‘বুদবুদ-অর্থনীতি’ এবং নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদ

Prabhat Patnaik
উৎপাদন ব্যবস্থা হিসাবে পুঁজিবাদের অযৌক্তিকতা এবং তার বিপরীতে সমাজতন্ত্রের প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রবর্তনের বদলে অন্য কোনও উদাহরণের প্রয়োজন নেই।

নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদ স্বাভাবিকভাবেই স্থবিরতার প্রবণতায় ভোগে। এর কারণ দুটি- প্রথমত, এটি ক্রমাগত আয়ের বৈষম্যকে বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দেয়; কারণ দরিদ্ররা নিজেদের আয়ের একটি বড় অংশই খরচ করে ফেলে, অথচ ধনীরা তাদের আয়ের বেশিরভাগ অংশই ‘সঞ্চয়’ করে (অর্থাৎ খরচ করে না), ফলে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা এবং সামগ্রিক চাহিদা উৎপাদনযোগ্য পণ্যের বৃদ্ধির তুলনায় কমে যায়। এর ফলে বেকারত্ব এবং অব্যবহৃত উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনীতিকে নিম্নগামী করে তোলে।

ক্রমাগত আয় বৈষম্য বৃদ্ধির এমন প্রবণতা তৈরি হয় কারণ, পুঁজি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে বিশ্বের শ্রমবাজারকে তৃতীয় বিশ্বের বিপুল শ্রমশক্তি-যোগানের নেতিবাচক ফলাফলের শিকার হতে হয় এবং শ্রমশক্তির এই বিপুল যোগান সরিয়ে নেওয়া সত্ত্বেও তার আপেক্ষিক আয়তন কমে না। একদিকে উৎপাদক ও কৃষকদের উপর থেকে রাষ্ট্রের সহায়তা তুলে নেওয়া হয়, দুর্দশায় ঠেলে দিয়ে তাদের শহরে চাকরির খোঁজে পাঠায়। অন্যদিকে শ্রমশক্তির উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির হার, যা ‘বাণিজ্যিক উদারীকরণ’-এর কারণে নতুন প্রযুক্তি-প্রক্রিয়া গ্রহণের মাধ্যমে ঘটে তার সুবাদে নতুন চাকরির সংখ্যাও কমিয়ে দেয়। ফলে বিশ্বের বাজারে বাস্তব মজুরি শ্রম উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় কমে যায়, প্রতিটি দেশে এবং বিশ্বের সমগ্র উৎপাদনে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের অংশ বৃদ্ধি পায়। আয় বৈষম্যের এমন বৃদ্ধি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য, এটিই ঐ স্থবিরতার মূল কারণ যা নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

এমন স্থবিরতার বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বিতীয় কারণ মোট চাহিদা ও উৎপাদনযোগ্য পণ্যের মধ্যে ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অক্ষমতা। বিশ শতকের বিখ্যাত পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস রাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপেরই প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের তরফে কার্যকরী হস্তক্ষেপের অর্থই হল বড় আকারের রাষ্ট্রীয় ব্যয়বরাদ্দ- যা হয় রাজস্ব ঘাটতি দিয়ে নাহলে ধনীদের উপর কর চাপিয়ে আদায় হবে। কিন্তু তেমটা না করে বিকল্প হিসাবে যদি প্রথমে শ্রমজীবী মানুষের উপর কর চাপিয়ে পরে সেই অর্থ খরচ করানোর পদ্ধতি গৃহীত হয় তাতে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ে না। কারণ তারা নিজেদের আয়ের পুরোটা খরচই করে ফেলেন। রাজস্ব আদায় থেকে ব্যয়বরাদ্দের মাধ্যমে চাহিদার সংকট মোকাবিলা করার এহেন সরকারী হস্তক্ষেপের দ্বিবিধ কৌশলের কোনটিই বিশ্বায়িত লগ্নী পুঁজি পছন্দ করে না, তাই কেইনসিয়ান পদ্ধতিও কাজে আসে না। ফলে অতি উৎপাদনের উপর নির্ভর করে থাকা নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চাহিদা কম থাকার কারনজনিত স্থবিরতার সমস্যাটি বিনা প্রতিরোধেই প্রকট হয়।

এমন অবস্থাতেই ‘বুদবুদ’ (bubble)-এর উৎপত্তি হয়। কোনও সম্পদ বা সম্পদের দাবির সম্পর্কে বাজারে চলতে থাকা জল্পনামূলক বিশ্লেষণ সেই সম্পদের দামকে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেয়। এতে সংশ্লিষ্ট খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ-সহ সহজ অর্থসংস্থান এবং সম্পদের দাবিদারদের জন্য অতিরিক্ত ভোগের সুযোগ তৈরি করে কারণ যারা নিজেদের অতিরিক্ত ধনী বলে মনে করে, তারাই বেশি খরচ করে। যদিও এমন সব সম্পদের একটি বড়ো অংশ সত্যিই কাল্পনিক। ফলে সম্পদের মূল্য সম্পর্কিত বুদবুদটি মূলত অর্থনৈতিক ঘটনা হলেও বাস্তবিক অর্থনীতির উপর তার প্রভাব পড়ে। এ ধরণের বুদবুদ গজিয়ে ওঠার ঘটনাগুলি নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উদ্ভুত স্থবিরতার বিরুদ্ধে সাময়িক প্রতিরোধের ভূমিকা পালন করে।

এমন বুদবুদ কিন্তু স্থবিরতাকে অস্বীকার করে না কিংবা তার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরী কোনও বিকল্প বৃদ্ধির ধারাকেও গড়ে তোলে না। ঐ বুদবুদ কেবল মাঝে-মধ্যে দেখা দেয় এবং বৃদ্ধির প্রবণতার চারপাশে সাময়িক ঢেউ তুলেই মিলিয়ে যায়। এহেন উত্থানের সময় বাস্তব অর্থনীতিতে কিছু উন্নতি ঘটলেও ঐ বুদবুদ ফেটে পড়লে আর্থিক সংকটের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতি পুনরায় বিপর্যস্ত হয়। সাধারণত নতুন ‘প্রযুক্তিতে নির্মিত পণ্য’ বাজারে আসার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট বুদবুদ তৈরির কারণও যুক্ত থাকে। সাধারণভাবে নতুন কোনও পণ্য বা প্রক্রিয়ার আকারে নতুন প্রযুক্তির প্রবর্তনের সাথে সংশ্লিষ্ট বুদবুদের সংযুক্তি থাকে। নতুন কোনও প্রযুক্তির সুবাদে সৃষ্ট উচ্ছ্বাস নিজেকেই একটি বুদবুদে রূপান্তরিত করে যা পরে এক অনুমানমূলক ঘটনায় রূপান্তরিত হয়। তখন নতুন প্রযুক্তি কী আনবে তা আর মূল বিষয় থাকে না, বরং অন্যান্য ‘ফাটকাবাজ’-দের আচরণ সম্পর্কে অনুমানই হয়ে দাঁড়ায় আসল কথা।

প্রযুক্তিকে ঢেউয়ে প্রবর্তিত হওয়ার প্রসঙ্গে অস্ট্রো-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ জোসেফ সামপেটার’র দৃষ্টিভঙ্গি সঠিকই ছিল, কিন্তু ‘সামগ্রিক চাহিদা’র ঘাটতি ও অতি-উৎপাদনের প্রবণতার গুরুত্বকে তিনি যেমন উপলব্ধি করতে পারেননি; কিভাবে তা প্রযুক্তি-ঢেউয়ের আকার ও প্রকৃতি নির্ধারণ করে তাও বোঝেননি। ফলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন অর্থনীতি সবসময় পূর্ণ-কর্মসংস্থানের স্তরে থাকবে অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তির সুবাদে ওঠা ঢেউ কেবল দামই বদলায়, কর্মসংস্থান নয়। তাই অমন ঢেউ শেষ হলে, সংশ্লিষ্ট ঝড়ের অবস্থা শান্ত হয়ে গেলেই শ্রমিকরা নিজদের শ্রমশক্তির জনিত উৎপাদনক্ষমতার বাড়তি সুফল উচ্চতর মজুরির মাধ্যমে পাবেন এমনটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল। হায়, এমন মনোরম ধারণা সম্মত অর্থনীতির বাস্তব চিত্রটি কিন্তু স্থায়ী হয় না! এর তাৎপর্য আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি।

অর্থনৈতিক স্থবিরতার এহেন সাময়িক বিরতির উদাহরণ নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ইতিমধ্যে দু’বার দেখা গেছে। দুটিই ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে- ১৯৯০-র ‘ডট-কম বাবল’ এবং তারপরেই ‘রিয়াল-এস্টেট বুদবুদ’। একের পর আরেকটি বুদবুদ তৈরি হওয়ায় এমন দ্রুতগতির পিছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যানের ইচ্ছাকৃত কৌশলও কিছুটা দায়ী ছিল। রিয়াল-এস্টেট বুদবুদ-র পতনের পর, বিশ্ব-অর্থনীতি এক দীর্ঘকালব্যাপী স্থবিরতায় ডুবে যায়, যার প্রথম পর্যায়টি পতনের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় আরও বেশি করে দুর্বল হয়। অতিমারী জনিত মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠার পর ২১-২২ সাল নাগাদ আর্থিক বৃদ্ধির হার বিগত তিন দশক (৮২-৯১, ৯২-২০০১, ২০০২-২০১১) থেকেও কম হয়, অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দশকগুলোর তুলনায়ও কম।

বর্তমানে ‘কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা’ (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) নিয়ে বহুজনের যেমনটি ধারণা, তাতে এমন ভাবা হচ্ছে যেন এর সুবাদে শুধু আজকের স্থবিরতাকেই কাটিয়ে ওঠা যাবে এমন না বরং সেই সুফল হবে দীর্ঘমেয়াদী। এ ধারণা সম্পূর্ণই ভুল। আর্থিকভাবে এআই-এর বুদবুদ আকারে অনেক বড়ো হলেও বাস্তব অর্থনীতিতে তার প্রভাব নগণ্যই। এখানে দুটি কথা মনে রাখতে হবে। প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক ও বাস্তব অর্থনীতিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রভাব ইতিবাচক হলেও আপেক্ষিকভাবে নগণ্য। ইউএস ব্যুরো অফ লেবর স্ট্যাটিসটিক্স (U.S. Bureau of Labour Statistics)-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-এর জুলাই মাসে সে দেশে যুব-বেকারত্বের হার ছিল ১০.৮%, যা শুধু বেশি নয় বরং আগের বছরের জুলাই মাসের তুলনায় (তখন ছিল ৯.৮%) বেড়েছে। অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জনিত বুদবুদ-এর কার্যকারণ বাস্তব অর্থনীতিকে এতদূর বাড়ায়নি যে তার জোরে যুবসমাজে বেকারত্বের বার্ষিক হারকে কমিয়ে দেওয়া যায়, এর উল্টোটাই ঘটেছে।

দ্বিতীয়ত এই বুদবুদ ফেটে পড়লে তিনটি কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। এক, ঐ বুদবুদ ভাঙার অভিঘাত বা সাধারণ প্রযুক্তির ঢেউ থাকা স্বত্বেও সংশ্লিষ্ট ‘ভাটার পরিস্থিতি’ যা চাকরির ক্ষেত্রে চক্রাকার প্রভাব দেখায় সেটি ক্রমশঃই ক্ষীয়মাণ। দুই, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিজেই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে (‘অর্থনৈতিক চক্রের মন্দা’র অবস্থা নেই যখন) কর্মসংস্থান কমায়। তিন, কর্মচারীদের কম আয়ের প্রভাবে সামগ্রিক চাহিদা ও সামগ্রিক কার্যকলাপে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, একেই অর্থনীতিবিদরা ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’ বলেন। প্রথমটির প্রকোপ কমলেও, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরিস্থিতি সেই অবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নিট ফলাফল হবে স্থায়ী বেকারত্ববৃদ্ধি, যা নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আর্থিক স্থবিরতার প্রবণতাকে আরও বাড়াবে।

উৎপাদন ব্যবস্থা হিসাবে পুঁজিবাদের অযৌক্তিকতা এবং তার বিপরীতে সমাজতন্ত্রের প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রবর্তনের বদলে অন্য কোনও উদাহরণের প্রয়োজন নেই। এ এক এমন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যা প্রকৃত মজুরিতে কোনও হ্রাস না করেই সকলের জন্য অবসরের সময় বৃদ্ধির উপায় হিসাবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হবে। এর ফলে মানুষের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান কমবে যেমন ঠিক, কিন্তু প্রকৃত মজুরি এবং সামগ্রিক চাহিদা হ্রাসের মাধ্যমে ঐ পরিস্থিতির ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’র (কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত মজুরি) দুটি দিকের প্রতিই আরও বেশি জোর দেওয়া হবে।

মূল প্রবন্ধটি পিপল্‌স ডেমোক্র্যাসি পত্রিকার ২০ - ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত

বাংলা অনুবাদঃ সৌভিক ঘোষ, অঞ্জন মুখোপাধ্যায়


প্রকাশের তারিখ: ২৮-অক্টোবর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org