সঙ্ঘ নারী সংগ্রাম - ৬

চন্দন দাস
দেশভাগের চক্রান্তের প্রভাব মহিলাদের মধ্যেও পড়েছিল। মুসলিম লীগ এগিয়ে আসা মহিলাদেরও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার করে তোলার চক্রান্ত করে। আবার হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রভাবও মহিলাদের মধ্যে কিছুটা পড়েছিল পাশপাশি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জাতীয়তাবাদী বলছে,আন্দোলনের সংগঠকদের এই প্রশ্নে দুর্বলতা।

ষষ্ঠ পর্ব
'ভারতীয় গ্রামে লাল এজেন্ট।’ দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা এই শিরোনামে খবর ছাপলো—১৯৩৬-এর জুনে।
সেই ‘লাল এজেন্ট’দের অন্যতম ছিলেন লতিকা দাস। মহিলাদের মধ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সদস্য তিনিই, কমরেড লতিকা দাস। ১৯৩৬-এর শেষ দিকে তিনি পার্টি সদস্য হন। তার আগে ঢাকা বিপ্লবী দলে যুক্ত ছিলেন। কলকাতায় এসে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন।
কলকাতার রাজপথে ১৯৪৯-এর ২৭শে এপ্রিল পুলিশের বুলেটে শহীদ হন চার মহিলা আন্দোলনের নেত্রী। তাঁদের অন্যতম ছিলেন কমরেড লতিকা দাস। রণেন সেনকে বিয়ে করার সূত্রে তিনি লতিকা সেন হিসাবে পরিচিত। সেদিন বাকি যাঁদের রক্তে কলকাতা লাল হয়েছিল তাঁরা হলেন কমরেড প্রতিভা গাঙ্গুলি, অমিয়া দত্ত, গীতা সরকার। সেদিন বিমান ব্যানার্জি নামে এক যুবকও নিহত হয়েছিলেন।
কিন্তু আলোচনার বিষয় স্বাধীনতা পূর্ব বাংলায় সেই মহিলা ‘লাল এজেন্ট’দের নিয়ে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে হয়, সেই সময়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি, মুসলমান মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসনের পুলিশের বিরুদ্ধে লড়ে বামপন্থী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির পক্ষে কাজ করেছেন মহিলা আন্দোলনের নেতা, কর্মীরা। আর এই সবের পাশাপাশি ছিল সমাজে দীর্ঘলালিত পুরুষতান্ত্রিক, সামন্ততন্ত্রের জোয়াল। এই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মহিলাদের মধ্যে বামপন্থার প্রভাব তুলে ধরা লক্ষ্যে একটি উদাহরণ দিচ্ছি। কমরেড সরোজ মুখার্জি তাঁর ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আমরা’য় উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৪১-’৪২-এ পার্টিতে মহিলা সদস্য বাড়তে থাকে। ড. বিধান রায়ের ভাইঝি রেনু রায় সিপিআই-এর সদস্য হন। ১৯৪২-এ পার্টি সদস্য হন সূর্য সেনের ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির সদস্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহের কমরেড কল্পনা দত্ত। কবি জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা দাশ পার্টি সদস্য হন বরিশাল থেকে। ওই সময়েই জলপাইগুড়ি থেকে পার্টি সদস্য পদ অর্জন করেছেন কমরেড লায়লা সামাদ।
মহিলা আন্দোলনের কর্মীরা সেই সময় শ্রমিক এবং কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করার কাজেও আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই ক্ষেত্রে শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দির আত্মকথা ‘দি মেমোয়ার্স অব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি’র একটি অংশের উল্লেখ করা যাক। ১৯২৬-এর পরিস্থিতিতে তাঁর তৎপরতা বোঝাতে পরবর্তীকালের মুসলিম লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দি লিখছেন,‘‘কমিউনিস্ট শ্রমিক সংগঠনের বিরোধিতায় আমি যে চেম্বার অব লেবার প্রতিষ্ঠিত করি এক সময় তাতে ৩৬টি ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য হয়।’’ উল্লেখ্য, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে বামপন্থীদের শক্তি তখন বাড়ছিল। আর তা ভাঙার জন্য সোহরাওয়ার্দির মতো লোক ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বামপন্থীদের পক্ষে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন মহিলাও ভূমিকা পালন করেছিলেন। যেমন চটকল শ্রমিকদের সংগঠকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে দুখমন বিবিকে। টালিগঞ্জের চালকল শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করছিলেন গুলবাহার বিবি।
অন্যদিকে কেমন ছিল হিন্দু মহাসভার তৎপরতা? তার আগেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ(আরেসএস) তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাংলার প্রতিক্রিয়াশীল জোতদার, জমিদার এবং মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল হিন্দু মহাসভা। তারা মহিলাদের সংগঠনও বানিয়েছিল। ১৯৩৯-এর ২৭শে ডিসেম্বর তৎকালীন ওয়েলিংটন স্কোয়ারে মহাসভার উদ্বোধন করেন। প্রসঙ্গত এটি মূলত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির উদ্যোগে বাংলায় হিন্দু মহাসভার নব কলরবে উদ্বোধন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জাফরান রঙের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার। সেদিন ভাইসরয় কলকাতায় ছিলেন। হিন্দু মহাসভার সেই সভা সম্পর্কে তিনি লন্ডনে তিনি যে রিপোর্ট পাঠান, তাতে তিনি লেখেন,‘‘হিন্দু মহাসভা যথেষ্ট উদ্দিপনা সহাকারে আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে এবং কতকটা যেন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে এগোচ্ছে।...যেভাবে সবকিছু চলছে তাতে মহাসভা কংগ্রেসের কিছু শক্তি হরণ করতে সমর্থ হলে আমি অবাক হব না।’’
এই পরিস্থিতিতে দুই ধরণের সাম্প্রদায়িক শক্তিই সমাজে বিভেদমূলক কাজে তৎপর ছিল। আবার এই পরিস্থিতে বাংলায় কংগ্রেস গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ ছিল। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এবং তাঁর ভাই শরৎ বসুকে কোণঠাসা করতে লাগাতার প্রচার চলছিল যে, তাঁরা কমিউনিস্ট, সোসালিস্ট এবং মুসলমানদের ঘণিষ্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হচ্ছে। সমাজে আর্থিক মন্দা মারাত্মক চেহারা নিচ্ছে।
এমন অবস্থায় স্বাধীনতার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল আন্দোলনে মহিলাদের ভূমিকা হয়ে ওঠে তাৎপর্যবাহী। এই ক্ষেত্রে ছোট হলেও কমিউনিস্ট পার্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
সেই সময়ে বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে মহিলা আন্দোলনের সংগঠকদের অনেককে দেখা গেছে। সেটিই স্বাভাবিক। আবার কৃষক আন্দোলনে, তেভাগার দাবিতে উত্তাল লড়াইয়ে দেখা গেছে জান কবুল মহিলাদের। আর মহিলা আন্দোলনের এই বিকাশ পর্বে মুসলমান ধর্মাবলম্বী মহিলাদের অনেককে দেখা গেছে বামপন্থী আন্দোলনের পরিসরে। এই ক্ষেত্রে উদাহরণ অনেক। যেমন, ১৯৩৯-এ কলকাতা কর্পোরেশনের শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন হয়। হয় স্ট্রাইকও। সেই স্ট্রাইক সহ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠকদের মধ্যে ছিলেন বরিশালের ম্যাজিস্ট্রেট নরুন্নবীর স্ত্রী সাকিনা বেগম। আবার ১৯৩৯-এর ২০ এবং ২১শে মে মালদহের নঘরিয়ায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার তৃতীয় সম্মেলন হয়। প্রকাশ্য সমাবেশ হয়েছিল ২০শে মে। সেই সমাবেশে পাঁচ হাজারের বেশি কৃষক পরিবারের রমণী উপস্থিত হয়েছিলেন। সিপিআই-এর ইতিহাস বলছে ওই সময়ে অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট আন্দোলন শক্তিশালী ছিল সুরমা ভ্যালি এলাকায়। আসাম এবং সিলেটের ওই এলাকায় কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন জুবেদা খাতুন। অন্যদিকে কলকাতার বস্তিতে কমিউনিস্টদের সলগঠন গড়ে তোলায় সেই সময় অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন কুতুবউদ্দিন আহ্মেদের মেয়ে নাজিমুন্নেসা(নান্নী)।
কিন্তু দেশভাগের চক্রান্তের প্রভাব মহিলাদের মধ্যেও পড়েছিল। মুসলিম লীগ এগিয়ে আসা মহিলাদেরও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার করে তোলার চক্রান্ত করে। আবার হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রভাবও মহিলাদের মধ্যে কিছুটা পড়েছিল পাশপাশি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জাতীয়তাবাদী বলছে,আন্দোলনের সংগঠকদের এই প্রশ্নে দুর্বলতা। সুশোভন সরকারের লেখা ‘নোটস অন দ্য বেঙ্গল রেনেসাঁ’ বলছে, কিছু কিছু মুসলিম মাতৃভূমি ও দেশমাতৃকার আরাধনাকে ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী বলে মনে করত। দেশপ্রেমিক হিন্দু লেখকরা তাদের লেখায় শুধু হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শই তুলে ধরতেন না, তারা রাজপুত, শিখ এবং মারাঠাদের সংগ্রামের গৌরবগাঁথা রচনা করতেন।
এখানেই শেষ নয়। ‘স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাংলাদেশে নারীজাগরণ’ বইতে ভারতী রায় তুলে ধরেছেন একটি গূঢ় প্রশ্ন— মুসলিম মহিলাদের অনেকে গান্ধীজীর সমর্থক ছিলেন। কিন্তু মহিলাদের আন্দোলনমুখী করার জন্য সাবিত্রী, সীতা, দময়ন্তী, দ্রৌপদীর কথা বলা মুসলিম মহিলাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি অনেক ক্ষেত্রে। তাঁরা দেশপ্রেমিক, কিন্তু তাঁদের কাছে মা আমিনা, বিবি ফতেমা ও মরিয়ম অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ছিলেন।
সেই ধাক্কা সামলেও অনেক মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের একাংশ পরবর্তীকালে বামপন্থী আন্দোলনেও যুক্ত হয়েছেন। বিশেষত কৃষক এবং শ্রমিক আন্দোলনে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বাকিটা? জানে দিনাজপুর, ডোঙাজোড়া, কাকদ্বীপ, ভাঙড়, ডুবিরভেড়ি।
সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি ১০ টি পর্বে প্রকাশিত হবে।
প্রকাশ: ৩১-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 31-Aug-25 18:22 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/sangh-womens-struggle-6
Categories: Fact & Figures
Tags: rss, education of muslim woman, indian woman freedom fighter
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (147)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
বাংলার বিকল্প পরিবেশ ভাবনা ও উন্নয়নের অভিমুখ
- সৌরভ চক্রবর্ত্তী
পশ্চিমবাংলার ক্রীড়ানীতি ও বিপল্প প্রস্তাব
- সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়
তথ্য প্রযুক্তি এ আই আমাদের রাজ্যে সম্ভাবনা
- নন্দিনী মুখার্জি
প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি
- ওয়েবডেস্ক





