পরিবেশ হোক আগামীর চিন্তা – আগামীর সংস্কৃতি

উজ্জ্বল কুমার মুখোপাধ্যায়
১৯৯৭ পরবর্তী পৃথিবীতে পরিবেশের উপর আক্রমণ যেমন মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়তে থাকে তেমনি হারে বাড়তে থাকে সম্পদ এবং পুঁজির ঘনীভবনের গতিও। নতুন পৃথিবী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পৃথিবী বিশ্বাস করে না যে সম্পদ এবং পুঁজির বৃদ্ধির জন্য অন্য দেশের রাজনৈতিক প্রভুত্বকে আমার হাতের তলায় আনতে হবে, যা ছিল ঔপনিবেশিক পর্যায়ের পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলির ধারণা।

প্রথম পর্ব
অপরেশ বাবু বা অপরেশ সামন্ত মানুষটির পরিচয় অন্যত্র হয়ে থাকলেও বর্তমান লেখার পাঠককূলের কাছে তিনি চেনা মানুষ নন, এই আন্দাজে ওঁর পরিচয় এই লেখায় যুক্ত করলাম। ডাক ও তার বিভাগে অপুদা বললে আজ অবসরের বছর সাতেকের পরেও নতুন কাজে যোগ দেওয়া ছাড়া মোটামুটি সকলেই এক ডাকে চেনে। চেনে না বলে বরং জানে বলাই ভালো। যাদের কথা বলছি, তারা বেশির ভাগ-ই ওঁকে চোখের দেখা দেখেনি, একথা হলফ করে বলে যায়। কিন্তু বড়দের, মানে বয়:জেষ্ঠ্য সহকর্মীদের কাছ থেকে অপুদার সম্বন্ধে শুনতে শুনতে, অফিস ম্যাগাজিনে ওঁর লেখা পড়তে পড়তে, ইউনিয়নের বার্ষিক সভায়, বিভিন্ন বিভাগের বা জেলার সাংস্কৃতিক ক্লাবের আয়োজিত সেমিনারে, বা অধুনা, বিশেষত এই অনলাইনের বাজারে ওয়েবিনারগুলিতে ওঁর তীব্র যুক্তিবোধ সমৃদ্ধ ক্ষুরধার আলোচনাগুলি শুনতে শুনতে ওঁকে যেমন ভাবে জানা যায়, সেই আর কী। কিন্তু তাই বলে অপরেশ সামন্ত কোনো ভিন গ্রহের বাসিন্দা নন। আজীবন বাড়ি থেকে সাইকেলে সাঁতরাগাছি ইস্টিশন, ট্রেন-এ হাওড়া আর তারপর বাসে চেপে ডালহৌসি। আবার দিনের শেষে সেই রাস্তায় ফেরা। মাঝে বার তিনেক চা, আর দেড়টা নাগাদ দুটো রুটি আর আলু ছেঁচকি। এক্কেবারে আটপৌরে বাঙালীর জীবন যেমন। তফাৎ অবশ্যই আছে কিন্তু আমাদের সকলের সাথে ওঁর, যার জন্য এই ভনিতা। তফাৎ-টা ওঁর বিচক্ষনতার বিচ্ছুরণে। দুর্বলতা বা নেশা, যা-ই বলা যাক, অপরেশ সামন্তের এমন অভ্যাস দুটি। গঙ্গাস্নান, আর নিয়মানুবর্তিতা। রোজ সকালে ৩১ নম্বর বাকসাড়া বাজার রোডের বাড়ি থেকে সাইকেলে নাজিরগঞ্জ ঘাটে তিনটে ডুব, আর দশটার মধ্যে আপিস। এর অন্যথা অপরেশ-বৌদিও মনে করতে পারেন না। ব্যতিক্রম ছিল কেবল ওঁর অবসরের দিন। অপুদা সেদিন আপিসে ঢোকেন সওয়া দশটায়। অনেক পরে জানা যায় সেদিন ভোররাতে তিনকড়ি সামন্ত, মানে অপরেশ বাবুর বাবা শেষ নি:স্বাস ত্যাগ করেন। এছাড়া কোনোদিন যদি এমন মনে হত যে কোনো কারণে আপিস ঢুকতে দশটা বেজে যাবে, সেদিন আর বাস থেকে নামা নেই। এক্কেবারে ধর্মতলা, আর সেখান থেকে হয় ব্রিটিশ কাউন্সিল, নতুবা সটান আলিপুরের জাতীয গ্রন্থাগার। অবশ্য আরো একটি গন্তব্য চম্বুক-এর মতো টেনে নিয়ে যেত অপরেশ সামন্তকে মাঝে মধ্যে-ই। অপরেশ বাবুর স্বপ্ন-পুরুষ আচার্য্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কর্মক্ষেত্র গোয়াবাগানের বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদে। অপরেশ বাবুর সবচেয়ে শ্লাঘার বিষয় ছিল এটা, যে উনি আচার্য্যদেবকে দেখেছেন, এমনকি তেনার কাছে আদর-ও খেয়েছেন। বাবা ছোটবেলা থেকে গ্রুপথিয়েটার-এর সর্বক্ষণের কর্মী হওয়াতে ওঁর বড় হওয়া ঠাকুরদার হাত ধরে। সূর্যদেব সামন্ত, অপরেশ বাবুর ঠাকুরদা, বাকসাড়া স্কুলের পদার্থবিদ্যার মাস্টার, ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বি.এ. ক্লাস-এর সহপাঠী।
আলোচনাটা হাওড়া শিবপুরের ষষ্টিতলার ঘোষালবাড়ির বৈঠকখানার আড্ডা কেন্দ্রিক। সাইকেল চেপে এই আড্ডায় নিত্যনৈমিত্তিক উপস্থিতি অপরেশবাবুর অন্যতম নেশা । এ ছাড়া পার্মানেন্ট মেম্বার বাকি জনা ছয়েকের, যাদের বয়স আঠার থেকে উনসত্তর, তাদের সকলেরই বাস অবশ্য ঘোষাল বাড়ির থেকে হাঁটা রাস্তায়। পার্মানেন্ট মেম্বার মানে তাস-পেটার সদস্যরা আর কী । কিন্তু তাতে তাস বা আড্ডার কিছুই যায় আসে না। কারণ তাস ছাড়াও তর্ক-সভা জমে এখানে দুর্দান্ত । এবারের ভারী বৃষ্টি, আনাজের দাম আর হওয়া দূষণ বিষয়-এ কথা বার্তায় আবহাওয়ার খামখেয়ালী ব্যবহার, বিশেষকরে ভ্রমণ সুখী বাঙালির স্বপ্নের বিচরণ ক্ষেত্র হিমালয়ের ঘটে যাওয়া এবছরের সাংঘাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগাবলী ভ্রমণসুখী বাঙালির স্বপ্নের বিচরণ ক্ষেত্র হিমালয়ের ঘটে যাওয়া এবছরের সাংঘাতিক পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগাবলী ব্যাখ্যা করছিলেন অপুদা একদিন। আর তাতেই কমবয়সীদের আবদারে রাজি হয়ে যান তিনি বিশ্ব পরিবেশ দিবসে একটু বিশেষভাবে পরিবেশ আলোচনা উত্থাপনের প্রস্তাবে।
প্রাইমারি স্কুলের হেড দিদিমণি হিমু দি ঘোষালবাড়ির বৈঠকখানার ম্যানেজার বিশেষ। ওঁর নির্দেশেই এবং ব্যবস্থাপনাতেই চা, জল খাবার, আড্ডা খানার সাফ-সুতরো, সবকিছুই হয়ে থাকে। তেমনি এরকম বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজকও ওঁকে ছাড়া আর কারুর কথা ভাবাই যায় না। আজকের পরিবেশ আলোচনার মঞ্চটাও তাই ওঁরই দখলে। আয়োজন হয়েছে ঘোষালদের ঠাকুরদালানে। শ-দেড়েক মানুষ উপস্থিত। চৌকিটার, যেটা এ ধরনের অনুষ্ঠানে স্টেজ বিশেষ হয়ে থাকে, তার এক কোনায় দাঁড়িয়ে উঠে অপুদার নাম প্রস্তাব করা ছাড়া আর খুব একটা এগোতে সাহস করলেন না হিমু দি। চৌকির এক কোণে ধপ করে বসে পড়ার পর অপরেশ বাবু যে আলোচনা করেছিলেন স্মৃতি থেকে তার অনুলিখন নীচে পেশ করলাম।
পরিবেশ সংক্রান্ত বড় ঘটনা বলতে সেই ১৯৫২ সালের প্রথম দ্য গ্রেট লন্ডন স্মগ-এর কথা আসে । প্রায় তিন-চার দিন একটানা লন্ডন শহরে বিশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যেতো না । তারিখটা ছিল ছয় থেকে নয় ডিসেম্বর । শুধু একটা পরিসংখ্যানই এই ঘটনার তীব্রতা কে সূচিত করে - সেটা হল ওই সপ্তাহখানেকের মধ্যে ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু, আর লক্ষাধিকের terminal lung-related ailment. সব মৃত্যু বাতাসে বায়ুদূষণজনিত কারণে ফুসফুসের ক্ষমতা হ্রাস হয়ে যাওয়া, এবং অক্সিজেন-এর অভাবে যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যু। এরপরে যে সাংঘাতিক পরিবেশজনিত ঘটনা ঘটে যেতে থাকে পুরো ষাটের দশক জুড়ে এবং সত্তরের দশকের গোড়ায় সেটা হল অ্যাসিড বৃষ্টি । অ্যাসিড বৃষ্টির মত এত সাংঘাতিক ঘটনা মানুষের আগে জানা ছিল না। গরমের দিন শেষে আশীর্বাদের মতো আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টি যদি তার সাথে প্রভূত পরিমাণে অ্যাসিড সমেত নেমে আসতে থাকে তাহলে কি হয় সেটা মানুষ বুঝেছে ষাটের দশকে প্রধানত উত্তর ইউরোপের দেশগুলিতে। লন্ডন-স্মগ এক বিশেষ এবং বিপুল পরিবেশ দুর্ঘটনা, তেমনই, উত্তর ইউরোপের দেশগুলির অ্যাসিড বৃষ্টিও। এই দুটি ছাড়াও সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে পরিবেশ সংক্রান্ত দুর্ঘটনা যেন ঘটেই চলেছিল এই সময়টা জুড়ে। অ্যাসিড বৃষ্টির ঘটনা ক্রমাগত তার পরিধি বাড়াতে থাকে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারতবর্ষ, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া - বস্তুত কোন ভূখণ্ডই আর বাকি থাকে না । অগত্যা পরিস্থিতির চাহিদা এটাই হয় যে এই ধরনের ঘটনাকে রুখতে পৃথিবীর সব দেশেরই রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে শুরু করেন যে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলির উপর বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজন । উৎপাদন, মুনাফা এবং উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর অত্যাচারের একটা বাঁধন দরকার। না হলে প্রকৃতির প্রত্যুত্তর সামলানোর মতো সভ্যতা গড়ে ওঠা সম্ভব নয় । অতএব তারা আলোচনায় বসে, আর শুরু হয় বর্তমান পৃথিবীর প্রথম পরিবেশ সম্মেলন ১৯৭২ সালে, সুইডেন-এর রাজধানী স্টকহোলম শহরে। ভারতবাসী হিসেবে গর্ব অনুভব করতে পারি এইজন্য যে এই সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী।
১৯৭২ সালের এই পরিবেশ সম্মেলনের মঞ্চ থেকেই ছোট বড় সব দেশই একটা বিষয়ে একমত হল যে প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে পরিবেশ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করবে, আর এই আইনের অভিমুখ মোটামুটি ওই সম্মেলন-ই ঠিক করে দেয় যা নিয়ে মতানৈক্যের কোন বিষয় আমরা কখনো দেখিনি । এই আইনের অভিমুখ বলতে গেলে এক কথায় বলা যায় কনজারভেশন অফ নেচার বা পরিবেশের সংরক্ষণ । এই ধারাতেই আমাদের দেশেও ১৯৭৪ সালে আমরা প্রথম পেলাম জল দূষণ নিরোধ সংক্রান্ত এবং এরপরই ১৯৮১ তে বায়ুদূষণ নিবারণ সংক্রান্ত আইন । আর তারপরেই ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত সবথেকে বড় এবং জঘন্যতম পরিবেশ দুর্ঘটনা, যার সাক্ষী হয় ভারতবর্ষের একদম মাঝখানে থাকা ভূপাল শহর । ১৯৮৪ সালের ভূপালের ইউনিয়ন কারবাইড কারখানায় বিষাক্ত গ্যাস লিক-এর ঘটনা, যাতে মুহুর্তে প্রায় চার হাজার মানুষ্ মারা যান, আর অসুস্থ হয়ে জীবন কাটান আরো প্রায় ছয় লক্ষাধিক মানুষ। সেই দুর্ঘটনার বিস্তারের আলোচনার কোন সুযোগ এই পরিসরে নেই, তা সত্ত্বেও এ কথা বলা যায় ওই দুর্ঘটনা ঘটা এবং তার পরবর্তীকালে দুর্ঘটনা-উত্তর পরিস্থিতির ব্যবস্থাপনায় এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে পরিবেশ সংক্রান্ত এই ধরনের বড় এবং সাংঘাতিক ঘটনা বা দুর্ঘটনাকে সামলানোর মতো জায়গায় আমাদের দেশ তখনও আসেনি । অতএব প্রয়োজন হয় আইনী পরিকাঠামোর এক নতুন ভিত্তি যার উপরে ১৯৮৬ সালে আমরা পাই পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৮৬ পরিভাষায় Environment Protection Act – 1986 । এই নতুন আইন কে আমরা জেনে এসেছি আমব্রেলা অ্যাক্ট হিসেবে যার মানে হল এই আইনের ধারার ক্ষমতা অন্য যেকোনো আইনের চেয়ে বেশি । অর্থাৎ প্রয়োগিক ক্ষেত্রে যদি দেখা যায় অন্য কোন আইনের কোন ধারার সাথে এই আইনের ধারার বৈপরীত্য উপস্থিত হয়েছে তবে সভ্য সমাজ এই পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা মেনে নিতে বাধ্য হবে। অতএব শুরু হল আমাদের দেশে পরিবেশ সংরক্ষণের এক নতুন অধ্যায় ।
এরপর ১৯৯২ সালে এলো ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো শহরে পৃথিবীর প্রথম বায়ো ডাইভারসিটি কনভেনশন । এই বায়োডাইভারসিটি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সভায় পৃথিবী পেল এক নতুন দিকনির্দেশ, যাকে আমরা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা টেকসই উন্নয়ন বলে জেনেছি । তার মানে এই সময়ের মধ্যে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে এই পৃথিবীতে পরিবেশের উপর আক্রমণ প্রধানত উন্নয়ন সংক্রান্ত কার্যক্রমের থেকেই হয় এবং এ ধারণা প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলেই নতুন এবং সময়োপযোগী ধারণা হলো উন্নয়ন বা ডেভলপমেন্টাল কাজকর্মের এক বিশেষ ধরণ প্রয়োজন । সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট কথাটার এক কথায় মানে হল সেই ধরনের উন্নয়ন ক্রিয়া কলাপ যাতে প্রতি মুহূর্তেই পৃথিবী ধাতস্থ হবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে । ধারণাটির নির্যাস হলো এই যে আমরা জানি এ পৃথিবীতে মানুষ তার বেঁচে থাকার এবং বেঁচে থাকার অবস্থার ক্রমাগত উন্নয়নের জন্য যে কার্যকলাপ, যাকে এক কথায় উন্নয়ন বলা হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুই প্রকৃতির ভান্ডার থেকেই আমরা নিয়ে থাকি । উদাহরণস্বরূপ ইট কাঠ পাথর এবং সমস্ত রকমের শক্তির উৎস যেমন কয়লা তেল এবং সূর্যালোক সবই প্রকৃতির অবদান। বিস্তর বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও পৃথিবী আজ এ কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে যে প্রকৃতির অবদানের এই ভান্ডার অসীম নয় । এ কথা আমাদের দেশের পরিবেশ নীতি ২০০৬ এ পরিষ্কার ভাবে লিপিবদ্ধ আছে । সেখানে আমরা ঘোষণা করেছি যে আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের ধারণা এবং উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে উঠেছে “অন দ্যা কনসেপ্ট অফ ফাইনাইটনেস অফ নেচার”, অর্থাৎ প্রকৃতি আমাদের যা দেয় তার সীমাবদ্ধতার উপর । এ ধারণা কোন কঠিন ধারণা নয় । সাদা চোখে সাদা মনে একটা সারা বছরকে যদি ঘুরে আসতে দেখি তাহলেই বোঝা যায়, কি জল, কি পাহাড় এবং মালভূমি থেকে বাহিত উর্বর পলি বা বালুকা রাজি এই সব কিছুই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ । আবার গাছ-গাছালি এবং অরণ্যরাজির দিকে তাকাই যদি তাহলেও দেখতে পাই গাছের ফল বা অন্যান্য শাক-সবজি যা প্রাকৃতিক ভাবেই মানুষের কাছে প্রকৃতি উজাড় করে দেয় তাও কিন্তু সসীম । অর্থাৎ প্রকৃতির মানুষের জন্য তার ডালি খুলতে কোন আপত্তি নেই । শুধু মানুষকে বুঝে নিতে হবে প্রকৃতির কাছ থেকে কি হারে তার উপহার মানুষ পেতে পারে এবং তাকে ব্যবহার করা, এই দুটি দ্রুতি বা হারের মধ্যে সমতা বজায় রাখার বিষয়টাই টেকসই উন্নয়ন বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এর ধারণা দিয়ে বাঁধা ।
১৯৯২ সালের এই নতুন উন্নয়ন ধারায় যখন আমরা চলতে শুরু করি তখন মনে হয়েছিল দিশা বুঝিবা পাওয়া গেল। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে ১৯৯৭ তে জাপানের কিয়োটো শহরে তৈরি হয় সম্ভবত পৃথিবীকে বাঁচাবার এবং আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার সর্বশেষ প্রকল্প, যাকে আমরা কিয়োটো প্রোটোকল বলে জেনে এসেছি । ২০১২ সালের মধ্যে সারা পৃথিবীর উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রীন হাউস এর উননব্বই সালে যে মাত্রা ছিলো, সেই মাত্রায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, এটাই কিয়োটো প্রোটোকল । ১৯৮৯ সালকে সূচিত করা হয় এ কারণেই যে বর্তমানে মানুষের হাতে যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি ভান্ডার বর্তমান, তার সাহায্যে ওই বছরের গ্রিন হাউস উদ্গমনের যে মাত্রা, তাতে বেঁধে রাখা এবং টেকসই উন্নয়নের যে ভিত্তি অর্থাৎ প্রকৃতির দান এবং মানুষের ব্যবহারের মধ্যে সমতা, তাকে প্রায়োগীকভাবে সফল করা সম্ভব। কাজে কাজেই কিয়োটো প্রোটোকল মানুষের কাছে এক নতুন বার্তা বয়ে নিয়ে এলো আর তা হলো ভবিষ্যৎটা পরিবেশগত দিক থেকে সুস্থ এবং শঙ্কাহীন করে ফেলবার প্রতিশ্রুতি । মানুষ ভাবল তো এরকম, কিন্তু মানুষ যে ভাবনাটাকে জেনেশুনে পাস কাটিয়ে গেল সেটা হল এ পৃথিবীর উৎপাদনের উপকরণ, যার থেকে উন্নয়নের সব কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদন হয়, তার মালিকানা যার হাতে সে এই কথাটা মানলো না। এই যে তারা মানলো না, সে কথা ঘোষণাও করল না সম্ভবত জনপ্রিয় জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এ ঘোষণা করবে না বলেই । কিন্তু চিরকাল তারা যেটা করে আসে তা হল চুপচাপ তাদের নিজেদের কাজ করে চলা। আমরা