এ সময়ের দাবি: কিছু জরুরী প্রসঙ্গ
গত ২৭শে আগস্ট থেকে এই ৫০% শুল্কনীতি লাগু হওয়ার পর থেকে এই সকল শিল্পক্ষেত্র গুরুতর সঙ্কটের আশঙ্কায় দিন গুনছে। শ্রমনিবিড় এই সব শিল্পে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান, ওদের পরিভাষায় ‘সরসঙ্ঘচালক’ মোহন ভাগবত এই গত কয়েক দিনের মধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে তাদের স্বয়ংসেবকরা যদি কাশী এবং মথুরায় হিন্দুদের ধর্মীয় জমি মুসলমানদের থেকে ‘পুনর্দখল’ করতে চায়, তিনি বা তাঁরা তাতে বাধা দেবেন না। সোজা কথায় সঙ্ঘের গুন্ডাবাহিনীকে গায়ের জোরে বর্তমানে মুসলমানদের ধর্মস্থান দখল করতে বলা হচ্ছে, যেই স্থানগুলো হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে যে ঐতিহাসিকভাবে হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাসের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এই ‘বিশ্বাসের’ কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কি নেই, তা ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা আর ২০১৯ সালের সুপ্রীম কোর্টের রায়ে সেই গায়ের জোরে দখলীকৃত স্থানে ‘হিন্দু পার্টি’ (আসলে হিন্দুত্ববাদী শাসক দল)-র অধিকার ঘোষণা করার পরে আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। ইতিহাস যা ইচ্ছে বলুক, হিন্দুত্ববাদীদের ‘বিশ্বাস’টাই বড় কথা। কাজেই অধুনা মথুরা অঞ্চলে শ্রীকৃষ্ণ নামের পৌরাণিক চরিত্রটি জন্মেছিলেন কিনা অথবা সত্যিই কোনদিন শঙ্করাচার্য কাশী নামের বর্তমান শহরটি স্থাপন করেছিলেন কিনা শুধুমাত্র হিন্দুদের ধর্মস্থান হিসাবে, এসব এখন গৌণ বিষয়। সঙ্ঘ যে এই মতলব বহুদিন ধরেই করে চলেছে, এ নতুন কিছুনা। ‘অযোধ্যা তো ঝাঁকি হ্যায়, কাশী মথুরা বাকি হ্যায়’ এই স্লোগান সঙ্ঘ বহুকাল ধরেই দিয়ে চলেছে এবং তাদের রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টির ও এটি ঘোষিত অবস্থান। কিন্তু ঠিক যে সময়টা মোহন ভাগবত বেছে নিয়েছেন এই ঘোষণার জন্য, সেটি বেশ ইন্টারেস্টিং!
বিশ্বজোড়া মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্য ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে। তাই টারিফ-ওয়ারের নামে একতরফা অর্থনৈতিক যুদ্ধে নামতে হয়েছে ওদের গোটা প্রশাসন কে। এই হিংস্র আক্রমণের মুখে ভারত ও রয়েছে। বিগত প্রায় আড়াই দশক ধরে ভারত সরকারের মার্কিন ভজনা সত্ত্বেও বিরাট শুল্ক বসানো হয়েছে ভারত থেকে ওদের দেশে রপ্তানী করা হয় এমন বহু পণ্যের ওপর। আমাদের দেশের বস্ত্রশিল্প, চর্মশিল্প, মীন চিংড়ি, গয়না শিল্পের বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৭শে আগস্ট থেকে এই ৫০% শুল্কনীতি লাগু হওয়ার পর থেকে এই সকল শিল্পক্ষেত্র গুরুতর সঙ্কটের আশঙ্কায় দিন গুনছে। শ্রমনিবিড় এই সব শিল্পে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এই শুল্কনীতির ফলে আমাদের দেশের জিডিপি বৃদ্ধি অন্ততঃ ১%এর খানিক বেশি পরিমাণেই নেমে যাবে, এমন পূর্বাভাষ পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের তরফে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এইসব শিল্পক্ষেত্র কে নির্দিষ্টভাবে