স্বপ্নের ফেরিওয়ালা: বিপ্লবী ফিদেল

কিউবা বিপ্লবের পর একের পর এক মার্কিন রাষ্ট্রপতি তাঁকে হত্যা, কিংবা উৎখাতের চেষ্টা করে গিয়েছেন। কিন্তু তাদের ফুৎকারে উড়িয়ে ফিদেল বলতেন, ‘যদি হত্যার ছক থেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য অলিম্পিকে কোনও পদক থাকত, তবে আমিই পেতাম সোনার পদক’। ফিদেল তথা কিউবান বিপ্লবীরা সিনেমার কায়দায় সিআইএ-কে বার বার গোল দিয়েছেন, তার কারণ ফিদেলদের সাথে মাটির তীব্র যোগাযোগ।

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকেই ভারত ও কিউবা একে অন্যের ‘অল ওয়েদার ফ্রেন্ড’। বিপ্লবের পর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় যোগ দিতে কাস্ত্রো পৌঁছেছিলেন নিউ ইয়র্ক। সেটা ১৯৬০ সালের ঘটনা। সেখানের পাঁচ তারা হোটলে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন তিনি। নিউইয়র্কের কৃষ্ণাঙ্গদের পাড়া ‘হারলেম’এর তেরেসা হোটেলের মালিক এসে কাস্ত্রো এবং তাঁর সঙ্গী প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানান। পুরো টিম নিয়ে কাস্ত্রো গিয়ে ওঠেন হারলেমে। সেখানে প্রথম যে ব্যক্তি ফিদেলকে দেখতে এসেছিলেন, তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। পরবর্তীকালে ভারতের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী নটবর সিং-এর সাথে অভিজ্ঞতা ভাগ করেছিলেন কাস্ত্রো, “আমি তার (নেহেরু) দুর্দান্ত অঙ্গভঙ্গি কখনও ভুলতে পারবো না। তখন আমি ৩৪ বছরের ছোকরা। ব্যাপকভাবে পরিচিতিও ছিল না। টেনশনে ছিলাম। নেহেরু আমার মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার টেনশন উধাও হয়ে গেল”। এই বন্ধুত্বের ভিত পোক্ত করেছিল জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন। ঠান্ডা যুদ্ধের আবহে তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন দেশগুলো আপাত বৃষ্টিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবার জন্য বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে এই জোট তৈরি করেন। ১৯৬১ সালে যুগোস্লাভিয়ার জোসিপ ব্রোজ টিটো, মিশরের গামাল আবদেল নাসের, ভারতের জওহরলাল নেহেরু, ঘানার কোয়ামে নক্রুমা এবং ইন্দোনেশিয়ার সুকর্নোর নেতৃত্বে তার প্রথম সম্মেলন বেলগ্রেডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Non-aligned Movement বা NAM। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে (ন্যাম) নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ফিদেলকে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন এবং ফিদেল তা চালিয়েও নিয়ে গেছেন শেষতক। দুই দেশের মধ্যে ১৪ হাজার কিলোমিটারের দূরত্বকে অনেক কাছাকাছি এনেছিল তৃতীয় বিশ্বের জোট।
আরেকটা বিখ্যাত মূহুর্ত হলো ১৯৮৩ এর ন্যাম সম্মেলন। দিল্লিতে। এর আগেরবার ন্যাম সম্মেলন হয়েছিল কিউবাতে এবং চেয়ারম্যান ছিলেন কাস্ত্রো। কিন্তু দিল্লির সম্মেলনের সুর কেটেছিলো ইয়াসের আরাফাত ক্ষুব্ধ হয়ে যাওয়ায়। কারণ খুব সঙ্গত। ওনার আগে ইজরায়েলের বন্ধু দেশ জর্ডনের রাজাকে বক্তৃতা দিতে দেওয়া হয়েছিলো। আরাফত কারো কথা না শুনে সোজা বিমান ধরতে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন তাঁকে মানিয়ে সভায় বসান বিপ্লবী নেতাই। আবার সভার শেষে ইন্দিরা গান্ধীকে ‘বিয়ার হাগ’অর্থাৎ 'জাদু কি ঝাপ্পি' করতেও তিনি দুইবার ভাবেন না তিনি, ফিদেল। সেবার এক কথায় দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে দেশ-বিদেশের নেতাদের সামনে নিজের ক্যারিশমা দিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর মুখ রক্ষা করে দিয়েছিলেন একা ফিদেল। ফিদেলের ব্যবহারে অভিভূত হয়ে গিয়েছিল উপস্থিত সকলে। ভারত সম্পর্কে সর্বদা অনুসন্ধিৎসু ফিদেল একবার কঠিন প্রশ্ন করে বসেছিলেন তৎকালীন ইউপিএ-১ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে। ২০০৬-এ হাভানায় ‘ন্যাম’ শীর্ষ সম্মেলনের সময়। প্রশ্ন ছিলো, 'খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন করার এত দশক পরে কেন ভারতকে গম আমদানি করতে হচ্ছে?'