যদি গ্রিনহাউস গ্যাস উদগমনের হার এর দিকে তাকাই তাহলে দেখব এই ১৯৯৭ পরবর্তী পৃথিবী সবচেয়ে বেশি হারে এবং দ্রুততার সঙ্গে এই গ্রিনহাউস গ্যাস উদ্গমন করে চলেছে অথচ বিষয়টা হওয়া উচিত ছিল তার উল্টো । এর সঙ্গে সমতা রেখে এই উৎপাদনের উপকরণ আর উন্নয়নের কাজে যে টাকা লাগে, অর্থাৎ সেই পুঁজির ঘনীভবনের ইতিবৃত্তের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিস্কার হয়। আজকের এই আলোচনার পরিসরে পরিসংখ্যান দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না, কারণ সেটা বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে যেকোনো মানুষ তথ্যভাণ্ডার খুলে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু বুঝবার ব্যাপার এই যে ১৯৯৭ পরবর্তী পৃথিবীতে পরিবেশের উপর আক্রমণ যেমন মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়তে থাকে তেমনি হারে বাড়তে থাকে সম্পদ এবং পুঁজির ঘনীভবনের গতিও। নতুন পৃথিবী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পৃথিবী বিশ্বাস করে না যে সম্পদ এবং পুঁজির বৃদ্ধির জন্য অন্য দেশের রাজনৈতিক প্রভুত্বকে আমার হাতের তলায় আনতে হবে, যা ছিল ঔপনিবেশিক পর্যায়ের পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলির ধারণা। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখতে পাই যে অতীতের সেই শক্তিধর দেশগুলির মালিক যারা ছিলেন তারা নিজেদের ছদ্মবেশ পাল্টে আজ হয়েছেন মাল্টিন্যাশনালস। ওঁরা দেশের গণ্ডি মানেন না, ওঁরা উন্নয়নের এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সেই মডেল আনয়ন করেছেন যা একটা দেশের রাজনৈতিক গণ্ডি দিয়ে বাধা যাবে না। অর্থাৎ পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে এই শক্তিধরদের যেমন কোন দেশের গণ্ডি আটকাতে পারবে না, সম্পদ আহরণের পর তারা বাণিজ্যের জন্য যে পণ্য তৈরি করবে তার বিক্রি বাটাও কোন দেশের বাউন্ডারি দিয়ে আটকে রাখা যাবে না। বিশ্বায়নের এই মূলসূত্রের ওপর ভর করে নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা নিও ইকোনমিক পলিসি রূপায়ণ শুরু হল যার ভিত্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণের এবং টেকসই উন্নয়নের নীতিগুলিকে নস্যাৎ করে দেওয়াটাই হল দস্তুর। আর এর সাথে যুক্ত হল ইনফরমেশন টেকনোলজির সাংঘাতিক গতি বৃদ্ধি থেকে মানুষের মস্তিষ্কের দখলদারির যে আধুনিকতম মডেল তারা আনয়ন করতে পারল, তা। আজকের মানুষের অভ্যাসের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে ইলেকট্রনিক এবং কাগুজে মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমার নিজের প্রয়োজন বলে আমার মস্তিষ্কে যা বর্ষণ করে চলেছে তাকেই আমার প্রয়োজন বলেই মেনে নিতে নিতে আমরা বড় হচ্ছি, বুড়ো হচ্ছি।
একটা উদাহরণ হয়তো কথাটাকে পরিষ্কার করতে পারে। রবিবারের সবথেকে জনপ্রিয় খবরের কাগজ, তার খবরের অংশে পৌঁছতে দুটো তিনটে বা কখনো কখনো চারটে পর্যন্ত পাতা উল্টে ফেলতে হয়। এরা সকলে সেই সামগ্রী একান্তভাবেই আমার প্রয়োজন যাকে ছাড়া আধুনিক পৃথিবীতে জীবনটা মূল্যহীন সেই সামগ্রীর ঢালাও বিবরণ নিয়ে উপস্থিত। একটু মনে করলেই দেখা যাবে এই পাতাগুলির যে বিজ্ঞাপন, সে বিজ্ঞাপন খুব বেশি হলে রয়েছে তিনটি বিষয়ে। এক, শিক্ষা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সেই প্রতিষ্ঠান থেকে কৃতি ছাত্রদের ছবি এবং বিজ্ঞাপন। ওই প্রতিষ্ঠান-ই কেবলমাত্র আমার জীবনে কাঙ্খিত সাফল্য এনে দিতে পারে। অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে। এটাই মূল প্রতিপাদ্য। দুই, বাসস্থান। রবিবারের পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন দেখিয়ে দেয় স্বপ্নপুরীর মত নতুন নগরী গড়ে ওঠার হিসেব। যেখানে বসবাস করাটাই আধুনিক মানুষের আল্টিমেট গোল হওয়া উচিত। এর পরে আসে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। একদম অপারেশনের টেবিল থেকে ধরা চুড়ো বাধা ডাক্তার বাবু ছুরি-কাঁচি হাতে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের সকলকে নিয়ে রবিবারের প্রভাতী দৈনিকে কখনো কখনো একদম সামনের পাতায় পাতা জোড়া তাদের উপস্থিতি। ঘোষণাটা এটাই যে আমাদের হাসপাতালেই কেবলমাত্র আপনার সুস্বাস্থ্যের গ্যারান্টি। শুধু তার পিছনে এই বিজ্ঞাপন দাতাদের যে আশা আকাঙ্ক্ষা সুপ্ত হয়ে রয়েছে তার কথা ভাবলেই শরীর কেমন গুলিয়ে ওঠে। তাদের সেই সুপ্ত বাসনা আপনার অস্বাস্থ্যের কামনা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলতে আমার মগজে প্রতিনিয়ত বর্ষণ করা হয় ভালো হাসপাতাল ও চিকিৎসা, যার পূর্ব-শর্ত হলো মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়া। এবং সব থেকে আশ্চর্য এই ধরনের ধারণা প্রণয়নের পিছনে রাষ্ট্রের সরাসরি সক্রিয় ভূমিকা। আমাকে ভাবতে এবং বুঝতে বাধ্য করা হয় যে অসুস্থ মানুষের চিকিৎসাই হল জনসাস্থ্যের চাহিদা। অসুস্থ না হবার প্রকল্প বা অসুস্থ না হয়ে পড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করার কোন বিজ্ঞাপন বা কোন রাষ্ট্রক্ষেত্রের বিশেষ প্রকল্প আধুনিককালে ধারাবাহিকভাবে রূপায়ণ এবং প্রচার হয়েছে বলে জনমানষে কোনো ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায় না। এবং তার পিছনে সক্রিয় রাষ্ট্রীয় আশীর্বাদ নিয়ে যে উন্নয়ন সংক্রান্ত ঘটনা ঘটানো চলেছে আমাদের সমাজে দেশে এবং আধুনিক পৃথিবীতে তাই হল টেকসই উন্নয়নের ধারণার সবথেকে বড় এবং বলা যেতে পারে একমাত্র প্রতিদ্বন্দী। এই নয়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অবশ্যম্ভাবী আর একটা ফল, যা পৃথিবীর কাছে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা, তা আমরা সম্প্রতি যে প্যান্ডেমিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলে এলাম, সেই অবস্থা এবং পরিস্থিতি।
আলোচনা যখন এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে এবং বক্তার একটু জল-পানের প্রয়োজন, সেই অবকাশে গলা পাওয়া গেল শ্যামাদার। শ্যামা দা ব্যাংক কর্মচারী। বাড়ি থেকে দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে তার অফিস এবং অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের উপকারে সব সময় তাকে পাওয়া যায়। পরোপকারী মানুষ বলতে যা বোঝায় শ্যামা দা একদম-ই তাই। কিন্তু এই ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার সাথে সাথে আর একটা বিষয় তার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেটা হল তার সর্বজ্ঞ ভাব। সবকিছুতে মতামত প্রকাশ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা করার অদম্য উৎসাহ এবং উদ্দীপনা তার মধ্যে বহুল পরিমানে বর্তমান। সেই শ্যামা দা গলা তুললেন । তার বক্তব্য করোনা বিষয়ক পরিস্থিতি এবং যে বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা চলে এলাম, তা ছিল নিছকই এক কষ্ট কল্পনা। বাস্তবে এ রোগের তেমন প্রভাব ধর্তব্যের মধ্যে আনা উচিত হয় নি । কিছু মানুষ হাঁচিতে কাশিতে চিরকাল-ই মরে, কিছু মানুষ পেটব্যথাতেও মরে। ও কিছু নয়। দুদিন পরে ঠিক হয়ে যায়। এটাকে নিয়ে বড় বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলছিলাম আমরা। দু তিন ঢোঁক জল খেয়ে অপরেশ বাবু আবার শুরু করলেন। তাঁর ব্যাখ্যাটা ছিল এই রকম। পৃথিবী দেখেনি, কখনো ভাবতেও পারেনি এমন এক পরিস্থিতির আনয়ন করতে হলো এবং তাতে সমর্থন যোগালো পৃথিবীর সব দেশ, সমস্ত বুদ্ধিমত্তা এবং সব ধরনের চিন্তাশীল মস্তিষ্ক। পৃথিবীর সামনে করোনা এক সম্পূর্ণ নতুন এবং অজানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। প্রথম ঝটকায় আমরা দেখতে পেলাম অতি দ্রুত হারে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মধ্যে। বয়স্ক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে, আর তার মধ্যে সবথেকে বেশি সংখ্যায় রয়েছেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষ জন, যেটা এর আগে কখনো কোথাও অনুভূত হয়নি। আমরা হারিয়ে চলেছিলাম প্রতিদিন ১২/১৫/২০ জন করে এমন ব্যক্তিত্ব যারা অসুস্থ মানুষের প্রাণ রক্ষায় প্রথম সারির সৈনিক। এ সময়ের করোনা পরিস্থিতি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছিল যার কোন তুলনা মানুষের অভিজ্ঞতায় অমিল। এর কাছাকাছি ঘটনার আঁচ যদি পেতে হয়, তাহলে হাঁটতে হবে ১০০ বছরেরও বেশি পেছনে। যদিও সে সময়ের এই একই ধরনের ভাইরাস ঘটিত জটিল রোগ এবং তার প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল অল্প দু'তিনটি দেশের মধ্যে। বর্তমান পৃথিবীতে যাতায়াত এবং মালপত্রের এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া এবং বন্টনের যে নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে তার দৌলতে করোনাভাইরাসের জীবাণুও ছড়িয়ে পড়ে অতি দ্রুত। বাস্তবিকভাবে এই যাতায়াত আটকে দেওয়া ছাড়া এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে রোধ করার আর কোনো তাৎক্ষণিক দাওয়াই মানুষের পক্ষে ভেবে ওঠা ছিল অসম্ভব। এই পৃথিবীতে সব কিছুকে অস্বীকার করার কিছু উপকরণ প্রত্যেকের কাছেই আছে। কেবলমাত্র মৃত্যু ছাড়া। মৃত্যুর মতো এমন অমোঘ 100% সত্য আর কিছুই নেই এবং সেই মৃত্যু তড়িৎ গতিতে করোনা এফেক্টেড মানুষকে গ্রাস করে চলেছিল, এ কথা অস্বীকার করবে কে? এই মৃত্যু মিছিলই পৃথিবীকে প্রভাবিত করে ট্রান্স গ্লোব লক ডাউন বা সারা পৃথিবীর সমস্ত কর্মকাণ্ডের স্থিতাবস্থা সম্পর্কে ভাবতে, যদিও এ ছিলো এক অসম্ভব ভাবনা। এ ভাবনাটা যে কোনদিন ভাবতে হবে তা কেউ কোনদিন স্বপ্নেও দেখেছিল কিনা জানা নেই। অথচ সারা পৃথিবী শুধু ভাবনা নয়, এই ট্রান্স গ্লোব লকডাউনকে রূপ দিতে বাধ্য হয়। এ কিন্তু ছেলেখেলা নয়। এবং আজ আমাদের কাছে পরিষ্কার, এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে আমাদের বা মানুষের নিজেদের পৃথিবীর গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্য পৃথিবীবাসীদের যে গণ্ডি, সেই গণ্ডি অতিক্রম করে আমাদের লালসা চরিতার্থ করার আকাঙ্খায়। অন্য প্রাণীর পৃথিবীতে অধিগ্রহণের শর্তেই আমরা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছি, যা উল্টে আক্রমণ করেছে মনুষ্য জাতিকে। আমি এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হয়েছি যে এই করোনা পরিস্থিতিও উন্নয়ন কর্মকান্ডের এবং নতুন উন্নয়ন অর্থনীতির আমদানি করা এক উদ্ভট পরিস্থিতি। অতএব পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবেশ জনিত দুর্ঘটনা বলে করোনা পরিস্থিতির পিছনে লাগালে সেটা অত্যুক্তি হবে না। আমাদের ভাবতে হবে রেলগাড়ির শেষ স্টেশনটা নিয়ে। আমাদের ভাবতে হবে আমাদের যাত্রাপথের বিস্তার নিয়ে, আমাদের ভাবতে হবে শেষের গল্পটা নিয়ে। আমাদের ভাবতে হবে পৃথিবীর সীমাবদ্ধতা নিয়ে এবং সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যে মনুষ্য জাতি তার সুখ তার সুবিধে তার আনন্দ খুঁজে পাবার সংস্কৃতি নিয়ে। সেটাই গ্যারান্টি করতে পারে পরিবেশের ব্যবস্থা এবং ওই টেঁকসই উন্নয়ন। অথচ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বর্তমান মডেল এটা সহ্য করতে নারাজ। তারা এক্ষুনি চায় তাদের ক্ষমতা, তাদের সম্পদের আহরণ, তাদের পুঁজির আহরণের দ্রুতি আরো বৃদ্ধি করতে। তারা আরও বেশি প্রভুত্ব কায়েম করতে চায় মানুষের মস্তিষ্কের উপর। তাদের আকাঙ্ক্ষা তাদের মত করে যেন মনুষ্য জাতি গড়ে ওঠে শুধুমাত্র তাদের উৎপাদন সামগ্রীর তাদের ঠিক করা রাস্তায় ব্যবহার করার পুতুল হিসেবে। তাদের এ কর্মকাণ্ড নতুন কিছু নয়। আবহমানকালে কিন্তু বিজ্ঞানের অমোঘ নিয়মে আমরা জানি যে পরিমাণগত পরিবর্তন নতুন গুণকে সূচিত করে। এই সূত্র ধরেই বিশেষ করে আজকের দিনের ইনফরমেশন টেকনোলজির থেকে প্রাপ্ত যে ক্ষমতা এদের হাতে পুঞ্জিভূত হয়ে চলেছে তার বলে মানুষের মস্তিষ্কে ইঞ্জিনিয়ারিং করবার পরিকল্পনা এদের কাছে সবথেকে নতুন এবং আধুনিকতম প্রকল্প। সেই প্রকল্পের রাস্তাতেই পৃথিবী চলেছে এবং সেই প্রকল্পের রাস্তাতেই তারা প্রতিদিন টেকসই উন্নয়নের ধারণার বিরোধিতা করে চলেছে মনুষ্যজাতির তড়িৎ গতিতে উন্নয়নের ঘোমটার তলায়। আর অবশ্যই তার ফল দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায়। অপর্যাপ্ত আবহাওয়ার পরিবর্তন আজ শিশুদেরও বোধগম্যতার মধ্যে এসে গেছে। বিশেষকরে এই বছরের হিমালয়ের দিকে তাকালে নিশ্চিতভাবে বলা চলে যে পৃথিবী আরো প্রমাণের অপেক্ষা করে না এটা বুঝতে যে পরিবেশ সংরক্ষণের যে রাস্তায় আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম ৫০ বছর আগে সেই রাস্তায় হাঁটার ধরণ পরাজিত হয়েছে, আর তাই মনে হয় কাছাকাছি পঞ্চাশ বছর পরেও (১৯৭৪ এর পর ২০২২) সেই একই পরিবেশ দিবসের স্লোগান দিতে বাধ্য হয়েছিল ইউনাইটেড নেশনস। মানুষকে আবেদন করতে বাধ্য হয়েছিল ২০২২-এ তারা এই কথা বলে যে পৃথিবী তো আমাদের একটাই, এসো আমরা রক্ষা করি এই পৃথিবীকে।
শুরু করার আগে ভাবা যায়নি সভা এত দীর্ঘায়িত হবে। অথচ বিষয়ের মধ্যে বুঁদ গেছে উপস্থিত শ-দেড়েক মানুষ। কিন্তু ঘড়ির কাটার বাস্তবতা লক্ষ্য করে চোখের ইশারায় অপরেশ বাবুকে থামতে বলে হিমুদি দাঁড়িয়ে উঠে ঘোষণা করলেন আমরা আমাদের পরিবেশ পাঠের প্রথম ভাগ আজ এখানে শেষ করছি। কারো অনুমতি ছাড়াই ঘোষণা করছি যে এর দ্বিতীয় পর্ব আমরা শুনবো হপ্তা-খানেক পর। আপনাদের সকলের উপস্থিতি একান্ত কাম্য।
মজলিশী মানুষ, ব্যবসায় ও সংসারে সমপৃক্ত অনন্ত ঘোষাল এতক্ষণ শুনছিলেন মন দিয়ে। বলে উঠলেন, “আচ্ছা, এইসব কথা তো অনেক হলো, এবার চা-টা হয়ে যাক”। সকলে একটু নড়ে চড়ে বসার মধ্যে-ই বাইরে তুলি, মানে অনন্তবাবুর ছোটো মেয়ের গলা শোনা গেলো, “তোমরা সব দেখবে এসো, কতদিন পরে বাঁদর খেলা এসেছে”। তুলির কথায় চোখ তুললেন অনন্ত বাবু, খানিক চুপ থেকে আস্তে আস্তে ওঁকে বলতে শোনা গেল, “তা প্রায় বছর পনেরো তো হবেই। আবার বাঁদর খেলা এলো? তা ভালো; দিন বদলের শুরুর ইঙ্গিত হলেই মঙ্গল।
আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে।
প্রকাশ: ১২-অক্টোবর-২০২৫
শেষ এডিট:: 17-Oct-25 11:21 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/let-the-environment-be-the-thought-of-the-future-–-the-culture-of-the-future
Categories: Fact & Figures
Tags: environment, environmentalcrisis, greenworld
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (147)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
বাংলার বিকল্প পরিবেশ ভাবনা ও উন্নয়নের অভিমুখ
- সৌরভ চক্রবর্ত্তী
পশ্চিমবাংলার ক্রীড়ানীতি ও বিপল্প প্রস্তাব
- সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়
তথ্য প্রযুক্তি এ আই আমাদের রাজ্যে সম্ভাবনা
- নন্দিনী মুখার্জি
প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি
- ওয়েবডেস্ক





