নিদারুণ শোকের রাতেও স্টল ভাঙছিল সঙ্ঘ, বিজেপি!

চন্দন দাস
কী চমৎকার মিল দু’ পক্ষের। আসলে তারা কোনওদিনই দুটি পক্ষ নয়। তারা একটিই পক্ষ— প্রগতির বিরোধী। তাই কমিউনিস্ট-বিদ্বেষী।

শনিবারের রাত আর একবার প্রমাণ করেছে ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘের কর্মীরা নৃশংস, নির্লজ্জ এবং যে কোন শোকের মুহুর্তেও বামপন্থীদের প্রতি আক্রমনে বেপরোয়া।
এই ক্ষেত্রে বরাবর তাদের আক্রোশ কমিউনিস্টদের প্রচার মাধ্যমের উপর। সেই প্রচার মাধ্যমের মধ্যে বই, পুস্তিকা, সাহিত্য ফ্যাসিবাদীদের চিরন্তন শত্রু।
কমিউনিস্ট পার্টিকে বাংলাতে এই আক্রমণ মোকাবিলা করেই এগতে হয়েছে।
কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম বুকস্টল প্রায় ৭৯ বছর আগে— নোয়াখালী এবং যশোরে।
তবে তা শুধু শারদোৎসবের সময়ের জন্য নয়। হয়েছিল স্থায়ী বুকস্টল। যশোর শহরে হয়েছিল বুকস্টল। ১৯৪৭-এর প্রথম দিকে। সেই সময়েই নোয়াখালী জেলার পাঁচটি জায়গাতেও পার্টির কর্মীরা বুকস্টল খুলে ফেলেছিলেন।
শারদোৎসবের সময় বুকস্টল শুরু ১৯৫২-তে কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের উদ্যোগে কলকাতায়। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস বলছে তার আগেই মার্কসবাদী, প্রগতিশীল রচনা, সাহিত্যের স্টল বাংলায় শুরু হয়ে গেছিল। শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার আগে।
এই প্রসঙ্গেই আর একটি তথ্য প্রাসঙ্গিক। কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশিত বই, পুস্তক, মার্কসবাদী রচনাগুলির বারবার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আটকাতে চেয়েছে। তারা সে সব বাজেয়াপ্ত করেছে, পুড়িয়েছে। কিন্তু একই পথে এগিয়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং মৌলবাদী শক্তি। পশ্চিমবঙ্গে গত মে’তে বিজেপি সরকার গড়েছে। এবারের শারদীয়ার সময় তারা সিপিআই(এম), সিপিআই, সিপিআই(এম-এল) লিবারেশন সহ বামপন্থীদের বুকস্টলগুলি বন্ধ করতে চেয়েছে। এই ক্ষেত্রে দুটি পথ তারা নিয়েছে। প্রথমত, বিজেপি, আরএসএস-এর কর্মীরা বামপন্থীদের স্টলগুলিতে হামলা চালিয়েছে। কিছু জায়গায় স্টল পুড়িয়ে দিয়এছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তারা এই আক্রমন করেছে গভীর রাতে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ, প্রশাসনকে ব্যবহার করে বামপন্থীদের স্টল করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আরএসএস, বিজেপি’র এই বইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ছবিই আমরা দেখতে পাই কমরেড মনি সিং ১৯৪৮-এর বর্ণনায়। ‘জীবন ও সংগ্রাম’-এ মেটিয়াবুরুজের শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম যুগের সংগঠক, চট্টগ্রামের টংক আন্দোলনের নেতা, মুক্তিযোদ্ধা মনি সিং লিখছেন,‘‘সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের উদ্যোগ সেই সময় শুধু সাংস্কৃতিক সংগঠন বা গানের দল গড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মার্কসবাদী ও প্রগতিশীল পুস্তক প্রকাশ ও প্রচারের জন্যও পার্টি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’, ঢাকায় ছিল ‘প্রতিরোধ পাবলিশার্স’-এর বইয়ের দোকান। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম এবং আরো অন্যান্য জেলায় বইয়ের দোকান ছিল। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান পগর ১৯৪৮-এ মুসলিম লীগ সরকারের কমিউনিস্টবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশের সর্বত্র বইয়ের দোকানগুলো হয় গুন্ডাবাহিনী দ্বারা লুন্ঠিত হয়, নতুনবা সরকারি হস্তক্ষেপে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করা হয়।’’
কী চমৎকার মিল দু’ পক্ষের। আসলে তারা কোনওদিনই দুটি পক্ষ নয়। তারা একটিই পক্ষ— প্রগতির বিরোধী। তাই কমিউনিস্ট-বিদ্বেষী।
বাংলা তখন অবিভক্ত। তখন ২৭টি জেলা। ১ লা মে’র মধ্যে ২৫টি জেলার সম্মেলন হয়ে গেছিল। সেবার প্রথম জেলা কমিটিগুলিতে ‘সাহিত্য সাব কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তাৎপর্যপূর্ণ হলো বেশিরভাগ জেলায় সেই সাব কমিটি তৈরি হয়ে গেছিল।
জেলা কমিটির সেই সাব কমিটিগুলির একটা রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব সামলেছিলেন কমরেড সুধাংশু দাশগুপ্ত। তখন ইমেল, মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স হ্যান্ডেল ছিল না। কিন্তু একটি আশ্চর্য পার্টি সংগঠন ছিল। দাঙ্গা, হামলার আশঙ্কা, পুলিশী নিপিড়নের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে দার্জিলিং— পার্টির রিপোর্ট পৌঁছে যেত। সুধাংশু দাশগুপ্তের ‘সাহিত্য প্রচার’ সংক্রান্ত সাব কমিটিগুলির ভূমিকা সম্পর্কিত রিপোর্ট পাঠিয়েছিল জেলা কমিটিগুলি।
সেই রিপোর্ট বলছে তখন অধিকাংশ জেলায় লিট-সাব কমিটি তৈরি হয়ে গেছে। কয়েকটি জেলা আবার সম্মেলন পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি। তার আগেই তারা ‘লিট-স্টাফ’ গড়ে তুলেছিল। ১৯৩৯-এর ২৬জুন এনবিএ-এর প্রতিষ্টা। মাত্র ২০০টাকা সম্বল করে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি যাত্রা শুরু করে। ১৯৪৭-এর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল— এই চার মাসে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি থেকে ৬১,২৯৯ টি বই এবং পুস্তিকা জেলা কমিটিগুলি নিয়েছিল। সেগুলির দাম ছিল ২৬,৪৪০ টাকা ৬ পয়সা। সেই সময়েই এনবিএ প্রথম ‘কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন' এবং ‘কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য' বই দুটি প্রকাশ করে।
সুধাংশু দাশগুপ্তর সেই বিস্তৃত রিপোর্ট জানাচ্ছে,‘যশোরে প্রাইমারী ইউনিট ও লোকাল কমিটীতে সাহিত্য প্রচারের জন্য কমরেড নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা কাজও আরম্ভ করে দিয়েছেন– জেলার লিট সাব-কমিটির তত্বাবধানে শহরে একটি বুকস্টলও খোলা হয়েছে।… নোয়াখালী জেলায় এখন পর্য্যন্ত জিলা লিট- ইনচার্জ্জ নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয় নাই, কিন্তু ব্রাঞ্চে ব্রাঞ্চে কাজের ভিত্তিতে লিট স্টাফ গড়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই জিলার বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচটী বুকস্টল খোলা হয়েছে এবং এই পাঁচটী অঞ্চলেই এক একজন কমরেড- এর উপর সাহিত্য প্রচারের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
বই, পুস্তিকা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানা কৌশল নিয়েছিল ১৯ হাজার পার্টি সদস্য বিশিষ্ট সেই পার্টি। রিপোর্ট বলছে কয়েকটি জেলায় পার্টি কর্মীরা হাটে, বাজারে এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়েও বই, পুস্তিকা বিক্রি করতেন। সুধাংশু দাশগুপ্ত জলপাইগুড়ির এক ‘শ্রমিক কমরেড'-এর উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখছেন,‘‘একটু দৃষ্টি রাখলেই লিট-স্টাফের জন্য উপযুক্ত কমরেড পাওয়া যাবেই। এর একটী উদাহরণ জলপাইগুড়ির শ্রমিক কমরেড যদুনাথ। তাঁর কর্মক্ষেত্র হচ্ছে দোমোহানী– সেখানে তিনি প্রতি সপ্তাহে বিক্রি করেন ত্রিশ কপি ‘‘জনযুগ’’ আর তিন কপি ‘‘নয়া জমানা’’। ‘‘জনযুগে’’ বিজ্ঞাপন দেখে নিজে টাকা সংগ্রহ ক’রে বোম্বে থেকে তিনি ২৯ টাকার হিন্দি পুস্তিকা আনান এবং অল্প কয়েকদিনের মধ্যে বিক্রি করে ফেলেন।’
এই জেলা সম্মেলন গুলির পরে স্বাভাবিকভাবেই হয় পার্টির রাজ্য সম্মেলন। ১৯৪৭-এর অক্টোবর। সেই বছর শারদোৎসব ছিল ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর। তার আগে, ৪ থেকে ৬ অক্টোবর, ৮ নং ডেকার্স লেনে পার্টি অফিসের বিরাট ছাদে প্যান্ডেল বেঁধে হয় রাজ্য সম্মেলন। সিপিআই-এর চতুর্থ রাজ্য সম্মেলন। ১৯৪৩-র মার্চের তৃতীয় রাজ্য সম্মেলন থেকে ১৯৪৭-এর অক্টোবরে চতুর্থ রাজ্য সম্মেলনের মাঝে পার্টির সদস্য সংখ্যা ৩ হাজার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৯,২৫০।
দুই বাংলাতেই পার্টি তখন শক্তিশালী হচ্ছিল। সদস্য বাড়ছিল। গণভিত্তিও বাড়ছিল স্বাভাবিকভাবেই। সেই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পাশাপাশি পার্টিকর্মীদের রাজনৈতিক, মতাদর্শগত চর্চায় এগিয়ে নিয়ে চলার ভাবনা থেকেই বুকস্টলের পরিকল্পনা করেছিল পার্টি। আর এই ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বাধার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির আক্রমনের মুখোমুখিও পার্টিকর্মীদের হতে হয়েছে।
কিন্তু কখনোই পার্টির বই, পুস্তিকা প্রকাশ যেমন বন্ধ হয়নি, তেমনই তার প্রচার এবং সেই লক্ষ্যে বুকস্টল করা থামানো যায়নি।
প্রকাশ: ১৮-অক্টোবর-২০২৬
শেষ এডিট:: 18-Oct-26 10:03 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/even-on-a-night-of-deep-sorrow-the-sangh-bjp-was-breaking-stalls!
Categories: Current Affairs
Tags: bjp, rss, bjp thug, party book stall
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (183)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (163)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (89)
- Highlight - হাইলাইট (102)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (156)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (19)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
কমলাকান্তর মাছ, ডেকার্স লেনের প্যান্ডেল আর উৎসব
- চন্দন দাস
বর্তমান প্রেক্ষিতে বঙ্গভঙ্গ ও রবীন্দ্রনাথ
- অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি
- ওয়েবডেস্ক
আজকের দুনিয়ায় চে গ্যেভারার প্রাসঙ্গিকতা
- সমন্বয় রাহা
খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ার জ্বালা
- প্রভাত পট্টনায়ক