কী সাহায্য করা হবে তা নিয়ে কোন বক্তব্য এখনো শোনা যায়নি অর্থমন্ত্রীর মুখে, এমনিই কিছু গোল গোল কথা ছাড়া। বিজেপি মন্ত্রীসভার যে নীতিন গডকরির ওপর দেশের বহু বড় শিল্পপতির বেশ আশা ভরসা আছে, ভাবা হচ্ছিল যে তিনি বুঝি আলাদা কিছু বলবেন এই নিয়ে। বিশেষ করে ভারতের বড়-মাঝারি বেশ কিছু রপ্তানিকারক শিল্পগোষ্ঠীর সাথে গডকরির মাখামাখি বাণিজ্যিক মহলে সুবিদিত। সেই নীতিন গডকড়ির নিজের ছেলেই পেট্রলিয়ামে ইথানল মিশ্রণ সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় beneficiary, তা নিয়ে এখন বহু অ-বাম রাজনীতিক এবং পত্র পত্রিকাও কথা বলতে শুরু করেছে। কাজেই তাঁর পক্ষে এই মুহূর্তে নিজের ঘর সামলানো বাদে আর কোনো বিষয়ে খুব একটা উদ্যোগ আশা করা যায় না। সাধে কী আর বামেরা বলে থাকে যে ক্যাপিটালিজম মানেই ক্রোনি, অর্থাৎ পুঁজিবাদ মানেই ধান্দার পুঁজি। পুঁজিবাদের কোনো honest approach হয় না!
দুটো ব্যাপার এই সময়ে লক্ষ্যণীয়। পুঁজিবাদ বিরাট সঙ্কটে পড়েছে আর সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পরে এই প্রথমবার মার্কিন আধিপত্য বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিরাট প্রশ্ন উঠেছে। বিজেপির তরফে সরাসরি নির্বাচন কমিশন ভোটে জোচ্চুরি করতে নেমেছে তার প্রাথমিক স্তরে বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বিহারে SIR করতে গিয়ে তাদের সুপ্রিম কোর্টের ভৎসনার সম্মুখীন ও হতে হয়েছে। এমন ও ভাবনা ছড়াচ্ছে যে বিহার বিধানসভায় বিজেপি-নীতিশ কুমার জোট হেরে গেলে কিংবা বিজেপি রাজ্যে সরকারের অংশ হতে না পারলে দিল্লীতেও না বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারের পতন ঘটে। অভিজ্ঞ মহলে এ কথাও চালু রয়েছে যে কেন্দ্রে যদি বিজেপি না থাকে তাহলে এই মুহূর্তে বহু রাজ্যেই তাদের গঠন করা সরকার ও টিকবে না। আর ঠিক এই সময়েই মোহন ভাগবতের মনে পড়ে গেল যে কাশীতে জ্ঞানবাপী মসজিদ ভেঙে মন্দির আর মথুরায় ‘কৃষ্ণজন্মভূমি’ পুনর্দখল করতে না পারলে হিন্দুদের বুঝি সর্বনাশ ঘটে! আসলে অযোধ্যায় ঘটা করে বানানো রাম মন্দির বিজেপি কে কাঙ্খিত রাজনৈতিক মাইলেজ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনকে নোংরাভাবে ব্যবহার করে বিভিন্ন রাজ্যে "ভোটচুরি"র যে ছবি উঠে এসেছে, তাতে এমনটা মনে করা অন্যায় হবে না যে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এমন কিছু না ঘটিয়ে থাকলে বিজেপির পক্ষে ঐ ২৪০ টা আসন পাওয়াও বুঝি সম্ভব হতনা। অতএব এক সাথে এক জোড়া দুই জায়গায় মসজিদ বনাম মন্দির জিগিড় তুলতে না পারলে বিভিন্ন রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনগুলোয় সুবিধা করতে পারবে না বিজেপি।
