চা শ্রমিক বাঁচাও , বাংলা বাঁচাও
গৌতম ঘোষ
কোচবিহার আলিপুর জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার তরাই এবং উত্তর দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ চা বলয়ে নানান জাতি ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ একসাথে বসবাস করে।

উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি নির্ভরশীল টি, টিম্বার এবং ট্যুরিজমের উপরে। মূলত চা শিল্পের সাথে সরকারি হিসেবে সাড়ে চার লক্ষ চার শ্রমিক নিযুক্ত আছে। টেম্পোরারি শ্রমিকের সংখ্যা ধরলে তা প্রায় ১০ লক্ষ। এছাড়া নতুন করে গড়ে ওঠা অজস্র ছোট ছোট চা বাগান যা কোচবিহার থেকে শুরু করে উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুর মহকুমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই নতুন গড়ে ওঠা চা বাগান মূলত কৃষি জমির উপরে গড়ে উঠেছে। এই সময়কালে প্রায় ৮৭ হাজার হেক্টর কৃষি জমি চা বাগানে পরিণত হয়েছে। এই জমিগুলি মূলত রাজবংশী আদিবাসী এবং গরিব প্রান্তিক মুসলমানদের জমিতে গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ একশ্রেণীর নব্য ধনীরা এই জমিগুলি জলের দরে ক্রয় করে চা বাগান গড়েছেন। নামমাত্র দাম দেওয়া হয়েছে এবং একরপিছু একজন করে কাজ দেওয়া হয়েছে। এইভাবে একজন স্বাধীন কৃষক শুধু বারোমাস কাজ পাবার আশায় পরাধীন শ্রমিকে পরিণত হয়েছে। নতুন করে গড়ে ওঠা চা বাগান গুলিতে আজ প্রায় ৫০ শতাংশের উপরে চা উৎপাদিত হচ্ছে। এই ছোট ছোট চা বাগান গুলিতে কোন শ্রম আইনি কার্যকরী নয়।
উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে নতুন গড়ে ওঠা চা বাগানকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন শতাধিক বট লিভ ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। এই চা উৎপাদন কারখানা গুলিতে মজুরি প্রদান ছাড়া কোন সুযোগ সুবিধাই দেওয়া হয় না। কেন্দ্রীয় সরকারের টি বোর্ডের কোন নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে এই কারখানা গুলিতে। অধিক মুনাফার জন্য কোনরূপ গুণমান নিয়ন্ত্রন করা হয় না। নিম্নমানের সস্তার চা এই ফ্যাক্টরি গুলিতে তৈরি হয়। এছাড়া শেড গার্ডেন বলতে কোচবিহার জেলার কিছু অংশ আলিপুরদুয়ার জেলা, জলপাইগুড়ি জেলা এবং দার্জিলিংয়ের এবং তরাইয়ের সমতলে প্রায় চার শতাধিক শেড গার্ডেন বিদ্যমান।
এই চা বাগান গুলিতে মূলত আদিবাসী এবং নেপালি শ্রমিকরা কাজ করে। বেশিরভাগ চা বাগান শ্রমিকই অভিবাসী শ্রমিক। রাচি দুমকা ছোটনাগপুর বিভিন্ন জায়গা থেকে দরিদ্র আদিবাসী শ্রমিকদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে আর কাঠিদের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনাধীন অবস্থায় ভারতে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই চা শ্রমিকদের মধ্যে উড়াও, ,মুন্ডা, খেরিয়া নানান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ আছেন । এদের মধ্যে সাংস্কৃতিক জাতিগত ভাষাগত বিভিন্নতা আছে। এই চা শ্রমিকরা সকলেই নিজেদের মধ্যে প্রচলিত সাদ্রী ভাষাতে কথা বলেন।সাদ্রী ভাষা হিন্দি বাংলা এবং আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি। বর্তমানে বেশিরভাগ আদিবাসীরাই জনপ্রিয় ভাষা হিসেবে এটিকে ব্যবহার করছেন। উড়াও সমাজের কথ্য ভাষা কুরুখ,মুন্ডাদের মধ্যে প্রচলিত ভাষা মুন্ডারী এইরকম মহালিরা সাঁওতালি ভাষায় কথা বলেন। এইরকম বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীতে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত আছে। সব ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীগুলিতে মূলত সাদরি ভাষা যোগাযোগের কমন একটি ভাষা।অন্যদিকে কোচবিহার আলিপুর জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার তরাই এবং উত্তর দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ চা বলয়ে নানান জাতি ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ একসাথে বসবাস করে।
এখানে আলিপুরদুয়ার কুচবিহার জলপাইগুড়িতে কোচ রাজবংশী, রাভা জনগোষ্ঠী, মেচ বা বড়ো জনগোষ্ঠী এবং দার্জিলিং পাহাড়ে আদিম উপজাতি বলতে লেপচারা এবং শেরপা এছাড়া অনেক ট্রাইবেল জনগোষ্ঠী আছে এবং বিস্তীর্ণ তরাই এলাকার মেচি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে আদিম একটি উপজাতিগোষ্ঠী ধিমালরা বসবাস করে। এই আদিম উপজাতি গোষ্ঠীগুলির আলাদা আলাদা পরিচিতি সত্তা আছে। তাদের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে আলাদা আলাদা আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে। বামফ্রন্ট সরকার পরিচালিত হওয়ার সময়েআমূল ভূমি সংস্কারের যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল এই আদিমতম জনগোষ্ঠীগুলি অনেকাংশেই উপকৃত হয়েছেন। বাম সরকারের শিক্ষা প্রসারে যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল তার সুফল ও এই জনগোষ্ঠী গুলির মধ্যে পড়েছিল। যার ফলে প্রথম প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া শিখে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছে। পরিচিতি সত্তার রাজনীতিকে ব্যবহার করে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন প্রতিনিয়ত উস্কানিমূলক প্রচার করে চলেছে। আমরা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর নিজস্ব দাবি দাওয়া যেগুলিতে গণতান্ত্রিক উপাদান আছে সেগুলির প্রতি দৃঢ়ভাবে সমর্থন জ্ঞাপন করি। আজকের দিনে বাস্তব এটি শুধু শ্রেণী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভবপর নয়। পরিচিতি সত্তার রাজনীতির সাথে শ্রেণী আন্দোলনকে সংপৃক্ত করতে হবে এটি হচ্ছে সময়ের দাবি। এহেন চ্যালেঞ্জ এর মধ্যে সিপিআইএমের পক্ষ থেকে কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ থেকে শুরু হয়েছে বাংলা বাঁচাও যাত্রা। প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই যাত্রা আজকে জলপাইগুড়ির বিভিন্ন এলাকা ছুঁয়ে বিকেল চারটায় দার্জিলিং জেলার টিকিয়াপাড়া মাঠে উপস্থিত হবে। এই বাংলা বাঁচাও যাত্রা শেষ হবে ১৭ ই ডিসেম্বর উত্তর চব্বিশ পরগনার কামারহাটিতে।
দার্জিলিং জেলার পাহাড় তরাইয়ের বিস্তীর্ণ চা বাগান বনবস্তি গ্রাম শহর সর্বত্র ব্যাপক প্রচারের মধ্য দিয়ে ৩০শে নভেম্বর জমায়েত হতে চলেছে শিলিগুড়ি শহরের টিকিয়াপাড়া মাঠে। এখানে যেমন ন্যূনতম মজুরির দাবিতে বসবাসের জমির অধিকারের দাবিতে নতুন নতুন শ্রমিকরা উপস্থিত হবে তেমনি বন বস্তি গ্রামীন এলাকার কৃষক রাও এই মহতী সমাবেশে যোগ দিতে চলেছেন। শহরাঞ্চলের অসংগঠিত শ্রমিক কর্মচারী শিক্ষক সমাজ ছাত্র-যুব ব্যাপক মাত্রায় উপস্থিত থাকবে। সকলের কাছে আহ্বান আসুন প্রকৃত অর্থেই তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির বাইনারি পলিটিক্সকে পরাজিত করতে এবং ব্যাপক দুর্নীতি প্রাকৃতিক সম্পদ লুট এবং বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে ঐক্যের বার্তা নিয়ে সকলে মিলে সমাবেশে সমবেত হই। এই লেখাটির শিরোনাম : চরম দুর্নীতি প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের চাশ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় জন জাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ঐক্য রক্ষায় বাংলা বাঁচাও যাত্রা তথা উত্তরবঙ্গ বাঁচাও।
প্রকাশ: ০১-ডিসেম্বর-২০২৫
শেষ এডিট:: 01-Dec-25 09:10 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/save-the-tea-workers-save-bengal
Categories: Campaigns & Struggle
Tags: #tmcjungleraj, bjp, tea garden, bangla bachao yatra, tea workers
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (147)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
বাংলার বিকল্প পরিবেশ ভাবনা ও উন্নয়নের অভিমুখ
- সৌরভ চক্রবর্ত্তী
পশ্চিমবাংলার ক্রীড়ানীতি ও বিপল্প প্রস্তাব
- সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়
তথ্য প্রযুক্তি এ আই আমাদের রাজ্যে সম্ভাবনা
- নন্দিনী মুখার্জি
প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি
- ওয়েবডেস্ক





