সিঁদুরে মেঘে এখন আর কে ডরায়?

রেশন কার্ড, এপিক, অথবা আধার কার্ড গ্রহণে কমিশনের অস্বীকৃতি, অর্থাৎ যে নথিগুলি সাধারণত বেশীরভাগ সাধারণ মানুষের কাছেই থাকে সেগুলিকে মান্যতা দিতে অস্বীকার করাট্যাঁই স্পষ্ট হয়েছে SIR এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকার অর্থপূর্ণ সংশোধন কম ভোটার তালিকা থেকে গণবিযুক্তি বেশী।

যা ঘটেছে তা অনিবার্যই ছিল। বিগত দুসপ্তার ঝোড়ো ঘটনাক্রম গণতন্ত্রের ওপর সংগঠিত আক্রমণের বিষয়টিকে নিয়ে এসেছে তীক্ষ্ণ আলোকবৃত্তের মধ্যিখানে- আক্রমণটি দেখা যাচ্ছে বহুস্তরীয়। একেবারে প্রাথমিক স্তরে, গণতন্ত্র এবং প্রতিনিধিত্ব মূলক সরকারের যা ভিত্তি- সংবিধানপ্রদত্ত জনগণের সেই ভোটাধিকারটি- আজ বিহারের ‘স্পেশাল ইন্সেন্টিভ রিভিশন’ পদ্ধতি বা SIR দ্বারা হুমকির সম্মুখীন। সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারা অন্তর্ঘাত হলো আক্রমণের দ্বিতীয় দিক - ভারতের নির্বাচন কমিশন - বিভিন্ন স্তরে স্বাধীন ভাবে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বটি অর্পিত রয়েছে যাদের ওপর। তৃতীয় স্তরে, খোদ বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ কারচুপির দ্বারা।
প্রাপ্তবয়স্কের সার্বজনীন ভোটাধিকার নীতিটির ওপর আক্রমণের শুরু ভারতের নির্বাচন কমিশনের ২৪ শে জুনের SIR বিষয়ক ঘোষণার মাধ্যমে। SIR এর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পাঠকদের আমরা ইতিপূর্বে অবগত করেছি। যাইহোক, যা সব থেকে আশাব্যঞ্জক, তা হলো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তৎপর ও সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া, বিহার এবং জাতীয় স্তরে। বিরোধীদের যৌথ কার্যক্রমের দীর্ঘ সুপ্তির পর, SIR প্রক্রিয়াই ঐক্যকে করেছে কার্যকর। সমগ্র SIR প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করার জন্য যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন তা যে কোন বোধগম্য অথবা সুসংবদ্ধ সংশোধনী প্রক্রিয়ার পক্ষেই অত্যন্ত কম। SIR এর পিছনে আসল উদ্দেশ্যটি যেমন সহজবোধ্য ছিল তেমনই প্রতিক্রিয়াও এসেছে যথাযথ ভাবে - তাই, ২৫ শে জুনের মধ্যেই বিহারে প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায় এবং দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে দেশ জুড়ে।
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন স্বয়ংক্রিয়তার হ্রস্বমানতা একেবারে প্রথম থেকেই ছিল স্পষ্ট প্রতীয়মান। এই ধরণের একটি ব্যাপক প্রক্রিয়া শুরু করার পূর্বে, কমিশন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে স্বতন্ত্র ভাবে বা যৌথভাবে পরামর্শ করার কোন প্রয়াসই করেনি, যা আসলে দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত প্রথার সরাসরি উল্লঙ্ঘন। অবশ্যই এই উল্লঙ্ঘন কেবলমাত্র অস্বাভাবিক ছিল না বরং এ আসলে নির্দিষ্ট একটি দলের হয়ে করা দলদাস আচরণ। তাই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি যখন প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, এমনকি ভারতের নির্বাচন কমিশনেরও আগে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পক্ষাবলম্বন করতে আসরে নেমে পড়ে বিজেপি।
আবেদনপত্রের সঙ্গে যে ১১টি নথির কোন একটি যুক্ত করার নিদান কমিশন দিয়েছিল তাতেই স্পষ্ট ছিল দরিদ্র নাগরিক, বিশেষত জীবনজীবিকার সন্ধানে ক্রমাগত ভ্রমণ করা প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য প্রক্রিয়াটি কতখানি কঠিন হতে চলেছে। রেশন কার্ড, এপিক, অথবা আধার কার্ড গ্রহণে কমিশনের অস্বীকৃতি, অর্থাৎ যে নথিগুলি সাধারণত বেশীরভাগ সাধারণ মানুষের কাছেই থাকে সেগুলিকে মান্যতা দিতে অস্বীকার করাট্যাঁই স্পষ্ট হয়েছে SIR এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকার অর্থপূর্ণ সংশোধন কম ভোটার তালিকা থেকে গণবিযুক্তি বেশী।
SIR এর মূলগত ধারণাটিই নির্বাচন কমিশন তৈরি হওয়া ইস্তক ভোটার তালিকা নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটির থেকে মৌলিক বিচ্যুতির দৃষ্টান্ত। প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্যই ভোটাধিকার বরাবর ছিল সার্বজনীন এবং নির্বাচন কমিশন ও তার ব্যবস্থপনার মাধ্যমে প্রযুক্ত, ব্যক্তি নাগরিকের ওপর তার নাগরিকত্ব প্রমাণ করার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ছাড়াই। প্রশ্ন উঠলে, কমিশন সংবিধানের ধারা ৩২৬ কে উদ্ধৃত করত যার মূল বক্তব্য সার্বজনীন ভোটাধিকারের নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিকতার ধারণাটি যে ধারার কেন্দ্রবিন্দু নয়। সংবিধানের এই ধারায় কোন প্রেক্ষিতেই নাগরিকত্ব নির্ধারণ বা যাচাইয়ের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়নি। বরং উল্টে, দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত একটি পদ্ধতি রয়েছে যার মাধ্যমে তালিকা থেকে নাম বিযুক্ত করা যায় কেবলমাত্র নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দ্বারা অভিযোগ যাচাইয়ের পরই - স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকই এসমস্ত বিষয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই, বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করে উদ্বেগের এই বিষয়গুলি সম্পর্কে অবগত করেছিল। কমিশন সরাসরি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির এই প্রয়াসকে খতিয়ে দেখতে অস্বীকার করে, দলগুলির জন্য সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হওয়ার শেষ বিকল্পটি বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় রাখেনি - নাগরিকদের সংবিধান প্রদত্ত ভোটাধিকার রক্ষা আর SIR এর সাংবিধান বিরোধী প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করার।
বিষয়টির গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বিহারে ড্রাফট ইলেক্টোরাল রোলস ( DER) প্রকাশিত হওয়ার পর। যাতে দেখা যাচ্ছে ৬৫ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। বিরাট সংখ্যায় নাম বাদ দেওয়া হয়েছে মৃত এবং " নিখোঁজ " ভোটার হিসেবে - এই বিভাগটি, সাধারণ ভাবে বললে, আসলে প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশকে বোঝায়।
বিরাট সংখ্যায় নাম বাদ যাওয়ার সব থেকে বড় প্রশ্নটি এখন উঠে আসছে যে এই নামগুলি বাদ হয়েছে জানুয়ারি ২০২৫ এর সংক্ষিপ্ত সংশোধনের পর, যার নোটিফিকেশন জারি হয়েছিল এপ্রিল - মে তে। এটা আসলে কোন সংশোধনীই ছিল না উল্টে, কার্যত, এটা আসলে নতুন একটি তালিকার সৃষ্টি, যার স্পষ্ট উদ্দেশ্য গণহারে নাম বিযুক্তি। একটিও সংযোজন ভোটার তালিকায় হয়নি, কমিশনের আসল উদ্দেশ্য এ থেকেই উন্মোচিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় কমিশন শুধু ৬৫ লক্ষ ভোটারের নামই বাদ করেনি সঙ্গে যাদের নাম বাদ গেছে তাদের নামের তালিকা এবং বাদ যাওয়ার কারণ প্রকাশ করতেও অস্বীকার করছে। প্রক্রিয়াটির অসচ্চরিত্র এর থেকেই প্রমাণ হয়, এবং সুপ্রিমকোর্ট, তার অন্তর্বর্তী আদেশে, কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে নাম বাদের তালিকা কারণ সহ যন্ত্র - পাঠযোগ্য পদ্ধতিতে প্রকাশ করার। কোর্ট আধার কার্ডকে বসবাসের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করারও নির্দেশ দিয়েছে। তৎসত্ত্বেও, গুরুতর প্রশ্নগুলি রয়েই যাচ্ছে - সর্বোপরি, নির্বাচন কমিশনের কী নাগরিকত্ব যাচাই বা নির্ধারণের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব রয়েছে।
একটি সুবিস্তৃত ধারণা হলো, SIR এর নামে আসলে নির্বাচন কমিশন পিছনের দরজা দিয়ে NRC প্রক্রিয়া শুরু করতে চাইছে। হিন্দুত্ব - তাড়িত ভারতীয় নাগরিকত্বের ধারণায় নবসংজ্ঞায়ন - ধর্মীয় পরিচিতি নির্ভরতার - যোগসূত্রগুলি খুবই স্পষ্ট। আসন্ন নির্বাচনে এগুলো যে প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজের কথাতেই প্রকাশ পেয়েছে তার স্বাধীনতা দিবসের লালকেল্লার ভাষণটিতে, যাতে তিনি তথাকথিত " অনুপ্রবেশকারী" দের বিরুদ্ধে নতুন করে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
SIR এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যগুলি উন্মোচিত হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন সমীক্ষা এবং তথ্য বিশ্লেষণে - এমনকি মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও। লোকনীতি - সিডিএসের নিরীক্ষণে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে SIR এর জন্য প্রয়োজনীয় ১১টির নথি পেশের সংস্থান বিহারের খুব সামান্য সংখ্যক মানুষেরই রয়েছে, প্রধানত রাজ্যটির এই জাতীয় নথি প্রদানের পরিকাঠামো না থাকার কারণেই। অন্য একটি নিরীক্ষণে দেখা গিয়েছে নাম বিযুক্তির আওতায় সবথেকে বেশী এসেছেন মুসলমান এবং মহিলারা, যা আসলে দৃঢ়প্রোথিত সামাজিক অসাম্য এবং সামাজিক স্তরভেদে ক্ষমতায়নের তারতম্যকেই প্রতিফলিত করছে ।
ইতিমধ্যে, একটি বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে - গণপরিসরে থাকা নির্বাচন কমিশনের নিজেদের দেওয়া প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতেই - প্রকাশ পেয়েছে ব্যাঙ্গালোর লোকসভা কেন্দ্রের একটি অংশে অভূতপূর্ব ভোট কারচুপির ঘটনা। এই উন্মোচন নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতায় শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে লোকনীতি - সিডিএসের সমীক্ষা নিশ্চিত করেছে, জনমানসে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাসের বিপুল ঘাটতির বিষয়টিকে।
এরপরেও নির্বাচন কমিশনের যেটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট ছিল, তার ওপর চূড়ান্ত আঘাতটি হেনেছেন নির্বাচন কমিশনার নিজেই, ১৭ই আগস্ট। বিরোধীদের মোকাবিলায় কার্যত দলীয় আনুগত্যপ্রসূত ভূমিকা নিয়ে তিনি পরিবেশন করেছেন একগাদা মিথ্যের সমষ্টি। নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির মধ্যে নির্লজ্জ গাঁটছড়ার এর চেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত আর হয় না।
যুদ্ধটি এখন আপাতত জনতার আদালতে। বিহারের নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষায় ১৭ ই আগস্ট ঘোষিত হয়েছে " ভোট অধিকার যাত্রা ", যা চূড়ান্ত রূপ পাবে ১ সেপ্টেম্বর পাটনায়। মধ্যবর্তী সময়ে, ভারতের সর্বত্র জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে একইসঙ্গে সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ চরিত্র ধ্বংসের বিরুদ্ধে এবং সংবিধান প্রদত্ত জনগণের সবথেকে মূল্যবান অধিকার - ভোটাধিকারকে বিলুপ্ত করতে চাওয়ার প্রয়াসের বিরুদ্ধে।
মূল প্রবন্ধঃ পিপলস ডেমোক্র্যাসি পত্রিকার ১৮-২৪ অগাস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়
বাংলা অনুবাদঃ রাজদীপ বিশ্বাস
বাংলা শিরোনামঃ রাজ্য ওয়েবডেস্কের নিজস্ব
প্রকাশ: ২৭-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 27-Aug-25 16:42 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/chickens-have-come-home-to-roost
Categories: Current Affairs
Tags: constitution, constitutionofindia, democracy, democraticright, republic, secularism, wethepeople
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (147)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