যে কোনো ফ্যাসিস্ত দলের মতই RSS তথা বিজেপি'র একটা বড় টার্গেট গ্রুপ হল' পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী। মানে, মূলতঃ মধ্যবিত্ত যারা। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে এই শ্রেণীর মধ্যে বিজেপি'র প্রতি সমর্থন বেশ খানিক কমেছে। তদুপরি NRIদের মধ্যে যে সমর্থন ওরা পেত', সেটিও এখন বড় প্রশ্নের মুখে কারণ পশ্চিমের বিভিন্ন দেশেই (যেখানে NRI রা বড় পরিমাণে বাস করেন) বর্তমানে উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটছে আর তার সাথেই স্বাভাবিকভাবেই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন যে H1B Visa দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো কড়াকড়ি বাড়ানো হবে কিংবা সেটি পুরোপুরি বন্ধ'ও করে দেওয়া যেতে পারে। এই ট্রাম্পকেই একসময় প্রায় বিষ্ণুর দশম অবতার বানিয়ে প্রচুর নাচানাচি করেছে এ দেশের হিন্দুত্ববাদীরা! মধ্যবিত্ত white caller workers দের মধ্যে একেই দেশের ভেতরে কাজের সুযোগ কমছে, আইটি সেক্টরে ব্যাপক ছাঁটাই কিছু কোম্পানী হয় শুরু করে দিয়েছে বা করার সুযোগ খুঁজছে, বিভিন্ন রাজ্যে দৈনিক কাজের সময় বাড়ানোর ফিকির চলছে (কর্নাটকে আন্দোলন করে আটকানো গেল' তো মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফড়নবীশ শুরু করতে চাইছেন)। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ যে ব্যাপকহারে কমেছে দক্ষিণপন্থী রাজিনীতির বাড়বাড়ন্তের সাথে সাথে, তা তো বলাই বাহুল্য। এর সাথে রয়েছে ভাল হারে মূল্যবৃদ্ধি। দেশের বেশ কিছু বড় শহরে বসবাস করার জন্য বাড়ি-ঘর-ফ্ল্যাট কেনা মধ্যবিত্তের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে ইতিমধ্যেই। রিয়াল এস্টেট শিল্পের বেশ কিছু industry association বলতে শুরু করেছে যে এই হারে দাম বাড়তে থাকলে আর এক দশকের মধ্যে Tier-1 তো বটেই, Tier-2 শহর/ আধা শহর অঞ্চলেও মধ্যবিত্তের পক্ষে বাড়ি/ফ্ল্যাট কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। আম্বানি/আদানি গোষ্ঠীর হাতে প্রায় গোটা অর্থনীতিকে তুলে দেওয়ার ফলে বিজেপির পার্টি তহবিলের শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে কিন্তু সাধারণ শ্রমজীবি মানুষ তো কোন ছাড়, White coller মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্যেও বিশেষ কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছেনা। যদিবা কিছু চাকরির সুযোগ তৈরিও হয় (প্রয়োজনের তুলনায় নেহাতই কম) সেখানেও শ্রম আইনের ক্রমশ সঙ্কোচনের ফলে মজুরির তুলনায় কাজের চাপ অস্বাভাবিক বেশি থাকছে। সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন online forum, confessions page এ কর্পোরেট-সাদা কলার কর্মচারীদের আর্থিক নিতাপত্তাহীনতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, ইত্যাদির অগুনতি ঘটনার কথা চোখ বোলালেই জানা যাবে।
১৯৯১ এর পুঁজিবাদী উদারীকরণের কিছু চুঁইয়ে পড়া লাভ এ দেশের মধ্যবিত্তদের একটা অংশ পেয়েছিল। প্রযুক্তি বা ফিনান্সের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের (যারা গোটা তরুণ কর্মক্ষম জনসংখ্যার ক্ষুদ্রাংশ মাত্র) একটা অংশ দেশি বিদেশী কর্পোরেট সংস্থায় নিজেদের আর্থিক উন্নতির বড় সুযোগ পেয়েছিল। এই তরুণদের বাকি অংশ মূলত: এই "শাইনিং" উদাহরণ দেখে নিজেরাও এক সোনালি স্বপ্নের আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু ১৯৯১ এ দেখানো স্বপ্ন সাড়ে তিন দশক বাদে অনেকখানি নিভুনিভু এখন। আইএমএফ, বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণের সাথেই চাপিয়ে দেওয়া "অর্থনৈতিক