"এই ধরনের ঘটনা আটকানোর সক্ষমতা আদালতের নেই" - দিল্লির হিংসা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির বক্তব্য

Author
ওয়েবডেস্ক



প্রকাশ: ০৩-মার্চ-২০২০

নয়াদিল্লি, ২ মার্চ— অসহায়তার কথা জানাল শীর্ষ আদালত। দিল্লির দাঙ্গা নিয়ে হিংসায় ক্ষতিগ্রস্তদের তরফ থেকে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বললেন, ঘটনা ঘটে যাওয়া আমরা আটকাতে পারি না। যে চাপ আসছে, তা সামলানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। 

দিল্লির দাঙ্গার পিছনে বিজেপি নেতাদের ঘৃণা ছড়ানো ভাষণ প্ররোচনার কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। তা নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে এফআইআর করার আবেদন জানিয়েছিলেন সমাজকর্মীরা। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে দিল্লি হাইকোর্ট দিল্লি পুলিশকে এফআইআর দায়েরের পরামর্শও দিয়েছিল। কিন্তু যেদিন এই নির্দেশ হয় সেদিনই মাঝরাতে বদলি হয়ে যান বিচারপতি। পরের দিন রায় বদলে যায়। কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি পুলিশকে চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয় আবেদনকারীদের বক্তব্যের উত্তর দিতে। এবার সুপ্রিম কোর্টে হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ জনের তরফ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে এই এফআইআর এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের। হিংসা যাতে আর না ছড়ায় সেই লক্ষ্যে আদালতের দ্রুত হস্তক্ষেপের আবেদনও জানানো হয়। 

সেইমতোই প্রধান বিচারপতি এসএ বোবদের নেতৃত্বে বেঞ্চের সামনে এদিন জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন করেন আইনজীবীরা। পরিস্থিতির গুরুত্ব তাঁরা তুলে ধরলেও প্রধান বিচারপতি বলেন, এখনই আমরা কী করতে পারি? এই চাপ সামলানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বরিষ্ঠ আইনজীবী কলিন গঞ্জালভেস আবেদনকারীদের তরফ থেকে বলেন, আপনারা অনেক কিছু করতে পারেন। বিচারপতি বোবদে বলেন, ‘আমরা বলছি না যে মানুষ মারা যান। কিন্তু ঘটনা ঘটা আটকানো আমাদের সাধ্যের মধ্যে পড়ে না। আগে থেকেই প্রতিষেধকের কোনও ব্যবস্থা আমরা করতে পারি না। ঘটনা ঘটার পরে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে পারি। যে চাপ আমাদের ওপরে আসছে আমরা তা দেখছি। যেন আদালতই দায়ী। আমরা সংবাদপত্র পড়ছি, কী ধরনের মন্তব্য করা হচ্ছে তা দেখছি। ঘটনা ঘটার পরে আদালত অবতীর্ণ হয়, এই ধরনের ঘটনা আটকানোর সক্ষমতা আদালতের নেই।’ 

আইনজীবী গঞ্জালভেস বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি যাতে না হয় তা আদালত দেখতে পারে। এর উত্তরে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা চাই শান্তি ফিরুক কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে’। 

দিল্লি হাইকোর্টে মামলা চলছে বলে বেঞ্চের তরফ থেকে বলা হলে গঞ্জালভেস বলেন, হাইকোর্ট ছ’সপ্তাহ শুনানি পিছিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা হতাশাজনক। এখনও মানুষ মারা যাচ্ছেন, হাইকোর্ট কেন জরুরি ভিত্তিতে শুনবে না? সুপ্রিম কোর্ট যাতে মঙ্গলবার এই আবেদনের শুনানি শোনে, তার আবেদন জানাতে থাকেন গঞ্জালভেস। অবশেষে শীর্ষ আদালত বুধবার শুনানিতে রাজি হয়েছে। ‘দেখি আমরা কী করতে পারি’, এই মন্তব্য করেছেন বিচারপতিরা। 

শুধু এফআইআর নয়, এদিনের পিটিশনে আবেদন জানানো হয়েছিল দাঙ্গার তদন্তে দিল্লি পুলিশের বাইরের অফিসারদের দিয়ে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হোক, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনা মোতায়েন করা হোক, দাঙ্গায় পুলিশকর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক, সমস্ত ক্ষতিগ্রস্তদের উদাহরণযোগ্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পুলিশ ও আধা সেনাদের হাতে আটক ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হোক, দাঙ্গা-আক্রান্ত এলাকায় সিসিটিভি’র ফুটেজ সুরক্ষিত রাখা হোক, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অবিলম্বে প্রকাশ করা হোক। সেইমতো কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে শীর্ষ আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। 

কপিল মিশ্র, অনুরাগ ঠাকুর, পরবেশ ভার্মার মতো বিজেপি নেতাদের প্ররোচনামূলক ভাষণে শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে, অভিযোগ করে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন জানানো হয়েছিল। বিচারপতি এস মুরলীধর এবং তলবন্ত সিং দিল্লি পুলিশের ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন কেন এতদিন এফআইআর দায়ের করা হয়নি। আদালতে ভাষণের ভিডিও ক্লিপ শোনানো হয়। দ্রুত ব্যবস্থা নেবার নির্দেশও দেয় হাইকোর্ট। সেদিনই মাঝরাতে বদলি হয়ে যান বিচারপতি মুরলীধর। পরের দিন বেঞ্চ বদলে যায়। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিএন প্যাটেল এবং সি হরিশঙ্করের বেঞ্চে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, এফআইআর দায়ের মতো ‘সহায়ক’ পরিস্থিতি নেই। কার্যত সেই যুক্তি মেনে নিয়ে চার সপ্তাহ শুনানি স্থগিত রাখা হয়। 

সুপ্রিম কোর্টে আবেদনকারীরা হাইকোর্টের এই কালক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, জীবন-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জরুরি পরিস্থিতি বুঝতে হাইকোর্ট বিলম্ব করেছে। এই কারণেই সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন তাঁরা। 

এদিন সুপ্রিম কোর্টের ‘অসহায়তা’ প্রকাশে আইনজীবী মহলেও বিস্ময় তৈরি হয়েছে। দিল্লির দাঙ্গায় ইতিমধ্যেই ৪৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়। উপরন্তু এই দাঙ্গায় পুলিশের ভূমিকা গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই দাঙ্গাকারীদের সাহায্য করেছে বলে অভিযোগ উঠছে। নিষ্ক্রিয় থেকে দাঙ্গাকারীদের মদত দিয়েছে। জখম ব্যক্তিকে রাস্তায় ফেলে মার এবং জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বাধ্য করে নিজেরাই ছবি তুলছে পুলিশ, এমন ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। শাসক দলের নেতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা দাঙ্গার আগে ‘গোলি মারো’ স্লোগান তুলেছেন, কার্যত আক্রমণের হুঙ্কার দিয়েছেন। এর পরেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত যদি পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলার নির্দেশ না দেয়, তাহলে আর কোথায় বিচার পাওয়া যাবে— এদিন এমন প্রশ্নই তুলেছেন অনেক আইনজীবী। 

সাম্প্রতিক সময়ে বারংবারই অভিযোগ উঠেছে, বিচার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। সরকারের পক্ষে  অস্বস্তিকর হতে পারে, এমন মামলার শুনানি পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ অযোধ্যা মামলায় পরপর ৪০ দিন শুনানি হয়েছে। কাশ্মীরে ৩৭০ নং ধারা সংক্রান্ত মামলা বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠাতে রাজি হয়নি আদালত। সুপ্রিম কোর্টের কর্মরত বিচারপতির মুখে শোনা গেছে প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা। দিল্লির ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও সর্বোচ্চ আদালতের ‘অসহায়তা’ প্রকাশ তাই প্রশ্ন জাগিয়েছে। 

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 03-Mar-20 12:20 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/we-cannot-stop-things-from-happening-says-chief-justice-of-india-cji-sharad-a-bobde
Categories: Current Affairs
Tags: delhi violence, modi govt 2.0, supreme court
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড