ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো ও নয়া ফ্যাসিবাদের বিপদ

Author
শমীক লাহিড়ী

নয়া উদারনীতি (Neo Liberalism) কেবল বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটা রাষ্ট্রের সামাজিক চরিত্রকেও পুনর্গঠিত করে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন এক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়, যার প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় পুঁজির সঞ্চয়কে অনুকূল রাখা। রাষ্ট্র তখন নাগরিকের কাছে জবাবদিহির চাইতে বিনিয়োগকারীর কাছে আস্থাশীল হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সামাজিক ব্যয়, শ্রমিকের সুরক্ষা, কৃষি বা জনকল্যাণের পরিবর্তে অগ্রাধিকার পায় বিনিয়োগের পরিবেশ, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং কর্পোরেট প্রতিযোগিতা।

India's Constitutional Structure and the Danger of New Fascism
"মানুষ তার নিজের ইতিহাস নিজেই সৃষ্টি করে, কিন্তু সে তা নিজের পছন্দমতো পরিস্থিতিতে সৃষ্টি করে না; বরং অতীত থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই তা সৃষ্টি করে।" — কার্ল মার্কস, লুই বোনাপার্টের আঠারোই ব্রুমেয়ার।

সংবিধান একটি আইনি দলিল, না একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা?
ভারতের সংবিধান নিয়ে আলোচনা প্রায়শই দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে আবর্তিত হয়। একদিকে সংবিধানকে এমন এক পবিত্র দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা ইতিহাস ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে; অন্যদিকে এমনও মত আছে, যা একে কেবল শাসকশ্রেণির আধিপত্যের আইনি কাঠামো বলে খারিজ করে দেয়। এই দুই অবস্থানই অসম্পূর্ণ। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়, সংবিধানকে বুঝতে হলে তাকে আইন নয়, ইতিহাসের আলোয় পড়তে হবে; বিধান নয়, সামাজিক শক্তির সম্পর্কের ভাষা হিসেবে পড়তে হবে।
সংবিধান কোনো শূন্যস্থানে জন্ম নেয় না। প্রতিটি সংবিধানই একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যমান সামাজিক শক্তিগুলির আপস, সংঘাত, প্রত্যাশা এবং সীমাবদ্ধতার রাজনৈতিক দলিল। সেই অর্থে সংবিধান কেবল রাষ্ট্রকে সংগঠিত করে না; রাষ্ট্রের সামাজিক চরিত্রও প্রতিফলিত করে।
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইস্তাহারে লিখেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী অংশ (Executive) মূলত বুর্জোয়া শ্রেণির সামগ্রিক স্বার্থ পরিচালনার কমিটি। এই বাক্যটি বহুবার উদ্ধৃত হলেও বহু ক্ষেত্রেই যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মার্কস কখনও বলেননি যে রাষ্ট্র প্রতিটি মুহূর্তে কোনো একক পুঁজিপতির নির্দেশ পালন করে। তাঁর বক্তব্য ছিল আরও গভীর — রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামো সেই উৎপাদন-সম্পর্ককে রক্ষা করে, যার ওপর সমাজের বিরাজমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে।

এই ধারণাকে আন্তোনিও গ্রামশি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল দমন (Coercion)-এর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; সমানভাবে দাঁড়িয়ে থাকে সম্মতির (Consent) ওপর। সংসদ, আদালত, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, সাহিত্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান — সব মিলিয়ে রাষ্ট্র একটি নৈতিক ও বৌদ্ধিক নেতৃত্ব (moral and intellectual leadership) নির্মাণ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র কেবল শাসন করে না; সমাজকে নির্দিষ্টভাবে ভাবতেও শেখায়।
গ্রিক মার্কসবাদী রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ নিকোস পুলান্টজাস এই আলোচনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেন। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্র হলো ‘শ্রেণিসমূহের শক্তির সম্পর্কের ঘনীভূত রূপ’ (the condensation of class relations)। এই সংজ্ঞার অর্থ এটি রাষ্ট্রকে কোনো একমাত্রিক যন্ত্র হিসেবে দেখে না। রাষ্ট্রের ভেতরেও দ্বন্দ্ব আছে, প্রতিরোধ আছে, আপস আছে। ফলে সংবিধানও কেবল শাসকশ্রেণির দলিল নয়; এটি নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের ক্ষেত্রও হতে পারে।
এই তাত্ত্বিক অবস্থান থেকেই ভারতের সংবিধানকে পড়া প্রয়োজন।

ভারতীয় সংবিধান বিপ্লব নয়, কিন্তু শুধুই আপসও নয়
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ভারত ছিল গভীর সংকটে নিমজ্জিত বহুমাত্রিক সমাজ। দেশভাগের রক্তক্ষয়, সাম্প্রদায়িক হিংসা, শরণার্থীর ঢল, দেশীয় রাজ্যগুলির একীকরণ, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির উত্তরাধিকার এবং চরম দারিদ্র্য — এই বাস্তবতার মধ্যেই সংবিধান রচিত হয়।
এই কারণে ভারতীয় সংবিধানকে কেবল উদারপন্থী গণতন্ত্রের দলিল বললে ভুল হবে। আবার একে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দলিল বললেও ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে। এটা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন সামাজিক শক্তির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা (Historical Compromise)।
একদিকে সংবিধান ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন, ধর্মনিরপেক্ষতা, সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্দেশক তত্ত্বে (Directive Principles of State Policy) এমন এক সমাজের স্বপ্ন ব্যক্ত করে, যেখানে অর্থনৈতিক ন্যায়, সামাজিক সমতা এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হবে।
এই দ্বৈত চরিত্র ভারতীয় সংবিধানের সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার সবচেয়ে বড় টানাপোড়েনও।
ড. বিআর আম্বেদকর এই টানাপোড়েন গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। ২৫ নভেম্বর ১৯৪৯-এ সংবিধান সভায় তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন —
"Political democracy cannot last unless there lies at the base of it social democracy." (সামাজিক গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হলে রাজনৈতিক গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।)
আম্বেদকর পরের বাক্যেই ব্যাখ্যা করেছিলেন, সামাজিক গণতন্ত্র বলতে তিনি কী বোঝেন —
"Social democracy means a way of life which recognises liberty, equality and fraternity as the principles of life." (সামাজিক গণতন্ত্র বলতে আমি এমন এক জীবনদর্শনকে বুঝি, যা স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বকে সমাজজীবনের মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।)
এই দু’টি বাক্যের মধ্যেই ভারতীয় সংবিধানের ভবিষ্যৎ সংকটের পূর্বাভাস নিহিত ছিল।
আম্বেদকর বুঝেছিলেন, যদি সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, জাতিভিত্তিক নিপীড়ন এবং সামাজিক অসমতা অব্যাহত থাকে, তবে রাজনৈতিক গণতন্ত্র ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে। ভোটাধিকার তখন কাগজে থাকবে, কিন্তু বাস্তব ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাবে না।
এইখানেই আম্বেদকর এবং মার্কসের মধ্যে একটি আকর্ষণীয় সংলাপ তৈরি হয়।
‘ইহুদি প্রশ্ন প্রসঙ্গে' গ্রন্থে (১৮৪৩–৪৪) মার্কস রাজনৈতিক মুক্তি (Political Emancipation) এবং মানবমুক্তি (Human Emancipation)-র মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য করেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র নাগরিকদের আইনি ও রাজনৈতিক সমতা দিতে পারে; কিন্তু তাতে সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রেণিগত সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না। আম্বেদকরও অন্য ভাষায় একই সতর্কতা দিয়েছিলেন — সংবিধান সামাজিক গণতন্ত্র ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
অর্থাৎ ভারতের সংবিধানের প্রকল্প ছিল কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম তৈরি করা নয়; ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে ধীরে ধীরে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তরিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্মাণ করা।
কিন্তু এখানে একটা ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাও ছিল।
স্বাধীনতা এলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় অংশ অপরিবর্তিত রয়ে গেল। ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতন্ত্র, পুলিশ ব্যবস্থা, দণ্ডবিধি এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতির অনেকটাই স্বাধীন ভারতে বহাল থাকল। এছাড়াও সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে ভারতীয় পুঁজিবাদ সমঝোতা করায় অর্থনৈতিক মৌলিক কোনও পরিবর্তনও হোল না। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সংবিধানের ভিতরে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের কিছু কাঠামোও বহন করে আনা হলো।
এই দ্বৈততা বোঝা ছাড়া ভারত রাষ্ট্রকে বোঝা অসম্ভব।
 
নয়া উদারনীতি, কর্পোরেট পুঁজি ও নয়া-ফ্যাসিবাদের প্রশ্ন
ভারতীয় সংবিধানের ভেতরে যে দ্বৈততা নিহিত ছিল — একদিকে রাজনৈতিক গণতন্ত্র, অন্যদিকে গভীর সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য — তার চরিত্র স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে নতুনভাবে রূপ নিতে শুরু করে। বিশেষত ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর ভারতে রাষ্ট্রের ভূমিকা, পুঁজির প্রকৃতি এবং গণতন্ত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য কেবল অর্থনীতির ভাষা যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রতত্ত্ব, মতাদর্শ এবং রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব — সবকিছুকেই একসঙ্গে পড়তে হয়।
অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়ক বারবার যুক্তি দিয়েছেন, নয়া উদারনীতি (Neo Liberalism) কেবল বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটা রাষ্ট্রের সামাজিক চরিত্রকেও পুনর্গঠিত করে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন এক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়, যার প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় পুঁজির সঞ্চয়কে অনুকূল রাখা। রাষ্ট্র তখন নাগরিকের কাছে জবাবদিহির চাইতে বিনিয়োগকারীর কাছে আস্থাশীল হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সামাজিক ব্যয়, শ্রমিকের সুরক্ষা, কৃষি বা জনকল্যাণের পরিবর্তে অগ্রাধিকার পায় বিনিয়োগের পরিবেশ, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং কর্পোরেট প্রতিযোগিতা।
হাঙ্গেরীর অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ কার্ল পোলানি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মহান রূপান্তর’ (The Great Transformation)-এ দেখিয়েছিলেন, যখন বাজার নিজেকে সমাজের নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন সমাজের ভেতরে এক গভীর অস্থিরতা জন্ম নেয়। মানুষ কেবল অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই হারায় না; হারায় পরিচয়ের স্থিতিও। এই অনিশ্চয়তার সময়েই সমাজ প্রায়শই এমন রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, যারা জটিল অর্থনৈতিক সমস্যার সহজ সাংস্কৃতিক উত্তর দেয়। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ হিসেবে পুঁজির কেন্দ্রীভবনকে নয়, বরং ‘অন্য’ কোনো সম্প্রদায়, ধর্ম, অভিবাসী বা সংখ্যালঘুকে সামনে আনা হয়। পোলানির বিশ্লেষণ আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রসঙ্গত, তিনি কিন্তু মার্কসবাদী ছিলেন না, যদিও তাঁর লেখায় মার্কসের মতবাদের গভীর প্রভাব দেখা যায়।

এই বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক এবং বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি। তাঁর কাঠামোগত সংকটের (Organic Crisis) ধারণায় ব্যাখ্যা করেন, শাসকশ্রেণির সংকট তখনই প্রকট হয়, যখন তারা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের জোরে নয়, সমাজের সম্মতির মাধ্যমেও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। গ্রামশির বিখ্যাত উক্তি —"The old is dying and the new cannot be born; in this interregnum a great variety of morbid symptoms appear." (পুরোনো পৃথিবী মরে যাচ্ছে, নতুন পৃথিবী এখনও জন্ম নিতে পারেনি; আর এই অন্তর্বর্তী কালে নানা ধরনের বিকৃত উপসর্গ দেখা দেয়)। এই মতবাদ অন্তর্বর্তী সময়ের রাজনৈতিক চরিত্রকে ব্যাখ্যা করে। পুরোনো সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়ে, কিন্তু নতুন কোনো ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক ঐকমত্য গড়ে ওঠে না। এই শূন্যস্থানেই কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি শক্তি সঞ্চয় করে।
গ্রামশির কাছে আধিপত্য (Hegemony) মানে কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়; সাংস্কৃতিক নেতৃত্বও। তাই ইতিহাসের পুনর্লিখন, শিক্ষার বিষয়বস্তু পরিবর্তন, সংবাদমাধ্যমের বয়ান, সংস্কৃতির বৈচিত্র ধ্বংস করা বা ‘জাতীয় সংস্কৃতি’-এর একমাত্রিক সংজ্ঞা — এই সবকে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার বিস্তৃত পরিসরের অংশ হিসেবে দেখতেন। এখানেই কর্পোরেট পুঁজি এবং মতাদর্শের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং তথ্যপ্রবাহ হাতেগোনা কয়েকটা বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন জনমত গঠনের ক্ষেত্রও ক্রমশ অসম হয়ে পড়ে। সংবাদ তখন কেবল তথ্য নয়; মতাদর্শ উৎপাদনের ক্ষেত্রও হয়ে ওঠে।

জামাইকায় জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক, সমাজবিজ্ঞানী এবং মার্কসবাদী চিন্তাবিদ স্টুয়ার্ট হল এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে ‘কর্তৃত্ববাদী জনতাবাদ’ (Authoritarian Populism) ধারণাটি ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, আধুনিক কর্তৃত্ববাদ সবসময় সংবিধান বাতিল করে আসে না; বরং অনেক সময় সংবিধানের ভেতর দিয়েই তার প্রভাব বিস্তার করে। নির্বাচন, সংসদ, আদালত — সবকিছুই বহাল থাকে; কিন্তু জনপরিসরের বৈচিত্র্য সংকুচিত হতে থাকে। রাষ্ট্রের সমালোচনা এবং রাষ্ট্রবিরোধিতার মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। বিরোধী মতকে প্রায়শই জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নিরাপত্তা, জাতীয় ঐক্য বা সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ভাষা ব্যবহার করে নাগরিক স্বাধীনতার পরিসর সীমিত করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। হলের মতে, এই ধরনের রাজনীতি কেবল দমন নয়; জনপ্রিয় সম্মতিও সংগঠিত করে।

এই আলোচনায় ইতালীয় দার্শনিক, সেমিওটিশিয়ান (চিহ্নতত্ত্ববিদ), সাহিত্য-সমালোচক, ঔপন্যাসিক এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী বুদ্ধিজীবী উমবের্তো একো-র ‘আদি ফ্যাসিবাদ’ (Ur-Fascism) প্রবন্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একো দেখিয়েছিলেন, ফ্যাসিবাদকে কেবল ১৯৩০-এর ইতালি বা জার্মানির অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তিনি কিছু পুনরাবৃত্ত বৈশিষ্ট্যের কথা বলেন — কোনও পৌরাণিক অতীতের গৌরব নির্মাণ, বহুত্ববাদকে দুর্বলতা হিসেবে দেখানো, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা, এবং যুক্তির পরিবর্তে আবেগকে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান মাধ্যম করে তোলা। তবে একো কোথাও বলেননি যে এই বৈশিষ্ট্যগুলির এক বা দুটি উপস্থিত থাকলেই কোনো রাষ্ট্রকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলা যায়। বরং তিনি সতর্ক করেন — এই প্রবণতাগুলিকে চিহ্নিত করা জরুরি, কারণ এগুলি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করতে পারে।

ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই ধারণাগুলিকে প্রয়োগ করতে হলে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। মার্কসবাদীদের বিশ্লেষণের কাজ কোনো রাজনৈতিক লেবেল লাগানো নয়; বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের বহুত্ব, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সাংবিধানিক নৈতিকতার বাস্তব অবস্থাকে বিশ্লেষণ করা। এখানেই ভারতীয় সংবিধানের শক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরালা রাজ্য (১৯৭৩) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে, সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা সীমাহীন নয়; সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে (Basic Fabric) ধ্বংস করা যায় না। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্র — এসবকে পরবর্তী রায়গুলিতে এই মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ধারণা, কারণ এটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপরও সাংবিধানিক সীমা আরোপ করে।
মানেকা গান্ধী বনাম ভারত সরকার (১৯৭৮) মামলায় আদালত অনুচ্ছেদ ২১-এর নতুন ব্যাখ্যা দেয় এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে কেবল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত করে। আবার এসআর বোম্মাই বনাম ভারত সরকার (১৯৯৪) মামলায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই রায়গুলি দেখায় যে সংবিধান কেবল ক্ষমতার দলিল নয়; ক্ষমতার ওপর সীমারেখাও।
কিন্তু মার্কসবাদ আমাদের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো সংবিধানই নিজে নিজে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে না। গ্রামশির ভাষায়, আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার পেছনে সক্রিয় সামাজিক শক্তি থাকে। আম্বেদকরও ‘সাংবিধানিক নৈতিকতা’-এর (Constitutional Morality) কথা বলতে গিয়ে এই বিষয়টিই বোঝাতে চেয়েছিলেন। সংবিধান কেবল বিচারপতিদের দলিল নয়; নাগরিকদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও দলিল। নাগরিক সমাজ যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা থেকে সরে আসে, তবে বিশ্বের সবচেয়ে প্রগতিশীল সংবিধানও কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোকে রক্ষা করার প্রশ্ন কেবল আদালতের লড়াই নয়; এটা শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মহিলা, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং সমস্ত গণতান্ত্রিক নাগরিকের অংশগ্রহণে নির্মিত একটি সামাজিক সংগ্রাম। মার্কসবাদের ভাষায়, গণতন্ত্র কোনো স্থির অবস্থা নয়; এটা সর্বদাই একটি অসমাপ্ত প্রকল্প।
আজ ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই কেবল এটা নয় যে সংবিধান টিকে থাকবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো — সংবিধানের ‘আত্মা’, অর্থাৎ স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায় এবং ভ্রাতৃত্বের প্রতিশ্রুতি কতটা জীবন্ত থাকবে। কারণ ইতিহাস আমাদের শেখায়, সংবিধানের মৃত্যু একদিনে ঘটে না; তার মৃত্যু শুরু হয় তখনই, যখন নাগরিকরা ধীরে ধীরে তার ভাষা, তার মূল্যবোধ এবং তার নৈতিক সাহস ভুলে যেতে শুরু করেন।

ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোকে রক্ষা করার অর্থ কেবল একটি আইনি নথিকে সংরক্ষণ করা নয়; বরং এমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে রক্ষা করা, যেখানে রাষ্ট্রের বৈধতা আসে নাগরিকের স্বাধীনতা থেকে, মতভেদের প্রতি সহিষ্ণুতা থেকে এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার অবিরাম প্রচেষ্টা থেকে। মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এটাই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি — রাষ্ট্রকে কেবল প্রশ্ন করার অধিকার নয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে আরও গণতান্ত্রিক করে তোলার সংগ্রামও জরুরি।
প্রকাশ: ১৯-আগস্ট-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 19-Aug-26 08:56 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/indias-constitutional-structure-and-the-danger-of-new-fascism - exists in postID 32302
Categories: Fact & Figures
Tags: constitution, fascism, neo fascism, neoliberalism, neo
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড