ঋত্বিক: প্রান্তিক শ্রেনী ও কৌম অবচেতন

কখনো অনুসূয়া আকাশে ঝড় তুলে, দেবতাদের অস্বীকার করে মন্দাকিনী নদীকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনেন। কখনো পর্বত কন্যা পার্বতী বিস্তৃত বৃক্ষ ছায়ার মাঝে আবির্ভূত হয়ে শেষে আবার পর্বতেই বিলীন হন।

শিল্প আর শ্রম- এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ শিকার করার পদ্ধতি বুঝতে চিত্রলিপির ব্যবহার শুরু করে। ম্যামথের গায়ে কিভাবে বর্শা ঢুকেছে তা ছবির মাধ্যমে দেখিয়ে দিলে প্যালিওলিথিক যুগে ইউরোপের আদিম মানুষের শিকারে সুবিধা হতো। এই ম্যামথের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জীবিকা নির্বাহের কাজে ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ চিত্রকলার ব্যবহার শুরু হয় দৈনন্দিন বেঁচে থাকার তাগিদেই। শ্রমিকের দশ হাত একত্রে চালনার মধ্যে দিয়েই ছন্দের উৎপত্তি হয়েছে। আর এই ছন্দের মাধ্যমেই গানের জন্ম। লোকনৃত্যের ক্ষেত্রেও রায়বেশের মত নাচ আদতে শ্রমের জন্যই। ঋত্বিক ঘটক শিল্পের সংজ্ঞা এবং উৎপত্তির বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন - শ্রমের সঙ্গে শিল্পের একেবারে নাড়ীর যোগ। এই যোগসূত্র বোঝাতেই তিনি আদিম সভ্যতার ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন। যে ইতিহাসে শুধুমাত্র উচ্চ বর্গীয়দের কথা লেখা নেই। যে ইতিহাস আদতে সঙ্ঘবদ্ধতার কথা বলে। ঋত্বিক বলেছেন এই প্রাগৈতিহাসিক যুগেই শিল্প আর শ্রম একত্রে পথ চলা শুরু করে। তবে সব শ্রম শিল্পে পরিণত হয় না। ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে যায়। সাথে কিছু পাগল রং, ছন্দ, সুর যোগ করে সেই ঘটনাকে পরিপূর্ণ শিল্পের অবয়ব দেয়। আর এই শিল্পের অবয়বের মধ্যে দিয়েই প্রতীক বা সিম্বলের উৎপত্তি। ঋত্বিকের মতে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সঞ্চিত ইতিহাস এবং স্মৃতি যা কৌম অবচেতন বা কালেক্টিভ আনকনসাস বলে পরিচিত, তারই যে সঞ্চিত সৃষ্টির ভান্ডার মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম উত্তরাধিকারীর মতন বহন করে চলেছে, সেই সৃষ্টির অলিখিত ইতিহাসের নির্যাস থেকেই প্রতীকের জন্ম হয়।
মজার বিষয় হল শিল্প, শ্রম, আদিমতম ইতিহাস, প্রতীক, কৌম অবচেতন - এই সবকটি বিষয়কে ঋত্বিক ঘটক অদ্ভুতভাবে এক ছাদের তলায় নিয়ে চলে এলেন। শুরু করলেন বস্তুবাদী বিশ্লেষণের মাধ্যমে এবং ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পৃক্ত হলো সেই বস্তুবাদী ব্যাখ্যায়। এখানেই ঋত্বিক ব্যতিক্রমী। শিল্পের উৎপত্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে যে পাগলের উদাহরণ তিনি দিয়েছেন, সেই পাগল নতুন ব্যাকরণ তৈরি করার কাজে হাত দিলেন তার সিনেমার মাধ্যমে। প্রতীক এবং কৌম অবচেতন থেকেই উঠে আসে আর্কিটাইপ (archetype) - এর প্রসঙ্গ। গ্রিক শব্দ arche অর্থাৎ ‘আদি’ এবং typos অর্থাৎ ‘রূপ’। একত্রে আদিরূপ বা মৌলরূপ বোঝায়। অর্থাৎ এমন একটি সর্বজনীন প্রতিমূর্তি যা মানুষের সম্মিলিত অবচেতনে বিদ্যমান থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ত্রিনয়নী মাতৃমূর্তি।
ঋত্বিক ঘটক একবার কবি সিদ্ধেশ্বর সেনকে বলেছিলেন যে তার কবিতার মতোই ঋত্বিক নিজের সমস্ত ছবিতে মাতৃত্বের প্রতিমূর্তি খুঁজে গেছেন। কখনো অনুসূয়া আকাশে ঝড় তুলে, দেবতাদের অস্বীকার করে মন্দাকিনী নদীকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনেন। কখনো পর্বত কন্যা পার্বতী বিস্তৃত বৃক্ষ ছায়ার মাঝে আবির্ভূত হয়ে শেষে আবার পর্বতেই বিলীন হন।
‘কোমল গান্ধার’ ছবির ক্যাফের দৃশ্য - ভৃগু এক মিছিলের দিকে নির্দেশ করে অনসূয়াকে মনে করতে বলে এই শহর হলো তপোবন আর সে শকুন্তলা। শহরটা যেনো শাখা প্রশাখার মত তার পা জড়িয়ে ধরছে, একটি রাস্তার শিশু হরিণ শাবকের মত কাছে এসে দুটো পয়সা চাইছে। যেনো এ এক আদিম উপাখ্যান। কোনো এক মহা পণ্ডিত লিখে গেছিলেন এই যুগ যুগান্তরের চিরাচরিত ঘটনা। আমরা যেনো সেই ঘটনাপ্রবাহের অংশ মাত্র। এই মাইথোলজিক্যাল রেফারেন্স কিন্তু চিরা চরিত ন্যারেটিভ হয়ে উঠে আসেনি। রেফারেন্সগুলি প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মধ্য দিয়েই ব্যক্ত করেছেন ঋত্বিক তার সিনেমায়। 'মেঘে ঢাকা তারা'য় উদ্বাস্তু কলোনির মেয়ে নীতার জন্ম হয় জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন। ‘সুবর্ণরেখা’র অভিরাম চিহ্নিত হয় বাগদির সন্তান হিসেবে। এখানেই ঋত্বিক সমাজের চিরাচরিত ধারণাকে এক ঝাঁকুনি দেয়। ‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে উঠে আসে ওঁরাও উপজাতির জীবনের কথা।
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে হয়তো সেই প্রথম আদিবাসীদের জীবন যাত্রার কথা উঠে আসে দৃঢ়ভাবে। ঋত্বিক বলে যায় এই দেশের আসল উত্তরাধিকারীদের কথা যারা সৃষ্টির আদিকাল থেকে আগলে রেখেছে সবটা কিন্তু ইতিহাস তাদের উপেক্ষা করেছে বারবার।
ঋত্বিক ঘটক তাঁর সিনেমার মধ্যে দিয়ে বারবার লিখে যেতে চেয়েছেন এই প্রান্তিক শ্রেণীর ইতিহাস। যে ইতিহাস উপেক্ষিত। উপেক্ষিত মানুষদের কথা বলতে গিয়েই উঠে এসেছে মঙ্গলকাব্য, মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ক, মাইথোলজি, রবীন্দ্রনাথ অথবা চে গুয়েভারার প্রসঙ্গ। উপেক্ষিত মানুষের মধ্যে মাতৃত্বের স্বরূপ খুঁজেছেন তিনি বারবার। বলেছেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির কথা। মহাবিশ্বের আদি সত্যের গল্প। যে গল্প শেষ হয়না বরং আবার শুরু হয় শুরু থেকে। এই গল্পের বৃত্তে বারবার ফিরে আসে ভাঙাচোরা রাস্তায় ছেঁড়া চটি অথবা সুবর্ণরেখার তীরে নতুন ঘর খোঁজার আখ্যান। শেষ বলে কিছু নেই আদতে। প্রত্যেকটা শেষ আসলে একটা শুরু। মেঘে ঢাকা তারার শেষ দৃশ্য -
শংকর দেখছে আবার নতুন এক নীতার গল্প শুরু হচ্ছে। অথবা সব নীতাদের গল্প হয়তো একই হয়। ঠিক একই জায়গায় এসে ছিঁড়ে যায় তাপ্পি মারা চটি। ইতিহাস ফিরে আসে আবার। সুবর্ণরেখার শেষ দৃশ্যে ঈশ্বরকে তার ভাগ্নে প্রশ্ন করে তাদের নতুন বাড়ি কোথায়... ঠিক যেমন প্রশ্ন করতো সীতা।
ঋত্বিক ঘটক সেই সকল মানুষের প্রতিনিধি, সেই নেগলেকটেড শ্রেণীর প্রতিনিধি যারা সঙ্ঘবদ্ধ হলে বিপ্লবের জন্ম হয়। এই শ্রেণীর ভাষা, অভ্যাস, সংস্কৃতি প্রতিনিধিত্ব করেছেন ঋত্বিক ঘটক তাঁর প্রত্যেকটি কাজে। আর এইসবের মধ্যেই খুঁজে গেছেন মাতৃত্বের স্বরূপ।
(আমাদের ফেলো না, ঋত্বিক কুমার ঘটক, সাহিত্য পত্র, ১৩৭৫)
প্রকাশ: ০৪-নভেম্বর-২০২৫
শেষ এডিট:: 04-Nov-25 09:44 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/ritwik-a-retrospect
Categories: Current Affairs
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (147)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





