তারিত আলোচনার আপাতত সুযোগ নেই। তাঁর জীবনের সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে শুধু এইটুকুই বলা যায় ভগৎ সিং তাঁর মা বিদ্যাবতিকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘Ma, I have no doubt that my country will one day be free. But I am afraid that the brown sahibs are going to sit in the chair the white sahibs will vacate.’। ভগৎ সিং-এর কাছে স্বাধীনতার অর্থ নিছক রাজনৈতিক ছিল না। তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল আর্থ-সামাজিক মুক্তিও। মূলগত, কাঠামোগত পরিবর্তন চেয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন একটি সাম্যর আদর্শে বলীয়ান ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ। সেই সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়াই তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা অর্পণ হবে। প্রকাশের তারিখ: ২৮-সেপ্টেম্বর-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|