মহাত্মার চিঠি, যোশীর উত্তর

Author
ওয়েবডেস্ক

আমাদের কোষাধ্যক্ষ পি সুন্দরাইয়া বর্তমানে বিজয়ওয়াড়ায় রয়েছেন। সেখানে তিনি পার্টির প্রায় এক হাজার সদস্যকে নিয়ে একটি খাল থেকে পলি অপসারণের কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা হয় এবং কৃষকেরা আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে পারেন। সরকারি জনপথ বিভাগ এ কাজে নিজেদের অক্ষমতার কথা জানিয়েছিল, তাই আমাদের কর্মীরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছেন।

Mahatma’s Letter, Joshi’s Response

ভূমিকাঃ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ইতিহাসের এক বিরাট পর্ব। তার শেষ পর্যায় ১৯৪০’এর দশক, ততদিনে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দেশবাসীর চিন্তা-চেতনায় ‘মহাত্মা’ হিসাবে গৃহীত। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’র প্রথম সাধারণ সম্পাদক পূরণ চাঁদ যোশী’র সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর সুপরিচিতি ছিল, আলাপ-আলোচনা ছাড়াও তারা পরস্পরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রসঙ্গে চিঠি লিখেছিলেন। আজকের প্রতিবেদনে সেইসব চিঠির সংকলন থেকেই দুটি’কে বেছে নেওয়া হয়েছে। তৎকালীন বিশ্বযুদ্ধ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতের পরিস্থিতি সম্পর্কে মহাত্মার মতামত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মেলেনিকমিউনিস্ট পার্টি ও তাদের কাজ সম্পর্কে অনেকেই নানারকম কথাবার্তা বলতেন, কিছুটা শুনে বাকিটা ধরে নিয়ে। কমিউনিস্টদের নীতি ও কর্মপদ্ধতি প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধী কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, যোশী সেগুলিরই উত্তর দেন।

দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস প্রসঙ্গে এ দুটি চিঠি শুধু ঐতিহাসিক তথ্যের কারনেই উল্লেখযোগ্য নয়, নীতি সাম্যবাদের বিশ্বজনীন মতাদর্শের ভিত্তিতে কমিউনিস্ট’রা নিজেদের দেশে কিভাবে কাজ করেছিল, কি করতে চেয়েছিল তা উপলব্ধি করতে সহায়ক বলেও গুরুত্বপূর্ণ।

মূল চিঠিগুলি ইংরেজিতে লেখা, ওয়েবডেস্কের তরফে তারই বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে।

 

জুহু,

১১ জুন ১৯৪৪

প্রিয় যোশী,

আমাদের সাক্ষাতের সময়* যে প্রশ্নগুলি তুলেছিলাম, তার দ্রুত উত্তর আশা করেছিলাম। এর মধ্যে আরও কয়েকটি প্রশ্ন উঠেছে। অনুগ্রহ করে সবগুলির উত্তর দিন।

১. ‘জনযুদ্ধ’ (People's War) শব্দে ‘জন’ বলতে কাদের বলা হচ্ছে? জনযুদ্ধ কি ভারতের কোটি কোটি মানুষের যুদ্ধ, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য, আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নাকি সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্যই যুদ্ধ? মিত্রশক্তি কি সত্যিই এমন কোনও যুদ্ধ করছে?

২. আপনার প্রতিনিধিত্বকারী কমিউনিস্ট পার্টির অর্থভাণ্ডার কি জনসমক্ষে নিরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত? যদি তেমনটি হয়, আমি কি তা দেখতে পারি?

৩. শোনা যাচ্ছে গত দু-বছরে শ্রমিক ধর্মঘটের নেতা ও সংগঠকদের গ্রেপ্তারে কমিউনিস্ট পার্টি নাকি সক্রিয়ভাবে সরকারকে সাহায্য করেছে।


৪. কমিউনিস্ট পার্টি নাকি গোপনে কংগ্রেসের সংগঠনে প্রবেশ করে তাকে প্রভাবিত করার নীতি গ্রহন করেছে, এমন কথা উঠছে।

৫. কমিউনিস্ট পার্টির নীতি কি বিদেশ থেকে নির্ধারিত হয় না?

ইতি,
এম কে গান্ধী

*এ চিঠির প্রথমেই গান্ধীজি পি সি যোশীর সঙ্গে সাক্ষাতের যে উল্লেখ করেছেন তা ১৯৪৪ সালের জুন মাসের গোড়ার দিকের ঘটনা। তারও আগে ঐ বছরেরই ৬ই মে যোশী গান্ধী’কে একটি চিঠি লিখে জানান যে কমিউনিস্ট পার্টি নীতি ইত্যাদি প্রসঙ্গে তিনি আলোচনায় রাজি আছেন। পি সি যোশী’র লেখা সেই চিঠির পরেই মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যোশীর প্রত্যক্ষ সাক্ষাতে আলোচনা হয়েছিল, উপরের চিঠিটি তার পরে লেখা।

পি সি যোশীর উত্তর

বোম্বাই,

১৪ জুন ১৯৪৪

প্রিয় গান্ধীজি,


আপনার ছোট্ট চিরকুট পেয়ে আমি আনন্দিত হয়েছি। আপনি আমাদের সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী হয়েছেন জেনে ভালো লাগল। আমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিইনি, কারণ আপনার স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ দিতে চাইনি।

আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলছি—

‘জনযুদ্ধ’ বলতে আমরা সমগ্র বিশ্বের মানুষের যুদ্ধকে বুঝি। এর মধ্যে ভারতের জনগণ যেমন রয়েছে, তেমনি বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষও রয়েছে। আমাদের মতে এই যুদ্ধে পৃথিবী দুটি শিবিরে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, যা সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত রূপ। অন্যদিকে রয়েছে স্বাধীনতাকামী জনগণ। কোথাও তাদের সরকার প্রতিক্রিয়াশীল, কোথাও তারা এখনও উপনিবেশের শৃঙ্খলে আবদ্ধ; কিন্তু তাদের লক্ষ্য স্বাধীনতা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সংগ্রাম এ লড়াইকে নতুন শক্তি দিয়েছে।

আমরা মনে করি, উপনিবেশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে নিজেদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা। ভারতীয় জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে একই সঙ্গে জাতীয় সরকার ও স্বাধীনতার দাবিও আরও শক্তিশালী হবে।

প্রশ্ন ২- আপনার প্রতিনিধিত্বকারী কমিউনিস্ট পার্টির অর্থভাণ্ডার কি জনসমক্ষে নিরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত? যদি হয়, আমি কি তা দেখতে পারি?

আমাদের পার্টির অর্থভাণ্ডার এমন অর্থে জনসমক্ষে নিরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত নয় যে, যে-কোনও ব্যক্তি এসে তা পরীক্ষা করতে পারবেন। তবে আপনি নিজে হিসাব দেখতে আগ্রহী হয়েছেন জেনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। কারণ আমাদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার আপনার কানে পৌঁছেছে, তার সত্যতা আপনি নিজেই যাচাই করতে চাইছেন।

আমরা আপনাকে শ্রদ্ধা করি এবং বিশ্বাস করি। তাই আপনি যদি আমাদের হিসাব পরীক্ষা করতে চান, আমরা আন্তরিকভাবে তার ব্যবস্থা করব। আমাদের কোষাধ্যক্ষ পি সুন্দরাইয়া বর্তমানে বিজয়ওয়াড়ায় রয়েছেন। সেখানে তিনি পার্টির প্রায় এক হাজার সদস্যকে নিয়ে একটি খাল থেকে পলি অপসারণের কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা হয় এবং কৃষকেরা আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে পারেন। সরকারি জনপথ বিভাগ এ কাজে নিজেদের অক্ষমতার কথা জানিয়েছিল, তাই আমাদের কর্মীরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী ও আমাদের হিসাবরক্ষক লীলা-ও সেখানে আছেন। তাঁরা দু'জনেই শীঘ্র বোম্বাই ফিরে আসবেন।

আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে হিসাব দেখতে চান, তাহলে সমস্ত খাতা-পত্র নিয়ে তাঁরা আপনার কাছে উপস্থিত হবেন। আর যদি আপনি কোনও প্রতিনিধিকে নিয়োগ করেন, তাহলে আমাদের অনুরোধ থাকবে তিনি যেন এমন একজন সৎ ব্যক্তি হন, যাঁর সম্পর্কে আমাদেরও আস্থা আছে এবং যিনি আগে থেকেই আমাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট নন।

আমাদের হিসাব হয়তো কোনও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত নয়। বহু বছর ধরে আমাদের অবৈধ অবস্থায় কাজ করতে হয়েছে। সেই সময়ে বিস্তারিত হিসাব বা নথি রাখা ছিল বিপজ্জনক। ফলে এখনো আমরা সুশৃঙ্খল হিসাবরক্ষার অভ্যাস গড়ে তুলছি। আমাদের কাছে কিছু অজ্ঞাতনামা দাতাও আছেন। আমার বিশ্বাস, আপনার কাছেও এমন দাতা রয়েছেন। তবে যদি আপনার মনে সন্দেহ থাকে যে “অজ্ঞাতনামা” শব্দটি সরকারি অর্থ গোপন করার আড়াল, তাহলে আমি কেবলমাত্র আপনাকেই তাঁদের পরিচয় জানাতে প্রস্তুত।

আমি এমন কয়েকজন সহকর্মীকেও আপনার সামনে হাজির করতে পারি, যাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মূল্য লক্ষাধিক টাকা এবং যাঁরা তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি পার্টির কাজে উৎসর্গ করেছেন। তাঁরা ধনী ও সুপরিচিত পরিবারের সন্তান, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পদের চেয়ে দেশসেবাকে বড় বলে মনে করেছেন। তাঁদের সঙ্গে অল্পক্ষণ কথা বললেই আপনি বুঝতে পারবেন, তাঁরা নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক।

আপনার যদি তবুও সন্দেহ থাকে, তাহলে কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করছি— ইফতিখারউদ্দিন ও তাঁর বেগম, শওকত আনসারি, জোহরা এবং এন এম যোশী। তাঁরা জানেন, আমাদের অর্থ কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে ব্যয় হয়। তাঁরা এটাও জানেন যে সরকার আমাদের এক পয়সাও দেয় না।

ড. ও শ্রীমতী সুব্বরায়নের কাছ থেকেও আপনি জানতে পারেন যে তাঁদের সন্তান মোহন ও পার্বতী, যাঁরা আমাদের পার্টির সদস্য তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি কীভাবে পার্টির আদর্শে নিবেদিত হবে।

এবার আমি আপনাকেই একটি পাল্টা অনুরোধ করতে চাই। আপনি যদি পেয়ারেলালজিকে আমার সঙ্গে দেশের যে কোনও গ্রাম বা শহরে পাঠান, যেখানে আমরা কাজ করেছি, তাহলে তিনি দেখবেন কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের সভায় উপস্থিত হন। সভার শেষে আমি যখন পার্টি তহবিলের জন্য আবেদন করব, তখন তিনি নিজেই প্রত্যক্ষ করবেন—সাধারণ মানুষ আন্তরিকভাবে অর্থ দান করছেন।

আমরাও অর্থ সংগ্রহ করি সেই একই উৎস থেকে, যেখান থেকে আপনি করেন—এই দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। তাঁদের দেশপ্রেম, আমাদের প্রতি তাঁদের বিশ্বাস এবং আমাদের জনসেবাই এই অর্থ সংগ্রহের ভিত্তি। আমরা গর্বিত যে, জনগণের কাছ থেকে গণঅর্থ সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের যে ঐতিহ্য আপনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমরা সেই ধারাকেই এগিয়ে নিয়ে চলেছি।

প্রশ্ন ৩- শোনা যাচ্ছে গত দু-বছরে শ্রমিক ধর্মঘটের নেতা ও সংগঠকদের গ্রেপ্তারে কমিউনিস্ট পার্টি নাকি সক্রিয়ভাবে সরকারকে সাহায্য করেছে।

এই অভিযোগ করা খুব সহজ, কিন্তু তা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। আমি আইনজীবীর মতো কেবল এই বলে দায় এড়াতে চাই না যে অভিযোগকারীরাই প্রমাণ দিক। বরং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই উত্তর দিতে চাই।

প্রথমত, আপনি যদি নিশ্চিত হন যে সরকার আমাদের অর্থ জোগায় না, তাহলে নিশ্চয়ই এটাও বিশ্বাস করবেন যে আমরা শ্রমিক নেতাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো কাজ করতে পারি না।

দ্বিতীয়ত, আহমেদাবাদ ও জামশেদপুর বাদ দিলে ভারতের অধিকাংশ শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে আমাদের পার্টির নেতৃত্ব প্রশ্নাতীত। আমরা প্রকাশ্য সভায় আমাদের বিরোধীদের সঙ্গে বিতর্ক করি এবং তাঁদেরও শ্রমিকদের সামনে নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ দিই। প্রায় সমস্ত প্রধান শ্রমিক নেতা আমাদের পার্টির সদস্য। যাঁরা সদস্য নন, তাঁরাও আমাদের বন্ধু ও সহযোগী। শ্রমিক আন্দোলনের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে যাঁর সামান্য ধারণা আছে, তিনিও এমন অভিযোগ সহজে বিশ্বাস করবেন না।

শ্রী এন এম যোশী দেশের প্রবীণতম ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। তিনি কমিউনিস্ট নন। অতীতে তাঁর সঙ্গে আমাদের মতভেদ ছিল এবং আজও সব বিষয়ে আমাদের মত এক নয়। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনে আমাদের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর মতো অবহিত মানুষ খুব কমই আছেন। আপনি তাঁর সঙ্গে কথা বললে প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন।

বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতিতে আমরা ধর্মঘটের নীতি পরিত্যাগ করেছি। কারণ আমাদের বিশ্বাস, সেই সময় ধর্মঘট করলে তা একদিকে জাপানি আগ্রাসীদেরই সুবিধা দিত, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করত।

শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান অবনতির মধ্যেও আমরা তাঁদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কথা বুঝিয়ে ধর্মঘট থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছি। এটিই প্রমাণ করে যে শ্রমিক শ্রেণি কেবল আমাদের ওপর আস্থা রাখে না, দেশের বৃহত্তর স্বার্থকেও নিজেদের স্বার্থ বলে মনে করে।

প্রশ্ন ৪- কমিউনিস্ট পার্টি নাকি গোপনে কংগ্রেসের সংগঠনে প্রবেশ করে তাকে প্রভাবিত করার নীতি গ্রহন করেছে, এমন কথা উঠছে।

এমন অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। কংগ্রেসে “অনুপ্রবেশ” করার কোনও নীতি আমরা কখনও গ্রহণ করিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির জন্মলগ্ন থেকেই আমরা কংগ্রেসের ভিতরে কাজ করে আসছি। এটি কোনও গোপন পরিকল্পনা নয়, বরং ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণেরই একটি স্বাভাবিক পথ।

মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার সময় সরকারি কৌঁসুলি ল্যাংফোর্ড জেমসও একই অভিযোগ তুলেছিলেন। তখনও আমরা এই অভিযোগকে হাস্যকর বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম। এর উদ্দেশ্য ছিল কংগ্রেসের অ-কমিউনিস্ট সদস্যদের আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তাঁদের মনে অকারণ ভয় সৃষ্টি করা।

আগে এই ধরনের প্রচার চালাত ব্রিটিশ শাসকেরা। এখন সেই একই অভিযোগ জাপানি প্রচারযন্ত্রও করছে। উভয়েরই লক্ষ্য এক—ভারতের জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করা।

আমাদের উদ্দেশ্য শত্রুতাপূর্ণ কি না, তার বিচার আমাদের সহকর্মী কংগ্রেস সদস্যরাই করবেন। অতীতেও আমরা তাঁদের ভালোবাসা ও সম্মান অর্জন করেছি এবং ভবিষ্যতেও আমাদের কাজের মাধ্যমেই সেই বিশ্বাস বজায় রাখতে চাই।

আমাদের বহু সহকর্মী অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি এবং বিভিন্ন প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই কংগ্রেসের ভেতরে কাজ করছেন।

আমরা কংগ্রেসে আছি, কারণ আমরা নিজেদের এই দেশের দেশপ্রেমিক সন্তান বলে মনে করি। দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয় সংগঠনের ভেতরে থেকেই আমরা স্বাধীনতার সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে চাই। কোনও অপপ্রচারই আমাদের এই পথ থেকে সরাতে পারবে না।

প্রশ্ন ৫- কমিউনিস্ট পার্টির নীতি কি বিদেশ থেকে নির্ধারিত হয় না?

ভারতের জনগণের স্বার্থ এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই তার নীতি নির্ধারণ করে।

এক সময় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল (কমিন্টার্ন) ছিল। তখন আমাদের “মস্কোর এজেন্ট” বলা হতো। কিন্তু কমিন্টার্ন বিলুপ্ত হওয়ার পরও একই অভিযোগ করা হচ্ছে। এটি বিস্ময়কর। আমি এই বিষয়ে কিছু নথি সংযুক্ত করছি। সেগুলোই প্রমাণ করবে যে এই অভিযোগ ভিত্তিহীন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি রয়েছে। তাদের আদর্শ এক হলেও প্রত্যেকটি পার্টি নিজ নিজ দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে নিজস্ব নীতি গ্রহণ করে। ব্রিটেন, আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া— সব দেশের কমিউনিস্ট পার্টিই ৯ আগস্টের পর কংগ্রেস নেতাদের গ্রেপ্তারের বিরোধিতা করেছে এবং ভারতের জন্য প্রকৃত জাতীয় সরকারের দাবি তুলেছে।

যুদ্ধ যত শেষের দিকে এগোচ্ছে, ততই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফিনল্যান্ড, যুগোস্লাভিয়া, ফ্রান্স ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির প্রকাশিত নথিতে আপনি দেখতে পাবেন, তারা প্রত্যেকে নিজেদের দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিজেদের জনগণের জন্য সংগ্রামের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

 

উপসংহার

আপনি যেমন খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে আমাদের সম্পর্কে আপনার মনে সন্দেহ রয়েছে, আমিও অকপটে বলছি—আপনার প্রশ্নগুলি আমাদের কষ্ট দিয়েছে। কারণ এগুলির মধ্যে সেই সব অপপ্রচারেরই প্রতিধ্বনি রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে কমিউনিজমের শত্রুরা দীর্ঘদিন ধরে ছড়িয়ে আসছে।

আমরা একটি নবীন রাজনৈতিক শক্তি। আমাদের জন্ম এই দেশের মানুষের মধ্যেই। দেশপ্রেমের যে অগ্নিশিখা আপনার মতো প্রবীণ নেতারা জ্বালিয়েছেন, সেই শিখার মধ্য দিয়েই আমাদের বিকাশ ঘটেছে। আমরা জানি, নতুন একটি শক্তিকে বোঝা সহজ নয়। কিন্তু আপনার মতো একজন জাতীয় নেতার কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, আপনি অপপ্রচারের বদলে আমাদের কাজের ভিত্তিতে বিচার করবেন।

মার্কসের সময় থেকে কমিউনিজমের মতো এত অপপ্রচার আর কোনও মতবাদের বিরুদ্ধে হয়নি। লেনিন ও স্টালিনের বিরুদ্ধে যত নিন্দা করা হয়েছে, ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। তবুও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকাশই প্রমাণ করে যে কুৎসা কোনও আদর্শকে ধ্বংস করতে পারে না।

আমরাও কমিউনিস্ট হওয়ার আগে বিভিন্ন ধারণা নিয়ে বড় হয়েছি। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের সেই ভ্রান্তি দূর করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, সত্য শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হবেই।

আপনি আমাদের খুব বেশি চেনেন না। কিন্তু জওহরলাল নেহরু আমাদের অনেক কাছ থেকে চিনতেন। কংগ্রেসের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নীতির প্রশ্নে আমরা বহুবার তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেছি। আজ তিনি কারাগারে। আপনার অন্যান্য সহকর্মীরাও বন্দি। ফলে দেশের জটিল পরিস্থিতিতে সঠিক পথ খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন অনেকটাই আপনার ওপর।

আজ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পরে কমিউনিস্ট পার্টিও দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের ভুলভাবে বিচার করা দেশের পক্ষেও ক্ষতিকর হবে।

আমরা জনগণের বিচারের ওপর আস্থা রাখি। সেই আস্থাই আমাদের শক্তি দেয়, সাহস দেয় এবং নিজেদের ভুল সংশোধনের প্রেরণাও দেয়। কংগ্রেস সমাজতন্ত্রীদের কেউ কেউ বলেন, সরকার আমাদের প্রশ্রয় দিয়েছে বলেই আমরা বেড়ে উঠেছি। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গত দুই বছরে আমাদের চারজন সহকর্মীকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। প্রায় চারশো কর্মী কারাগারে বন্দি এবং একশোরও বেশি কর্মী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। এ কি কোনও সরকারের আশীর্বাদের চিত্র?

ইতিহাস সাক্ষী, পরাধীন দেশে কেবল সেই রাজনৈতিক শক্তিই টিকে থাকে যারা জনগণের সেবা করে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। অন্য সব শক্তি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়।

খাদ্য সমস্যা এবং মুসলিম লীগের অবস্থান সম্পর্কে আরও কিছু নথি পাঠানোর বিষয়ে আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আর কোনও দীর্ঘ চিঠি পাঠিয়ে আপনাকে ক্লান্ত করতে চাই না।

আপনার দ্রুত আরোগ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি।

সশ্রদ্ধ,

পি সি যোশী


প্রকাশ: ১১-আগস্ট-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 10-Aug-26 20:16 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/mahatma’s-letter-joshi’s-response
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড