আলো দিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: অপটোজেনেটিক্সের গল্প

এখানে আয়নের কথাটা একটু খুলে বলা দরকার, কারণ গোটা গল্পটাই এর উপর দাঁড়িয়ে। বিশ্রামের অবস্থায় স্নায়ুকোষের ভেতরটা বাইরের তুলনায় সামান্য ঋণাত্মক থাকে। ধনাত্মক আয়ন, যেমন সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম বা প্রোটন, দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে সেই ঋণাত্মক ভাব কমে আসে, আর কোষ উত্তেজিত হয়ে সংকেত পাঠানোর দিকে এগোয়। উল্টো দিকে ঋণাত্মক ক্লোরাইড আয়ন ভেতরে ঢুকলে সাধারণত ভেতরটা আরও ঋণাত্মক হয়ে পড়ে, আর কোষ শান্ত থাকে। অর্থাৎ আয়ন-দরজা দিয়ে কোন আয়ন ঢুকছে, তাই ঠিক করে দেয় কোষটি উজ্জীবিত হবে, না অবদমিত।

এই বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল প্রাপকদের কাজের প্রভাব সুদূর প্রসারিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা মনের সন্ধান করে গেছেন নানান উপায়ে, তার মধ্যে ভাববাদের দিক ছিল,বস্তুবাদেরও দিক ছিল আবার দুইয়ের মিশেল ছিল। কিন্তু একটা সময়ের পর বিজ্ঞানের ও প্রযুক্তির অগ্রগতি অন্ত্যত একটা বিষয় নিশ্চিত করে দিয়েছে যে মনের শুলুক-সন্ধান পাওয়া যাবে মগজেই - পথটা অত্যন্ত জটিল,দুরূহ ও দীর্ঘস্থায়ী - এইবারের নোবেল বিজয়ীরা কিছুটা ব্যতিক্রমী পথে হেঁটেই সেই পথের সন্ধানে গেছেন।
এই দীর্ঘ প্রবন্ধের লেখক ,যিনি নিজে একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী, চেষ্টা করেছেন যতটা সহজভাবে বক্তব্যগুলো আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন।
তিনটি পর্বে এই প্রবন্ধ প্রকাশিত হবে, আজ রইল তার প্রথম কিস্তি।
২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হল তিনজনের নামে: কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল। পুরস্কারের স্বীকৃতি-বাক্যে লেখা হয়েছে: "আলোতে খুলে যাওয়া আয়ন চ্যানেল এবং অপটোজেনেটিক্স-সংক্রান্ত আবিষ্কারের জন্য।" নামটিকে ভেঙে দেখলেই পদ্ধতিটির ব্যাপারে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। 'অপটো' এসেছে গ্রিক 'অপটিকোস' থেকে, যার যোগ দৃষ্টি আর আলোর সঙ্গে; আর 'জেনেটিক্স' মানে জিনতত্ত্ব বা বংশগতিবিদ্যা। জিনের সাহায্যে প্রথমে কোষের ভেতর একটি আলোকসংবেদী সুইচ বসানো হয়, তারপর আলো দিয়ে সেই সুইচ চালু বা বন্ধ করে কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু কীভাবে মানুষ এই আবিষ্কারে পৌঁছল? আর কেনই বা এই আবিষ্কারের প্রয়োজন হল?
একটি সুইচ, যা এসেছিল শ্যাওলার ভেতর থেকে
অপটোজেনেটিক্সের কেন্দ্রে এমন একটি প্রোটিন, যার উৎস মানুষের বা অন্য কোনও প্রাণীর মস্তিষ্ক নয়, এক রকমের এককোষী সবুজ শ্যাওলা। প্রোটিনটি আলো পেলেই আয়ন চলাচলের পথ খুলে দেয়, তাই এর জিন যে স্নায়ুকোষে বসানো হয়, আলো দিয়ে সেই কোষকেই উজ্জীবিত করা যায়। আবার অন্য আরেক ধরনের প্রোটিন দিয়ে কোষের কার্যকলাপ বন্ধও করা যায়।
এতে পাওয়া গেল দুটো প্রধান সুবিধা: গতি আর সুনির্দিষ্টতা। এক, পরীক্ষায় সাড়া আসে মিলিসেকেন্ডে, অর্থাৎ মস্তিষ্ক নিজে যে গতিতে কাজ করে ঠিক সেই গতিতে। দুই, কোন কোষগোষ্ঠীকে উজ্জীবিত করা হবে, তা জিনের বহিঃপ্রকাশ (জিন এক্সপ্রেশন) নিয়ন্ত্রণ করে বেছে নেওয়া যায়।
একটা ধারণা গোড়াতেই পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার। অপটোজেনেটিক্স কিন্তু প্রধানত গবেষণার যন্ত্র, চিকিৎসার পদ্ধতি নয়। গত কুড়ি বছরে এর প্রায় সমস্ত ব্যবহার হয়েছে পরীক্ষাগারে, মূলত ইঁদুরের মস্তিষ্কে, তার পাশাপাশি ফলের মাছি, জেব্রা মাছের ছানা, এক রকমের গোলকৃমি ও কিছু ক্ষেত্রে বাঁদরেও। চিকিৎসায় প্রয়োগ সবে শুরু হয়েছে, এবং তাও খুবই সীমিত পরিসরে।
সবচেয়ে অদ্ভুত দিকটি হল, এই আবিষ্কারের শুরু কিন্তু মস্তিষ্ক নিয়ে কোনও প্রশ্ন থেকে নয়। শুরু হয়েছিল একটা সরল কৌতূহল থেকে: পুকুরের জলে ভাসা এককোষী একটা শ্যাওলা আলোর দিকে সাঁতরে যায় কী করে?
সমস্যাটা কী ছিল? ইলেকট্রোড হল একটি অন্ধ হাতিয়ার
অপটোজেনেটিক্সের আগে মস্তিষ্কে স্নায়ু সক্রিয় করবার প্রধান যন্ত্র ছিল ইলেকট্রোড, অর্থাৎ একটি সরু ধাতব তার, যার ডগা দিয়ে সামান্য বিদ্যুৎ পাঠানো যায়। সমস্যা হল, মস্তিষ্কের সব কোষ এক রকমের নয়। সেখানে যেমন নানা ধরনের নিউরন বা স্নায়ুকোষ আছে, তেমনি আছে নিউরন নয় এমন বহু সহায়ক কোষও।
এক চিলতে জায়গার মধ্যেই পাশাপাশি থাকে উত্তেজক কোষ, নিবারক কোষ, নানা রকম সহায়ক কোষ। প্রত্যেক স্নায়ুকোষেরই আবার কোষদেহ থেকে বিস্তৃত অন্তর্মুখী (ডেনড্রাইট) ও বহির্মুখী (অ্যাক্সন) শাখা-প্রশাখা থাকে, যাদের মধ্যে দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেতের আদান (ডেনড্রাইট) ও প্রদান (অ্যাক্সন) হয়। এক বাটি চাউমিন থেকে যেমন একটা নুডলকে আলাদা করা খুব মুশকিল, একইভাবে অসংখ্য স্নায়ুকোষ ও সহায়ক কোষ এবং তাদের বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা একই সঙ্গে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে থাকে। সেই সঙ্গে আছে বহু দূরের স্নায়ুকোষ থেকে আসা তার, যাদের কেউ কেউ শুধু ওই জায়গাটা পেরিয়ে অন্য কোথাও পৌঁছে যাচ্ছে, আর কেউ কেউ হয়তোবা আশেপাশের কোষের ডেনড্রাইটে সংকেত পৌঁছে দিচ্ছে।
সাধারণ ইলেকট্রোড কিন্তু এদের কারও মধ্যেই কোনও তফাত করতে পারে না। ইলেকট্রোডের ডগার আশেপাশে যত কোষ আছে, সবাইকে একসঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেয়। ফলে কোন কোষ ঠিক কী করছে, তা আলাদা করে চেনার উপায় থাকে না। একটা অর্কেস্ট্রায় কোন একটি বাদ্যযন্ত্র কোন সুর ধরে আছে তা জানতে চেয়ে যদি গোটা অর্কেস্ট্রাকে কাঠি নাড়িয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহলে সামগ্রিক একটা আওয়াজ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু উত্তরটা পাওয়া যায় না; ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম।
সাধারণ ইলেকট্রোডের তুলনায় একটি কোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ মাপা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্যাচ ক্ল্যাম্প অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট একটি পদ্ধতি: কাচের অতি সরু একটি নল দিয়ে একটি কোষের গায়ে, এমনকি তার ভেতরেও পৌঁছনো যায়। কিন্তু একেকটি কোষকে ধরতে ও উজ্জীবিত করতে লাগে প্রচুর সময় আর একটি কুশলী, অভ্যস্ত হাত। তাছাড়া একসঙ্গে অনেক কোষে তা করা যায় না। গোটা একটা নিউরাল সার্কিট বা স্নায়ুবর্তনীকে নেড়েচেড়ে দেখবার জন্য এই উপায়টিও তাই যথেষ্ট উপযোগী নয়।
বাকি উপায়গুলো ছিল আরও অস্পষ্ট। প্রচলিত ওষুধ কোষের ধরন বোঝে না, আর কাজ করে সেকেন্ড থেকে ঘণ্টার মাপে। মস্তিষ্কে ক্ষত তৈরি করে দেখার পদ্ধতি একই সঙ্গে বিপজ্জনক ও অপরিবর্তনীয়। অথচ মস্তিষ্কের ভেতরের ঘটনাগুলির সময়ের মাপকাঠি মিলিসেকেন্ড।
ফ্রান্সিস ক্রিক প্রশ্নটা পরিষ্কার করে দিলেন
১৯৭৯ সালে সায়েন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকায় ফ্রান্সিস ক্রিক, যিনি ডিএনএ-র দ্বৈত সর্পিল গঠনের অন্যতম আবিষ্কারক, স্নায়ুবিজ্ঞানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা লিখেছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। তাঁর ভাষায়, দরকার এমন একটা উপায়, যা দিয়ে কেবল এক শ্রেণির সব স্নায়ুকোষকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যাবে, বাকিদের মোটামুটি অপরিবর্তিত রেখে।
লক্ষণীয়, তিনি প্রথমে উল্লেখ করেছিলেন কোষ থামিয়ে দেখার কথা, জাগিয়ে দেখার নয়; যুক্তিটা অবশ্য দুদিকেই সমান খাটে। যে কোনও পরীক্ষা থেকে আমরা ঠিক ততটুকুই জানতে পারি, যতটুকু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। একসঙ্গে দশ রকম কোষে ধাক্কা দিয়ে আচরণের বদল দেখলে কোনটা কী কাজ করল তা অজানাই থেকে যায়।
১৯৯৯ সালের একটি প্রবন্ধে ক্রিক আরও এক ধাপ এগোলেন। সজাগ প্রাণীর মধ্যে এক বা একাধিক শ্রেণির স্নায়ুকোষ দ্রুত চালু ও বন্ধ করা দরকার, আর তার জন্য তাঁর প্রস্তাবিত সংকেত ছিল আলো। তাঁর বক্তব্য ছিল যে আদর্শ সংকেত হবে আলো, সম্ভবত ইনফ্রারেড বা অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যে, যাতে তা মস্তিষ্কের যথেষ্ট গভীরে ঢুকতে পারে। তিনি নিজেই লিখেছিলেন যে ভাবনাটি এখন দূরকল্পনার মতো শোনালেও হয়তো একদিন কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণির কোষকে এভাবে আলোকসংবেদী করে তোলা যাবে।
ফাঁকটা স্পষ্ট ছিল। স্নায়ুকোষ সাধারণত আলোয় সাড়া দেয় না, আর তাকে সাড়া দেওয়ানোর কোনও পদ্ধতিও তখন জানা ছিল না। ক্রিক রাস্তাটার দিকে আঙুল তুলেছিলেন, সমাধানটা খুঁজে পাননি। মজার ব্যাপার হল, যন্ত্রটা তখন পৃথিবীতেই মজুত ছিল, কেবল সেটা ছিল পুকুরের শ্যাওলার গায়ে।
কাছাকাছি আরও কয়েকটি চেষ্টা
প্রথম চেষ্টাগুলো আলো ব্যবহার করত বটে, কিন্তু জিনের সাহায্য ছাড়াই। ১৯৯৩ সালে এডওয়ার্ড ক্যালাওয়ে ও লরেন্স কাট্জ একটি কৌশল দেখান, যাতে গ্লুটামেট নামের স্নায়ু-উদ্দীপক সংকেত-অণুকে এক রকমের রাসায়নিক খাঁচায় বন্দি করে টিস্যুতে ছড়িয়ে দেওয়া হত। আলো ফেললে খাঁচা ভেঙে যেত, গ্লুটামেট মুক্ত হত, আর আশেপাশের কোষ সাড়া দিত।
এই পদ্ধতির বেশ কিছু সুবিধা ছিল। উদ্দীপনার জায়গা অনেক সূক্ষ্মভাবে বেছে নেওয়া যেত, আর গ্লুটামেট ধরার রিসেপ্টর থাকে কোষদেহ ও ডেনড্রাইটে, অ্যাক্সনে নয়, তাই পাশ দিয়ে চলে যাওয়া তারগুলো অনেকটাই রেহাই পেত। কিন্তু যেটা পাওয়া যেত না, সেটা হল জিনগত পরিচয় অনুযায়ী কোষের বাছাই, অর্থাৎ একই জায়গায় থাকা নানা ধরনের নিউরনের মধ্যে কেবল একটি শ্রেণিকে আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করবার উপায়। ঠিক এই ফাঁকটাই পরে অপটোজেনেটিক্স পূরণ করে।
জিনগতভাবে চিহ্নিত কোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার প্রথম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখান গেরো মাইজেনবক ও তাঁর সহকর্মীরা, ২০০২ সালে। ফলের মাছির আলোকসংবেদী ব্যবস্থার তিনটি প্রোটিনকে একসঙ্গে স্নায়ুকোষে তৈরি করিয়ে তাঁরা দেখান, আলোতে কীভাবে জিনগতভাবে চিহ্নিত কোষগুলোই সাড়া দেয়। নীতিগতভাবে এটিই ছিল ক্রিকের দেখানো রাস্তায় প্রথম মাইলফলক। কিন্তু তিনটি আলাদা জিনকে একসঙ্গে ঢোকানো কঠিন কাজ, একইসাথে রেটিনাল নামের একটি সহায়ক অণুও বাইরে থেকে জোগাতে হত, আর সংকেতটি কোষের নিজের রাসায়নিক শৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে ঘুরে আসত বলে সাড়া দেওয়ার সময়ও ছিল যথেষ্ট দীর্ঘ। স্নায়ুকোষ যে ভাষায় কথা বলে, এই গতিতে সেই ভাষাকে ধরা সম্ভব ছিল না।
পুকুরের শ্যাওলার সেই যন্ত্রের খোঁজ পেতে তিনটি ধাপ লেগেছিল।
প্রথম ধাপ: অতিলবণপ্রিয় এক অণুজীবে পাওয়া গেল এক আলোকসংবেদী পাম্প
সত্তরের দশকের গোড়ায় ডিটার ওস্টারহেল্ট ও ভাল্টার স্টোকেনিয়াস আর্কিয়া-গোষ্ঠীর একটি অতিলবণপ্রিয় অণুজীবে এমন একটি প্রোটিন শনাক্ত করেন, যা আলোর দ্বারা সক্রিয় হয়ে প্রোটন কণাকে কোষের বাইরে পাম্প করে। প্রোটিনটির নাম দেওয়া হয় ব্যাকটেরিওরোডপসিন।
এটা ছিল সত্যিকারের বিস্ময়, কারণ রোডপসিন ততদিন পর্যন্ত মূলত প্রাণীর চোখের প্রোটিন হিসেবে পরিচিত ছিল। অণুজীবে রোডপসিন-জাতীয় প্রোটিন পাওয়ার মানে, এই ধরনের আলোকসংবেদী প্রোটিন প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।
দ্বিতীয় ধাপ: আলোর দিকে সাঁতরানো এক শ্যাওলা
ক্ল্যামিডোমোনাস রাইনহার্ডটি একটি এককোষী সবুজ শ্যাওলা, পুকুর-নদীর জলে আর স্যাঁতসেঁতে মাটিতে পাওয়া যায়। তার দুটি চাবুকের মতো লেজ আছে, আর গায়ে একটি কমলা রঙের ছোট্ট দাগ, যাকে বলে আইস্পট বা চোখের-দাগ। আলো পড়লে সে আলোর দিকে সাঁতরে যায়, আবার আলোর জোর খুব বেড়ে গেলে উৎস থেকে দূরেও সরে যেতে পারে।
পিটার হেগেমানের প্রশ্নটি ছিল সরল, এবং সেই সরলতাতেই তার শক্তি। চোখ নেই, মস্তিষ্ক নেই, স্নায়ু নেই, তবু এই একটিমাত্র কোষ আলো টের পায় কী করে?
আশির দশকে দেখা গিয়েছিল, অন্ধ শ্যাওলার মধ্যে রেটিনাল নামের অণুটি ফিরিয়ে দিলে তার আলোর দিকে যাওয়ার ক্ষমতা ফিরে আসে, অর্থাৎ এখানেও সেন্সরটি একটি রোডপসিন। নব্বইয়ের দশকে হেগেমান ও তাঁর সহকর্মীরা এই আইস্পটের বৈদ্যুতিক সাড়া মেপে দেখলেন। সাড়াটি এতই দ্রুত ছিল যে গবেষকরা অবাক হয়ে যান; প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ধারণা দিয়ে তখন ঘটনাটির ব্যাখ্যা করা যায়নি। প্রাণীর চোখে আলো পড়ার পর বেশ কয়েক ধাপের রাসায়নিক শৃঙ্খল পেরিয়ে বৈদ্যুতিক পরিবর্তন আসে, কিন্তু এখানে সেই দীর্ঘ শৃঙ্খল ছাড়াই একেবারে মুহূর্তের মধ্যে সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল। হেগেমানের সন্দেহ হল, আলোর সেন্সরটি আর আয়নের দরজাটি আসলে একটিই প্রোটিন।
কিন্তু হেগেমানের এই কথাটা সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত ধারণার সঙ্গে খাপ খেত না। রোডপসিন নিয়ে যা জানা ছিল তার প্রায় সবটাই এসেছিল মেরুদণ্ডী প্রাণীর চোখ থেকে, আর সেখানে রোডপসিনের কাজ ছিল কেবল খবর পাঠানো; দরজা খোলা বা বন্ধ করত সম্পূর্ণ আলাদা কিছু প্রোটিন। শৃঙ্খলের ধাপে ধাপে কাজের এই ভাগাভাগিটাকে এত সাধারণ নিয়ম বলে ধরা হত যে একটিমাত্র অণু একই সঙ্গে সেন্সর আর দরজা, এমন প্রস্তাব অনেকের কাছেই অসম্ভব ঠেকেছিল।
তৃতীয় ধাপ: জিন খুঁজে পাওয়া, আর ব্যাঙের ডিমে পরীক্ষা
২০০০-এর দশকের গোড়ায় ক্ল্যামিডোমোনাসের জিন-তালিকা তৈরির কাজ এগোতে এগোতে রোডপসিন-ঘেঁষা কয়েকটি জিনের হদিশ মিলল। একাধিক গবেষকদল কিন্তু প্রায় একই সময়ে, স্বাধীনভাবে, এই জিনগুলির সন্ধান পেয়েছিলেন। হেগেমানের দল এদের নাম দেন চ্যানেলঅপসিন, আর অনুমান করেন এরা আলো-চালিত আয়ন চ্যানেল হতে পারে। জন স্পুডিকের দলও একই জিন পেয়েছিলেন, এবং সাড়ার দ্রুততা দেখে তাঁরাও সম্ভাবনার কথা তুলেছিলেন যে প্রোটিনটি নিজেই চ্যানেল হতে পারে, বা কোনও চ্যানেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকতে পারে। তৃতীয় একটি দল দেখান, প্রোটিনগুলি ঠিক ওই আইস্পটেই গিয়ে বসে। অর্থাৎ অনুমানটা হেগেমানের একার ছিল না, আর এর নির্ণায়ক প্রমাণ এসেছিল অন্য পথে: জিনটিকে অন্য কোষে প্রকাশ করিয়ে (জিন এক্সপ্রেশন) সেখানে বৈদ্যুতিক সাড়া মেপে দেখার মাধ্যমে।
সেই কাজটি করেন গেয়র্গ নাগেল, তখন ফ্রাঙ্কফুর্টে আর্নস্ট বামবার্গের গবেষণাগারে। তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল ব্যাঙের ডিমে বাইরের জিন ঢুকিয়ে তার বৈদ্যুতিক আচরণ মাপায়, কারণ আকারে বড় ব্যাঙের ডিম মাপজোকের জন্য খুবই সুবিধাজনক। আলো ফেলতেই দেখা গেল, আধানযুক্ত কণা সরাসরি কোষের পর্দা পেরিয়ে চলাচল করছে। কোনও মধ্যবর্তী ধাপ নেই, কোনও বাড়তি যন্ত্রপাতি নেই। প্রোটিনটি নিজেই আলো পেয়ে খুলে যাওয়া একটি দরজা।
এখানে আয়নের কথাটা একটু খুলে বলা দরকার, কারণ গোটা গল্পটাই এর উপর দাঁড়িয়ে। বিশ্রামের অবস্থায় স্নায়ুকোষের ভেতরটা বাইরের তুলনায় সামান্য ঋণাত্মক থাকে। ধনাত্মক আয়ন, যেমন সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম বা প্রোটন, দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে সেই ঋণাত্মক ভাব কমে আসে, আর কোষ উত্তেজিত হয়ে সংকেত পাঠানোর দিকে এগোয়। উল্টো দিকে ঋণাত্মক ক্লোরাইড আয়ন ভেতরে ঢুকলে সাধারণত ভেতরটা আরও ঋণাত্মক হয়ে পড়ে, আর কোষ শান্ত থাকে। অর্থাৎ আয়ন-দরজা দিয়ে কোন আয়ন ঢুকছে, তাই ঠিক করে দেয় কোষটি উজ্জীবিত হবে, না অবদমিত।
দুটি চ্যানেলরোডপসিন প্রোটিনের আবিষ্কার অবশ্য আলাদা, আর সেই তফাতটা মনে রাখার মতো। প্রথমটি, চ্যানেলরোডপসিন-১, প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে, এবং প্রথম বিবরণে সেটি ছিল সবুজ আলোয় সাড়া দেওয়া একটি প্রোটন-চ্যানেল। দ্বিতীয়টি, চ্যানেলরোডপসিন-২, আসে ২০০৩ সালে, আর পরে স্নায়ুবিজ্ঞানের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে এটিই। এর মধ্যে দিয়ে নানা ধরনের ধনাত্মক আয়ন চলাচল করে, আর একে সবচেয়ে ভালোভাবে সক্রিয় করে নীল আলো। আলোর রং আসলে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যেরই প্রকাশ: দৃশ্যমান আলোয় নীলের দিকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট, সবুজ ও হলুদ হয়ে লালের দিকে ক্রমশ দীর্ঘ। ওই ২০০৩ সালের কাজেই দেখানো হয় যে প্রোটিনটি স্তন্যপায়ীর কোষেও প্রকাশ করিয়ে আলো দিয়ে বৈদ্যুতিক সাড়া তৈরি করা যায়।
প্রকাশ: ২৮-অক্টোবর-২০২৬
শেষ এডিট:: 28-Oct-26 15:52 | by 4
Permalink: https://cpimwestbengal.org/switching-the-brain-with-light-the-story-of-optogenetics
Categories: Current Affairs
Tags: , nobel prize physiology, 2026
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (184)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (164)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (90)
- Highlight - হাইলাইট (103)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (156)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (19)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)