হাভানা দুনিয়ার অন্যতম প্রাণবন্ত শহর। বেসবল খেলার উত্তেজনা, ক্যারিবিয়ান নাচ-গান হুল্লোড়ে, কিউবা লিব্রের গন্ধে, সালসার তালে, বিপ্লবের তেজে মজে থাকা এক জগৎ। কিন্তু ছোট্ট দ্বীপের দাঁড়িওয়ালা লম্বা মানুষটির মৃত্যুর দিন এই শহরটিরও যেন মৃত্যু হয়েছিল৷ চারদিকে নিস্তব্ধতা৷ বিভিন্ন বিনোদন অনুষ্ঠান ও জনপ্রিয় বেসবল ম্যাচ বাতিল৷ কারণ ড. ফিদেল কাস্ত্রো রুজ মানে ওদের কাছে গোটা দেশটা। অভিভাবক, বন্ধু, নেতা, কমরেড। এমনকি এক কমিউনিস্ট নেতার জন্যে ক্যাথলিক চার্চেও চলেছিলো কান্নার রোল, বিশেষ প্রার্থনা সভা। ২০১৬ এর পঁচিশে নভেম্বর ফিদেল চলে যাওয়ার পর হাউ হাউ করে বাচ্চার মতো কাঁদছিলেন মারাদোনা। ফিদেলকে নিজের “দ্বিতীয় পিতা” বলতেন উনি। কিউবায় পৌঁছে মারাদোনা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবী তার প্রকৃত নেতা হারিয়েছে। আমিও নিজেকে একজন কিউবান মনে করছি। এখন অনেক খেলোয়াড় থাকতে পারে। কিন্তু ফিদেল বিশ্ব একাদশের মালিক ছিলেন। কারণ, বিভিন্ন বিষয় সমাধান করার জন্য তাঁর মতো নেতা গোটা বিশ্বে আরেকটি মেলা দায়। ফিদেলের কোনও মৃত্যু নেই৷” চার বছর পরে, একই তারিখে চলে যান মারাদোনাও। কাস্ত্রো যেদিন মারা গেলেন, সেদিন কেঁদেছিলো সিয়েরা মায়েস্ত্রার প্রতিটি গ্রাম। কিন্তু ততদিনে দিলদরিয়া মুক্ত হৃদয়ের আমুদে ক্যারিবিয়ান গানের কথায়, মাটোগ্রাসোর খনি, পম্পাসের ক্ষেত, আমাজনের বন, মাচুপিচুর শিখর, নিকেল খনি, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল মাঠগুলোতে বহু মানুষ 'ফিদেলিস্তা' হয়ে উঠেছিলো।
হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে হুল্লোড় করা, ছাত্রী মহলে জনপ্রিয়, বাস্কেটবল-বক্সিং এর বাদশা, আইনের ছাত্র ও গবেষক ড. কাস্ত্রো ১৯৪৮ সালে বাস ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সহজাত নেতা কাস্ত্রো পড়ুয়া ও শ্রমিকদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নিয়ে বুঝতে পারেন, স্বৈরাচারে গোটা নির্বাচনটাই 'ফেক'। তাই সশস্ত্র সংগ্রামের পথ নেন কিছু অসম সাহসী তরুণদের নিয়ে। মনকাডা ব্যারাকে আক্রমণ করতে গিয়ে প্রিয় সহকর্মীদের হারিয়ে, জেলে প্রায় মৃত্যু মুখে পৌঁছেও আশা ছাড়েননি তিনি। কাস্ত্রোর ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে নোবেলজয়ী গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ গ্রানমায় লেখেন, “ফিদেল কাস্ত্রো আছেনই জয়ের জন্য। এমনকি দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে ছোট কাজেও পরাজয়ের মুখে তার চোখ-মুখ, মনোভাব দেখে বোঝা যায়, তিনি তা মানতে পারেননি। ওই পরিস্থিতিতে জয়ী হওয়া পর্যন্ত তিনি শেষতক লড়তেন।” তাই তো জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মাত্র ৮২ জনকে নিয়ে ও সামান্য অস্ত্র নিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েন।মাত্র ৩২ বছর বয়সেই আমেরিকার চামচা স্বৈরাচারী বাতিস্তার পতন ঘটিয়ে 'বিপ্লব' করেন। ২০০৯ সালে লুই বায়েজের লেখা ‘দিস ইজ ফিদেল’ বইতে ভাই ও কমরেড রাউল কাস্ত্রো স্মৃতিচারণে বলেন, “১৯৫৬ সালে ১৮ ডিসেম্বর ফিদেল ও আমি সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাদদেশে চিংকো পালমাস নামে এক জায়গায় ছিলাম। আমাদের প্রথম আলিঙ্গনের পর তার প্রশ্ন ছিল: ‘তোমার কাছে কয়টা রাইফেল আছে?’ আমি উত্তর দিলাম, পাঁচটি। তখন তিনি বললেন, ‘আমার কাছে আছে দুটি। সব মিলে সাতটি হল। এখন আমরা যুদ্ধে জয়ী হতে পারি!" পাঠকের কাছে এটা পাগলামো বা ছেলেমানুষি মনে হলেও এটাই ছিলো ফিদেলের হার না মানা জেদ, হিম্মত ও আশাবাদ। এটাই যে কোনোও যুদ্ধ জয় বা ভোটে জেতারও মূল চাবিকাঠি।
টানা অর্ধশত বছর ধরে নিজের দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে গেছেন তিনি ও তার কমরেডরা৷ অশান্ত আটলান্টিকের বুকে কঠোর শৈলশিরার মত যুগ যুগ ধরে ফিদেল আটকেছে অসংখ্য ঝড় ঝঞ্জা। তীব্র আন্তর্জাতিকতাবোধ সম্পন্ন কিউবান বিপ্লবীরা ফিদেলের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করতে লড়তে গিয়েছিলেন আলজেরিয়া থেকে নামিবিয়া, নিকারাগুয়া থেকে কঙ্গো। এই যে সাম্প্রতিক হয়ে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপে দারুণ ফেললো ছোট্ট কেপ ভার্দে, তাকে মুক্ত করতেও এগিয়ে এসেছিলেন সেই ফিদেল। ফিদেল বলেছিলো কালো মানুষদের লড়াই তো কিউবার সমাজতন্ত্রের লড়াই। কারণ কিউবা থেকে মার্কিন দেশ, ক্ষেত থেকে কারখানা- কালো মানুষদের রক্ত-ঘাম-শ্রমে গড়ে উঠেছে। তাই তো ১৯৬৭-৬৮ সালে ভিক্টর ড্রেকের নেতৃত্বে কিউবা গিনি-বিসাউ ও কেপ ভার্দের PAIGC-কে সামরিক ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠায় কিউবা। PAIGC নেতা আমিলকার ক্যাব্রাল শিখিয়েছিলেন, “শত্রু পর্তুগিজ জনতা নয়, পর্তুগিজ উপনিবেশবাদ”। এই সংগ্রামই ১৯৭৪ সালে পর্তুগিজ ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন ঘটায়। এবং গিনি-বিসাউ, কেপ ভার্দে, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিকের স্বাধীনতা আনে। কিন্তু নেপথ্যে লড়েছিলো কিউবার কমিউনিস্ট সেনারা ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো একে “মানবতার কাছে ঋণ পরিশোধ” বলেছিলেন।
বিষাক্ত চুরুট,বিস্ফোরক ঝিনুক - স্কুবা স্যুট- মিল্কশেক, প্রেমিকার মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ, বোনের মাধ্যমে খুনের চেষ্টা, এমনকি কাস্ত্রোর ‘লুকস’ নষ্ট করতে তাঁর জুতোয় থ্যালিয়াম লবণ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যাতে তার বিখ্যাত দাড়ি ঝরে পড়ে যায়, নিশ্চিত মৃত্যু থেকে একইদিনে বেঁচে গিয়েছিলেন দু’-দু’বার, চুরুটে বোমা থেকে স্নানঘরের শাওয়ারে বিষ। এই রকম ৬৩৮ ভাবে ফিদেলকে মারার চেষ্টা করে ছিলো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ (এরা আমাদের দেশের পরমাণু বিজ্ঞানের অন্যতম জনক হোমি ভাবা সহ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী)। বে অফ পিগস থেকে গুপ্তহত্যা- আইসেনহাওয়ার থেকে জুনিয়র বুশ। কিউবা বিপ্লবের পর একের পর এক মার্কিন রাষ্ট্রপতি তাঁকে হত্যা, কিংবা উৎখাতের চেষ্টা করে গিয়েছেন। কিন্তু তাদের ফুৎকারে উড়িয়ে ফিদেল বলতেন, ‘যদি হত্যার ছক থেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য অলিম্পিকে কোনও পদক থাকত, তবে আমিই পেতাম সোনার পদক’। ফিদেল তথা কিউবান বিপ্লবীরা সিনেমার কায়দায় সিআইএ-কে বার বার গোল দিয়েছেন, তার কারণ ফিদেলদের সাথে মাটির তীব্র যোগাযোগ। আর সেখান থেকেই পালটা প্রতিরোধী ‘বিপ্লবী নেটওয়ার্ক’।
যখন ক্রেমলিন থেকে লাল পতাকা নেমে যাচ্ছে, ‘কাল কা যোগী’রা বার্লিনের দেওয়ালে উঠে পোজ মেরে ‘ইতিহাসের পরিসমাপ্তি’র বাতেলা মারছে, শিরদাঁড়া বিক্রি হয়ে যাওয়া কমিউনিস্ট ও সোসালিষ্ট পার্টি গুলো নিজের নাম-সাইনবোর্ড পাল্টাচ্ছে, সেই সময় ক্যারিবিয়ান সাগরের পাড়ে ফিদেল গোটা দুনিয়ার লড়াকু মানুষদের জন্যে জুগিয়েছিলেন ভোকাল টনিক- ‘সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যৎ আমাদের’। উনি বিশ্বাসটা জুগিয়েছিলেন। পাল্টা দেওয়াটাই ওর অভ্যাস। তাই তো ধনতান্ত্রিক শিবিরকে ওভার বাউন্ডারি মারার কায়দায় বলেন, “They talk about the failure of socialism but where is the success of capitalism in Africa, Asia and Latin America?”
বিখ্যাত দাড়ি, মুখের চুরুট, আর কালচে-সবুজ সামরিক পোশাকে পরে থাকা লোকটা ভারত-সহ ১৫৯ টা দেশ দেশ সফর করেছিলেন। তিনি ছিলেন মানবতার সৈনিক। সমাজতন্ত্রের প্রচারক। শুধু কিউবা না। একটা শোষণহীন দুনিয়া গড়ার অক্লান্ত যোদ্ধা। বহুকাল আগে থেকেই পরিবেশ থেকে মৌলবাদ নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগ আজ দুনিয়া টের পাচ্ছে। ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরো আর্থ সামিটে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো পরিবেশ নিয়ে অত্যন্ত দূরদর্শী বক্তব্য আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত ভোগ ও অপচয় প্রকৃতি ধ্বংস করছে। ধনীদের অতিরিক্ত ভোগের মাধ্যমে বাতাস, নদী ও সমুদ্র দূষণ করছে, এরসাথে অন্ধ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নামে অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে কোটি কোটি প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতি শেষ করে দিচ্ছে। তিনি বৈদেশিক ঋণের বদলে 'পরিবেশগত ঋণ' পরিশোধের এবং মানবজাতিকে বাঁচাতে সম্পদ ন্যায্য বণ্টনের আহ্বান জানান।
শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর নামে কিউবায় কোনও রাস্তা নেই, কোনও মূর্তি নেই৷ প্রাচীন সন্ন্যাসীর যেমন কঠিন সাধনায় ব্রতী থাকতেন। তাঁর অমোঘ উক্তি, “There is no cult of personality around any living revolutionary, in the form of statues, official photographs, or the names of streets or institutions. The leaders of this country are human beings, not gods..” এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জমানায় কমিউনিস্ট দুনিয়ার ‘নয়নের মণি’ হয়েও, সাচ্চা কমিউনিস্টের মতো এই ‘individualism’ এর মাঝে আমাদের শিখিয়েছিলেন সমষ্টিচর্চা এবং মানবপ্রেম। যতবার ফিদেলের চরিত্রের ‘চ’ নিয়ে টান পরে, ততবার ওঁর হাতে করে হয়ে যাওয়া বিপ্লবের ‘ব’ ওঁর শত্রুর চোখের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি রেখে গিয়েছেন একটি অনন্য দেশ। যেখানে আছে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং তাও বিনামূল্যে। গড় আয়ু ৭৯.১ বছর। অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা। যার দৌলতে শিক্ষিতের হার সে দেশে ৯৯.৮ শতাংশ। ধনতন্ত্রের মক্কা ধনী মার্কিন দেশের থেকে ভালো। শুধু শুকনো পরিসংখ্যান শুধু নয়, ফিদেল আজোও বেঁচে আছে সিয়েরা মায়েস্ত্রার গ্রামে। আমাজনের ডাক্তারখানায়। করোনা মিশনে। ২০০৫ সালে ফিদেল তৈরি করেছিলেন 'ইন্টারন্যাশনাল কনটিনজেন্ট অব ডক্টরস স্পেশলাইজড ইন ডিজাস্টার সিচুয়েশনস অ্যান্ড সিরিয়াস এপিডেমিকস'। পৃথিবীর প্রান্তিক অঞ্চলে যেখানে সে দেশের ডাক্তাররাও পৌঁছতে পারে না, সেখানকার গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য পৌঁছে যায় কিউবান ডাক্তাররা। তাই করোনা মিশন থেকে হাইতির ভূমিকম্প- স্বাস্থ্যের প্রসঙ্গ আসলেই, কিউবা হলো ভূরাজনৈতিক মাধ্যাকর্ষণের কেন্দ্র।
ফিদেল কাস্ত্রোর নামে পার্ক আছে ভিয়েতনামে। রাস্তা, স্কুল, শিক্ষা-স্বাস্থ্য দপ্তরের নাম দেওয়া হয়েছে ফিদেল কাস্ত্রোর নামে বিশ্বে নানা দেশে- তানজানিয়া, আ্যঙ্গোলা, গিনি, নামিবিয়া, মোজাম্বিকে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া, কেপটাউনের মতো বিভিন্ন শহরে। স্কুল আছে বলিভিয়াতে। ইতালিতে আস্ত প্লাজা বা চক। রাশিয়ার মস্কো শহরে তাঁর নামে স্কোয়ার এবং মূর্তি উদ্বোধন করতে আসেন স্বয়ং ভ্লাদিমির পুতিন। কিন্তু ফিদেলের শেষ ইচ্ছা মতো তাঁর নামে একটাও রাস্তা, পাড়া, চৌহদ্দি বা মূর্তি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না কিউবায়। একমাত্র ব্যতিক্রম, ‘সেন্টেরো ফিদেল কাস্ত্রো রুজ’। ফিদেলের একটা নির্দেশই অমান্য করেছে তাঁর মৃত্যুর পর কিউবার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সেখানেই কিউবার একমাত্র ফিদেলের মূর্তিটা আছে। ফিদেলের জীবদ্দশায় ২০১৪ সালে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিন এই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি উপহার দেন। দৃশ্যতই ফিদেল খচে যান ! তবু ভদ্রতার খাতিরে জুনিয়র কমরেডকে বকা দিতে পারেননি। এমনই অভিমত সেন্টারের ডিরেক্টরের।
২০১৬ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর সবার মাথায় একটা চিন্তা আসে। কি করে আগামী প্রজন্মকে তাঁর আদর্শ, চিন্তা ও কাজগুলো সম্পর্কে জানানো যায়? দায়িত্ব পরে কিউবার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইউসেবিও লিয়েলের ওপর। ভদ্রলোক পুরনো হাভানার গোটা অঞ্চলকে ছবির মত সাজিয়েছেন। সেই ইউসেবিও হাভানার এক সময়ের বড়লোকদের পাড়ার, বিখ্যাত এক তামাক ব্যারনের বাড়িকে রূপান্তরিত করেন বিপ্লবীর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে। ফিদেল কাস্ত্রো সেন্টার। (উৎসাহীরা এখানে দেখতে পারেন- https://www.centrofidel.cu/) যেমন বাতিস্তার প্রাসাদকে বানানো হয়েছে বিপ্লবের মিউজিয়াম হিসেবে। ফিদেল কাস্ত্রো সেন্টারে গিয়ে দেখলাম প্রায় কয়েক হাজার ছবি, অপূর্ব বাগান এবং কাঠের পুরনো কাঠ ও ও কাঁচের কাজগুলো সংরক্ষণ করে বানানো অপূর্ব স্থাপত্য। প্রাচীন এথেন্স এর অনুকরণে এখানে একটা সভা ঘর আছে। যেখানে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ ডেমোক্র্যাটিক ইউথের একটা সভাও হল। কিন্তু এই হলটা কিন্তু শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ছিল না। এখানেও স্থিতিশীল উন্নয়নের ভাবনা। সেন্টারের প্রতিটা রুম আলাদা আলাদা বিষয়ে ভাগ করা। কিউবা বিপ্লবের সাফল্য, বিপ্লবীদের জীবন, মিলিটারি সাফল্যগুলো, সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্রনেতাদের থেকে পাওয়া উপহার এবং ফিদেলের প্রথম পার্টি মেম্বারশিপ কার্ড। আছে এমন কিছু মজার ছবি, যা দেখে কলেজের চ্যাংড়া ছেলে ছোকরারাও গুরু হিসাবে মানবে ভবিষ্যতের মহাবিপ্লবীকে। আছে মার্কেজের দেওয়ার শার্ট, পোপের দেওয়া বিশেষ সম্মান। শিহরণ জাগাবে গেরিলা যুদ্ধে ব্যবহৃত রাইফেল, ফিদেলের অপূর্ব হাতের লেখায় চিঠিগুলো। সেন্টারের একটা নিজস্ব লাইব্রেরি আছে যেখানে গবেষকরা কিউবার ইতিহাস, সমাজ নিয়ে চর্চা করতে পারেন। প্রায় পুরোটাই ডিজিটাইজ করা হয়েছে।
যা আরোও আকর্ষণীয় করেছে সেন্টারটিকে। তবে এই বিল্ডিং এর ঢোকার সময়েই প্রথম যে ঘরটা আসে, তা ফিদেলের নামে নয়। কিউবার মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা ফিদেল যাকে সারা জীবন ধরে আদর্শ মেনেছেন, সেই হোসে মার্তির নামে।
ফিদেল মানে অদম্য, অফুরন্ত প্রাণশক্তি। আখের উৎপাদন বাড়াতে গোটা দেশকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন আখ কাটতে। আবার আলেকজান্ডার, হ্যানিবল থেকে মার্শাল জুকভের রণকৌশল ছিলো হাতের তালুতে। তিনি একদিকে দুর্ধর্ষ সার্প শুটার। আবার অনর্গল বলতে পারতেন মার্ক্স, লেনিন থেকে দাস বিদ্রোহ, আমেরিকার মুক্তি সংগ্রামের একটার পর একটা অধ্যায়। জীবন্ত বিশ্বকোষের মতো। আবার গোগ্রাসে গিলেছেন মার্তি, গোর্কি, গান্ধী, নেহেরু, মাও, মার্কেজ, হেমিংওয়েদের লেখা, উপন্যাস। আ্যডাম স্মিথ থেকে জোসেফ স্টিগলিৎজের অর্থশাস্ত্রও তিনি পড়েছেন। দুর্দমনীয় মনোবল। অসম্ভব প্রত্যয়। নিজ লক্ষ্যে অবিচল। অকুতোভয়। হেরেও যিনি হারিয়ে যান না। বন্ধু মার্কেজের কথায়, ‘এক ধ্রুপদী অনুপ্রেরণা, মাধুর্যের অপ্রতিরোধ্য ঝলকানি, কেবল তারাই তা অস্বীকার করে এই অনুভবের গৌরব নেই যাদের’। গেরিলা যুদ্ধকালীন সময়েই ফিদেল ভক্ত হন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের। ‘ফর হুম দ্য বেল টুলস’ হয় পথের সাথী। পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন সেই হেমিংওয়ের সাথী। সারা জীবনে বহু বন্ধুকে কুড়িয়েছেন ফিদেল। চিলির আলেন্দে, পাবলো নেরুদা থেকে কলম্বিয়ার মার্কেজ। তার বন্ধু হওয়ার অপরাধে আলেন্দের মতো বহু দেশ নায়কদের শেষ করেছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র।
অবিসংবাদিত এই নেতাকে কখনো ভুলতে পারবে না কিউবাবাসী৷ সারা জীবন ধরে মানুষের থেকে শিখেছেন। তিনি নিজে বলতেন, বন্ধু চে'র মেধা, শৃঙ্খলা স্বচ্ছতা, সততা এবং সক্ষমতা তাঁকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে বার বার। ফিদেলের মৃত্যুর দিন ফ্লোরিডাতে পুরানো স্বৈরাচারী বাতিস্তার চামচা, সাম্রাজ্যবাদের দালালরা সারা রাত মোচ্ছবের ডাক দিয়েছিল। তাঁরা ভেবেছিল ফিদেল শেষ অর্থাৎ সমাজতন্ত্র শেষ। কিন্তু সেগুড়ে বালি। আজকে ট্রাম্পের রাজে কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোও তীব্র হয়েছে। ব্ল্যাকআউট সর্বত্র। ওষুধ, খাবার, জ্বালানি - মার্কিন অবরোধে কিচ্ছুটি আসতে দেওয়া হচ্ছ্র না দ্বীপ রাষ্ট্রে। তাও অপ্রতিরোধ্য কিউবা মাথা নোয়াতে নারাজ। ওরা ভুলে যায় বিপ্লব ব্যক্তিনির্ভর নয়। ফিদেল জীবিত অবস্থায় বলেছেন যে, বিপ্লব পরবর্তী তিন প্রজন্ম প্রস্তুত। সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যে। ক্যাডার গড়া এভাবেই। বেঁচে থাকতেই তাঁকে ক্ষমা করেছে ইতিহাস। আসলে ফিদেলের মৃত্যু চায়নি ইতিহাস। ইতিহাসে খুব কম মানুষই হয়ে ওঠেন জীবন্ত কিংবদন্তী। ফিদেল তাঁদেরই একজন। বহু প্রজন্মের প্রেরণা। বিপ্লবের মহাকাব্যে নায়কদের মৃত্যু হয় না, শোক হয় না। তারা বারুদে, ব্যারিকেডে, মুষ্টিবদ্ধ হাতে অমর হয়ে থেকে যান। হয়তো আগামীকে এক দামাল প্রজন্মের রূপকথা শোনাবে বলে। জলপাই উর্দি পড়ে তিনি শিখিয়ে, পড়িয়ে, দেখিয়ে গেছেন বিপ্লব প্রেমেরই মতো। এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে রোমহর্ষ লুকিয়ে। এ এক অমোঘ টান। তাই চে'র কথা মতো- হয়তো ভালো প্রেমিক বা প্রেমিকা ভালো বিপ্লবী হতে পারে, ভালো কবি হতে পারে, কেঁদে ফেলতে পারে আবার ঝলসে উঠতে পারে বদলা নিতে। অত্যাচারিত, নির্যাতিতের জন্যে হৃদয় না কাঁদলে সে কিসের কমিউনিস্ট? ফিদেল প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আশা দেখিয়েছেন। সাথিদের ভালোবাসায় আর শত্রুর ভয়ে বেঁচে থাকেন ফিদেল! তাই তো আজও প্যালেস্টাইন থেকে পাঁশকুড়া, ধাক্কা খেয়ে, রক্তাক্ত, অপমানিত হয়েও, ফিদেল'রা আজও দুনিয়া বদল করার স্বপ্ন দেখাতেই থাকেন.....
প্রকাশ: ১৩-আগস্ট-২০২৬
শেষ এডিট:: 13-Aug-26 13:04 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/fidel-castro-revolutionary-huckster-of-dreams--
Categories: Fact & Figures
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (172)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (100)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)




