কমলাকান্তর মাছ, ডেকার্স লেনের প্যান্ডেল আর উৎসব

Author
চন্দন দাস

সেই শারদীয়াতেও, অনেকটা আজকের মতোই, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও দেশ রক্ষাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। আজকের পশ্চিমবঙ্গে সেই উৎসব এবং উৎসব মুখরতার সংস্কৃতিকে কোন খাতে নিয়ে যেতে চাইছে সাম্প্রদায়িক শক্তি?

Pandal at Dacres Lane and the festival of bengal
৮, ডেকার্স লেনের ছাদে সেই শরতে প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছিল। 

আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ছিল, সে’ কল্পনা করাই যায়। তবে যা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, মাটিতে, যেখানে সমাজ আর মানুষের বসবাস, সেখানে তীব্র সাম্প্রদায়িক বিভাজন, বিদ্বেষ, সন্দেহ পুরোপুরি যায়নি। একটি জাতির বুকের উপর দিয়ে কাঁটাতার এঁকে দেওয়ার প্রভাব তখনও ছিলই। 

তারই মাঝে শারদোৎসব ছিল দিন পনেরো পর। তখন, ১৯৪৭-এর অক্টোবরে ডেকার্স লেনের সেই বাড়ির ছাদে ওপার বাংলা এবং এপার বাংলা পাশাপাশি এসে বসেছিল। ৪ থেকে ৬ অক্টোবর হয়েছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অবিভক্ত বাংলা কমিটির চতুর্থ সম্মেলন। ৮, ডেকার্স লেনে ছিল তখন পার্টির অফিস। ১৯৪৬-এর মার্চ থেকে বছর দু’য়েক সেখান থেকেই পার্টি পরিচালিত হয়েছিল— অবিভক্ত বাংলায় এবং দুই বাংলায়।

১৯৪৩-র মার্চের তৃতীয় রাজ্য সম্মেলন থেকে ১৯৪৭-এর অক্টোবরে চতুর্থ রাজ্য সম্মেলনের মাঝে বাংলায় পার্টির সদস্য সংখ্যা ৩ হাজার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৯,২৫০। পার্টি লড়ছে, বাড়ছিল। তবু যে পার্টি বঙ্গ ভাগ চায়নি, সেই পার্টির নেতৃত্ব অক্টোবরের ওই তিনদিন দেশভাগ পরবর্তী পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে বসেছিল। শেষবার পদ্মা, মেঘনা আর গঙ্গা, সুবর্ণরেখা, মহানন্দা পাড়ের কমরেডরা এক ছাদের নিচে পাশাপাশি বসেছিলেন, একই রিপোর্টের উপর আলোচনা করেছিলেন। তারপর? দুই আলাদা বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির পথচলা শুরু।

আজ এই অক্টোবরে, শারদোৎসবের আগে কিছু প্রশ্নে দুই বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন কিছু ক্ষেত্রে প্রায় একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির আস্ফালন মারাত্মক চেহারা নিয়েছে কাঁটাতারের দু’দিকেই। এমনকি এই দুই শক্তিই কাঁটাতারের দু’ পাড়ের এক ভাষা, এক জাতির মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার জন্য এক বিধ্বংসী প্রকল্প নিয়ে এগচ্ছে। আক্রান্ত সংবিধান, স্বাধীনতার মর্মবস্তু, গণতন্ত্র। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, জনবিরোধী আর্থিক নীতি নিয়ে চলা শাসকরা মানুষের দুদর্শা আর তার জন্য জেগে ওঠা জনবিক্ষোভকে আড়াল করতে ধর্মীয় বিভাজনকে নিজেদের প্রধান হাতিয়ার করেছে। সেই মারাত্মক শক্তি খাদ্যাভাস থেকে উৎসব পালনের পদ্ধতি— সর্বত্র হস্তক্ষেপ করতে চাইছে। বদলে দিয়ে নিজেদের ছাঁচে গড়ে তুলতে চাইছে দেশকে।

ডেকার্স লেনের বাড়ির ছাদে সিপিআই-এর শেষ অবিভক্ত রাজ্য সম্মেলনের রিপোর্টে আজকের সঙ্কটের ইঙ্গিত ছিল। আবার ছিল কিছু কর্মসূচি, পরিকল্পনাও। যা পালন করা গেলে, সে পথে চললে দেশ অন্যরকম হতো।

সেই প্রশ্ন থাক। তা অনেক বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। তবে কিছু কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সিপিআই-এর সেই চতুর্থ রাজ্য সম্মেলনের রিপোর্টের একটি অংশ ছিল— ‘সহযোগিতার পথে ভবিষ্যৎ।’ সেখানে লেখা হয়েছিল,‘‘বাংলাদেশ আজ দুইভাগে বিভক্ত। কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশের এক ভাষা, এক স্বার্থ এবং এক ইতিহাস। অর্থনৈতিক সম্বন্ধের দিক দিয়াও বাংলার এক অংশ অপর অংশের সহিত জড়িত। এই বাংলাদেশ চিরদিন বিভক্ত হইয়া থাকিতে পারে না। এই বাংলা দেশের এক অংশের সঙ্গে অপর অংশের সংঘর্ষ চলিতে দিলে উভয় অংশেরই সর্ব্বনাশ হইবে। দুই বাংলাতেই সংখ্যালঘিষ্ঠদের স্বার্থ রক্ষা করিয়া দুই বাংলার সহযোগিতার বন্ধন দৃঢ় করিতে হইবে। সংখ্যালঘুদের গণতান্ত্রিক অধিকার লাভই উভয়বঙ্গের শান্তি এবং শক্তিলাভের প্রধান উপায়। সংখ্যালঘুদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য উভয়বঙ্গের জনসাধারণের সহযোগিতা চাই।’’ 
আর? ধর্ম, সংস্কৃতি, উৎসব নিয়ে সিপিআই-এর বাংলা কমিটি রিপোর্টে বলেছিল,‘‘পূর্ব্ববঙ্গে হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবন রক্ষার দায়িত্ব মুসলিম দেশবাসীকে লইতে হইবে এবং পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবন রক্ষার দায়িত্ব হিন্দু দেশবাসীকে লইতে হইবে। হিন্দু এবং মুসলমান ধর্ম্ম-উৎসব বাংলার সর্ব্বত্র যাহাতে ১৫ই আগস্টের মত মিলনোৎসবরূপে পালিত হয় সেজন্য সমস্ত দেশবাসীর আন্তরিক প্রচেষ্টা চাই। বঙ্গভঙ্গে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই ক্ষুব্ধ হইয়াছে, বাংলাদেশ এক হউক এ আকাঙ্ক্ষা উভয়েরই অন্তরের আকাঙ্ক্ষা কিন্তু এক অঞ্চলের উপর অপর অঞ্চলের এবং এক সম্প্রদায়ের উপর অপর সম্প্রদায়ের জবরদস্তি বাংলাকে কোনদিন ঐক্যবদ্ধ করিতে পারিবে না।’’

দুই বাংলা একদিন আবার ঐক্যবদ্ধ হবে, কাঁটাতার উপড়ে পড়বে— এমন আশা অনেকদিন পর্যন্ত দুই বাংলার একাংশের মানুষ মনের গভীরে ধারণ করতেন, লালন-পালন করতেন। আজ তা প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু বাঙালির জীবন, সংস্কৃতি, উৎসব রক্ষার দায়িত্ব পালনের অনুঘটক কী কী উদ্যোগ হতে পারে, তা তুলে ধরতে পেরেছিলেন কমিউনিস্টরা।

