|
মানুষের উপরেই ভরসা রাখার পথনির্দেশPradosh Kumar Bagchi |
জীবনযাপনের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে সবার আগে তিনি জোর দিয়েছিলেন এমন এক দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নকৌশলের ওপর যার পরিধির মধ্যে থাকবে সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাবার শর্তাদি। |
| মানবমুক্তির মহান ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকাশে যাঁরা মহত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন, জ্যোতি বসু ছিলেন তাঁদের অন্যতম। গণসংগ্রামের ময়দানে মানুষকে কাছে টেনে তিনি গড়েছিলেন এক নতুন ইতিহাস। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল বিলাতের মাটিতে। তার আগে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে না জড়ালেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের খোঁজ খবর রাখতেন। পরে উচ্চশিক্ষার্থে বিলাত গেলে আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে সংযোগ, কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে পরিচয় ও এবং লন্ডনে আগত ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ পথরেখা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর। ঐ সময় থেকেই তিনি দেশের স্বাধীনতা নিয়ে খুবই ভাবিত ছিলেন এবং একথাও অনুভব করেছিলেন যে কেবল স্বাধীনতা পেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না, তার পরেও লড়াই করে যেতে হবে মানুষের আর্থিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। নতুবা জনগণের মনে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত দেশের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার উপর আঘাত হানতে পারে। লন্ডনে থাকাকালীনই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ব্যারিস্টারি পরীক্ষা শেষে দেশে ফিরে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে দেখা করে কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হন। সেই থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রথমে ঔপনিবেশিক ভারতে পরে স্বাধীনোত্তর পর্বে, একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠনের লক্ষে তিনি কাজ করে গেছেন। জ্যোতি বসুর জন্ম ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই। এবার তাঁর ১১৩তম জন্মদিবস। যা পালিত হচ্ছে এমন একটা সময়ে যখন বাংলার রাজনীতিতে অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থান ঘটেছে। তৃণমূলী শাসনের দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচতে মানুষ বিজেপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল অনেক আশা নিয়ে, সেই বিজেপিই আজ রাজ্যে বুলডোজার সংস্কৃতি কায়েম করে গণতন্ত্রের নামে মানুষের মন থেকে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ভাবনার গোড়া উপড়ে ফেলতে চাইছে। আরএসএসের বহুদিনের এই অধরা স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে মমতা ব্যানার্জি সাহায্য করেছিলেন রাজ্যে বিজেপিকে ডেকে এনে। জ্যোতি বসুর চোখে এটাই ছিল মমতা ব্যানার্জির সবচেয়ে বড় অপরাধ। এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে আমাদের সেই বামফ্রন্ট সরকারের দিকেই ফিরে তাকাতে হবে, দীর্ঘ সময় যার নেতৃত্বে ছিলেন জ্যোতি বসু। দেশ গঠনের জন্য যখন রাষ্ট্রীয় স্তরে বিকল্প পথের অন্বেষণ চলছিল তখন পশ্চিমবঙ্গে সীমিত সাংবিধানিক ক্ষমতা এবং কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন সরকারগুলির অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নের কর্মসূচী রূপায়নে মানুষের অংশগ্রহণকে বামফ্রন্ট সরকার সুনিশ্চিত করেছিল। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের নতুন ভিত্তি রচনা করতে গিয়ে একেবারে গোড়াতেই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির অভিমুখ স্পষ্ট করে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, এই সরকার মহাকরণ থেকে নয়, কাজ করবে সাধারণের মধ্যে গিয়ে। তার অর্থ এই ছিল না যে অর্থহীনভাবে মহাকরণের সমস্ত অফিসার ও মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের টাকায় প্রমোদ ভ্রমণে বেরোতে হবে। বরং তিনি সেই সময় থেকেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থার কার্যকরী রূপদানের কথা ভেবেছেন। আর তার ফলস্বরূপ ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও সেই সময়ে কায়েমী শক্তি ঐ নির্বাচনকে বানচাল করতে চেয়েছিল। কিন্তু সফল হয়নি। বরং ‘বাস্তুঘুঘুর বাসা ভাঙো’ এই বৈপ্লবিক স্লোগানে উদ্দীপ্ত মানুষ বিপুলভাবে বামফ্রণ্টকে নির্বাচিত করেছিলেন। সেবার তিনটি স্তরে সর্বমোট ৫৫, ৯৫২ জন প্রতিনিধি গ্রামের মানুষের রায়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এত ব্যাপক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা শুধু এরাজ্যে নয়, সমগ্র দেশেও প্রথম। তার কয়েকদিনের মধ্যেই পঞ্চায়েতের শক্তি যে কতটা কার্যকরী হয়ে উঠতে পারে তা বোঝা গিয়েছিল ১৯৭৮ সালের বিধ্বংসী বন্যায়। নবগঠিত পঞ্চায়েতের সহায়তা ছাড়া শুধুমাত্র প্রশাসন দিয়ে যা মোকাবিলা করা যেতো না। বামফ্রণ্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বেশিরভাগ পৌরসভায় প্রশাসক বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সেই পৌরসভাগুলিকেও জনগণের দরবারে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সুশৃঙ্খলভাবে পঞ্চায়েত ও পৌরসভায় নির্বাচন হতে থাকায় একদিকে যেমন গণউদ্যোগ ও স্থায়ী সম্পদের সৃষ্টি হলো, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেলো এবং সেই সূত্রে সৃষ্ট নতুন সামাজিক ভিত্তি শিল্পের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উৎসাহ জোগাল। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ফলে তাদেরও রাজনৈতিক সুযোগ প্রসারিত হলো। তদুপরি বামফ্রন্ট সরকারের ব্যাপক ভূমিসংস্কারের লক্ষ ছিল বন্টনের ন্যায্যতা ও বর্ধিত উৎপাদনশীলতার মধ্যে সমন্বয় সাধন। সে কাজেও বিশেষ করে উদ্বৃত্ত জমি উদ্ধার ও বন্টনে নতুন নজির তৈরি করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ-আন্দোলনই গ্রামাঞ্চলের জনজীবনকে নতুন উচ্চতায় তুলে ধরেছিল। বঞ্চিত মানুষ পেয়েছিল কাজ, পেয়েছিল মর্যাদা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা, বহুদিনের চেষ্টায় পঞ্চায়েত ও পৌরসভার সক্রিয়তা স্বায়ত্বশাসনের যে বনিয়াদ তৈরি করেছিল, আজ তা দুর্নীতির চোরাবালিতে নিমজ্জিত। জাতপাত ও ধর্মের নামে ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করতে টাকার থলি নিয়ে ঘোরা, পেশিশক্তির অপব্যবহার সহ অপরাধ জগৎ ও ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে যুক্ত করার মতো উপাদানগুলি জ্যোতি বসু যাকে বলতেন ‘সামাজিক-রাজনৈতিক কদাচার’— তা আজ শুধু এরাজ্যে নয়, সমগ্র দেশেই তার বিস্তার। কিছুদিন আগেও কোনও সমস্যা গ্রামস্তরে বা ওয়ার্ডস্তরে গণতান্ত্রিক উপায়ে আলোচনা করে সমাধানের পরিবর্তে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করে সমাধান করে নিতে বলা হচ্ছিল। বামফ্রন্ট সরকার স্বায়ত্বশাসনের মাধ্যমে জনগণের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ায় গ্রাম শহরে বিকেন্দ্রীকরণের যে ছন্দ তৈরি হয়েছিল তাকে ধ্বংস করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এ ছিল এক ন্যক্কারজনক প্রয়াস। এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে মানুষের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা শুরু হয়েছে নতুন করে। উগ্র সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও নয়া ফ্যাসিবাদের বাস্তব বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে এখন এই রাজ্য তথা দেশের মানুষ। ১৯৪০-এর দশকে পরাধীন ভারতের এক বিশেষ ক্ষণে বিদেশ থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে এসে কমিউনিস্ট পার্টিতে নাম লিখিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। নিজের আখের না গুছিয়ে সমগ্র জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন মানুষের স্বার্থে। কমিউনিস্ট পার্টি তখন বেআইনি। সেই পরিস্তিতিতে একটা নিশ্চিত সুখী জীবনের রাস্তা ছেড়ে অনিশ্চিত, অচেনা, কঠিন সংগ্রামের পথ যখন বেছে নিচ্ছেন জ্যোতি বসু, তখন এদেশে মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের নামই শোনেনি অনেকে। আর যারা শুনেছিলেন তাঁদের অধিকাংশই আবার ঐ সব নামে আঁতকে উঠতেন। ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখন সময়ের অপেক্ষা। এই প্রেক্ষাপটে দেশ স্বাধীন হলে রাষ্ট্রের চরিত্র কি হবে সেই মূল প্রশ্নটা, যা লন্ডনে থাকাকালীনও জ্যোতি বসুদের খুবই ভাবিয়েছিল, ঐ সময়ে তা আরও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে ও পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কংগ্রেস স্বাধীনতার পর দেশের বৈচিত্রকে রক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সামনে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ রূপে তুলে ধরার অঙ্গীকার করেছিল। কমিউনিস্টরা তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ না করলেও ব্যক্তির রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপান্তরিত করার দাবিকে সামনে এনে গোড়া থেকেই তারা দেশকে সমাজতান্ত্রিক পথে অগ্রসর করার প্রস্তাব করেছিল। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও মুসলিম লিগ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে ক্ষমতায় আসতে চাইল। সেই সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রক্ষাপটে জ্যোতি বসুরা খুবই সচেষ্ট ছিলেন সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে একজোট করে এদেশের বৈচিত্রময় প্রগতিশীল ঐতিহ্যগুলি, যা অসংখ্য রক্ষণশীল কাঠামো ও প্রথার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের দান, সেগুলিকে অক্ষুন্ন রাখতে। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে উত্থিত বিতর্কের অবসানের আগেই অভাবনীয় দ্রুততার সঙ্গে ভারত ভাগ হয়ে গেল। কমিউনিস্টরা দেশভাগের বিরোধিতা করলেও তা প্রতিহত করার শক্তি তাদের ছিল না। দেশভাগের পর ধর্মের ভিত্তিতে একটি অংশ হলো পাকিস্তান। আর অবশিষ্ট ভারত, স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য থেকে অর্জিত আধুনিক ধারণার ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে প্রয়াসী হলেও ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করা গেল না বলে হিন্দুত্ববাদীরা হতাশায় ভেঙে পড়েছিল। যার বহিঃপ্রকাশ তারা ঘটাল গান্ধীজীকে হত্যা করে। এই প্রেক্ষাপটে জ্যোতি বসু বহু আগেই জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন সংঘ পরিবারের এই অপকর্মমূলক উদ্ভট মানসিকতা থেকে ‘উদ্ভূত হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাটি আমাদের সমাজের গণতান্ত্রিক কাঠামোটিকেই গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। এ বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক থাকতেই হবে।’ ১৯৪৬ সালে সীমাবদ্ধ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে আইনসভার নির্বাচনে রেলওয়ে নির্বাচন কেন্দ্র থেকে হুমায়ুন কবীরকে হারিয়ে আইনসভার সদস্য হয়েছিলেন জ্যোতি বসু। সেই থেকে সংসদীয় ও সংসদ বহির্ভূত রাজনীতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝেছিলেন যে আর্থিক বৈষম্য, সামাজিক বিভেদ, ধর্মীয় হানাহানি দূর করতে সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের যেমন ভূমিকা থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, তেমনি জনগণের আশা-আকাঙ্খাগুলির বাস্তব রূপায়নে গণআন্দোলনগুলিরও বিশেষ ভূমিকা আছে। বিরোধী দলনেতা হিসাবে তাঁর দক্ষতা ছিল অসামান্য। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কোনও বাসনা ও ব্যস্ততা তাঁর ছিল না। পরে ক্ষমতায় এসে বিরোধী দলনেতা হিসাবে অর্জিত বিপুল অভিজ্ঞতাই তাঁকে গণআন্দোলনে পুলিশ না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রাণিত করেছিল। অন্যদিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপেরও তিনি বিরোধী ছিলেন। এর ফলে এরাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলন পেয়েছিল পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ। বামফ্রন্ট সরকারের পরিচালনায় দেশের মডেল হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েতের গৌরবময় অর্জনগুলির পিছনেও কাজ করেছে দীর্ঘ ইতিহাস। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে বহু গণসংগ্রামের পরিণতি হিসাবেই তার উত্থান। যার প্রধান মুখ ছিলেন জ্যোতি বসুই। তখন থেকে বামপন্থী শক্তিগুলিকে নিশ্চিহ্ন করতে যে চক্রান্ত ও আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল তা ব্যর্থ করেই এগিয়েছিলেন বামপন্থীরা। জ্যোতি বসু নিজেই একাধিকবার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচেছিলেন, জেল খেটেছিলেন, আন্ডারগ্রাউণ্ডে থেকেছিলেন, ছদ্মনাম নিয়েছিলেন, কিন্তু কোনও অবস্থাতেই গণআন্দোলন থেকে, মানুষের পাশ থেকে সরে আসেননি। ১৯৪৬ সাল থেকে আইনসভায় ধারাবাহিকভাবে শ্রমজীবী ও কৃষকদের সমস্যার সমাধানের উপর তিনি জোর দিয়েছিলেন, আবার আইনসভার বাইরে বিভিন্ন মঞ্চে শ্রমিক ও কৃষকদের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন মূল বক্তা। স্বাধীনতার আগে ও পরে তেভাগা আন্দোলন, রেল শ্রমিকদের লড়াই, চা বাগান শ্রমিকদের লড়াই, উদ্বাস্ত আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, খেতমজুর আন্দোলনের কথা রাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে নিয়ে আসারও অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন তিনিই। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯— দুবারের যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন, সেই সূত্রে ব্যাপক জমির লড়াই, তারই পটভূমিতে ১৯৭৭ সালে বামফ্রণ্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা ও তাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ভূমি সংস্কার ও জমির পুনর্বণ্টন— সব মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্বে সংগ্রামী মানুষের যৌথ প্রয়াস কার্যত পরিণত হয়ে গিয়েছিল সংগ্রামী রূপকথায়। বর্গাদারদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুবাদে এই রাজ্যের কৃষি ফলন দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে উঠে আসে। একই সঙ্গে ঐ সময়কালেই তাৎপর্যপূর্ণভাবে একটি কার্যকরী কেন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে অঙ্গ-রাজ্যগুলির অধিকার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি সামনে আনেন। যে কথা ধাপে ধাপে শ্রীনগর থেকে কলকাতা সম্মেলন হয়ে শেষপর্যন্ত ধ্বনিত হয়েছিল তাঁরই কণ্ঠে, ঐতিহাসিক বিগেড ময়দানের উত্তাল সমাবেশে। জীবনযাপনের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে সবার আগে তিনি জোর দিয়েছিলেন এমন এক দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নকৌশলের ওপর যার পরিধির মধ্যে থাকবে সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাবার শর্তাদি। তিনি বলেছিলেন যে সমাজবাদ এখন একটু অসুবিধার মধ্যে থাকলেও ধনতন্ত্র মানবসভ্যতার শেষ কথা হতে পারে না। তবুও উপযুক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা যায়। মানবসম্পদ রক্ষা ও তার ব্যবহারের পাশাপাশি তিনি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের দেশ ভারতের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার উপরে খুবই জোর দিয়েছিলেন। এদেশে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল তাঁরই কণ্ঠে। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর তিনিই বিজেপিকে অসভ্য বর্বর দল বলে অভিহিত করেছিলেন একাধিকবার। তাঁর কথায় ‘যে ধর্মে মসজিদ ভাঙা যায়, যে ধর্মের নামে রায়ট করা যায়, হাজার হাজার মানুষ খুন করা যায়, সেই দলকে আমরা যদি একেবারে আলাদা, কোণঠাসা না করতে পারি তাহলে ভারতবর্ষের বাঁচবার কোনও পথ নেই। ভারতবর্ষ টুকরো হয়ে যাবে।’ ভারতের নিজস্বতার বেদীমূলে প্রতিষ্ঠিত একটি বহুজাতিক, বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্মীয় ও বহু সংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজের ঐক্যকে রক্ষা করাই আজকের দিনের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ। তবে সুনির্দিষ্ট নীতির উপর দাঁড়িয়ে জোটবদ্ধভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিই যে দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করতে পারে এই বিশ্বাস তাঁর বরাবরই ছিল। তাঁর মতো দূরদর্শী মানুষের প্রত্যক্ষ সহায়তা আমরা এখন পাবনা ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার, সবসময়ে মানুষের উপর আস্থা রাখার ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শই আমাদের পাথেয়। আমরা যেন মনে রাখতে পারি, তিনি যা প্রায়ই উল্লেখ করতেন— মানুষই গড়ে তোলে ইতিহাস। কিন্তু সবসময় সেই ইতিহাস তার মন মতো হয়তো হয় না, সেটি নির্ভর করে অতীতের শিক্ষা ও বাস্তব পরিস্থিতির মোকাবিলার উপর। এটা ঠিকই যে মানুষ কখনও কখনও ভুলও করেন। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়ই অবশ্যম্ভাবী। প্রকাশের তারিখ: ০৮-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|