সংস্কারের" নীতি মানতে গিয়ে জনগনের ব্যাপক অংশের ক্রয়ক্ষমতা আদতে কমেছে, ফলত: পুঁজিবাদ তার ক্লাসিক অতিউৎপাদনের গাড্ডায় পড়ে গেছে। বামেরা যতদিন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছিল, বেশ কিছু কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা করা গেছিল যার মাধ্যমে গরিব মানুষ, গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ইউপিএ-২ সরকারের আমল থেকে মন্টেক সিং- চিদাম্বরম জুটির হাত ধরে একেবারে দক্ষিণপন্থী যে সকল আর্থিক নীতি নেওয়া শুরু হল', যার গতি আরো বহুগুন বাড়ল' ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই কাজকর্মের সুযোগ আরো কমতে থাকল'। কিছু মুষ্ঠিমেয় পুঁজিপতির সম্পদ হু হু করে বাড়ল' আর কমতে থাকল' চাকরিজীবি মানুষ, ক্ষুদ্রশিল্পের সাথে যুক্ত মধ্যবিত্তের এগোনোর সুযোগ। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বিগত সকল সময়কে ছাপিয়ে স্বাধীন ভারতে সবচেয়ে বিকট আকার ধারণ করেছে।
কাজেই সময়ের নির্বাচনে সম্ভবতঃ ভুল হয়নি মোহন ভাগবতের। ধর্মীয় মেরুকরণ বাদে ক্ষমতা ধরে রাখতে আর কোনো রাজনৈতিক তাস থাকছে না শাসকগোষ্ঠীর হাতে। সাম্প্রতিককালে caste census ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে বিপুল অনগ্রসর অংশের দুরবস্থা তুলে ধরেছে। বিজেপির প্রায় ১১ বছরের শাসনে (বাজপেয়ীর আমল ধরলে ১৭ বছর) দলিত, ওবিসি অংশের যে বলার মত কোনো উন্নয়নই ঘটেনি, তা বিজেপি ও বুঝতে পারছে। মনুবাদী ভাবধারা কে "সনাতনী" ছাপ মেরে চালানোর রাজনীতিতে দলিত, ওবিসি অংশ'ও আর্থিক তো বটেই, বেশ কিছু ক্ষেত্রে দৈহিক অত্যাচার, পীড়নের ও শিকার হচ্ছে। জাতিবিদ্বেষী এই নিপীড়নে সরকারি মদত লক্ষ্যণীয়, বিশেষতঃ বিজেপি-শাষিত রাজ্যে। অতএব হিন্দু-মুসলমান বাইনারির বাইরে মানুষকে, বিশেষ করে গরিব মধ্যবিত্ত মানুষকে ভাবতে না দেওয়াটাই একমাত্র ‘সেফ অপশন’ সঙ্ঘ পরিবারের কাছে।
মার্কিন তাঁবেদারি করার বিদেশনীতি ভীষণভাবে ব্যাকফায়ার করেছে বিজেপির দিকে। কয়েক মাস আগেই পহেলগাঁওয়ে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসবাদী হামলা পরবর্তী সময়ে ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক লড়াইয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ সঙ্গীহীন অবস্থায় পেয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের আমন্ত্রিত আসনে পাকিস্তান উঠে এসেছে। নিরাপত্তা পরিষদে ৫টি পূর্ণকালীন সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে কেও প্রতিবাদ করেনি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবে। IMF নতুন করে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ মঞ্জুর করেছে পাকিস্তানকে, ভারতের তীব্র বিরোধীতা সত্ত্বেও। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধে আর কোন উপায় না দেখে শেষে চীন সফরে যেতে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে। হাত ধরতে হচ্ছে শি জিনপিং বা ভ্লাদিমির পুতিনের। বামপন্থীরা যে কথা এতদিন ধরে বলে আসছে মার্কিন তাঁবে না থেকে চীন বা ব্রিক্স গোষ্টীর সাথে, গ্লোবাল সাউথের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে, এখন ঢোঁক গিলে সেই পথেই যেতে হচ্ছে বিজেপির সরকার কে। এই ব্রিক্স গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত অভিন্ন মুদ্রার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিল ভারত সরকার এই কিছুদিন আগেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা অতি দক্ষিণপন্থী ঝোঁক যে জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে ভারতের অর্থনীতিকে, তাতে খুব দ্রুত কোন সমাধান (স্বল্পমেয়াদী হলেও) পাওয়া সম্ভব হবে না। ফ্যাসিস্ট রাজনীতির চিরাচরিত নিয়ম মেনেই শাসকগোষ্ঠীর প্রয়োজন নিত্যনতুন spectacle! যা কিনা একই সাথে নজর ঘোরাতে এবং জাতিসত্ত্বাভিত্তিক রাজনীতির নতুন কোন পথ খুলে দেয়। অতএব কাশী এবং মথুরা নিয়ে উন্মাদনা এখন জরুরি শাসকের জন্য।
কিন্তু একই সাথে সুযোগ তৈরি হচ্ছে বামপন্থীদের জন্য। একচেটিয়া পুঁজিপতি বাদে অর্থনীতির আর কোনো অংশই কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে বিশেষ কিছু সমর্থন পায়না এই মুহূর্তে। অপরিকল্পিত GST implementation, নোটবন্দী, কোভিডের লকডাউনের ধাক্কায় বিপর্যস্ত ক্ষুদ্র/মাঝারি শিল্প যেটুকু দাঁড়িয়েছিল, ট্রাম্পের এই শুল্কযুদ্ধে আরো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। তামিল নাড়ুর বস্ত্রশিল্প, পশ্চিম বাংলার চর্মশিল্প, shrimp feed, গুজরাটের গয়নাশিল্প ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড়িয়ে। এই প্রত্যেকটি শিল্পক্ষেত্র শ্রমনিবিড়। বহু ক্ষেত্রেই শিল্পের মালিকপক্ষ'ও বর্তমান বিশ্বের আর্থিক নিরিখে খুব বৃহৎ পুঁজির মালিক নয়। তার ওপর একচেটিয়া পুঁজিপতিরাও গিলে খেতে চাইছে এই সকল ক্ষেত্র কে। গোটা জায়গাটায় বামপন্থীদের intervention এর বড় সুযোগ রয়েছে। এই সকল ছোট-মাঝারি শিল্পকে সরকারি সহায়তা, শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি এবং তা সম্ভব। সর্বভারতীয় প্রেক্ষিত বুঝে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এই আন্দোলন বামপন্থীরা ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব নয় সেই সকল দলের নির্বাচনী বণ্ড পুষ্ট শ্রেণীগত অবস্থানের ফলেই। পপুলিস্ট রাজনীতি করা এক জিনিস আর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নীতির দাবিতে লড়াই আন্দোলন আরেক ব্যাপার। এ দেশের বিভিন্ন প্রাদেশিক পপুলিস্ট রাজনীতি করা দল যারা প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্নভাবে হিন্দুত্ববাদীদের সাথে বোঝাপড়া করে চলে, তাদের তরফে এই ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প বা তার শ্রমিকদের স্বপক্ষে কোনো দৃঢ় নীতিগত অবস্থান নেওয়া তাদের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই খুব বেশি দূর সম্ভব না। উদাহরন হিসাবে বলা যেতে পারে যে মমতা ব্যানার্জী আসন্ন দুর্গাপূজো উপলক্ষ্যে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ধার্য করেছেন ক্লাব খয়রাতির জন্য। কিন্তু এখনো অবধি রাজ্যের বিপন্ন চর্মশিল্পের সহায়তায় একটি পয়সাও বরাদ্দ করেন নি। কোনো রকম “নরম হিন্দুত্ববাদ” দিয়ে যে স্বয়ংসেবক সংঘ আর তাদের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি’র “কড়া হিন্দুত্ববাদ” কে টক্কর দেওয়া সম্ভব নয়, বরং প্রথমটা কো-অপ্ট হয়ে যায় পরেরটায়, সেই উদাহরণ গুজরাটে কংগ্রেস এবং দিল্লীতে আম আদমি পার্টির নির্বাচনী পরাজয় এবং সাংগঠনিক ক্ষয় থেকেই বোঝা যায়।
নবীন পট্টনায়েক ওড়িষা’র মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যেভাবে সঙ্ঘকে “খোলা-হাত” দিয়েছিলেন, পশ্চিম বাংলায় মমতা ব্যনার্জীও একই রাজনীতি করে চলেছেন। ওড়িষায় সংঘ বাড়তে বাড়তে এখন বিজেপি কে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকারে বসাতে পেরেছে। সরকারে এসেই ওড়িষায় জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা বাড়িয়েছে। ওড়িষা কে আরেক উত্তর প্রদেশের মতই দুর্বৃত্ত-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আনতে চাইছে বিজেপি। পশ্চিম বাংলায় প্রশাসনের দুর্বৃত্তায়নের কাজটা মমতা ব্যানার্জী নিজেই অনেকখানি এগিয়ে রেখেছেন। এ রাজ্যে NRC এবং SIR, এই দুইকেই একসাথে চালানোর চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে বিজেপি। দুর্বৃত্ত-পরিচালিত প্রশাসন এবং করুণ অর্থনীতি ক্লিষ্ট এই রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি কে মেইন্সট্রীম করে ফেলাটা যতখানি কঠিন মনে করা হত’ এক সময়, এখন আর ততখানি কঠিন মনে হচ্ছে না। গোপাল পাঁঠার মত এক চরম বিতর্কিত চরিত্রের সিনেমার পর্দায় নবনির্মাণ বা ১৯৪৬ এর কলকাতায় ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দৃষ্টিভঙ্গী থেকে প্রচার আসলে বহু কষ্টে অনেকখানি নিরাময় করা পুরনো ঘা’কে খুঁচিয়ে দিতে চাইছে। এ পরিবেশে উত্তর ভারতে এবং সামগ্রিকভাবে হিন্দতুত্ববাদী রাজনীতির বলয়ে থাকা রাজ্যুগুলোতে কাশী মথুরা নিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারলে পশ্চিম বাংলা’ও সেই সর্বনাশা আগুনের বাইরে থাকতে পারবে না, এই কথা আজ হলপ করে বলা যায়।
বামপন্থী এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বা গোষ্টীগুলির একসাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় আসন্ন। এই প্রতিরোধের মূল লক্ষ্য সংঘ পরিবার হলেও তাদের তাঁবেদার বা প্রচ্ছন্ন enabler দলগুলিকেও বাদ দেওয়া চলবে না ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রত্যাক্রমণের থেকে। নয়া-ফ্যাসিবাদী দক্ষিণপন্থী আগ্রাসনের এই উলঙ্গ, হিংস্র আক্রমণের মুখে এ সময়ে বামপন্থী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের কোনো রকম ডিফেন্সিভ অবস্থান ভারতবর্ষকে আরো সামাজিক অর্থনীতিক ক্ষতির দিকে নিয়ে যাবে। ওদের হিংস্রতা যত বাড়বে বুঝতে হবে ওদের পতন ততখানি আসন্ন। প্রত্যাঘাতের জোর বাড়ানোই সময়ের দাবি এখন।
প্রকাশ: ০২-সেপ্টেম্বর-২০২৫
শেষ এডিট:: 02-Sep-25 08:58 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-current-struggle-a-few-points
Categories: Current Affairs
Tags: constitutionofindia, democracy, democraticright, republic, secualrism
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (147)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