শারদোৎসবের আগে আয়োজিত সেই সম্মেলনে কমিউনিস্টরা আর কী আহ্বান জানিয়েছিল? জমি, শিল্প, বস্তির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র সম্পর্কে সিপিআই-এর সেই সময়কার রিপোর্ট গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে শুধু বিভাজনের আগুনে রক্তাক্ত দেশের সামনে সিপিআই শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যা বলেছিল, মনে হতে পারে এই শরতে তা সমান প্রাসঙ্গিক। সিপিআই-এর বাংলা কমিটি লিখেছিল,‘‘উভয় বঙ্গের জনসাধারণের সাধারণ শুভবুদ্ধি এবং কলিকাতার জনগণের গুণ্ডাবিরোধী সংগ্রাম সারা ভারতবর্ষের কাছে আশার আলো জ্বালাইয়া তুলিয়াছে, বাংলা দেশের শান্তিই আজ আসাম, উড়িষ্যা, বিহার প্রমুখ ভারতের পূর্ব্ব অঞ্চলের শান্তি বাঁচাইয়া রাখিয়াছে। বাংলার শান্তি যদি বিপন্ন হয় তো উহা সমগ্র পূর্ব্ব অঞ্চলের শান্তি বাঁচাইয়া রাখিয়াছে। বাংলার শান্তি যদি বিপন্ন হয় তো উহা সমগ্র পূর্ব্ব ভারতে আগুন জ্বালাইয়া দিবে। সেপ্টেম্বর হইতে এখন পর্য্যন্ত বাংলায় বিশেষ কোন দুর্ঘটনা ঘটে নাই বটে, কিন্তু অবস্থা আবার খারাপের দিকে চলিতেছে। তাই কমিউনিস্ট পার্টি আবার বাংলার শ্রমিক শ্রেণীকে, বাংলার ছাত্রসমাজকে ও বাংলার জনসাধারণকে আহ্বান করিতেছে দাঙ্গার বিরুদ্ধে সংগ্রামে সর্ব্বশক্তি নিয়োজিত করুন, দেশের ভবিষ্যত রক্ষা করুন।’’
সেই শারদীয়াতেও, অনেকটা আজকের মতোই, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও দেশ রক্ষাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। 

আজকের পশ্চিমবঙ্গে সেই উৎসব এবং উৎসব মুখরতার সংস্কৃতিকে কোন খাতে নিয়ে যেতে চাইছে সাম্প্রদায়িক শক্তি?
গত সেপ্টেম্বরে লিলুয়ায় এসেছিলেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। বাগেশ্বরবাবা নামেই তিনি পরিচিত। এসেছিলেন এক ‘হনুমান কথা’র আসরে। নিজেকে ‘হিন্দুরাষ্ট্রের সৈনিক’ হিসাবে পরিচিত করতে পছন্দ করা ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ বলেছিলেন,‘‘এখানে নবরাত্রির সময়ে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের পিছনে আমিষ খাওয়া হয়। খারাপ খারাপ খাবার বানানো হয়। এটা আমার অপছন্দ। এই বারে নবরাত্রির সময়ে কলকাতার হিন্দুরা জেগে উঠে এই ধরনের লোকজনকে বহিষ্কার করুন।’’ আরও কী বলেছিলেন? তাঁর বক্তব্য ছিল,‘‘পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের কাছে প্রার্থনা, নবরাত্রিতে দেবীর প্রতিমা থাকুক বা না-থাকুক, কিন্তু প্রতিমার পাশে আমিষ বিক্রি চলবে না।’’

বাগেশ্বরবাবা যদি বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের মুখোমুখি পড়তেন, তাহলে কী হতো? আর সেই সময়ে যদি আমাদের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেখানে থাকতেন, তিনি কী করতেন? তাঁর ‘কূল রাখি না শ্যাম রাখি’ অবস্থা হতো।
কেন? কমলাকান্তর দপ্তরের একাদশ অধ্যায়ের শিরোনাম ‘আমার দুর্গোৎসব।’ দুর্গাপুজো এবং উৎসবকে এইভাবে মিলিয়ে দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রাজ্যের বর্তমান শাসক দল এবং তাদের ‘দিশাদানকারী’ সঙ্ঘ পরিবারের কতটা কোপের মুখে পড়তেন তা কল্পনা করা কঠিন। দুর্গাপূজার সঙ্গে যে বাঙালির উৎসবমুখরতার একটি নিবিঢ় যোগাযোগ আছে এবং তা যে কোনও অবস্থাতেই ধর্মকে অসন্মানিত করে না, ধর্মাচরণে বাধা সৃষ্টি করে না, সেই ধারনাই প্রায় দেড়শো বছর পরের বাংলায় রীতিমতো রাজদ্রোহ হিসাবে চিহ্নিত হবে। যদি বঙ্কিমচন্দ্র তা জানতেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই কমলাকান্তর মাধ্যমে লিখতেন না যে,‘‘দেখিলাম—সুবর্ণমণ্ডিতা, এই সপ্তমীর শারদীয়া প্রতিমা! জলে, হাসিতেছে, ভাসিতেছে, আলোক বিকীর্ণ করিতেছে!’’  
‘দুর্গোৎসব’-এর পর আবার ‘শারদীয়া প্রতিমা’’? তাও বঙ্কিমচন্দ্র? 

কমলাকান্তর দপ্তর-এর একাদশ অধ্যায়ের এই আগের অধ্যায়— ‘বড় বাজার।’ সেখানে কমলাকান্ত একসময় জানালেন,‘‘ভাবিয়া চিন্তিয়া, মনের দুঃখে আফিমের মাত্রা চড়াইলাম। তখন জ্ঞাননেত্র ফুটিল। সম্মুখে ভাবের বাজার সুবিস্তৃত দেখিলাম। দেখিলাম, অসংখ্য দোকানদার দোকান সাজাইয়া বসিয়া আছে-অসংখ্য খরিদ্দারে খরিদ করিতেছে-দেখিলাম, সেই অসংখ্য দোকানদারে অসংখ্য খরিদ্দারে পরস্পরকে অসংখ্য অঙ্গুষ্ঠ দেখাইতেছে। আমি গামছা কাঁধে করিয়া, বাজার করিতে বাহির হইলাম।’’ 

রূপের হাটে গিয়ে কমলাকান্ত মাছেদের সামনে পড়লেন। বঙ্কিমচন্দ্র সেই বাজারের বিস্তৃত বর্ণনার মাঝে কমলাকান্তর মুখ দিয়ে বলালেন,‘‘দেখিলাম, ছোট বড় রুই, কাতলা, মৃগেল, ইলিস, চুনো পুঁটি, মাগুর খরিদ্দারের জন্ম লেজ আছড়াইয়া ধড়ফড় করিতেছে; যত বেলা বাড়িতেছে, তত বিক্রয়ের জন্ম খাবি খাইতেছে। মেছনীরা ডাকিতেছে,‘‘মাছ নেবে গো! কুল পুকুরের সন্তা মাছ, অমনি ছাড়বো-বোঝা বিক্রি হলেই বাঁচি।...কেহ ডাকিতেছে,‘‘ওরে আমার সরম পুঁটি, বিক্রি হলেই উঠি। ঝোলে ঝালে অম্বলে, তেলে ঘিয়ে জলে, যাতে দিবে ফেলে, রান্না যাবে চলে, সংসারের দিন সুখে কাটাবে, আমার এই সরম পুঁটির বলে। কেহ বলিতেছে, ‘‘কাদা ছেঁদে চাঁদা এনেছি-দেখে খরিদ্দার পাগল হয়। কিনে নিয়ে ঘর আলো কর।’’
‘কাদা ছেঁদে চাঁদা’য় পাগল হয়ে যাওয়া দেশে নিরামিষ চালাতে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রীর পছন্দের এক ‘বাবা।’ 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কী করতেন, কী লিখতেন— তা ভাবলেই আশঙ্কা হয়।

প্রকাশ: ১৫-অক্টোবর-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 15-Oct-26 19:13 | by 6
Permalink: https://cpimwestbengal.org/pandal-at-dacres-lane-and-the-festival-of-bengal
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড